দশদিগন্তে

মিথ্যাচার দ্বারা ইতিহাসের সত্য ঢাকা দেওয়া যায় না

সিএইচটি-অবজারভার.কম: রোববার ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ :
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক :
মিথ্যাচার দ্বারা ইতিহাসেরসত্য ঢাকা দেওয়া যায় না
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী :

পাগলা মেহেরালির গল্পটি সকলেরই জানা। যা কিছু চোখের সামনে তিনি দেখতেন বলতেন ‘সব ঝুট হায়।’ মেহেরালির চাইতেও বড় পাগলের আমদানি হয়েছিল এক সময় ইংল্যান্ডে। দার্শনিক নামধারী একদল মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল যাদের বলা হতো মায়াবাদী। এই মায়াবাদীরা বলতেন যা কিছু তাদের চারপাশে পরিদৃশ্যমান তার সবকিছুই মিথ্যা। তা চোখের ভ্রম। তাদের এই দর্শনতত্ত্বে কিছু কিছু লোক বিশ্বাস করতেও শুরু করেছিল।

এই মায়াবাদীদের প্রচার যখন তুঙ্গে, তখন ইংল্যান্ডে আরেক দল লোকের আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা মায়াবাদী দার্শনিকদের দেখলেই পেটাতো। মায়াবাদীরা প্রতিবাদ করলেই তারা বলতেন, আপনাদের তো অস্তিত্ব নেই। আপনারাতো মায়া অথবা চোখের ভ্রম। মায়া বা ছায়াকে আবার পেটানো যায় নাকি? এভাবে মায়াবাদ-বিরোধীদের লাঠ্যাষৌধির মুখে ইংল্যান্ডে মায়াবাদী দর্শনের অবসান হয়।
বর্তমানে ইংল্যান্ডে বসবাসরত জিয়াপুত্র তারেক রহমান আবার মায়াবাদী ইতিহাস চর্চা শুরু করেছেন। তার কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সব ঘটনা মিথ্যা। মায়া মরীচীকা। স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়নি। শেখ মুজিব জাতির পিতা নন। তিনি দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতিও ছিলেন না। তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। ইত্যাদি ইত্যাদি। তার লেটেস্ট গবেষণাপ্রসূত মায়াবাদী তত্ত্ব হলো, “বিএনপি ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়নি; আওয়ামী লীগ ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নিয়েছে।”
এই মায়াবাদী ইতিহাসের পাশাপাশি একটি কল্পনানির্ভর ইতিহাসও তৈরি করার চেষ্টা চলছে। এই কল্পিত ইতিহাসের তত্ত্ব হলো, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আন্দোলন-সংগ্রাম দ্বারা নয়, জিয়াউর রহমানের একটি ঘোষণায় দেশ স্বাধীন হয়েছে। জিয়াউর রহমানই দেশের স্বাধীনতার ঘোষক। জিয়াউর রহমান কালুরঘাটের বেতার-ঘোষণায় নিজেকে রাষ্ট্রপতি বলায় তিনিই দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য পঁচিশ বছরের আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা থেকে মুক্তিযুদ্ধ সব কিছু মিথ্যা। একমাত্র সত্য, তারেক রহমানের লন্ডনে বসে মিথ্যার কাসুন্দি ঘাঁটা।
মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে মায়াবাদী দার্শনিকদের বিরুদ্ধে লাঠ্যাষৌধি প্রয়োগের ফলে এই অসত্য দর্শনের অবসান ঘটেছিল। বর্তমান যুগে ইংল্যান্ডে বসে প্রতারিত মিথ্যাশ্রিত মায়াবাদী ইতিহাস চর্চাও বন্ধ করার একমাত্র পন্থা সম্ভবত অনুরূপ লাঠ্যাষৌধি প্রয়োগ। কারণ, যারা বিশ্বাস করে একটা মিথ্যাকে একশোবার বলা হলে তা সত্য হয়ে যায়, যুক্তিতর্ক দ্বারা তাদের কথার প্রতিবাদ করা বৃথা। তারেক রহমান নিজেও জানেন, তার এই ইতিহাস চর্চা মিথ্যাশ্রিত। যেসব ভাড়াটে জামায়াতি স্কলার লন্ডনে বসে তাকে এই মিথ্যার রসদ জোগান দিচ্ছেন (কারণ নিজের বিদ্যাবুদ্ধি দ্বারা মিথ্যা ইতিহাস তৈরি করার যোগ্যতাও তার নেই) তারাও জানেন এই মিথ্যাচার টিকবে না। তবু গরজ বড় বালাই।
বিদেশে বসে প্রকৃত রাজনীতির চর্চাও করা যায়। তারেক রহমান দেশে থাকতে হাওয়া ভবনের অধীশ্বর হিসেবে যা-ই করে থাকুন, দীর্ঘকাল ইংল্যান্ডের মতো একটি সভ্য ও উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে বাস করার পর নিজেকে একজন প্রকৃত রাজনীতিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগটি গ্রহণ করবেন বলে আশা করা গিয়েছিল। দস্যু রত্নাকর যদি সাধনার বলে পরবর্তীকালে মহাপুরুষ হতে পারেন, তাহলে ইচ্ছা থাকলে তারেক রহমান তা হতে পারবেন না কেন?
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তারেক রহমানের সে ইচ্ছা নেই। নিজেকে সংশোধনের চারিত্রিক সততা এবং আগ্রহও তার মধ্যে নেই। বিএনপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে গত ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার পূর্ব লন্ডনে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে (লাগে টাকা দেবে গৌরি সেন) সভা ডেকে যেসব কথা বলেছেন, তাতে বোঝা যায়, টিকটিকি মারা গেলেও তার লেজের লাফালাফি সহজে থামে না।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণের বদলে তারেক রহমানের এই অনবরত মিথ্যাশ্রয়ী অতীত ইতিহাস চর্চা কেন? তার একটি ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জেনেছি, তারেক রহমান তার রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ নিয়ে এখন অত্যন্ত ভীত। দেশে বিএনপি’তে চলেছে অস্থির অবস্থা। দলের প্রবীণ নেতারা দলে তারেক রহমানের একাধিপত্য মানতে আর রাজি নন। ব্রিটেনেও দলের পুরনো শিখণ্ডীকে আবার সামনে খাড়া করেও বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ ও খাড়া রাখা যাচ্ছে না। তারেক রহমান জেলে যাওয়ার ভয়ে দেশে ফিরতে পারছেন না, আবার বিলাতেও তার পায়ের তলা থেকে রাজনীতির মাটি সরে যাচ্ছে। তিনি শঙ্কিত এই ভেবে যে, বিএনপি’র রাজনীতিতেও তিনি সম্ভবত মাইনাস হতে যাচ্ছেন। তাই বার বার মরিয়া হয়ে এমন কাজ করতে চান, এমন কথা বলতে চান, যাতে তার নামটা আবার বিতর্কে ও আলোচনায় উঠে আসে। তিনি যেন আবার গুরুত্ব ফিরে পান।
সেজন্যেই আজ তার এই পাগলা মেহেরালির অবস্থা। সবসময় মুখে একটি কথা সব ঝুট হায়। তার সাম্প্রতিক ইতিহাস চর্চা এতোই মিথ্যাশ্রিত যে অনেকে মনে করেন তা নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। কারণ, এই আলোচনা দ্বারা মিথ্যাচারকেই গুরুত্ব দেয়া হবে। তবু তার ডাহা মিথ্যাগুলোর মুখোশ খুলে দেওয়া এজন্যই দরকার যে, নইলে নতুন প্রজন্ম তার দ্বারা বিভ্রান্ত হতে পারে। যেমন বিএনপি’র ৩৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে পূর্ব লন্ডনের সভায় তারেক রহমান বলেছেন, ‘‘১৯৭৮ সালে বিএনপি’র জন্ম হয়েছিল সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে। বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বরং আওয়ামী লীগসহ ২১টি দলের পুনর্জন্ম হয়েছিল ১৯৭৬ সালে ক্যান্টনমেন্টে।
তারেক রহমান আরো বলেন, ‘যারা বিএনপিকে সেনা ছাউনিতে জন্ম নেওয়া দল বলেন, তারা মিথ্যাচার করছেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর। এর বিপরীতে দেখা যায় জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে দেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে এক দলীয় বাকশাল গঠন করায় দেশে তখন কোনো রাজনৈতিক দল ছিলো না। এই অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোকে আবেদন করে স্বনামে রাজনীতি করার সুযোগ দেন তিনি। আওয়ামী লীগসহ ২১টি দল জিয়াউর রহমানের কাছে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের আবেদন জানায়। জিয়াউর রহমান সেই আবেদন মঞ্জুর করার পর ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাস থেকে আওয়ামী লীগসহ রাজনৈতিক দলগুলো স্বনামে রাজনীতি করা শুরু করে। সুতরাং বলা চলে বিএনপি নয় বরং আওয়ামী লীগসহ সেই ২১টি দলেরই পুনর্জন্ম ক্যান্টমেন্টে।’
যারা এই মিথ্যাটাকে তারেক রহমানের কণ্ঠে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, তারা তাকে গুছিয়ে মিথ্যা বলা শেখাননি। ফলে এই গোয়েবলসীয় তত্ত্বটি সত্যের আলোকে টেকে না। তারেক রহমান এতো মিথ্যার মধ্যে একটি সত্য কথা বলেছেন। জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি গঠন করেন, তখন ছিলেন দেশের ক্ষমতা দখলকারী প্রেসিডেন্ট। যে কথাটি তারেক বলেননি, সে কথা হলো এই ক্ষমতার বলেই তিনি ক্যান্টনমেন্টে বসে ডিজিআইএফের সহায়তায় বিএনপি গঠন করেছিলেন।
এই ব্যাপারে তিনি তার মন্ত্রগুরু পাকিস্তানের জেনারেল আইয়ুব খানের কৌশলটি নিখুঁতভাবে অনুসরণ করেন। প্রেসিডেন্ট পদে বসার পর তিনি আইয়ুবের কায়দায় হ্যা ও না লেখা একটা কালো বাক্স মারফত গণভোটের প্রহসন করেছিলেন। অর্থাত্ তার সঙ্গে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। কেবল হ্যা ও না লেখা বাক্সে ভোট দিতে পারবে। এই প্রহসনেও আইয়ুবের মতো তিনি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী দ্বারা হ্যা লেখা বাক্স জালভোট দ্বারা ভর্তি করেন।
অতঃপর আইয়ুব যেমন মুসলিম লীগ ভেঙে তাদের একদল নেতা ও কর্মীকে ভাগিয়ে এনে কনভেনশন মুসলিম লীগ তৈরি করেছিলেন, জিয়াউর রহমান তেমনি আওয়ামী লীগ থেকে কিছু সুবিধাবাদী নেতাকে (যেমন মিজানুর রহমান চৌধুরী, সোহরাব হোসেন, ইউসুফ আলী প্রমুখ) ভাগিয়ে এনে সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগ গঠন করে ওই দলকে তার অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধ করার কাজে লাগাতে চেয়েছেন। আইয়ুব খান মুসলিম লীগ ভাঙতে পেরেছিলেন, জিয়াউর রহমান শত ষড়যন্ত্র করেও আওয়ামী লীগ ভাঙতে পারেননি। তখন তিনি বহুধা বিভক্ত ভাসানী ন্যাপের দিকে নজর দেন। ওই ন্যাপের নেতা মশিউর রহমান জাদু মিয়া, ইউপিপির কাজী জাফর প্রমুখের সহায়তায় দলছুট সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের নিয়ে একটি দল গঠনের চেষ্টা করেন।
কিন্তু কেবল ভাসানী ন্যাপের দলছুটদের শক্তির উপর আস্থা রাখতে না পারায় তিনি স্বাধীনতার শত্রু-দলগুলো, যেমন নিষিদ্ধ ঘোষিত মুসলিম লীগ, জামায়াত থেকে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। এজন্যে সাম্প্রদায়িক দলগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসান। ’৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল শত্রু জামায়াতের নেতা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে পাকিস্তানের পাসপোর্টসহ বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেন। এই ভাবে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর সহায়তায় স্বাধীনতার যুদ্ধবিরোধী শিবির থেকে সুবিধাবাদী নেতাদের মন্ত্রিত্বের টোপ দেখিয়ে দলে টেনে বিএনপি দলটি খাড়া করেন। এই দল গঠন যদি গণতান্ত্রিক উপায়ে হয়ে থাকে, তাহলে পাকিস্তানে জেনারেল আইয়ুবের কনভেনশন মুসলিম লীগও ছিল গণতান্ত্রিক পন্থায় গঠিত দল।
জিয়াউর রহমান কি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন? এই প্রশ্নের জবাবে বলা চলে, হ্যা, তিনি জনগণের সরাসরি ভোটের প্রহসনে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। কর্ণেল তাহেরকে হত্যা এবং তার গণবাহিনীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জিয়াউর রহমান প্রথম অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসেন। তারপর কালো বাক্সের গণভোট প্রহসনে নিজের অবৈধ প্রেসিডেন্টগিরিকে বৈধতা দানের চেষ্টা করেন। তার পর করেন প্রেসিডেন্ট পদে জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিয়াউর রহমানের জয়লাভ সম্পর্কে তখন লন্ডনে ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় রিপোর্টে বলা হয়েছিল, “নির্বাচনের ভোট গণণার প্রথম দিকে দেখা যায়, জেনারেল ওসমানীর পক্ষে একচেটিয়া ভোট পড়েছে। এরপর সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ভোট গণনা কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন। তারপরই ভোট গণনার ধারা বদলে যায়। দেখা যায়, জিয়াউর রহমান এখন একচেটিয়া ভোট পাচ্ছেন।” পাকিস্তানের “ডেইলি নিউজ” পত্রিকায় মন্তব্য করা হয়েছিল, “প্রেসিডেন্ট পদে মোহতারেমা ফাতেমা জিন্নার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যে কৌশলে আইয়ুব খান জয়ী হয়েছিলেন, সেই একই কায়দায় বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন জিয়াউর রহমান।”
তারেক রহমান দাবি করেছেন, ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। দেশে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে ২১টি দলের আবেদনক্রমে তাদের রাজনীতি করার অনুমতি দেন। সুতরাং আওয়ামী লীগসহ ২১টি দলের পুনর্জন্ম ক্যান্টনমেন্টে।” এই উক্তিটিও স্বজ্ঞান প্রসূত একটি মিথ্যা উক্তি এবং ইতিহাস-বিকৃতি। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব দেশের প্রধান চারটি দল আওয়ামী লীগ, সিপিবি, ন্যাপ (মোজাফ্ফর) ও গণতন্ত্রী দলকে নিষিদ্ধ করেননি। তারা স্বেচ্ছায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাকশাল গঠন করেছিলেন। মুসলিম লীগ, জামায়াত, নেজামে ইসলামি ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক দল দেশ স্বাধীন হওয়ার পরই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। জিয়াউর রহমানই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর দেশে বন্দুকের জোরে সকল রাজনৈতিক তত্পরতা নিষিদ্ধ করেন।
পরে তিনি বিশ্বজনমতের চাপে সকল দলকে প্রথমে ঘরোয়া রাজনীতি এবং আরো পরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক তত্পরতা চালানোর অনুমতি দেন। কিন্তু দেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তিকে খর্ব করার জন্য স্বাধীনতা-বিরোধী সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দলগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। অবৈধভাবে সংবিধান সংশোধন করে তার ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্র ধ্বংস করেন। আওয়ামী লীগসহ যে গণতান্ত্রিক দলগুলো দেশে আগে থাকতেই ছিল এবং জিয়াউর রহমান যাদের তত্পরতা নিষিদ্ধ করেছিলেন, নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর তাদের আবার বাকশাল-পূর্ব নামে তত্পরতা শুরু করা কি ক্যান্টনমেন্টে পুনর্জন্ম নেওয়া? যে জন্মটি নিয়েছে বিএনপি এবং পরবর্তীকালে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি। দেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দল সামরিক ছাউনিতে সামরিক নেতার ঔরসে জন্ম নেয়নি।
তারেক রহমানের আজগুবি তত্ত্ব মানতে গেলে বলতে হবে ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত ভারতে কংগ্রেস দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৪৫ সালে এই নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় এবং কংগ্রেস আবার প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তত্পরতা শুরু করে। তার অর্থ কি ব্রিটিশ রাজের কৃপায় দিল্লির ক্যান্টনমেন্টে কংগ্রেস দলের পুনর্জন্ম হয়েছিল? একইভাবে পাকিস্তানে আইয়ুব খান আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, মুসলিম লীগসহ সকল রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক তত্পরতা নিষিদ্ধ করেছিলেন। এই নিষেধাজ্ঞা পরে তিনি প্রত্যাহার করেন। তার অর্থ কি এই যে, রাওয়ালপিন্ডির ক্যান্টনমেন্টে আইয়ুবের দ্বারা এই রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্জন্ম হয়েছে? পাকিস্তানে এখনো আদি মুসলিম লীগকে কেউ ক্যান্টনমেন্টের দল বলে না, কিন্তু আইয়ুবের কনভেনশন মুসলিম লীগকে বলে ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া দল। এই দুই মুসলিম লীগের পার্থক্যটা বোঝার বিদ্যাবুদ্ধি তারেক রহমানের আছে কি?
তারেক রহমান লন্ডনের সভায় বলেছেন, “তাদের আন্দোলন বৃথা যাবে না।” খুব ভালো কথা। কিন্তু তারা যা করছেন তা কি আন্দোলন? লন্ডনের সভায় বসে মিথ্যাশ্রয়ী ইতিহাস-চর্চা আর দেশে পেট্রোল বোমায় নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারা কি আন্দোলন? এই আন্দোলন করতে গিয়েই বিএনপি’র রাজনীতিতে আজ এই ধস নেমেছে। বিলাতে বসে ইতিহাস-বিকৃতি ও মিথ্যাচার দ্বারা এই ধস থামানো যাবে না। বরং লোক হাসানো যাবে। তারেক রহমানের সব চাইতে বড় শত্রু তার জিহ্বা। তিনি এই জিহ্বা সংযত করুন।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment