পশ্চিমাদের ঢাকা সন্ত্রাস নিয়ে কথা না বলাই ভালো

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

Paris

প্যারিসের ছয়টি স্বতন্ত্র স্থানে গত শুক্রবার মর্মান্তিক বোমা হামলায় একশর বেশি মানুষ মারা গেছে। দুইশর বেশি নর-নারী আহত হয়েছে। আহতদের অনেকেরই অবস্থা আশংকাজনক। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হল্যান্ডে আক্রান্ত এলাকার একটি এলাকা স্টেড ডি ফ্রান্সে জার্মানির সঙ্গে ফরাসি জাতীয় টিমের প্রীতি ফুটবল খেলা দেখছিলেন। তাকে সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। এ সন্ত্রাসে সুইসাইড হামলা এবং বোমা হামলা দুই-ই চালানো হয়। হামলাকারীরা সবাই নিহত বলে দাবি করা হয়েছে।

এ বর্বরতার নিন্দা করেছেন সবাই। প্রেসিডেন্ট ওবামা থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন পর্যন্ত। মাত্র আগের দিন (শুক্রবার) পশ্চিমা নেতারা ও মিডিয়া আইসিসের কুখ্যাত ঘাতক জিহাদি জনকে বা মোহাম্মদ এমওয়াজিকে ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়েছে বলে আনন্দে বগল বাজাতে শুরু করেছিলেন। মার্কিন পেন্টাগন থেকে দাবি করা হয়েছিল জিহাদি জনকে হত্যা করা সম্ভব হওয়ায় আইসিসের কোমর ভেঙে দেয়া হয়েছে। একমাত্র ব্রিটেনের লেবার পার্টির নবনির্বাচিত নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, এটা বিচারবহির্ভূত হত্যা। জিহাদি জন যত বড় অপরাধী হোক তার বিচারের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।

জিহাদি জনের মৃত্যু এখনও পুরোপুরি সমর্থিত খবর নয়। এটা মার্কিন সেনা কর্তৃপক্ষের দাবি। তবে আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনের মতো তাকেও চোরাগোপ্তা হামলায় হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি তার গোপন আস্তানা থেকে একটা গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন। তখন তার ওপর ড্রোন হামলা চালানো হয়। মার্কিন বা ন্যাটোর সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার লোকরা যখন তার খোঁজই পেয়েছিল তখন তাকে জীবিত ধরে কেন বিচারে সোপর্দ করা হল না এটাই এখন অনেক মহলের প্রশ্ন। ওসামা বিন লাদেনকেও জীবিত ধরা সম্ভব ছিল। কিন্তু অন্য একটি দেশের (পাকিস্তান) সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে গোপন হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়।

এ ধরনের ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটত? একাত্তরের কোনো বর্বর যুদ্ধাপরাধীকে যদি জীবিত ধরে এনে বিচারে সোপর্দ না করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সেনা-পুলিশ পাঠিয়ে ঘেরাও করে হত্যা করা হতো তাহলে কী হতো? এখন যে পশ্চিমা নেতা ও মিডিয়া জিহাদি জনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে আনন্দে বগল বাজাচ্ছেন এবং এ হত্যাকাণ্ড দ্বারা মানবিক অধিকার লংঘিত হচ্ছে কিনা সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে তারাই মানবাধিকার গেল গেল বলে চিৎকার জুড়তেন। বিচার স্বচ্ছ হয়নি, যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ প্রমাণিত হয়নি বলে জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করতেন।

আরও একটি কথা। বাংলাদেশে সম্প্রতি কয়েকজন মুক্তমনা ব্লগারকে একের পর এক হত্যা করা হয়েছে। এটা অবশ্যই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং নিন্দনীয় ঘটনা। কিন্তু কোনো ব্যাপক হত্যাকাণ্ড নয়। কিন্তু তাতেই বিশ্বময় হৈচৈ তোলা হয়েছিল। বাংলাদেশ নিরাপদ দেশ নয়, এ দেশে বিদেশীদের নিরাপত্তা নেই, দেশটিতে আইসিস আছে ইত্যাদি রব তুলে আমেরিকা ও ব্রিটেনের মতো দেশও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাজার গরম করে তুলেছিল। বাংলাদেশের তুলনায় এখন একশ গুণ ভয়াবহ ঘটনায় তারা নীরব কেন? বলা হয়েছে আইসিস এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ হত্যাকাণ্ড ব্যাপক এবং ভয়াবহ। একশর বেশি মানুষ নিহত হওয়া এবং দুশর বেশি মানুষ একদিনে আহত হওয়া প্যারিসের মতো উন্নত ইউরোপের একটি শহরে চাট্টিখানি কথা নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও একদিনের বোমা হামলায় ইউরোপের কোনো শহরে এত লোক একসঙ্গে হতাহত হয়েছে কিনা সন্দেহ।

প্যারিসে এই ভয়াবহ সন্ত্রাস আজ নতুন নয়। এই বছরেই জানুয়ারি মাসে তথাকথিত ইসলামিস্ট টেরোরিস্টরা প্যারিসে চার্লি হেবদো নামক সাপ্তাহিক কার্টুন পত্রিকার অফিসে এবং জুয়িস সুপার মার্কেটে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে ১৭ জনকে হত্যা করে। ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে এবং ২০০৪ সালে মাদ্রিদের ট্রেনে বোমা হামলার পর প্যারিসে একই বছর উপর্যুপরি দুবার সন্ত্রাসী হামলা আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা।

মহাশক্তিশালী ন্যাটোর এককালে শক্তিশালী হেডকোয়ার্টার বলে খ্যাত প্যারিসে এ সন্ত্রাস দমনে ফরাসি সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো বা তাদের বাকপটু মিডিয়াগুলোর কোনো হৈচৈ নেই। একথা কেউ বলছেন না যে, ফ্রান্স এখন একটি সন্ত্রাসকবলিত দেশ। এ দেশে দেশী-বিদেশী কোনো নাগরিকদের নিরাপত্তা নেই। ফরাসি সরকার তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। প্যারিসের বিদেশী নাগরিকদেরও সতর্ক করা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে দুজন বিদেশী নাগরিক গুপ্তহত্যার শিকার হতেই পশ্চিমা দুনিয়ায় এবং তাদের মিডিয়ায় সে কী হৈচৈ! এমনকি এ হামলায় আইএস জড়িত প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে সে কী প্রচার-প্রচারণা! মনে হচ্ছিল, পেলে আমেরিকা এখনই বাংলাদেশে আইএস দমনের জন্য সেনা সাহায্য পাঠায়। যারা পূর্ণ সামরিক শক্তি (ড্রোন হামলাসহ) প্রয়োগেও সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের সঙ্গে যুদ্ধে পেরে উঠছে না, ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী ইউরোপিয়ান দেশ সন্ত্রাসী দমনে ব্যর্থ, সেখানে আমেরিকা বা ন্যাটো কল্পিত আইএস বা আইসিসের খোঁজে বাংলাদেশে এসে সন্ত্রাস দমনে সাহায্য জোগাতে পারবে, তা কি হাস্যকর কথা নয়? আসলে আমেরিকা চায় যুদ্ধের বিস্তার। তাদের মারণাস্ত্র বাজারের বিস্তার। আইসিস বা সন্ত্রাস দমন নয়।

শুক্রবারের ঘটনার পরই ফ্রান্সে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। প্যারিসের বাসিন্দাদের ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। শহরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মিউজিয়াম, লাইব্রেরি, জিম, সুইমিংপুল, বাজার, সিনেমাগৃহ সবকিছু শনিবার বন্ধ রাখা হয়েছিল। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির চলতি সপ্তাহে ফ্রান্স সফরের কথা ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। এক কথায় এটা যেন গোটা ফ্রান্সের জন্য একটা যুদ্ধাবস্থা। অথচ শত্রু দৃশ্যমান নয়। এ যেন এক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ!

এ ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টির সন্দেহের নজর আইসিস বা আইএসের ওপর। গতকাল (রোববার ১৫ নভেম্বর) সানডে টাইমস খবর দিয়েছে, সিরিয়া থেকে আগত শরণার্থীদের মধ্যে আইসিস ঘাতকদের খোঁজা হচ্ছে। সিরিয়ান শরণার্থীদের পরিচয়েই এরা ফ্রান্সে ঢুকেছে। আইসিসের পক্ষ থেকে এই সন্ত্রাসের দায়ও স্বীকার করা হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের কোবরা ইমার্জেন্সি কমিটি রোববারেই জরুরি বৈঠকে বসেছেন। তারা আইসিসের কাছ থেকে সতর্ক বার্তা পেয়েছেন, পরবর্তী সন্ত্রাস লন্ডনে বা ব্রিটেনের কোনো শহরে ঘটানো হবে।

ইউরোপে ও আমেরিকায় আইসিসের সন্ত্রাস কতটা আতংক সৃষ্টি করেছে, তা বোঝা যায় কোনো কোনো পশ্চিমা বিশেষজ্ঞের মতামত থেকে। তাদের কেউ কেউ বলছেন, কমিউনিজমের সঙ্গে যুদ্ধের চেয়েও এ জঙ্গি ইসলামিজমের সঙ্গে যুদ্ধ ভয়াবহ। সানডে টাইমসের কলামিস্ট নিয়াল ফার্গুসনের মতে, রোমান সাম্রাজ্যের মতো বর্তমান পশ্চিমা সাম্রাজ্যেরও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। অতীতের রোম সভ্যতার পতনের যুগের মতোই বর্তমান ইউরোপীয় সভ্যতার অবস্থা।

সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র দ্বারাও কি এই যুদ্ধে জয়লাভ করা যাবে? অনেকেই তা বিশ্বাস করছেন না। এ সন্ত্রাসের পেছনে একটা অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস যুক্ত রয়েছে। যেমন সন্ত্রাসে বিশ্বাসী একশ্রেণীর মার্কসবাদী ও মাওবাদীদের সন্ত্রাসের পেছনেও যুক্ত অন্ধ তাত্ত্বিক বিশ্বাস। কমিউনিজমকে স্নায়ুযুদ্ধে ও গরম যুদ্ধে হটানোর জন্য পশ্চিমা জোটকে শুধু উন্নত সমরাস্ত্র নয়, উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আবেদনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। আমেরিকা পরিচিত ছিল ফ্রি ওয়ার্ল্ড বা মুক্ত গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা হিসেবে। পাল্টা সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকার গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের মুখোশ খুলে গেছে। তার আধিপত্যবাদী আগ্রাসন, মিথ্যা অজুহাতে যুদ্ধ বাধানো, যুদ্ধের বিস্তার, মধ্যপ্রাচ্যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, সেকুলার রাষ্ট্র নেতাদের হত্যা, জঙ্গি মৌলবাদীদের উত্থানে সহায়তা দান আমেরিকার ও তার সহযোগী ইউরোপীয় দেশগুলোর মুখোশ খুলে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক বিশ্বের নৈতিক নেতৃত্বের যে আসনে আমেরিকা বসা ছিল, সে আসন থেকে তার পতন ঘটেছে। ফলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট ও তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের মধ্যে এ নৈতিকতাবিহীন যুদ্ধ ও সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে এমন একটা কথা কলামিস্ট নিয়াল ফার্গুসনের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সম্ভবত বিনা দ্বিধায় বলা চলে।

বাংলাদেশে আইসিসের অস্তিত্ব দৃশ্যমান নয়। সম্ভবত নেই। বাংলাদেশে যে ব্লগার হত্যার বিভীষিকা সৃষ্টি করা হয়েছে তার মূলে আইসিস বা আইএস নয়, রয়েছে ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক দল, তাদের সমর্থক ও সহায়তাদানকারী কিছু জঙ্গি গ্র“প এবং সম্ভবত বিএনপিরও জামায়াত-সমর্থিত একটি অংশ। তাদের আশু উদ্দেশ্য হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো এবং ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা। তাদের প্রতি আইসিসের সমর্থন থাকতে পারে কিন্তু এ সমর্থনদানের জন্য ঢাকায় এসে তাদের সক্রিয় হওয়া সহজ নয় এবং তাদের জন্য তা প্রয়োজনও নয়। তারা মধ্যপ্রাচ্যে এখন অনেক বৃহত্তর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বড় শত্র“র সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত।

তবু আমেরিকা বা পশ্চিমা জোটের কেউ কেউ যে বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চায়, তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে শেখ হাসিনা অত্যন্ত স্পষ্টোক্তি করেছেন। তিনি বলেছেন, আইএসের অস্তিত্ব রয়েছে বাংলাদেশের কাছ থেকে এই স্বীকারোক্তি নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এবং দেশী কিছু শক্তি দেশটিকে লিবিয়া ও সিরিয়া বানাতে চায়। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধের বিস্তার। তাতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ বাড়বে দক্ষিণ এশিয়ায়। যুদ্ধের সম্প্রসারণ ঘটবে। যুদ্ধাস্ত্রের মার্কেট বাড়বে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মতো ধ্বংস হবে দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা।

আসলে আইসিস তাদের যুদ্ধের সম্প্রসারণ ঘটাতে চাচ্ছে ইউরোপে। এনগেজড করতে চাচ্ছে শত্রুকে ইউরোপের মাটিতে। আমেরিকাও এ সন্ত্রাস থেকে দীর্ঘকাল মুক্ত থাকবে না। এ সন্ত্রাস দমন করতে না পারলে, পশ্চিমাদের পক্ষে যুদ্ধ জয় সম্ভব না হলে রোমান সভ্যতার মতো বর্তমান ইউরোপীয় সভ্যতার জন্যও এক পতন যুগের সূচনা হতে পারে। – যুগান্তর

লন্ডন ১৫ নভেম্বর রোববার ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment