কালের আয়নায়

বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই এই বিতর্কটি কেন?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

রবীন্দ্রনাথের ‘পাত্রাধার কি পাত্র’ নিয়ে বিতর্কের মতো বাংলাদেশে একটি নতুন বিতর্কের হাওয়া এখনও বইছে। বিতর্কটি হলো, বাংলাদেশে তথাকথিত ‘ইসলামী স্টেট’ বা আইএস আছে কি নেই। সরকার বলছে, দেশটিতে আইএস নেই। আর আমেরিকা ও কিছু পশ্চিমা দেশ বলছে, আইএস আছে। পশ্চিমাদের সঙ্গে একই ধুয়া ধরেছেন আমাদের একটি নিরপেক্ষ সুশীল সমাজের কেউ কেউ এবং তাদের নিরপেক্ষ মুখপত্রটি। কেউ কেউ বলছেন, আমেরিকার সুরে সুর মিলিয়ে এই ধুয়া ধরার পেছনে উদ্দেশ্য আছে।

সম্প্রতি ঢাকায় ও রংপুরে দু’জন বিদেশি হত্যার পরই বাংলাদেশে আইএস আছে, এই ধুয়া তোলা হয়। ধুয়াটি তুলেছিল আমেরিকাসহ কোনো কোনো পশ্চিমা দেশ। এই দুটি হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব আইএস স্বীকার করেছে বলে সঙ্গে সঙ্গে খবরও প্রচারিত হয়। সরকারি গোয়েন্দা সূত্র থেকে বলা হয়, এই হত্যাকাণ্ডে আইএসের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। আসলে দুটি হত্যাকাণ্ডই ঘটিয়েছে ভাড়াটে ঘাতক দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল। তাদের উদ্দেশ্য, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকারের পতন ঘটানো।

পরবর্তীকালে লালমাটিয়া ও আজিজ সুপার মার্কেটের হত্যাকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টার দায়িত্ব স্বীকার করেছে আনসারুল্লাহ নামের সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠান। পুলিশ হত্যায়ও তারা জড়িত বলে মনে হয়। ইতালিয়ান নাগরিক তাভেলা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তার বড় ভাই মালয়েশিয়ায় পলায়ন করেছেন। তিনি এই কাণ্ডের হোতা বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি আবার ঢাকা সিটি বিএনপির একজন নেতা এবং তার আগে ওয়ার্ড কমিশনার ছিলেন। দেশে জাপানি নাগরিক হত্যার পেছনেও যারা জড়িত বলে অভিযুক্ত হচ্ছে, তাদেরও উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে যে কোনো বিদেশিকে হত্যা করে সরকারকে বিব্রত করা এবং বিদেশে বর্তমান সরকারের সমর্থন নষ্ট করা।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টাগুলোর পারিপার্শবিকতা লক্ষ্য করলে এগুলোতে আইএসকে জড়ানো কষ্টকর। একাত্তরের কোনো যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড ঘোষিত হলেই জামায়াত-শিবির এ ধরনের প্রতিশোধাত্মক হত্যাকাণ্ড শুরু করে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসও ঘটেছে সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকার রায় ঘোষিত হওয়ার কাছাকাছি সময়ে। আর দু’জন গ্রন্থ প্রকাশক ও দু’জন ব্লগারের ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামের স্বঘোষিত রক্ষক আনসারুল্লাহ। এদের সঙ্গে আরও ছোট ছোট জঙ্গি মৌলবাদী সংগঠন আছে। এদের জন্ম জামায়াতের সন্ত্রাসের রাজনীতির গর্ভে এবং এদের নীতি ও লক্ষ্যও প্রায় অভিন্ন। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা এদের আরও শক্তি বৃদ্ধি করছে।
এই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোই মিথ্যাবাদী রাখাল বালকের বাঘ বাঘ চিৎকারের মতো বর্তমান বাংলাদেশে আইএস আইএস বলে চিৎকার জুড়েছে। উদ্দেশ্য, তাদের ওপর থেকে পুলিশ ও জনসাধারণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া এবং সরকারকে বিভ্রান্ত করে রেখে তাদের তদন্তের মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। একশ্রেণীর পশ্চিমা মিডিয়া ও সরকার নিজেদের জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে বাংলাদেশের জামায়াত ও সহযোগী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে এই উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণায় মদদ জোগাচ্ছে। এ ব্যাপারে পশ্চিমা কোনো কোনো মহলের অন্য অভিসন্ধি থাকতে পারে। কিন্তু দেশের তথাকথিত নিরপেক্ষ সুশীল সমাজের কেউ কেউ এবং তাদের ‘নিরপেক্ষ’ মিডিয়াটি কেন জেনেশুনে এই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, তা বোঝা মুশকিল। আর কতকাল তারা ‘হিজ মাস্টার্স লয়াল ভয়েস’ হয়ে থাকবেন?
বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই – এই বিতর্ক তুলে যে জামায়াত ও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো দেশে গত চার দশক ধরে ধর্মের নামে রাজনীতি করছে এবং সেক্যুলারিস্টদের হত্যা করছে, তাদের সাম্প্রতিক তৎপরতার ওপর থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর এই চেষ্টা কেন? এই ধারাবাহিক বর্বর হত্যাকাণ্ড কীভাবে বন্ধ করা যায় এবং চিহ্নিত জামায়াত ও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে কার্যকরভাবে দমন করা যায়, তা নিয়ে মিডিয়ায় বাস্তব ও জোরালো আলোচনা শুরু করার বদলে ইনভিজিবল আইএস খোঁজার জন্য এত বিতর্ক ও প্রচার-প্রোপাগান্ডা কেন?
ঢাকার একটি ‘নিরপেক্ষ’ দৈনিক তো তাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সিনিয়র ও জুনিয়র দুই মুনশিকে দিয়ে জোরালো নিবন্ধ লিখিয়ে একটিতে সরকারকে একহাত নেওয়া হয়েছে এবং অন্যটিতে বাংলাদেশে ইসলামী স্টেট থাকার বিষয়টি প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার কাগজের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি তোলা হয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়। ওই পত্রিকার দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো প্রধান এলেন ব্যারির এক লেখায় তিনি ঢাকার কাগজের নিবন্ধ লেখকের নাম ও তার বক্তব্য উল্লেখ করে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় (৩০ সেপ্টেম্বর) এক দীর্ঘ কলাম লিখেছেন। শিরোনাম – ‘বাংলাদেশে আইএসের হুমকি’।
এলেন ব্যারির বক্তব্য মার্কিন সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আমেরিকাও সম্ভবত চায়, বাংলাদেশে জামায়াত ও তাদের সহযোগী দলগুলোর সন্ত্রাসীদের তৎপরতা থেকে সবার দৃষ্টি আইএসের দিকে ঘুরিয়ে দিতে। আমেরিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের শত্রু জামায়াতকে মডারেট ইসলামী দল বলে সার্টিফিকেট দিয়ে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়েছে। তারা জানে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বর্বর হত্যা রাজনীতির আসল হোতা কারা। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী সন্ত্রাসী দল হলেও তাদের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের অপত্য স্নেহ এখনও যায়নি। সুতরাং বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে জামায়াত ও তার সহযোগী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে বাঁচানোর এই চেষ্টা কি? একই উদ্দেশ্যে জামায়াতি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যাপারেও ওয়াশিংটনের অনীহা এবং নানা অজুহাতে প্রচ্ছন্ন বিরোধিতা গোপন নেই।
বাংলাদেশে আইএস নেই – এ কথা আমি বলি না। ক্ষুদ্র অস্তিত্ব থাকতে পারে। তা এখনও দৃশ্যমান নয়। আর তারা থাকলেও তাদের তৎপর হওয়ার দরকার নেই। তাদের কাজগুলো তো জামায়াত-শিবির এবং সহযোগী দলগুলোই করে দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে ইরাক ও সিরিয়া থেকে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে উড়ে আসার তাদের সময় ও সুযোগ কোথায়? অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সেখানে তাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ করতে হচ্ছে। সেখানকার তালেবান ও আল কায়দাও তাদের মিত্র নয়।
বাংলাদেশে সেক্যুলারিস্ট বুদ্ধিজীবী ও ব্লগারদের ওপর হামলার প্যাটার্নটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে – এই অজুহাতে চাপাতি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে হত্যা করা হয়। প্রথম এই হামলা চলে হুমায়ুন আজাদের ওপর। তার মৌলবাদবিরোধী ‘পাক সার জমিন’ উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়ার পরই। অভিযোগ রয়েছে, এই হত্যাচেষ্টার পেছনে উস্কানি ছিল জামায়াত নেতা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর।
হুমায়ুন আজাদের ওপর চাপাতি হামলার সময় আইএসের জন্মই হয়নি। তারপর থেকে অবিরাম চলছে সেক্যুলারপন্থি লেখক ও ব্লগারদের ওপর চাপাতি হত্যা, একেবারে সাম্প্রতিক দীপন হত্যা পর্যন্ত। এটা দীর্ঘকাল ধরে চলছে। এটা যে আইএসের জন্মের পূর্ব থেকে একই গ্রুপের কাজ এবং একই উদ্দেশ্যে একই প্যাটার্নে চালানো হচ্ছে – এটা বুঝতে একজন বালকেরও কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তাহলে অতীতের হত্যাকাণ্ডের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে তার ধারাবাহিকতার দায়িত্ব হঠাৎ আইএসের কাঁধে চাপানোর এই দেশি-বিদেশি চেষ্টা কেন? বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই – এই অহেতুক বিতর্ক ভুলে সন্ত্রাস ও হত্যার রাজনীতির আসল হোতাদের ওপর থেকে অদৃশ্য ও অস্তিত্বহীন শত্রুর দিকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার এই ‘নিরপেক্ষ’ বিতর্ক শুরু করা কেন?
আমার আশঙ্কা, বাংলাদেশ ক্রমেই একটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তে জড়িয়ে যাচ্ছে। আইএস সম্পর্কিত বিতর্ক তারই একটি বহিঃপ্রকাশ। হাসিনা সরকার এ সম্পর্কে ভালোভাবে সতর্ক হোক। সাম্প্রতিক বিদেশি হত্যা ও লেখক এবং পুস্তক প্রকাশক হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আওয়ামী লীগের কোনো জুনিয়র নেতা ও মন্ত্রী ঘটনা সম্পর্কে আবোল-তাবোল বক্তব্য রাখছেন। দীপন হত্যা প্রসঙ্গে মাহবুবউল আলম হানিফের বক্তব্য তার প্রমাণ। এরা ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে অক্ষম। এখন বিদেশ ভ্রমণ একটু কমিয়ে সিনিয়র নেতা, মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা যদি একটি বড় ধরনের দেশি-বিদেশি চক্রান্তকে গোড়াতেই ব্যর্থ করার জন্য সচেতন ও সক্রিয় না হন, তাহলে বিপদ এড়াতে পারবেন না।
অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে ফজলুল হক যখন প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টির সরকার গঠন করেছিলেন এবং মুসলিম লীগের পত্রিকাগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, তখন তিনি বলতেন – ‘আমার সরকারের বিপদ কোন দিক থেকে আসছে, তা আজাদ এবং মর্নিং নিউজ পত্রিকা পড়লেই বুঝতে পারি।’ বর্তমান হাসিনা সরকারও যদি বুঝতে চান, ঝড় কোন দিক থেকে আসছে, তাহলে সুশীল সমাজের কোনো কোনো বিশিষ্টজনের এবং তাদের ‘নিরপেক্ষ মিডিয়াটি’র প্রচ্ছন্ন প্রচারণাটির দিকে নজর রাখুন। বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই – এই বিতর্কটি একটি উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণারই অংশ।  – সমকাল
লন্ডন, ৬ নভেম্বর শুক্রবার, ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment