র‌্যাবের কার্যক্রমের লাগাম টেনে ধরা দরকার

সিএইচটি-অবজারভার.কম : সোমবার ০৫ অক্টোবর ২০১৫ :
সূত্র : যুগান্তর ;
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সহকারী পরিচালক ওমর সিরাজের র‌্যাবের হাতে রিমান্ডে থাকার সময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া এবং হৃদরোগ হাসপাতালে তার মৃত্যু র‌্যাবের ক্রেডিবিলিটিকে আবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। র‌্যাব অবশ্য কারণ দর্শিয়েছে যে, রিমান্ডে থাকার সময় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হলেও তিনি মারা যান। অন্যদিকে তার দেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং তার স্ত্রী দাবি করেছেন, র‌্যাবের হাতে নির্যাতনের ফলেই তিনি মারা গেছেন। স্বামীর মৃতদেহের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জানার পরই তিনি র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওমর সিরাজ সম্প্রতি নানা দুর্নীতির অভিযোগে আরও দুজনসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। অভিযোগ, তিনি মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা, সহকারী জজ নিয়োগ ও কৃষি ব্যাংকে লোক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রের অন্যতম হোতা। এই অভিযোগেই তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে থাকার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যু ঘটে।

ওমর সিরাজের বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৩ বছর। তিনি সুস্থ-সবল ছিলেন বলেই পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ইতিপূর্বে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ব্যাপারে র‌্যাব গুরুতরভাবে ক্রেডিবিলিটি হারায়। সন্ত্রাস দমন করতে গিয়ে ক্রসফায়ারে অনেক অভিযুক্ত সন্ত্রাসীর মৃত্যুর ব্যাপারেও জনমনে সন্দেহ বাড়ছিল, তথাপি গোড়ার দিকে এই ক্রসফায়ারে সন্ত্রাসীদের মৃত্যুর খবর দেশের মানুষ এজন্যই মেনে নিয়েছিল যে, সন্ত্রাস এখন দেশে সত্যি সত্যিই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল।

তারপর দিনের পর দিন যতই ক্রসফায়ারে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে ততই জনমনে এ খবরের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহও বাড়তে থাকে এবং দেশের অনেক বিশিষ্ট জনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ও আইনি সংস্থা একে বিচার বহির্ভূত হত্যা আখ্যা দিয়ে তা বন্ধ করার দাবি জানায়। কেউ কেউ র‌্যাব বিলোপের দাবিও তোলেন। তবে দাবিটি জনমতের ব্যাপক আনুকূল্য লাভ করেনি এবং সরকারও এই দাবি পূরণের আগ্রহ দেখায়নি।

র‌্যাব বা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন তৈরি হয় বিগত বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে। সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যেই সংস্থাটি গড়ে তোলা হয়েছিল। ক্রসফায়ারে মৃত্যুও শুরু হয় বিএনপির ক্ষমতায় থাকার জমানাতেই। অনেকে মনে করেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে র‌্যাব তুলে দেবে অথবা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করবে। আওয়ামী লীগ তার কোনোটাই করেনি। র‌্যাব তুলে দেয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও ছিল না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে ক্রম বর্ধিষ্ণু সন্ত্রাস দমনের জন্য র‌্যাব সংস্থাটি বহাল রাখা হয় এবং তার কার্যক্রম বন্ধ করা হয়নি।

র‌্যাব তুলে দেয়া হোক এ দাবিটি আগেও জনদাবি ছিল না। এখনও নেই। দেশে ব্যক্তি-সন্ত্রাসের সঙ্গে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের প্রাধান্য এত দেখা দিয়েছিল যে, র‌্যাবের মতো সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা সবাই অনুধাবন করেন। ব্রিটেন, আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও এ ধরনের স্পেশাল ফোর্স আছে। তবে তাদের ক্ষমতা সিভিল সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশেও র‌্যাবের মতো সংগঠনের প্রয়োজন আছে, দেশে যখন সন্ত্রাসীরা বিদেশী নাগরিক পর্যন্ত হত্যা শুরু করেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে বিচার বহির্ভূত হত্যার অভিযোগ যাতে না ওঠে সেজন্য তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। তাদের হাতে অগাধ ক্ষমতা দেয়া হয়ে থাকলে সরকারের উচিত তার লাগাম টেনে ধরা।

আমি একবার ঢাকায় অবস্থানকালে র‌্যাবের এক বন্ধুস্থানীয় অফিসারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তারা যাকে ক্রসফায়ারের মৃত্যু বলে দাবি করেন, তা আসলে বিচার বহির্ভূত হত্যা বলে যে অনেকে অভিযোগ করেন, সেই অভিযোগ কতটা সঠিক? তিনি বলেছিলেন, দু-একটি ক্ষেত্রে সঠিক, তবে সবক্ষেত্রে নয়। তার নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে তিনি বললেন, এ ব্যাপারে তার একটি অভিমত আছে। এটা তার ব্যক্তিগত অভিমত। র‌্যাবের অভিমত নয়।

তার অভিমত জানার জন্য আগ্রহী হলাম। তিনি বললেন, কোনো কোনো দুর্ধর্ষ এবং জঘন্য সন্ত্রাসীকে বিচারে শাস্তি পাওয়ার জন্য আদালতে পাঠানোর চেয়ে মেরে ফেলাই আমি সমীচীন মনে করি। আমাদের দেশে এক শ্রেণীর টাউট আইনজীবী বা উকিলের আবির্ভাব ঘটেছে, আদালতের একশ্রেণীর বিচারক পর্যন্ত তাদের দ্বারা প্রভাবিত এবং নিয়ন্ত্রিত। বাঘা বাঘা সন্ত্রাসীরা এ উকিলদের ধরে। প্রচুর পয়সা খরচ করে বিচারকদের পর্যন্ত প্রভাবিত করে এবং সহজেই জামিন পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে এসেই যারা তাদের ধরেছিল, তাদের নিকেশ করার চেষ্টা করে এবং আরও ভয়াবহ সন্ত্রাস চালায়। এরা শুধু জনজীবনের নয়, মানবতারও শত্রু। আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এদের দৌরাত্ম্য থেকে জনজীবনের নিরাপত্তা বিধান সম্ভব নয়। সুতরাং মানবাধিকার আন্দোলনের নেতারা যাই বলুন, আমাদের মতো দেশে মানবতার জঘন্য শত্রুদের নির্মূল করার জন্য বিচার বহির্ভূত কিছু ব্যবস্থা দরকার।

আমি তার যুক্তি সম্পূর্ণ অস্বীকার করিনি। কিন্তু সেই সঙ্গে এও বলেছি, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু নিধন অন্যায় বা অবৈধ নয়। কিন্তু নিরস্ত্র শত্রু-নিধন চলবে না। ইরাকে নিরস্ত্র শত্রুকে হত্যা এবং বন্দি শত্রুদের নির্যাতনের দায়ে মার্কিন সেনা অফিসারের বিচার এবং দণ্ড হয়েছে। বাংলাদেশেও সম্মুখ বন্দুকযুদ্ধে সন্ত্রাসী মারা গেলে আপত্তি নেই, তা অন্যায়ও নয়। কিন্তু নিরস্ত্র অথবা বন্দি সন্ত্রাসীকে কিছুতেই হত্যা করা চলবে না। তাকে বিচার করে শাস্তি দিতে হবে। টাউট শ্রেণীর উকিল ও একশ্রেণীর দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারকের জন্য যদি তারা শাস্তি এড়ায়, তাহলে এই শ্রেণীর উকিল ও বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনমত তৈরি করে সরকারের ওপর চাপ দিতে হবে।

কিন্তু এই চাপ প্রয়োগ করবেন কারা? শর্ষের ভেতরেই ভূত লুকিয়ে আছে। রাজনৈতিক দল- বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই বেঁচে থাকে সন্ত্রাসীরা। দেশের বহু পুলিশ অফিসার আমাকে আক্ষেপের সুরে বলেছেন, আমরা সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাব কীভাবে? যখনই কোনো রাঘব বোয়াল জাতীয় সন্ত্রাসী বা দুর্নীতিবাজকে ধরি, তখনই কোনো মন্ত্রী বা এমপির কাছ থেকে টেলিফোন আসে, ওকে ছেড়ে দাও। উনি আমাদের দলের লোক। জামায়াতি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সময়েও দেখা গেছে, তারা আওয়ামী লীগের কোনো কোনো প্রভাবশালী নেতার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়েই আছেন। বা তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের অংশীদার। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পুলিশের বিরুদ্ধে যেমন ঘুষ, দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন রাজনীতিকরা, তেমনি দেশের রাজনৈতিক কালচারেরও সংস্কার প্রয়োজন। দেশের রাজনীতিকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কালচার থেকে মুক্ত করা না গেলে পুলিশ কিংবা প্রশাসনের কোনো স্তরকেই দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে না। প্রশ্ন, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? আমাদের দেশের রাজনীতির বিড়াল আবার ঘুমন্ত বিড়ালও নয়।

যা বলার জন্য এত কথা বলা, তা হল- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নিহত সহকারী পরিচালক ওমর সিরাজ কোনো সন্ত্রাসী ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতির। ধরা পড়ার সময় তিনি বন্দুকযুদ্ধেও নিযুক্ত ছিলেন না। ধরা দিয়েছেন এবং রিমান্ডেও গেছেন। এ অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় এই ৩৩ বছর বয়সের সুস্থ যুবকের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ কী এবং এত দ্রুতই বা তার কেন হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রে মৃত্যু হল- এ প্রশ্ন জনমনে বিরাটভাবে দেখা দেবেই এবং স্বাভাবিকভাবেই তা দেখা দিয়েছে। তার পরিবার থেকে যে দাবি উঠেছে, রিমান্ডে থাকার সময় শারীরিক নির্যাতনই তার অসুস্থ হওয়া এবং পরবর্তী সময় মৃত্যুর কারণ এটাও জনমনে দাগ কাটবে।

এ সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা এখনই বলা যাবে না। মৃতদেহের পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পরই জানা যাবে এই মৃত্যুর আসল কারণ কী? যদি সন্দেহাতীতভাবে জানা যায়, ওমর সিরাজের মৃত্যু একটি স্বাভাবিক হৃদরোগের মৃত্যু তাহলে অন্য কথা। যদি প্রমাণিত হয় নির্যাতনের ফলে এই মৃত্যু হয়েছে তাহলে র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট অফিসারদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ যাতে না ওঠে এবং র‌্যাব যাতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সুযোগ আর না পায় সেই লক্ষ্যে সংগঠনটিকে এবং তার কার্যক্রমকে আরও সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার।

র‌্যাবকে তুলে দেয়া হোক সে দাবি আমি এখনও করি না। র‌্যাবের হাতে সন্ত্রাস দমন ও মোকাবেলার যে ক্ষমতা আছে, তা যাতে তারা আইন সম্মতভাবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রয়োগ করে তার ব্যবস্থা হওয়া দরকার। এ লক্ষ্যে র‌্যাব সংস্কার ও পুনর্গঠন দরকার হতে পারে। সরকারকে সে কাজে বিলম্ব করলে চলবে না।

সব কাজেরই একটা জবাবদিহিতা থাকা আবশ্যক। জবাবদিহিতা না থাকলে দেশে বা সমাজে স্বৈরাচার মাথা তোলে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রতিটি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেই সামরিক বাহিনীরও জবাবদিহিতা থাকে সিভিল অথরিটি বা সরকারের কাছে। বাংলাদেশেও র‌্যাবের জবাবদিহিতা থাকবে সিভিল সরকারের কাছে। কোনো কারণেই আইনের ঊর্ধ্বে যাতে সংস্থাটি উঠতে না পারে সেদিকে সিভিল ও লিগ্যাল অথরিটিকে কড়া নজর রাখতে হবে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, দেশে ব্যক্তি-সন্ত্রাস বন্ধ করার জন্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জন্ম দেয়া হলে তা আরও বিপজ্জনক।

বাংলাদেশে র‌্যাব টিকে থাকুক, কিন্তু তার কার্যক্রম সব অভিযোগমুক্ত করা হোক, জনগণের কাছে র‌্যাব ক্রেডিবিলিটি ফিরে পাক এটাই আমার কামনা।

লন্ডন, ৪ অক্টোবর, রোববার, ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment