চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ, শেখ হাসিনা

সিএইচটি-অবজারভার.কম: সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫ :

চ্যাম্পিয়ন মানে অনেকের মধ্যে সেরা। আর চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ, ধরিত্রীর সেরা। ধরিত্রী মাতার জন্য কাজ করে, ধরিত্রীকে সুন্দর রাখতে নিজেকে নিয়োজিত করে এই অভিধা জয় করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি দেশ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সামান্যতম দায়ী না হয়েও তার সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে; যখন বিশ্বের বড় বড় দেশ তাদের উন্নয়নের বিনিময়ে ধরিত্রীকে এই মহাহুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে; তখন কাউকে দোষারোপ করে নয়, বরং উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণকেই সবচেয়ে বড় কাজ হিসেবে দেখছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বের কাছে সেটা বিষ্ময়ের, সেটাই প্রশংসার।

অন্যরা কী করবে তা নিয়ে শেখ হাসিনা যতটা ভাবছেন তার চেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছেন নিজেরা কি করা যায়। কার্বন নিঃসরণ, যা মূলতঃ এই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী, কমিয়ে আনতে বিশ্ব ঐক্যমত্যের কথা বলছেন। বিশ্ব ফোরামে তার উচ্চকিত কণ্ঠই বেশি শোনা যায়।

দায়ীদেরই কাছে ধর্না ধরে, তারা কি করবেন সে দিকে তাকিয়ে না থেকে শেখ হাসিনা নিজেই নিচ্ছেন নিজেদের ব্যবস্থা। গঠন করেছেন নিজস্ব ট্রাস্ট ফান্ড। আর তা দিয়ে নিচ্ছেন প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা। এটাই চ্যাম্পিয়নের কাজ। আর সে কারণেই চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থদের একজন তিনি।

রোববার নিউইয়র্কে বিশ্বের নানা দেশের শীর্ষ নেতাদের সামনে ভূষিত করা হলো সেই পুরস্কারে। আর পুরস্কার হাতে নিয়ে শেখ হাসিনা সেই কথাটিই বললেন, যা বিশ্ব এখন শুনতে চায়। তিনি বললেন, আসুন আমরা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বিশ্বকে বাসযোগ্য করি।

আর পুরস্কার হাতে পেয়ে দেশবাসীর কথা বলতে ভোলেননি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ, আর সমস্যা সমাধানে নিজস্ব উদ্ভাবনী ব্যবস্থাই  জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ফল বয়ে আনছে।

বাংলাদেশে এরই মধ্যে ৪০ লাখ সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরাই হতে চলেছি বিশ্বের প্রথম ‘সোলার নেশন’। শেখ হাসিনা বিশ্বফোরামকে আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের পরেও দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে, ফলে নিশ্চিত হয়েছে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা। এ উন্নয়নের আরেক বিস্ময়!

বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যেহেতু সকলের ভবিষ্যতের কথা বলছি, তাই আমাদের দিক থেকে ধরিত্রীর পরিবেশ রক্ষায় আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কারকে বাংলাদেশের মানুষ জলবায়ূ পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যে অব্যহত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তারই স্বীকৃতি। তাই দেশের মানুষের পক্ষ থেকেই আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করছি, বলেন শেখ হাসিনা।

জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কর্মসূচি শেখ হাসিনাকে দেওয়া এই পুরস্কারের ঘোষণায় তাকে জলবায়ূ পরিবর্তন ইস্যুতে সামনের সারির অনন্য সাধারণ নেতৃত্ব বলে উল্লেখ করেছে। পরিবেশ সচেতন নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ আর ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করতে শেখ হাসিনার যে উদ্যোগ তার প্রশংসা করা হয়েছে এই ঘোষণায়।

বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ যে জলবায়ূ পরিবর্তন সংক্রান্ত কৌশল ও কর্ম পরিকল্পনা নেয় তা বিশ্বময় প্রশংসিত। বাংলাদেশই উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রথম এমন সমন্বিত কর্ম পরিকল্পনা নিয়েছে। আর বাংলাদেশই বিশ্বের প্রথম যে তার নিজস্ব জলবায়ূ পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে স্রেফ নিজস্ব অর্থায়নে এই ফান্ড ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমান প্রায় ২৪০০ কোটি টাকা। উপরন্তু বার্ষিক বাজেটের ৬ থেকে ৭ শতাংশ জলবায়ূ পরিবর্তন খাতে বরাদ্দ রাখার ঘোষণা ও তার বাস্তবায়ন শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন।

বর্তমান ও ভবিষ্যত নাগরিকের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র, বনাঞ্চল, আর বন্যপ্রাণি সম্পদ সুরক্ষার লক্ষ্যে ২০১১ সালে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নে সংবিধান সংশোধন করে শেখ হাসিনার সরকার। আর তারই আলোকে দেশের বনাঞ্চল রক্ষায় ২০০৯ সাল থেকে অন্তত আটটি নতুন আইন প্রণীত কিংবা সংশোধিত হয়েছে।

একটি হিসাবে দেখা গেছে ২০১৪-১৫ সালে দেশের বনাঞ্চল ১৭.০৮ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে যা ২০০৫-০৬ সালে ছিলো ৭ থেকে ৮ শতাংশ।

এটা শেখ হাসিনার আরেকটি যুগোপযোগী উদ্যোগেরই ফসল। যার নাম দেওয়া হয়েছে সামাজিক বনায়ন। দেশের শহর ও গ্রাম উভয়াঞ্চলে সম্ভাব্য প্রতিটি স্থানে গাছ লাগানো ও বড় করে তোলার উদ্যোগ রয়েছে এই কর্মসূচিতে। প্রতিটি বাড়িতে বছরে একটি ফলজ, একটি বনজ ও একটি ঔষধি গাছ লাগানোকে দেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক আচারে পরিণত করার এই উদ্যোগও বিশ্বজুড়ে আজ প্রশংসিত।

আরেকটি হিসেবে দেখানো হয়েছে প্রতি বছর দেশের মানুষের মাঝে ১২ কোটি গাছের চারা বিতরণ করা হচ্ছে, যার সংখ্যা ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল সময়ে ছিলো মাত্র চার কোটি।

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঘন-জনবসতির দেশগুলোর একটি (প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,২১৮ জন), আর মাথাপিছু চাষযোগ্য জমি সবচেয়ে কম (০.০৫ হেক্টর)। জলোচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মতো আবহাওয়ার চরম বৈরি আচরণ জলবায়ু পরিবর্তনেরই প্রভাব। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, শিল্পোন্নয়ন আর সামাজিক অবকাঠামো।

তবে জলবায়ূ পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে আসছে। গবেষণাগুলো বলছে সমুদ্রের স্তর আর এক মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে চলে যাবে।এর ফলে সৃষ্টি হবে কোটি কোটি পরিবেশ-উদ্বাস্তু। জরুরি ব্যবস্থা না নিলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকবে।যা প্রভাব ফেলবে মানুষের জীবন, জীবিকায় ও জীব ও পরিবেশ বৈচিত্র্যে।

পুরস্কার হাতে নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এসব কারণেই আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)র অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে গুরুত্ব দিচ্ছি। নভেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় কপ-২১ এ জলবায়ু চুক্তি গ্রহণ ও সঠিক বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে চাই।

এ বছর এই পুরস্কারে আরও ভূষিত করা হয়েছে ভিশনারি উদ্যোক্তা হিসেবে ইউনিলিভারের সিইও পল পোলম্যানকে, টেকসই উৎপাদনের পথিকৃৎ ন্যাচুরা ব্রাসিলকে, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটিকে এবং উদ্দীপনা ও কর্মোদ্যোগে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাণী শিকার প্রতিরোধকারী সংগঠন ব্ল্যাক মামবা এপিইউকে।

শেখ হাসিনা এর আগেও জয় করেছেন জাতিসংঘের অপর সংস্থা ইউনেস্কোর উফুয়ে বোইনি শান্তি পুরস্কার ১৯৯৮, পার্ল বাক অ্যাওয়ার্ড ১৯৯৯, ফাও’র কেরেস মেডাল, ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার ২০০৯ ও গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভেলপমেন্ট এক্সপো অ্যাওয়ার্ড-২০১৪।

জাতিসংঘের এই ঘোষণায় শেখ হাসিনাকে বিশ্ব নেতৃত্বের সামনে একজন উপমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা তার বাবা, মা ও তিন ভাই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর শত প্রতিকূলতার মধ্যেও যেভাবে নিজেকে দৃঢ় রেখে সামনে এগিয়ে গেছেন সে কথা উল্লেখ করা হয়েছে এই ঘোষণায়।

বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন পরিবেশ রক্ষায় বিনিয়োগ করলে তার মধ্য দিয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।

২০৩০ সালের জন্য যে টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা গৃহীত হয়েছে তার প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার মতো এমন নেতৃত্ব প্রশংসা ও স্বীকৃতি পেতেই থাকবেন।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment