জঙ্গি সমস্যা : শেখ হাসিনা ও সজীব জয়ের হুশিয়ারি

সিএইচটি-অবজারভার.কম: সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫ :

সূত্র : যুগান্তর ;

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

Joyলন্ডনের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং ‘ওয়াশিংটন টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি প্রবন্ধ দেশে এবং বিদেশের বিভিন্ন মহলে বেশ ভালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। হাসিনা এবং সজীব জয় দুজনেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন। শেখ হাসিনা বিশেষভাবে ব্রিটেনে এই মৌলবাদী জঙ্গিদের শক্ত ঘাঁটি থাকার উল্লেখ করে তাদের তৎপরতা সম্পর্কে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

ওয়াশিংটন টাইমসে প্রকাশিত সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘আনমাস্কিং টেরোরিস্ট ইন বাংলাদেশ’ বা বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের মুখোশ উন্মোন। এই প্রবন্ধে জয় জামায়াতের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন, ‘বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের উত্থানের জন্য জামায়াত দায়ী।’ জয় স্পষ্টই বলেছেন, ‘আল কায়দাকে সহায়তাদানকারী জামায়াতকে একটি বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিধা থাকা উচিত নয়।’

লন্ডনে গার্ডিয়ানকে দেয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং প্রায় একই সময়ে একটি মার্কিন দৈনিকে প্রকাশিত শেখ হাসিনার পুত্র এবং তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদের নিবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের মাটি থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে হলে বিদেশের মাটিতে তাদের যে শক্ত ঘাঁটিগুলো রয়েছে তার উচ্ছেদ সর্বাগ্রে প্রয়োজন। কারণ এসব ঘাঁটি থেকেই বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্য অর্থ ও অন্যান্য সাহায্য পাঠানো হয়। এই ব্যাপারে পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশের জামায়াতিরা যে একটি শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে তা আজ সর্বজনবিদিত।

এটা এখন কে না জানে ব্রিটিশ জিহাদিস্টদের মূল যোগাযোগ বাংলাদেশের জামায়াতের সঙ্গে। দেশটিতে মৌলবাদের উত্থানে তারা মদদ দিচ্ছে। তারা তরুণদের আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলছে। ধর্মপ্রচারের নামে ব্রিটেনে জামায়াত সমর্থকরা বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে তা বাংলাদেশে জামায়াত ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্য পাঠাচ্ছে। সালাফি গোষ্ঠীতে বাংলাদেশী সদস্য বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। বাংলাদেশে মুক্তচিন্তায় ব্লগারদের হত্যার ব্যাপারেও অভিযুক্ত তৌহিদুর রহমান ব্রিটিশ নাগরিক এবং সম্প্রতি তাকে ঢাকায় গ্রেফতার করা হয়েছে।

পূর্ব লন্ডনে এখন নানা ধর্মীয় সংগঠনের নামের আড়ালে জামায়াতিরা রাজনৈতিকভাবে তৎপর এবং অত্যন্ত শক্তিশালী। ব্রিটেনের দুটি প্রধান মেইনস্ট্রিম রাজনৈতিক দলের একটি লেবার পার্টি। বহুকাল ধরে পূর্ব লন্ডনে বাঙালিসহ এথনিক কমিউনিটির মধ্যে ছিল লেবার পার্টির একচেটিয়া প্রভাব। জামায়াতিরা সেই প্রভাব ভাঙতে সমর্থ হয়েছিল এবং তাদের সমর্থিত টাওয়ার হ্যামলেটস বার কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র পদে লুতফুর রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর তার কার্যকলাপে কেউ কেউ এই কাউন্সিলকে ‘ইসলামিক স্টেট অব টাওয়ার হ্যামলেটস’ বলতে শুরু করেছিলেন।

জামায়াতিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লুতফুর রহমান এমন সব কাজকর্মে লিপ্ত হন, যাতে আদালতে অভিযুক্ত হন এবং মেয়র পদ থেকে অপসারিত হন। ব্রিটিশ ভূখণ্ডে এবং ব্রিটিশ রাজনীতিতে জামায়াতের এই হুমকি সম্পর্কে ক্যামেরন সরকার অনেক বিলম্বে সচেতন হন এবং মসজিদে ও স্কুল-কলেজে মৌলবাদীদের অনুপ্রবেশ এবং ঘাঁটি স্থাপনের তৎপরতা বন্ধ করার জন্য সম্প্রতি কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ব্রিটেন থেকে আইএসতে যোগদানের জন্য বহু তরুণ-তরুণী সিরিয়ায় গমন করায় শেষ পর্যন্ত ক্যামেরন সরকারের টনক নড়েছে। সিরিয়ায় গমনকারী ব্রিটিশ তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেশকিছু বাংলাদেশী থাকায় ব্রিটেনের বাংলাদেশী পিতা-মাতা ও অভিভাবকরাও শংকিত।

অনেকেই মনে করেন এই জিহাদিস্টদের অর্থ ও সমর্থন লাভের যে উৎস রয়েছে ব্রিটেনে সেগুলোর উচ্ছেদ সাধনে ব্রিটিশ সরকারের তৎপরতা যথেষ্ট নয়। ফলে এই জিহাদিস্টদের রিক্রুুট এখনও ব্রিটেনে চলছে এবং তাদের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে। বাংলাদেশেও তারা যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা আঁটছে। এই জঙ্গি তৎপরতা বাংলাদেশেও নির্মূল করতে হলে ব্রিটেনের সহযোগিতা প্রয়োজন এবং শেখ হাসিনা সেই সহযোগিতা লাভের জন্যই ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

‘গার্ডিয়ান’কে দেয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য এতই স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল যে তার কোনো দ্বিতীয় অর্থ খোঁজা বাতুলতা। কিন্তু বিএনপিকে এই বাতুলতায় পেয়ে বসেছে। ‘গার্ডিয়ান’কে দেয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য সম্পর্কে তারা বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ব্রিটেনের গোটা বাংলাদেশী কমিউনিটিকেই জিহাদিস্ট বা জঙ্গিবাদী সাজানোর চেষ্টা করেছেন।’ ব্রিটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যে জামায়াতিরা শক্ত ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা করছে এবং অর্থ ও অন্যান্য সাহায্য বাংলাদেশের জামায়াতিদের কাছে পাঠাচ্ছে এই প্রমাণিত সত্যটি উচ্চারণ করা কি গোটা বাংলাদেশী কমিউনিটিকে জঙ্গিবাদী বলা? এই মিথ্যা প্রচারণায় অভ্যাসটি বিএনপির আজকের নয়, বহুদিনের। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান একটি বড় ধরনের জাতীয় সমস্যা। এ সমস্যা দূর করার ব্যাপারেও বিএনপির কোনো জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি নেই। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তারা বড় ধরনের জাতীয় সমস্যাকেও তুচ্ছ করতে পারে।

এই মনোভাবের পরিচয় বিএনপি আগেও দিয়েছে। আফগানিস্তানে আমেরিকা ‘ওয়ার অন টেরোরিজমের’ নামে তালেবানবিরোধী যুদ্ধে নামার পর যখন বহু জঙ্গি তালেবান নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাকিস্তান হয়ে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের সহায়তায় বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ শুরু করে তখন ইউরোপের কয়েকটি প্রধান সংবাদপত্র এ সম্পর্কে খবর ছাপে এবং শেখ হাসিনা বাংলাদেশে মৌলবাদী জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। তখন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানান এবং বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো মৌলবাদী নেই। হাসিনা দেশে মৌলবাদী আছে প্রচার চালিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন।’ বেগম জিয়ার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একই দিনে সম্পাদকীয় লিখে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার শেখ হাসিনা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন বলে অভিযোগ তোলেন, তারপর বেশিদিন যায়নি। বাংলাদেশে যখন বাংলা ভাইদের উত্থান ঘটল এবং জঙ্গিবাদীদের সংহারমূর্তি দেখা গেল, প্রথম আলো এবং স্টার দুই পত্রিকাই একেবারে নিশ্চুপ। কিল খেয়ে কিল হজম করাই হয়তো তাদের সাংবাদিকতার আদর্শ।

এবারও শেখ হাসিনা বাংলাদেশে জঙ্গি সমস্যা সম্পর্কে বিদেশী নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সময়োচিত কাজ করেছেন। তার সরকার জঙ্গি তৎপরতা অনেকটাই দমন করেছেন, কিন্তু তাদের পুরোপুরি উচ্ছেদ ঘটাতে পারেনি। তার প্রধান কারণ, তাদের অর্থ ও শক্তির উৎস বিদেশের মাটিতে। এ উৎস বন্ধ করার জন্যই তিনি ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অন্যদিকে সজীব ওয়াজেদ জয় সতর্ক করেছেন ওয়াশিংটনকে।

বাংলাদেশে জামায়াত শুধু স্বাধীনতার শত্রু নয়, সব মৌলবাদী সন্ত্রাসেরও উৎস। এ সত্যটা আমেরিকা বহুদিন স্বীকার করতে চায়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মার্কিন দূত ঢাকায় এসেছেন এবং জামায়াতকে মডারেট ইসলামী দল বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। বিএনপির কাঁধে চেপে এ ফ্যাসিস্ট দলটি বাংলাদেশে ক্ষমতায় বসার পরও জামায়াতের আসল চরিত্র সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসনের হুঁশ হয়নি। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর আমেরিকার টনক নড়ে এবং ধীরে ধীরে আল কায়দার সঙ্গে বাংলাদেশের জামায়াতের গোপন সংস্রব তাদের চোখে ধরা পড়ে। তারপরও আমেরিকা জামায়াতকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে এ সম্পর্কে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে আগ্রহ দেখায়নি।

সজীব জয় ওয়াশিংটন টাইমসে প্রবন্ধ লিখে এ সম্পর্কে ওবামা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি সময়োচিত কাজ করেছেন। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশে জামায়াত, হেফাজত প্রভৃতি মৌলবাদী দলের সঙ্গে আপস করে চলার একটা প্রবণতা আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে রয়েছে। এ ধারণাটি যে সর্বাংশে সঠিক নয়, তার প্রমাণ গার্ডিয়ানকে দেয়া শেখ হাসিনার মন্তব্য এবং ওয়াশিংটন টাইমসে প্রকাশিত সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রবন্ধ। দুজনেই অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জঙ্গিবাদ জন্ম দেয়া ও তার লালনে জামায়াতের ভূমিকা তুলে ধরেছেন এবং এই জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে ব্রিটেন ও আমেরিকার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র দুটিকে তাদের ইতিকর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

জঙ্গি মৌলবাদ এখন একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বৈশ্বিক সমস্যা। আঞ্চলিকভাবে এই সমস্যা দূর করার কাজে হাসিনা সরকার যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে পারেনি। কারণ তার শিকড় বিদেশেও সম্প্রসারিত। তথাকথিত ইসলামিক স্টেট এখন সিরিয়া ও ইরাকের যে বিশাল ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে তার আয়তন ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের চেয়েও বড়। তাদের লক্ষ্য এখন উপমহাদেশের দিকেও। একা উপমহাদেশের কোনো দেশ এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত উদ্যোগ ও তৎপরতা প্রয়োজন।

শেখ হাসিনা ও সজীব জয় দুজনেই এই প্রয়োজনীয়তার দিকে বিশ্বের দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকে তাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভালো কাজ করেছেন। ইরাকে বা সিরিয়ায় জঙ্গি দমনের নামে বোমা হামলা চালিয়ে কোনো লাভ হবে না। তাতে নিরীহ সাধারণ মানুষ মারা যাবে এবং যাচ্ছে। জঙ্গি ও জিহাদিস্ট দমনের জন্য বৈশ্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। ছোট দেশগুলোর সঙ্গে বড় দেশগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। আমেরিকা ও ব্রিটেন এই দুটি দেশই সন্ত্রাসবাদের উচ্ছেদ চায় না; চায় এই সন্ত্রাসবাদকে তাদের স্বার্থ ও আধিপত্য রক্ষায় কাজে লাগাতে। সমস্যার মূলও এখানেই। শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয় তাই এই দুটি দেশকেই জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে তাদের করণীয় সম্পর্কে সজাগ করার চেষ্টা চালিয়ে সময়োচিত কাজ করেছেন।

বাংলাদেশ ছোট দেশ হতে পারে; কিন্তু তার বক্তব্য একটি বৈশ্বিক সমস্যা সম্পর্কেই।

লন্ডন, ২৭ সেপ্টেম্বর, রোববার ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment