প্রাধান্য পাবে বুড্ডিস্ট হেরিটেজ

আজ উদ্বোধন হচ্ছে ‘পর্যটন বর্ষ ২০১৬’ বা ভিজিট বাংলাদেশ কর্মসূচি

ডেস্ক রিপোর্ট –


বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন নিদর্শনসহ তীর্থ পর্যটনকে প্রাধান্য দিয়ে আজ উদ্বোধন হচ্ছে ‘পর্যটন বর্ষ ২০১৬’ বা ভিজিট বাংলাদেশ কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর শেরে বাংলানগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দু’দিনের আন্তর্জাতিক বুড্ডিস্ট ট্যুরিজম সার্কিট কনফারেন্সে তিন বছরব্যাপী (২০১৬-১৮) পর্যটন বর্ষের উদ্বোধন করবেন। বুড্ডিস্ট হেরিটেজগুলো রক্ষণাবেক্ষণ এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের হেরিটেজগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডাব্লিউটিও) সহায়তায় আয়োজিত এই সম্মেলনে ইউএনডাব্লিউটিওর মহাসচিব তারেব রিফাই ছাড়াও এতে চীন, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভুটান, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার পর্যটন, সংস্কৃতিমন্ত্রীসহ বৌদ্ধ ধর্মের নেতা ও আন্তর্জাতিক পর্যটন বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ট্যুারিজম বোর্ড (বিটিবি) সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশসহ ভারত, নেপাল এবং ভুটানের প্রায় এক কোটি ত্রিশ লাখ বৌদ্ধ পর্যটককে আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশের প্রায় পাঁচশ’র মতো প্রাচীন বৌদ্ধ পর্যটন কেন্দ্রে প্রত্নসম্পদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার একটি ‘রোডম্যাপ’ তুলে ধরা হবে সম্মেলনে। রোডম্যাপটি চূড়ান্ত করার পর বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পর্যটন সুযোগ-সুবিধা সম্পাদন করা হবে। সম্মেলন শেষে দুজন বৌদ্ধ মংক দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন পরিদর্শনে যাবেন।

ভারতের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে চার কোটি আশি লাখ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থান ভ্রমণ করে থাকে। ২০১৪ সালে প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার বিদেশি পর্যটক গয়া ভ্রমণ করেছে। একই সময়ে বুদ্ধগয়ায় দুই লাখ, নালান্দায় এক লাখ ২৫ হাজার এবং বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনীতে এক লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেছে।

বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহাসিক কিছু নিদর্শন পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় এবং ময়নামতিতে রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোতে যদি প্রতি বছর দেড় লাখ বিদেশি পর্যটক ভ্রমণে আসে, তাহলে বছরে ৬০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব বলে মনে করে দেশের ট্যুর অপারেটররা। বিপুল পরিমাণ বৌদ্ধ পর্যটকের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সম্মেলনের আয়োজন করছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আশা, এই সম্মেলন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বৌদ্ধ পর্যটকের আগমন বাড়বে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যটন বর্ষের সুফল আসবে না বলে মনে করে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা।

বেঙ্গল ট্যুরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ হোসেন বলেন, ‘দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে ভিজিট বাংলাদেশ কর্মসূচির সুফল নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আমাদের প্রস্তুতি ভালো নয়। তবে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে, এটাই আমাদের জন্য আনন্দের।’

মাসুদ হোসেন আরো বলেন, বৌদ্ধ পর্যটক আকর্ষণে আগেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্মেলনে ১৩ জন মন্ত্রীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন এসেছে বলে জেনেছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পর্যটন বর্ষের সুফল পাওয়া কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন পর্যটন বর্ষে ১০ লাখ পর্যটক আনার লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করে বলেন, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান মাত্র ২ শতাংশ, যা আরো বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য ধর্মীয়, স্বাস্থ্য এবং উৎসব পর্যটনের ওপর আরো জোর দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পর্যটন বর্ষ সফলভাবে উদ্‌যাপনের জন্য বেসরকারি খাতের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

এদিকে ২০১৬ সালের পর্যটন বর্ষ উপলক্ষে বিশেষ ভ্রমণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) এবং পর্যটন করপোরেশন। এই প্যাকেজের আওতায় বাংলাদেশ ভ্রমণে আসা পর্যটকরা সরকারি-বেসরকারি হোটেল-মোটেল, বিমান ভাড়া, খাদ্যসহ বিভিন্ন সেবায় ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাবে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আকতারুজ্জামান খান কবির বলেন, ‘বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্যাবহী স্থানগুলো আমাদের বিদ্যমান পর্যটন কেন্দ্র, আমাদের প্রয়োজন একটি কর্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে এর বিশ্বমানের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে বৌদ্ধ পর্যটকদের আকৃষ্ট করা।’

পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান অপরূপ চৌধুরী বলেন, পর্যটন বর্ষ-২০১৬ চলাকালীন দলবদ্ধ ভ্রমণের আওতায় দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসে আসা বিদেশি পর্যটকরা পর্যটন করপোরেশনের আবাসিক স্থাপনা ব্যবহার করলে তারা সেসব হোটেল-মোটেলে সৌজন্যমূলক নাশতাসহ ৩০ শতাংশ মূল্য বিশেষ ছাড়ে এবং মধ্যাহ্ন ও নৈশভোজে ২০ শতাংশ ছাড় পাবে। তিনি বলেন, পর্যটন করপোরেশনের স্থাপনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তাদের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কার্যালয়ের মাধ্যমে পর্যটন করপোরেশন ও অন্যান্য আবাসিক ও আপ্যায়ন সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত সুবিধা বিপণন করবে। দেশে-বিদেশে যেসব বিমান অফিস রয়েছে সেখানকার কাউন্টার থেকে সরাসরি বিমান টিকিট ক্রয় করলে সেসব টিকিটের ওপর ১০ শতাংশ ছাড় পাবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন নভোএয়ারসহ অন্যান্য এয়ারলাইনসের প্রিভিলিজড কার্ড ও লয়্যালিটি কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণকারী বিদেশি পর্যটকরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থিত বলাকা ভিআইপি লাউঞ্জে ৩০ শতাংশ ছাড়ে খাবার গ্রহণ করতে পারবে।

পর্যটন বর্ষ সফল করতে হলে ব্যাপকভাবে ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন, যা এখনো শুরুই হয়নি বলে জানালেন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি প্রফেসর ড. আকবর উদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘গত তিন বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হারিয়েছে পর্যটন শিল্প। এ কারণে পর্যটন বর্ষকে ঘিরে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে এ খাতের উদ্যোক্তারা।’

ট্যুরিজম মালয়েশিয়া ক্যাম্পেইনের নানা দিক ও কর্মযজ্ঞের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্টের (বিএফটিডি) নির্বাহী পরিচালক রেজাউল একরাম বলেন, ‘১০ লাখ পর্যটক আনার যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তার বাস্তবায়নে খুব একটা সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না। আমাদের কোনো হোমওয়ার্ক নেই। তবে আশার কথা, সরকার কিছু বাজেট দিয়েছে। ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করে এবং বাজেট বরাদ্দ করে সরকার সদিচ্ছার প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর এই অর্থ ব্যয়ের দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে আমরা কতটুকু সুফল পাব।’ – কালের কন্ঠ

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment