এই অব্যাহত বর্বরতা আর কতকাল দেখতে হবে?

AGC

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

হত্যা আর সন্ত্রাস নিয়ে আর কত লিখব? ভেবেছিলাম জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সারা জীবন যে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সোনার দেশের স্বপ্ন দেখেছি, যে স্বপ্নের তাড়নায় মধ্য যৌবনে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছি, সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেখে যাব। তা হল না। এখন দূর বিদেশে বসেও দেশে রোজ ভয়াবহ হত্যা, সন্ত্রাস এবং তার অব্যাহত ধারা নিয়ে লিখতে হয়। শুধু অপরের জীবন নয়, নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হয়। রোজই দেশে স্বজন নিধনের বার্তা কানে আসে। আর শোক ও ভয়ের শিহরণে কম্পিত হয়ে ভাবি, আমরা কোথায় চলেছি? দেশ কোথায় চলেছে? এ কোন হ্যামিলনের বংশীবাদক ধ্বংসের বাঁশি বাজাচ্ছে, আর আমরা মোহান্ধ বালকের মতো তার পিছু পিছু মহাধ্বংসযজ্ঞের দিকে ছুটে চলেছি?

পঁচাত্তরের নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড নিয়ে ঢাকার একটি দৈনিকে একটি কলমে লিখব বলে মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছিলাম, এমন সময় খবরটি এলো। ঢাকায় আবার দিনে-দুপুরে চার যুবকের ওপর বর্বর চাপাতি হামলা হয়েছে। এরা কেউ মুক্তমনা ব্লগার, কবি, গবেষক এবং কেউ কেউ প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রকাশক। এরা হলেন শুদ্ধস্বর প্রকাশনা সংস্থার আহমেদুর রশীদ টুটুল, ব্লগার এবং গবেষক রণদীপম বসু, কবি ও ব্লগার তারিখ রহিম এবং জাগৃতি প্রকাশনার ফয়সল আরেফিন দীপন।

বিদেশে থাকি। এ তরুণ প্রজন্মের আধুনিক চিন্তার মানুষদের কারও সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। কেবল জাগৃতির ফয়সল আরেফিন দীপনের নাম দেখেই তাকে চিনতে পেরেছি। দীপন সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবী আবুল কাসেম ফজলুল হকের সন্তান। আমিও সন্তানের বাবা। আবুল কাসেম ফজলুল হকের এ মেধাবী সন্তানের নির্মম হত্যাকাণ্ডে তাকে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। যে ভাষা আমার জানা ছিল না বিজ্ঞানমনা ব্লগার অভিজিৎ রায়ের একইভাবে হত্যার পর তার শোকার্ত পিতাকে সমবেদনা জানানোর।

হামলা হয়েছে চারজনের ওপর। লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর অফিসে তিনজনের ওপর। নিউমার্কেটের কাছে আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনা অফিসে একজনের ওপর। এদের একজন দীপন মারা গেছেন। বাকি তিনজন টুটুল, রহিম ও বসু হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এ লেখার সময় পর্যন্ত খবর পেয়েছি দু’জনের অবস্থা ক্রিটিক্যাল। আমি একান্ত মনে প্রার্থনা করি এরা যেন বেঁচে ওঠেন। একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যার ভয়ানক ক্ষতির ধাক্কা আমরা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তার ওপর আমাদের নতুন প্রজন্মের মুক্তবুদ্ধির মানুষ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীদের এভাবে একের পর এক যদি হত্যা করা হয়, তাহলে দেশ শুধু মেধাশূন্য হবে না, একটি আধুনিক জাতি হিসেবেও আমাদের গড়ে ওঠা অসম্ভব হবে। এ হত্যাকারীরা সেটাই চায়। তারা চায় এই পৌনঃপুনিক হত্যাকাণ্ড দ্বারা জাতির মন ও মানসিকতাকে ভীতিগ্রস্ত করে দেশটিতে মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা।

সর্বশেষ বর্বর হামলার দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেছে সন্ত্রাসী ধর্মীয় সংগঠন আনসারুল্লাহ। তারা এক বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘দেশে শরিয়া শাসনের যারা বিরোধিতা করবে, তারা শুধু ব্লগার নয়, তারা শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক যাই হোক তাদের হত্যা করা হবে।’ এ সন্ত্রাসী গ্রুপটি ছোট-বড় যাই হোক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারা নিজেদের হাতে আইন তুলে নিতে চায়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকে না। গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার বাংলাদেশ রাষ্ট্র এই হুমকির মুখে পড়েছে। এ হুমকিকে হালকাভাবে নিলে সরকার ভুল করবে।

একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে বর্তমানের তরুণ বুদ্ধিজীবী হত্যার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উদ্দেশ্য, একটি গণতান্ত্রিক আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি ধ্বংস করা। একাত্তরের বুদ্ধিজীবীদের ‘ইসলাম ও মুসলমানের শত্রু’ আখ্যা দেয়া হয়েছিল; বর্তমানের তরুণ ব্লগারদের মুরতাদ, কাফের, নাস্তিক আখ্যা দেয়া হচ্ছে। অভিজিৎ রায় থেকে সম্প্রতি আক্রান্ত ব্লগারদের লেখা পড়লে দেখা যায়, তারা ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য লিখেছেন। ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লেখেননি। ধর্ম ও ধর্মান্ধতা এক কথা নয়।

ধর্মান্ধতা ফ্যাসিবাদের নামান্তর। হিংস্র এবং বর্বর। প্রকৃত ধর্ম ভিন্ন ধর্ম বা ভিন্ন মতের মানুষকে হত্যার বিধান দেয় না। বাংলাদেশে যারা শরিয়া আইন বা ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, তারা মোটেই ধর্মপ্রাণ নয়। তারা ধর্মের নাম ব্যবহার করে মধ্যযুগীয় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এদের অবিলম্বে প্রতিহত করা না গেলে বাংলাদেশ ক্রমশ ইরাক ও সিরিয়ার পরিণতির দিকে এগোবে।

এ কথা হয়তো সত্য, বাংলাদেশে ব্লগারদের মধ্যে কিছু যুবক আছে, যারা বিদেশে এসাইলাম প্রার্থী, ধর্মের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্য লিখে এরা নিজেদের বিদেশীদের কাছে ‘বিপন্ন’ বলে দেখাতে চায় এবং বিদেশে এসাইলাম চায়। কিন্তু যেসব ব্লাগরকে হত্যা করা হচ্ছে, অভিজিৎ রায় থেকে ফয়সল আরেফিন দীপন কেউ এসাইলাম প্রার্থী নন। অভিজিৎ রায় মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন এবং দীপন স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত পুস্তক ব্যবসায়ী। তিনি এবং শুদ্ধস্বর প্রকাশনার আহমেদুর রশীদ টুটুল প্রকৃত অর্থে ব্লগার নন। ঘাতকদের কাছে তাদের বড় অপরাধ সম্ভবত ছিল এই যে, তারা অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক। দীপন তার জাগৃতি প্রকাশনী থেকে অভিজিৎ রায়ের ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ বইটি প্রকাশ করেছিলেন। এ বইতেও নাস্তিকতাবাদ প্রচার করা হয়নি। কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এ ধরনের আলোচনা ছাড়া সমাজ প্রগতি অসম্ভব।

এ ব্লগার হত্যাকারীদের জন্য বর্তমানে সরকারের ভেতরেও কিছু কিছু কর্তাব্যক্তির এক ধরনের দুর্বলতা রয়েছে বলে আমার সন্দেহ হয়। আমি আওয়ামী লীগের এক কর্তাব্যক্তিকে এ চাপাতি হত্যাকারীদের ধরার ব্যাপারে সরকার কতটা কঠোর তা জানতে চেয়েছিলাম। তিনি আমার কথার জবাব না দিয়ে বললেন, এ ব্লগারদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা বিদেশে এসাইলাম প্রার্থী। আর কিছু আছে যারা ধর্ম, আল্লাহ, রাসূলের (সা.) নামে এমন সব উসকানিমূলক মন্তব্য লেখেন যা ধর্মপ্রাণ মানুষমাত্রকেই আঘাত করে এবং মানুষ উত্তেজিত হয় তাতে।

আমি তাকে বলেছি, যারা বিদেশে এসাইলাম প্রার্থী এবং ধর্মের বিরুদ্ধে যারা উসকানিমূলক লেখালেখি করেন, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। ব্রিটেনে ব্লাসফেমি আইন এখনও বলবৎ। তাছাড়া আছে রেসরিলেসন্স অ্যাক্ট। যে আইনে এক বর্ণের ও ধর্মের লোক অন্য বর্ণ ও ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বললে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে অসাধু ব্লগার ও লেখকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কঠোর আইনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাদের শাস্তি দান কোনো ব্যক্তি বা ধর্মান্ধ হিংস্র গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে না। সেক্ষেত্রে আইনের শাসন থাকে না, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকে না।

শরিয়া আইন বর্তমান যুগে পুরোপুরি চালু করা সম্ভব কিনা এবং বিশ্বের কোনো মুসলিম দেশে তা চালু আছে কিনা সে বিতর্কে আমি যাচ্ছি না। যে কেউ যে কোনো দেশে এ শরিয়া ল’ চালু করার দাবি জানাতে পারেন। কিন্তু এ দাবিটি তুলতে হবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে। খুন-খারাবির মাধ্যমে নয়। হত্যা ও সন্ত্রাস দ্বারা কোনো ধর্মীয় বিধান প্রতিষ্ঠা করতে হবে এমন কথা কোনো ধর্মও বলে না। বাংলাদেশে যারা ধর্মের খোলসে এ ত্রাস ও বর্বরতা চালাচ্ছে, তারা সম্ভবত ভাড়াটিয়া খুনি। তাদের পেছনে বড় ভাইয়েরা বা সংঘবদ্ধ চক্র আছে, তারা দেশী-বিদেশী বিপুল অর্থের মদদে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাষ্ট্রভিত্তি ধ্বংস করতে চায়। সরকার যদি এ ভয়াবহ চক্রান্তকে নিছক ব্লগার হত্যা এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে ভাবে, তাহলে ভয়ানক ভুল করবে।

আমার একটি সন্দেহ, কতটা সঠিক তা বলতে পারব না। তবু লিখছি। দেখেশুনে মনে হয় বেশ কিছুকাল ব্লগার হত্যা বন্ধ থাকার পর হঠাৎ বিদেশী হত্যা, পুলিশ হত্যা, পীর হত্যা এবং ঢাকায় ঐতিহাসিক মহররমের মিছিলে বোমা হামলার পরই আবার ব্লগার ও আধুনিক প্রকাশনা সংস্থার মালিকদের ওপর হামলা একটি পরিকল্পিত চক্রান্তের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় রায় ঘোষিত হওয়ার পরই এ হত্যাযজ্ঞ শুরু। উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট। দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং সরকারের পতন ঘটানো। এ উদ্দেশ্যে দেশে ও বিদেশে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকরা প্রচণ্ডভাবে সক্রিয়। দু’হাতে তারা টাকা ঢালছে প্রচার প্রোপাগান্ডা ও বিদেশে শক্তিশালী লবি তৈরিতে। বিদেশী হত্যা, ব্লগার হত্যা এ নীলনকশারই একটি অংশ বলে মনে হয়।

সরকার হুশিয়ার হোন, কঠোর হোন। হুমায়ুন আজাদের ওপর চাপাতি হামলা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত আসল ঘাতকরা ধরা পড়েনি। তাদের বিচার ও দণ্ড হয়নি। নাগরিকদের প্রত্যেকের, এমনকি তাদের কেউ নাস্তিক হলেও তার নিরাপত্তা বিধান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করতে না পারলে এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে গণ্য হবে। বাংলাদেশ যেন সেই ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত না হয়। সরকার সর্বশক্তি দিয়ে এ বর্বরতা এবং অবাধ নাগরিক হত্যা বন্ধ করুক। – যুগান্তর

লন্ডন ॥ ১ নভেম্বর ২০১৫, রোববার।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment