কালান্তরের কড়চা

সন্ত্রাসের নতুন চেহারা মোটিভ অভিন্ন

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

 

ঢাকায় ইতালিয়ান নাগরিক তাভেল্লা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করায় আশা করা যায়, রংপুরে জাপানি নাগরিকের হত্যায় জড়িত ঘাতকদেরও হদিস শিগগিরই মিলবে। সবচেয়ে বড় কথা, ঢাকায় মহররমের মিছিলে যে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হয়েছে তার দুষ্কৃতীদেরও হয়তো সন্ধান মিলবে। ‘বিচার বিলম্বিত হলে বিচার অস্বীকৃত হয়’-এই প্রবাদ স্মরণে রেখে বাংলাদেশের গোয়েন্দা পুলিশকে অবশ্যই এই সন্ত্রাসী হত্যা ও হামলার উৎস খুঁজে বের করে অপরাধীদের সমুচিত দণ্ডদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই সন্ত্রাসের হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দণ্ডদানের দ্বারাই মাত্র দেশে এ ধরনের নৃশংসতার অবসান ঘটানো সম্ভব। অন্য কোনো পন্থায় নয়।

এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে দেশে নানা ধরনের বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডগুলো যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এবং এর মোটিভ যে অভিন্ন এই সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইতালীয় ও জাপানি নাগরিক হত্যার পর সরকার বলেছিল, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএস নেই। দেশের বা বিদেশের কোনো কুচক্রী মহল চাইতে পারে, ‘বাংলাদেশে আইএস আছে’-এই কথাটা প্রমাণিত হোক। তাহলে দেশটিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ (সন্ত্রাস দমনে সাহায্যের নামে) ডেকে আনা যায়।

এ জন্যই হয়তো ঢাকায় বহু শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মহররমের মিছিলের ওপর হামলা। এটা শিয়া মুসলমানদের অনুষ্ঠান। আইএস ইরাক ও সিরিয়ায় শিয়া নিধন অভিযান চালাচ্ছে। শিয়া-সুন্নি বিরোধ সেখানে উসকে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও একই উদ্দেশ্যে কি সেই বিরোধ টেনে আনার চেষ্টা চলছে? পাকিস্তানেও এই বিরোধ টেনে আনা হয়েছে। সৌদি আরবের ওহাবিমন্ত্রে দীক্ষিত সুন্নি জামায়াত ও তালেবান সেখানে শিয়া হত্যা ও শিয়া মসজিদ ধ্বংসের কাজটি জোরেশোরে চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যত্র, বিশেষ করে কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে শিয়ারা তার প্রতিশোধ নিচ্ছে।

গোটা মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি বিরোধ তথা মুসলমান মুসলমানে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বাধিয়ে দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে নারদ মুনির মতো হাততালি দিচ্ছে আমেরিকা। বিরোধে ইন্ধন ও সামরিক সাহায্য জোগাচ্ছে। অস্ত্র বিক্রি দ্বারা অঢেল টাকা কামাচ্ছে। ইরাকের আইএস-অধিকৃত এলাকা থেকে আইএসের কাছ থেকেই সস্তায় তেল কিনছে। বিশ্বের বাজারে তেলের দাম কমিয়ে রাশিয়াকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করেছে। একই খেলা খেলছে ইসরায়েল। একদিকে ফিলিস্তিনের আরব নারী-শিশুদের বোমা হামলা দ্বারা অকাতরে হত্যা করছে, অন্যদিকে শিয়া রাষ্ট্র ইরান ও তার মিত্র সিরিয়াকে ধ্বংস করার জন্য সুন্নি ও ওহাবি রাষ্ট্র সৌদি আরবের মিত্র সেজে তাকে সাহায্য ও সমর্থন জোগাচ্ছে এবং আইএসকেও প্রথম দিকে সাহায্য-সহযোগিতা জুগিয়েছে। এখন রাশিয়া মঞ্চে নামায় আমেরিকা ও ইসরায়েল দুই চক্রই বিব্রত।

মধ্যপ্রাচ্যের এই শিয়া-সুন্নি সংঘাত আমাদের উপমহাদেশেও ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে এবং ইত্যবসরে পাকিস্তান পর্যন্ত ছড়িয়েছে। পাকিস্তানে প্রথমে সুন্নি ও আহমদিয়া বিরোধ বাধানো হয়েছিল। বিরোধটা ওয়াশিংটন ও রিয়াদের স্বার্থে পাকিস্তানের জামায়াতিরা বাধিয়েছিল। বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে আহমদিয়াদের নির্যাতনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের শাসকদের অন্ধ অনুকরণ করেছিল। জামায়াত ছিল বিএনপির ক্ষমতার পার্টনার। তাদের প্ররোচনাতেই আহমদিয়াদের বাংলাদেশেও অমুসলমান বলে ঘোষণার চেষ্টা করা হয় এবং তাদের মসজিদগুলোকে মসজিদ বলা যাবে না, উপাসনালয় বলতে হবে নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে এখন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় নেই। কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থেকেও আহমদিয়া নির্যাতনের মতো পাকিস্তানের অনুকরণে এখানেও শিয়া-সুন্নি সংঘাত বাধিয়ে তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করতে চায় কি না তা আজ শুধু সরকারকে নয়, দেশের গণতান্ত্রিক মহলকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দেখতে হবে। লক্ষ্য করলে বুঝতে কষ্ট হবে না, রাজপথে পেট্রলবোমা হামলার সন্ত্রাস এখন নেই এবং এই সন্ত্রাসের পথে বিএনপি আর পা বাড়াবে না বলছে বটে; কিন্তু সেই সন্ত্রাসই এক নতুন প্যাটার্নে নতুনভাবে শুরু হয়েছে। তারই বহিঃপ্রকাশ বিদেশি হত্যা, মহররমের তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা দ্বারা শিয়া হত্যা-এটা ভাবলে ভুল করা হবে কি?

দেশের এই সাম্প্রতিক হত্যা ও সন্ত্রাসের মোটিভ যে অভিন্ন, ঘটনার তদন্তকারীরাও তার গন্ধ পাচ্ছেন। এই মোটিভটি হলো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি। এই অস্থিরতা সৃষ্টি হলে সরকারের ওপর দেশের মানুষের অসন্তোষ বাড়বে। বিদেশিদের, বিশেষ করে সাহায্যদাতা পশ্চিমা দেশগুলোর আস্থা কমবে। নিরাপত্তার ভয়ে বিদেশিরা এ দেশে আসতে চাইবে না। দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম শ্লথ হবে। সরকার তার নির্দিষ্ট মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পাবে না। দেশে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তারা তৈরি করেছে, তা ধ্বংস হবে।

এই লক্ষ্যেই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তাঁদের বহু বিঘোষিত নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের নতুন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি এখন পর্যন্ত না দিয়ে তার লন্ডন অবস্থান দীর্ঘ করে বিদেশে বসে পুরনো চক্রান্তের রাজনীতির দাবার ঘুঁটি চালছেন কি না-এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। মনে হয় সাপ যেমন বছর বছর খোলস পাল্টায়, কিন্তু স্বভাব পাল্টাতে পারে না, তেমনি বিএনপিও মাঝে মাঝে খোলস পাল্টায়, চরিত্র পাল্টাতে পারছে না।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির একটি দুর্ভাগ্যজনক দিক হলো, বিএনপি বারবার ঘোষণা দিচ্ছে কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দল হয়ে উঠতে পারছে না। ফলে আওয়ামী লীগও সংসদে ও সংসদের বাইরে কোনো নিয়মতান্ত্রিক অথচ শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় একচ্ছত্রবাদী দল হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখাচ্ছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক কিছু কথাবার্তায় মনে হয়েছিল তিনি জামায়াতের সংস্রব এবং পুত্র তারেক রহমানের প্রভাব কাটিয়ে উঠবেন এবং দলের গঠনমূলক মনোভাবের প্রবীণ ও নবীন নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে দলকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করবেন। তাঁর দীর্ঘ লন্ডন অবস্থান এবং সেখানে বসে যেসব কথাবার্তা বলছেন তাতে মনে হয় না তাঁর দল চরিত্র বদলাতে পারবে অথবা বদলাতে চাচ্ছে।

মাঝখানে গুজব রটেছিল, বিএনপি ভারতের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌঁছার লক্ষ্যে আবার মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং এ জন্য লন্ডনে বসেও তাদের গোপন তৎপরতা চলছে। এমনও শোনা গিয়েছিল, দিল্লির মোদি সরকারকে খুশি করার লক্ষ্যে বিএনপি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেবে, তারা জামায়াতের সংস্রব স্থায়ীভাবে বর্জন করল। এখন বিএনপির লন্ডন সূত্র থেকেই জানা যায়, জামায়াতর সংস্রব বর্জনের এই প্রকাশ্য ঘোষণা আসবে কি না এবং দিল্লির মোদি সরকারের সঙ্গে বেগম জিয়া একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছেন কি না এ সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নয়। তারা মনে করে, বেগম জিয়ার লন্ডনে দীর্ঘ অবস্থানের (পারিবারিক দিক ছাড়া) মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি সফল হচ্ছে না।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য বর্তমানে যে সন্ত্রাস চলছে, তার উৎস সন্ধান ও অপরাধীদের চিহ্নিত করার ব্যাপারে শুধু সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নয়, দেশের সংবাদপত্রগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। আমার প্রয়াত সাংবাদিক বন্ধু এ বি এম মূসা একবার সখেদে বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে জার্নালিজম অত্যন্ত উন্নত হয়েছে; কিন্তু ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম এখনো উন্নত হয়নি। এটা উন্নত হলে বহু ভয়াবহ ও রহস্যপূর্ণ অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটিত হতো, অপরাধীরা শনাক্ত হতো এবং পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সহায়তা পেত।’

মূসা তাঁর বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে ইউরোপ ও আমেরিকার বহু ঘটনার উদাহরণ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘যে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট নিক্সন জড়িত ছিলেন, সেই কেলেঙ্কারির জট পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা খুলতে পারেনি। খুলেছিলেন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার এক ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার। যার ফলে নিক্সন ইমপিচমেন্টের সম্মুখীন হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। আর আমাদের দেশে ইলিয়াস গুম অথবা হত্যা থেকে শুরু করে সাগর-রুনি হত্যা পর্যন্ত কোনো রহস্যের কূল-কিনারা দীর্ঘকাল ধরে হচ্ছে না। কূল-কিনারা করতে না পারছে গোয়েন্দা সংস্থা, না পারছেন সাংবাদিকরা। এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের কোনো ইনভেস্টিগেটিভ তৎপরতা নেই। চলছে কেবল পুলিশের অকর্মণ্যতার ওপর দোষারোপ।’

প্রয়াত বন্ধু সাংবাদিকের এ কথার প্রতিধ্বনি করে বলতে চাই, দেশে বর্তমানে যে সন্ত্রাসী তৎপরতা চলছে, তার উৎস আবিষ্কার এবং অপরাধীদের শনাক্তকরণের ব্যাপারে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দায়িত্বই মুখ্য। কিন্তু এ ব্যাপারে সৎ ও দেশপ্রেমিক সাংবাদিকদের একটা দায়িত্ব আছে। বিদেশি হত্যা থেকে শুরু করে মহররমের মিছিলে হামলা পর্যন্ত যে সন্ত্রাস এখনো দেশে অব্যাহত তার উৎস অনুসন্ধান ও দুর্বৃত্তদের শনাক্তকরণের ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিংও একটা বড় সহায়তা দিতে পারে এবং এ ধরনের রিপোর্টিং বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের সাংবাদিকতায় প্রয়োজন।

এই সন্ত্রাস দমনের ব্যাপারে সরকারকে আরো কঠোরভাবে তৎপর হতে হবে। এই রাজনৈতিক মোটিভ এবং তার মদদদাতাদের খুঁজে বের করতে হবে। দেশি-বিদেশি চক্রান্ত, তা যতই বিরাট ব্যক্তিদের দ্বারা চালিত হোক না কেন, তার মুখোশ উন্মোচন করে দেশবাসীকে তা জানাতে হবে। শুধু জনগণের নিরাপত্তা নয়, দেশের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার স্বার্থেও সরকারকে এ কাজটি ত্বরান্বিত করতে হবে। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment