কালের আয়নায়

আসাদ কি নাসেরের মতো টিকে যেতে পারবেন?

সিএইচটি-অবজারভার.কম : শনিবার ১০ অক্টোবর ২০১৫ :

Missile
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে বলে মনে হয়। ‘অকার্যকর’ মার্কিন ও ন্যাটো বিমান হামলায় রোজ নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে। জনপদ ধ্বংস হয়েছে। সিরীয় শরণার্থীদের সমস্যা বিশ্বে বিরাট সংকট সৃষ্টি করেছে। ন্যাটো ও পশ্চিমা বিমান হামলায় তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএসের ধ্বংসাভিযান ও অগ্রগতি থামেনি। কারণ, গত কয়েক মাসে পশ্চিমা সামরিক তৎপরতায় একটা লক্ষ্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আইএসকে দমন তার মূল লক্ষ্য নয়। সিরিয়ায় রেজিম চেঞ্জ বা প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতা থেকে অপসারণই তাদের মূল লক্ষ্য। তাই আইএস দমনে বোমা হামলার নামে মূল টার্গেট ছিল আসাদের সরকারি বাহিনীকে বিপর্যস্ত করা।
সিরিয়া ও ইরাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের হস্তক্ষেপে লাখ লাখ নরনারী ও শিশুকে দেশত্যাগ করে ইউরোপে শরণার্থী হতে হয়েছে। বিপজ্জনক সমুদ্রপথে তারা মারা যাচ্ছে। মারা যাচ্ছে অনাহারে ও অসুস্থতায়। নির্যাতিত হচ্ছে ইউরোপের কোনো কোনো দেশের বর্ডার গার্ডদের হাতে। এত বড় হিউম্যান ট্র্যাজেডি গত কয়েক শতাব্দীতে ঘটেছে কিনা সন্দেহ। আর এই ট্র্যাজেডি ঘটিয়েছে আমেরিকাসহ পশ্চিমা সাম্রাজ্যলোভী দেশগুলো। তাতেও তাদের মধ্যে বিবেকপীড়া দেখা যায়নি। সিরিয়ায় আইএস দমনের নামে তারা যুদ্ধ চালাচ্ছে প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইরাক ও লিবিয়ার মতো তল্পিবাহক সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে। আর এই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে ভয়াবহ আগুন জ্বালানো হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও তত ভয়াবহ আগুন জ্বলেনি বলে অনেকের ধারণা।
রাশিয়া, ইরান ও চীন আসাদকে সমর্থন না দিলে এতদিনে তার শুধু ক্ষমতাচ্যুতি ঘটত না, তাকে হয়তো সাদ্দাম ও গাদ্দাফির মতো নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হতো। তাতে কি সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতো? ইরাক ও লিবিয়ায় কি সাদ্দাম ও গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত এবং হত্যা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা গেছে? না, দেশ দুটিতে শান্তির বদলে স্থায়ীভাবে অশান্তির আগুন জ্বলছে? ইরাক ও লিবিয়ায় ধ্বংসের আগুন জ্বলতে থাকা সত্ত্বেও আমেরিকা নির্লজ্জের মতো এখনও দাবি করছে, প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরালেই দেশটিতে শান্তি আসবে। আর এই শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে চলছে বোমা হামলা দ্বারা গোটা দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার চেষ্টা। বস্তুত আসাদকে ক্ষমতা থেকে হটানোর জন্যই সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সাহায্যে আইএসের জন্ম দেওয়া হয়েছিল এবং আইএসকে ইরাক ও সিরিয়ায় এক বিশাল এলাকা দখল করতে দেওয়া হয়েছে।
আসাদের পতন ঘটানো গেলেই মধ্যপ্রাচ্যের গোটা ভূখণ্ড ও তেলের ওপর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের হারানো আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেতে পারে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর অটোম্যান বা ওসমানিয়া সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন ছোট রাষ্ট্র তৈরি এবং তাতে তাঁবেদার শাসক বসিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। বর্তমানেও মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার একই লক্ষ্য। এই লক্ষ্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সেক্যুলার আরব জাতীয়তাবাদের শেষ শিখাটিও নিভিয়ে দেওয়া এবং সিরিয়া ও ইরাককে আরও বিভক্ত করে আমেরিকার যুদ্ধঘাঁটি সম্প্রসারণ, তেল স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ইসরায়েলের আধিপত্যবাদী অস্তিত্বকে সুরক্ষা দান।
এই লক্ষ্যেই আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া ও সুনি্নদের মধ্যে ভয়াবহ বিবাদ সৃষ্টি করেছে। প্রথমে সুনি্ন রাষ্ট্র সৌদি আরবকে মদদ জুগিয়ে শিয়া রাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছিল সৌদি আরব ও ইসরায়েলও। আসাদকে ধ্বংস করা গেলে এই অক্সিসের পরবর্তী টার্গেট হতো ইরান। এই ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। ওবামা প্রশাসন ইরানকে কাবু করতে না পেরে কৌশল পাল্টায় এবং ইরানের মিত্র সাজার ভূমিকা নেয়; কিন্তু আসাদের বিরুদ্ধে তৎপরতা অব্যাহত রাখে।
আমেরিকার এই দ্বিমুখী নীতিই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের জন্য লজ্জাকর ব্যর্থতা ডেকে আনতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। মার্কিন নীতির ফলেই সিরিয়ায় সুনি্ন আইএসের বিরুদ্ধে ইরান হামলা চালানোর সুযোগ পায়। এমনিতেই ইরান আসাদ বাহিনীকে সাহায্য জুগিয়ে আসছিল। এখন আইএস নির্মূল অভিযানে রাশিয়াও এগিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছে। ভয়াবহ সিরীয় শরণার্থী সমস্যায় বিব্রত বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছে, আইএসের বর্বর ধ্বংসাভিযান প্রতিহত করার ব্যাপারে আমেরিকার হয় ক্ষমতা নেই অথবা আগ্রহ নেই। তাই সিরিয়ায় আইএস দমনে রাশিয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্বের অধিকাংশ শান্তিকামী মানুষ, এমনকি ইরাক ও সিরিয়ার মানুষও আপত্তি জানায়নি, বরং অভিনন্দন জানিয়েছে।
এজন্য এই নিবন্ধের শুরুতেই লিখেছি, সিরিয়ায় রাশিয়ার বোমা হামলা শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মনে হয়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে। গত শতকের পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে প্রায় একই ধরনের দৃশ্যপট তৈরি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে। তখন উদীয়মান সেক্যুলার আরব স্টেট মিসরের নায়ক ছিলেন আরব জাতীয়তাবাদের উদ্গাতা প্রেসিডেন্ট নাসের। সুয়েজ খাল জাতীয়করণের পর তার বিরুদ্ধে একযোগে হামলা চালিয়েছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল। সেদিন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী হামলা প্রতিহত করা ও বিপন্ন নাসেরকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়ার নেতা ক্রুশ্চেভ। তাকে অবশ্য নাসেরের সাহায্যার্থে বোমা হামলা চালাতে হয়নি। তার সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকিতেই হামলাকারীরা তাদের হামলা বন্ধ করেছিল।
এবার সিরিয়ায় বোমাবর্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রুশ নায়েক পুতিন। তিনি এ ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইসরায়েলের নেতানিয়াহুর সঙ্গেও আলাপ করেছেন। এখানেও লক্ষ্য করার বিষয়, আমেরিকার সঙ্গে বৈঠকে পুতিন জোর দিয়েছেন আইএসের ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার ওপর। অন্যদিকে ওবামা এখনও জেদ ধরে বসে আছেন, আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরাতেই হবে। যেন আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারলেই সিরিয়ায় শান্তি আসবে। ইরাক ও লিবিয়ার দৃষ্টান্ত সামনে থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসন তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে সিরিয়ায় রেজিম চেঞ্জের হঠকারী নীতি থেকে সরতে রাজি নয়।
আখেরে এই নীতি থেকে আমেরিকা লাভবান হবে তা মনে হয় না। পুতিন সিরিয়ায় রেজিম চেঞ্জে রাজি নন, বরং সেই রেজিমকে রক্ষার জন্যই এবং সিরিয়ায় প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই বোমাবর্ষণ শুরু করেছেন। বিস্ময়করভাবে এই বোমাবর্ষণ দ্রুত সাফল্য অর্জন করছে। আইএসের অগ্রাভিযান বন্ধ হয়েছে এবং তাদের প্রধান ঘাঁটিগুলো ধ্বংস হচ্ছে, যা এতদিন মার্কিন বা ন্যাটোর বোমাবর্ষণে হয়নি বা তারা ধ্বংস করতে চায়নি। রাশিয়ান হস্তক্ষেপে এখানেই আমেরিকার শঠতাপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য নীতি ব্যর্থ হতে চলেছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক অভিমত প্রকাশ করেছেন।
সিরিয়ায় আইএস দমনে রুশ অভিযানে আমেরিকা তাই শঙ্কিত। রাশিয়ার বোমাবর্ষণ যে কার্যকর হচ্ছে এবং মার্কিন শঠতা বিশ্ববাসীর চোখে ধরা পড়ছে, তা বুঝতে পেরে ওয়াশিংটন নতুন প্রচার কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। বলা হচ্ছে, রাশিয়ান বোমায় অসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। আসলে এতদিন অসামরিক জনগণকে নির্বিচারে হত্যা করেছে মার্কিন বোমা (যে জন্য এত বড় শরণার্থী সমস্যা)। রাশিয়ার বিরুদ্ধে অসামরিক লোকজন হত্যার অভিযোগ তোলার দিনেই খবর প্রকাশ হয়, আফগানিস্তানে একটি হাসপাতালে বোমা ফেলে আমেরিকা ডাক্তার, রোগী ও নার্সদের অধিকাংশকে হত্যা করেছে। এখন আবার ধুয়া তোলা হয়েছে, রুশ বিমান ইরাকি ভূখণ্ডে বোমা ফেলছে এবং তুরস্কের আকাশ সীমান্তেও ঢুকছে। ইরানের ভূখণ্ডে মিসাইল পড়েছে বলেও তাদের দাবি। এটাও মার্কিন প্রচার। এর সত্যাসত্য নির্ধারণ কে করবে?
সিরিয়ায় রাশিয়ান হস্তক্ষেপ যেমন আইএসের বর্বর হত্যাভিযান বন্ধ করার নিশ্চিত সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তেমনি অন্য একটি আশঙ্কারও জন্ম দিয়েছে। আশঙ্কাটি হলো, আমেরিকার বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য নীতি রুশ হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আজ হোক কাল হোক তাকে পাততাড়ি গুটাতে হবে। সেটা হবে সুয়েজ যুদ্ধের ব্যর্থতার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের পাততাড়ি গুটানোর মতো। কিন্তু আমেরিকা এখনও পঞ্চাশের দশকের ব্রিটেনের মতো হতবল নয়। সে সহজে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাততাড়ি গুটাতে চাইবে কি?
যদি না চায় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়াকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে একটা কনফ্রন্টেশন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। অতীতেও একাধিকবার রুশ-মার্কিন কনফ্রন্টেশনের ভয়াবহ আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। কোরিয়া যুদ্ধ, কিউবা সংকট এবং কিছুটা সুয়েজ যুদ্ধের সময়েও। ‘৫৬ সালের সুয়েজ যুদ্ধে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ হয়তো আমেরিকাকেও যুদ্ধে টেনে আনত। ক্রুশ্চেভের বিচক্ষণতায় কিউবা এবং সুয়েজ দুই সংকটেই বিশ্ববাসী তৃতীয় মহাযুদ্ধের আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়।
এবারেও পুতিন এবং ওবামার ধৈর্য ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতার ওপরই নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি কোনদিকে গড়াবে। আসাদ কি পঞ্চাশের দশকের নাসেরের মতোই টিকে থাকতে পারবেন এবং পশ্চিমা চক্রান্ত ও হামলা থেকে কি মধ্যপ্রাচ্যের এই শেষ সেক্যুলার রাষ্ট্রটি তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে? আইএস ধ্বংস হবে এবং তার অধিকৃত ভূমি সিরিয়া ও ইরাক ফিরে পাবে? সব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য বিশ্ববাসীকে আরও বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
‘হিংসায় উন্মত্ত এই পৃথিবীতে’ আমরা যারা এখনও আশাবাদী, মানবতার চূড়ান্ত জয়ে আস্থাশীল তাদের বিশ্বাস, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরাজয় ও পতনের দিনটির সূচনা হতে চলেছে এবং তা হবে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতেই। ইতিহাস-বিধাতার কাছে শান্তিকামী মানুষের আজ একটাই প্রশ্ন_ ‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো/তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছো, তুমি কি বেসেছো ভালো?’
লন্ডন, ৯ অক্টোবর শুক্রবার, ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment