এটা সন্ত্রাস নয়, অঘোষিত যুদ্ধ


আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –
এটা সন্ত্রাস নয়, অঘোষিত যুদ্ধ

আগামী রবিবার (২২ নভেম্বর) প্যারিসে বাঙালি বৌদ্ধদের এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছি। যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যারিস শহরটি দেখার জন্য মন টানছে। প্যারিসে আমি বহুবার গেছি। প্যারিস শহরের তিলোত্তমা রূপ আমি দেখেছি। নাৎসিকবলিত যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যারিসের চেহারা দেখিনি। প্যারিস এবার বিধ্বস্ত হয়েছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দ্বারা। আইএস বা আইসিস সেই দায়িত্ব স্বীকার করেছে।

গত জানুয়ারি মাসেও প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে শার্লি এবদো নামের ম্যাগাজিন অফিসে এবং একটি জুয়িস মার্কেটে। ১৭ ব্যক্তি নিহত হয়েছিল। গত শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) প্যারিসের ছয়টি স্থানে একযোগে সমন্বিত হামলা আরো ব্যাপক এবং ভয়াবহ। মারা গেছে ১২৯ জন। আহত হয়েছে চার শর মতো নর-নারী। ফরাসি প্রেসিডেন্টকে একটি আক্রান্ত এলাকা থেকে দ্রুত সরিয়ে নিতে হয়েছে।  ফ্রান্সে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। সিকিউরিটি কঠোর করা হয়েছে। শত্রুর ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ফরাসি যুদ্ধবিমান সিরিয়ায় আইএস ঘাঁটির ওপর বোমা হামলা চালিয়েছে। মনে হতে পারে, একেবারে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন ঘটনা।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালেও নাৎসি বোমারু বিমান প্যারিসের ওপর হামলা চালালে লন্ডন শহরেও সাইরেন বা বিপদ সংকেত বাজত। এবারও প্যারিসে আইএসের হামলা চলার পর বিপদের ঘণ্টা বেজে উঠেছে লন্ডনেও। আইএসের পরবর্তী টার্গেট লন্ডন। গোয়েন্দা সূত্রে এই সতর্ক বার্তা পাওয়ার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন তাঁর কোবরা কমিটি নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছেন। লন্ডনে এবং ইউরোপের অন্যান্য শহরেও ভীতি সবার মনে; যদিও তা এখনো দৃশ্যমান নয়।

বন্ধুরা আমাকে বলেছেন, ‘এই অবস্থাতেও তুমি আগামী সপ্তাহেই প্যারিসে যেতে চাও? পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির নির্ধারিত প্যারিস সফর মুলতবি হয়ে যায় তা কি তুমি বুঝতে পারছ না?’ আমি তাঁদের বলেছি, আমার জীবন হাসিনা ও রুহানির মতো অমন মূল্যবান নয় যে আইএস তা টার্গেট করবে। আমাকে বা আমার মতো ছাপোষা কলমজীবীদের টার্গেট করতে পারে বাংলাদেশের জামায়াত-শিবির, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক ও ভাড়াটিয়া ঘাতকের দল। তা তো তারা অহরহ করে চলেছে। রোজই বাংলাদেশে তাদের হিটলিস্ট প্রকাশিত হচ্ছে। তাতে শুধু আমার নাম নয়, ড. আনিসুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক, ড. জাফর ইকবালসহ অনেকের নাম আছে বলে শুনেছি। তাঁরা সবাই মুক্ত জ্ঞানচর্চার মানুষ। কেউ ধর্মবিরোধী নন।

ঢাকায় এটা সন্ত্রাস। টার্গেট কিছু মুক্তমনা ব্যক্তিবিশেষ। উদ্দেশ্য, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর কাজে সাহায্য জোগানো। কিন্তু প্যারিসের ঘটনা নিছক সন্ত্রাস নয়। এটা যুদ্ধ। সিরিয়া ও ইরাকের একটা বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আইএস তাদের মধ্যযুগীয় তথাকথিত খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের হাতে একমাত্র বিমানশক্তি ছাড়া সব রকম মারণাস্ত্র আছে। এককালে এসব মারণাস্ত্র দ্বারা তাদের সজ্জিত করেছে আমেরিকা। উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন ঘটানো, ইসরায়েলের অভিলাষ পূর্ণ করা, তেলসমৃদ্ধ ইরাককে ভাগ করা এবং কুর্দিস্তানেরও প্রতিষ্ঠা।

আইএসের হাতে বিমানবিধ্বংসী মিসাইলও আছে বলে অনেকে সন্দেহ করে। রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস হওয়ার পেছনে আইএসের হাত রয়েছে বলে পশ্চিমা মিডিয়ায় অনেকেই মন্তব্য করেছে। বর্তমানে আমেরিকা, ব্রিটেনসহ ন্যাটো এবং রাশিয়া আইএসের ঘাঁটির ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে। স্থলযুদ্ধ চলছে। স্থানীয় সরকারি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আইএসের যুদ্ধে ইরাক ও সিরিয়ার বহু শহর কখনো এক পক্ষ এবং কখনো অপর পক্ষ দখল করে নেয়। স্থানীয় সরকারি সেনাবাহিনী যুদ্ধে পেরে উঠছে না বলে মার্কিন ল্যান্ড ফোর্স যুদ্ধে নামানোর দাবি উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা সে দাবি এযাবৎ ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। তিনি চান না রণক্ষেত্র থেকে অসংখ্য মার্কিন সৈন্যের লাশ আবার বডিব্যাগে ভর্তি হয়ে স্বদেশে ফিরে আসা শুরু হোক।

সব দিক বিবেচনা করেই বলা যায়, গত ১৩ নভেম্বর শুক্রবার প্যারিসে যা ঘটেছে, তা সন্ত্রাস নয়, আধুনিক যুদ্ধের অংশ। এই যুদ্ধে অসংখ্য সিভিলিয়ান মারা গেছে। এটা নিন্দনীয় ঘটনা। এই ঘটনার সরব নিন্দা জানিয়েছেন পশ্চিমা জোটের অধিকাংশ রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু তাঁরা ভুলে গেছেন এই অঘোষিত যুদ্ধের সূচনা করে সন্ত্রাসী দমনের নামে শত শত নিরীহ সিভিলিয়ান হত্যার প্রচলন করেন তাঁরাই। মার্কিন ড্রোন হামলা থেকে আফগানিস্তানে বিবাহ বাসর, সিনেমা হাউস, ক্রীড়া অঙ্গন, মসজিদ-কিছুই রক্ষা পায়নি। পাকিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় একই ধরনের অবাধ সিভিলিয়ান হত্যা চলছে বহুদিন ধরে।

এই নিহতদের সংখ্যার কাছে প্যারিসের নিহতদের সংখ্যা নস্যি। আমেরিকা বা ন্যাটোর প্রতিটি বিমান হামলায় ইরাক ও সিরিয়ায় শত শত নিরীহ নারী-শিশু নিহত হয়। মসজিদ, স্কুল ধ্বংস হয়। সাম্প্রতিক এক মার্কিন হামলা থেকে হাসপাতাল এবং তার ডাক্তার, নার্স ও রোগীরাও রক্ষা পায়নি। কিন্তু এই ‘কাওয়ার্ডলি হামলা’ ও বর্বর হত্যাকাণ্ডের নিন্দাসূচক একটি বাক্য ওবামা থেকে ক্যামেরন পর্যন্ত কারো মুখে শোনা যায়নি।

অতীতে যুদ্ধ ঘোষণার একটা নিয়মরীতি ছিল, একটা নৈতিকতা ছিল। বিনা যুদ্ধ ঘোষণায় এক দেশ অপর দেশকে অতর্কিতে আক্রমণ করত না। অসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে নিরীহ সিভিলিয়ান হত্যা করত না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এই নিয়মরীতি ভঙ্গ হয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একক সুপারপাওয়ার হিসেবে আমেরিকা এই নিয়মরীতি সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করতে শুরু করে। পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করা, মিথ্যা অজুহাত দর্শিয়ে (যেমন ইরাক যুদ্ধ) দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালানো মার্কিন আগ্রাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়।

গালফ যুদ্ধ থেকে শুরু করে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা পর্যন্ত সবই ছিল এত দিন আমেরিকার অঘোষিত যুদ্ধ। আইএসের দ্বারাই প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে তারা আসাদের পতন ঘটাবে ভেবেছিল। রাশিয়া, চীন ও ইরানের বিরোধিতায় তা সম্ভব হয়নি। এর ওপর আইএসও এখন আমেরিকার জন্য ‘ফ্রাংকেনস্টাইনের দানব’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ফলে আইএসের বিরুদ্ধেও শুরু হয়েছে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা জোটের অঘোষিত যুদ্ধ। কেবল তাদের স্থল সৈন্য এখন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। কিন্তু আর সব সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রই এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থল সৈন্য বা ল্যান্ড ফোর্স পাঠানোর চিন্তাও আমেরিকার মাথায় রয়েছে।

যুদ্ধে যা হয়, দুই পক্ষেই সিভিলিয়ান মারা যাচ্ছে। অসামরিক জনপদ ধ্বংস হচ্ছে। গত শুক্রবার প্যারিসের মাত্র ছয়টি এলাকা বোমাবিধ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বাগদাদ, মসুল, কাবুল, কান্দাহারের মতো শহরগুলো পশ্চিমাদের হামলায় ধ্বংস নগরীতে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য জনপদ বিরান হয়ে গেছে। হাজার হাজার অসহায় নারী-শিশু নিহত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে (সাম্প্রতিক সিরিয়ান এক্সোডাস) ইউরোপে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের জন্য আমেরিকা বা পশ্চিমা জোটের কোনো নেতার কণ্ঠে কোনো প্রকার অনুতাপের ভাষা নেই, দুঃখ প্রকাশ নেই।

শঠতা কখনো সত্যকে বেশি দিন চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। তাই এত দিন আইএসবিরোধী সন্ত্রাস দমনের অভিযান বলে চালানো হলেও এটা যে বাস্তবে একটি যুদ্ধ এবং অঘোষিত যুদ্ধ হিসেবে চলছিল তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্যারিসের শুক্রবারের ট্র্যাজেডি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ওলন্দকে বাধ্য করেছে এটাকে এখন ঘোষিত যুদ্ধ হিসেবে স্বীকার করতে।

১৩ নভেম্বর শুক্রবারের ঘটনার পরই ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলন্দ ঘোষণা করেছেন, ‘ডব ধৎব মড়রহম ঃড় ষবধফ ধ ধিৎ যিরপয রিষষ নব ঢ়রঃরষবংং’ (আমরা এমন একটি যুদ্ধ পরিচালনা করতে চলেছি, যা হবে দয়াহীন)। সম্ভবত আইএসের ঘাঁটিতে প্রচণ্ড বিমান হামলা চালিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্যের সত্যতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরলেন।

এই প্রকাশ্য যুদ্ধে পশ্চিমা জোট যদি সর্বশক্তি নিয়ে নামে, তাহলে আফগানিস্তানে যেমন তালেবান সরকারের পতন ঘটেছে, কিন্তু তাদের পরাজয় ঘটেনি, তেমনি ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের তথাকথিত খেলাফত স্টেটের পতন ঘটতে পারে, কিন্তু তাদের পরাজয় ঘটবে না। তারা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে একটা শক্তিকেন্দ্র হয়ে থাকবে এবং সৌদিসহ বিভিন্ন মার্কিন তাঁবেদার রাজতন্ত্র এবং খোদ আমেরিকার জন্যও একটি গুরুতর মাথাব্যথার কারণ হিসেবে টিকে থাকবে। প্রকাশ্য যুদ্ধটি আবার অঘোষিত যুদ্ধ ও সন্ত্রাসের চেহারায় ফিরে যেতে পারে।

এই ধর্মান্ধ অপশক্তির পতন ও পরাজয় সম্পূর্ণ করতে হলে আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যে তার আগ্রাসী ও যুদ্ধবাদী নীতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মধ্যযুগীয় স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকে পৃষ্ঠপোষকতা দানের বদলে গণতান্ত্রিক আরবজগতের অভ্যুদয়কে সমর্থন ও স্বাগত জানাতে হবে। ইসরায়েলের দস্যুবৃত্তি বন্ধ করে ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমর্থন দিতে হবে। নইলে ইউরোপে নাৎসিদের পতন ঘটেছে, কিন্তু তারা পরাজিত হয়নি; বরং নবশক্তিতে দিন দিন বলীয়ান হয়ে উঠছে। তেমনি মধ্যপ্রাচ্যেও আইএসের হয়তো পতন হবে, কিন্তু তারা পরাজিত হবে না। নতুন নামে নতুন চেহারায় আবার বলীয়ান হয়ে উঠতে চাইবে।

বাংলাদেশে আইএস যুদ্ধ চালাচ্ছে না। জামায়াত ও তাদের সহযোগী উগ্র গোষ্ঠীগুলো সন্ত্রাস চালাচ্ছে। এর কারণ কী আগেই বলেছি, হাসিনা সরকার শক্ত হলে এই সন্ত্রাসের পতন ও পরাজয় ঘটানো সম্ভব। কিন্তু আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকাকে আগে নৈতিক যুদ্ধে জয়ী হতে হবে। তার সমরশক্তি কোনো কাজ দেবে না। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment