ফাঁসির আগের রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত

অনলাইন ডেস্ক –

Saka 2

ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা ৪০ মিনিট। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুই কনডেম সেলের সামনে এসে দাঁড়ান চার কারারক্ষী। পেছনে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ও দু’জন চিকিৎসকসহ আরও ছয়জন। কনডেম সেলের পকেট গেটটি খোলা হয়। দুই কনডেম সেলে ঢোকেন তিনজন করে। এদের মধ্যে দু’জন কারারক্ষী, আরেকজন চিকিৎসক। এক কারারক্ষীর এক হাতে নিকষ কালো রঙের যমটুপি। আরেক হাতে হাতকড়া। যমটুপি দেখামাত্র স্বভাবসুলভ মুচকি হাসেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তবে এবার উপহাস বা বিদ্রুপের নয়, আসন্ন বিয়োগান্তক পরিণতির বিষাদক্লিষ্ট। ঠিক ওই মুহূর্তে মুজাহিদের সেলের চিত্র অন্যরকম। তিনি পুরো বিষয়টি অনুধাবন করামাত্র জোরে জোরে দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেন। এর মধ্যেই কনডেম সেলে গিয়ে শেষবারের মতো দুই ফাঁসির আসামির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন চিকিৎসকরা। এরপর কারারক্ষীরা মাথা থেকে গলা পর্যন্ত দীর্ঘ যমটুপি পরিয়ে দেন দু’জনকে। এ টুপি পরানোর সময় কিছুটা আপত্তি জানান মুজাহিদ। কিন্তু মুজাহিদকে কারাবিধির বাধ্যবাধকতার কথা জানালে তিনি যমটুপি পরতে রাজি হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে আগাগোড়া যুক্ত ছিলেন এমন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রোববার এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। ওই কারা কর্মকর্তা বলেন, যমটুপি পরানোর পর পিছমোড়া করে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের দুই হাতে হাতকড়া লাগিয়ে দেয়া হয়। এরপর দু’জনের দু’হাত ধরে ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে কারারক্ষীরা। এর আগেই ফাঁসিকাষ্ঠের চারদিক ঘিরে ফেলে সশস্ত্র কারারক্ষীদের একটি চৌকস দল। ফাঁসির মঞ্চে তোলার পর সাকা এবং মুজাহিদের হাঁটু শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে দেয়া হয়, যাতে তারা কোনোভাবে হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে না পারেন। কারাবিধি অনুযায়ী দুই হাঁটুর নিচেও হাতকড়া লাগানো হয়।

কারা সূত্র বলেছে, এর আগে শনিবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটে মানবতাবিরোধী অপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ এবং রাতেই ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়। কারা আদেশনামাও পড়ে শোনানো হয়। তবে কনডেম সেলে কারা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি দেখে দু’জনই ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতির বিষয়টি আঁচ করতে পারেন।

চূড়ান্তভাবে ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি জানিয়ে দেয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ বিধি অনুযায়ী দু’জনের কাছে তাদের অন্তিম ইচ্ছার কথা জানতে চায়। এমনকি বিশেষ কোনো খাবার বা কর্তৃপক্ষের সাধ্যের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব এমন ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু দু’জনের কেউই এ বিষয়ে তেমন কিছু জানাননি। কিছুক্ষণের মধ্যে কারা মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মনির হোসেন কনডেম সেলে ঢোকেন। তিনি তাদের গোসল ও অজু সেরে নিতে বলেন। এরপর দু’জনকেই বিশেষ পোশাক পরানো হয়। পেশ ইমাম তাদের তওবা পড়ান।
দণ্ড কার্যকরের সময় উপস্থিত ছিলেন এমন একজন কারা কর্মকর্তা জানান, যমটুপি পরে ফাঁসির মঞ্চে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েছিলেন সাকা ও মুজাহিদ। ফাঁসি মঞ্চের একটি প্লাটফর্মে পাশাপাশি দুটি ফাঁসির দড়ি ঝোলানো ছিল। সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবিরের হাতে ছিল একটি লাল রুমাল। এ পর্যায়ে জল্লাদের দায়িত্বপালনকারী শাহজাহান ও রাজু ফাঁসিকাষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা সাকা ও মুজাহিদের গলায় বিশেষ ধরনের দড়ি (ম্যানিলা রোপ) পরিয়ে দেন। দুই জল্লাদের দৃষ্টি তখন জেল সুপারের হাতে থাকা রুমালের দিকে নিবদ্ধ।

জেলখানার বাইরে তখন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেছে- এমন সংবাদে স্লোগান ও মিষ্টিমুখ করার পালাও চলছে। আদতে তখনও ফাঁসি কার্যকর হয়নি।

সময় তখন রাত ১২টা ৫৫ মিনিট। ঠিক ওই মুহূর্তে লাল রুমালটি মাটিতে ফেলে দেন জেল সুপার। আর সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসি মঞ্চের লিভার (হাতল) টেনে দেন জল্লাদ। আর এভাবেই কার্যকর হয় সর্বোচ্চ আদালতের দেয়া সাকা-মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায়।

সূত্র জানায়, প্রায় ২০ মিনিট দড়িতে ঝুলতে থাকেন এই দুই মানবতা বিরোধী অপরাধী। এরপর নির্দেশনা অনুযায়ী মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান সহযোগী জল্লাদ আবুল, হযরত, ইকবাল, মাসুদ ও মুকতার। তারা ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে থাকা লাশ দুটি নামিয়ে আনেন। এ পর্যায়ে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে চিকিৎসকরা দু’জনের দেহের স্পন্দন পরীক্ষা করেন। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তারা দু’জনের ডেথ সার্টিফিকেট (মৃত্যু সনদ) লিখে দেন। এরপর পোস্টমর্টেমসহ অন্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন কারা কর্তৃপক্ষ।

এর আগে শনিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আইজি প্রিজনের অফিস থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাতেই ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। এ নির্দেশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের (বিকাল ৫টা) ১ ঘণ্টা আগেই কেন্দ্রীয় কারাগারের সব বন্দিকে নির্ধারিত সেলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ততক্ষণে অবশ্য সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর নিয়ে কারাগারজুড়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হয়ে যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ বিধি অনুযায়ী সাকা-মুজাহিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাতের আয়োজন করেন। রাত ৯টার দিকে সাকা চৌধুরীর বড় ছেলে ফজলুল কাদের চৌধুরী ফাইয়াজের মোবাইলে ফোন করে কেন্দ্রীয় কারাগারে যেতে বলা হয়। এ সময় তাকে সাক্ষাৎপ্রার্থী স্বজনদের তালিকাও জানাতে বলেন কর্তৃপক্ষ। সাকার পরিবারের পক্ষ থেকে ৪০ জনের একটি তালিকা দেয়া হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ স্বজনের তালিকা ১২ জনে সীমিত রাখার অনুরোধ জানান। পরে অবশ্য সাকার সঙ্গে ১৭ জনকে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়। একইভাবে মুজাহিদের পরিবারের পক্ষ থেকে ১০ জন সাক্ষাৎ করেন।

সূত্র জানায়, ফাঁসির দড়িতে ঝোলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগের এ সাক্ষাতপর্বটি ছিল আবেগঘন। সাকা ও মুজাহিদ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে নানা ধরনের কথাবার্তা বলেন। তবে কারা কর্তৃপক্ষ সাক্ষাৎপর্বটির জন্য সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। যদিও অন্তিম সাক্ষাতের এ পর্বটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। যে কারণে দু’দফা দণ্ড কার্যকরের সময়ও বদলে ফেলতে হয়।

সূত্র জানায়, সাকা এবং মুজাহিদ তাদের পরিবারের সঙ্গে বেশ কিছু পারিবারিক কথাবার্তা বলেন। তবে উভয় পরিবারের কেউই উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করেননি। এ সময় সেখানে কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। স্বজনদের সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত সাকা ও মুজাহিদের এ সাক্ষাৎপর্বের ভিডিওচিত্র ধারণ করে রাখেন কারা কর্তৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, সাক্ষাৎপর্বে দণ্ডপ্রাপ্তরা মূলত কনডেম সেলেই থাকেন। লোহার শিক দিয়ে ঘেরা সেলের বাইরে থাকেন স্বজনরা। সাকা-মুজাহিদের ক্ষেত্রেও একইভাবে সাক্ষাৎপর্বটি সমাপ্ত হয়। তবে সাকা একপর্যায়ে কনডেম সেলের বাইরে এসে স্বজনদের সঙ্গে একান্তে কিছু সময় কাটানোর আবদার করেন। কিন্তু বিধিবহির্ভূত হওয়ায় তাকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি।

সূত্র জানায়, একদিকে যখন পরিবারের সঙ্গে দুই ফাঁসির আসামির শেষ দেখা চলছে, অন্যদিকে তখন একে একে কারাগারে প্রবেশ করেন- আইজি প্রিজন ব্রি. জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন, জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা, ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রতিনিধি গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদের সমন্বয়ে ফাঁসি কার্যকরসংক্রান্ত ১২ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। এ কমিটি ফাঁসি কার্যকরের চূড়ান্ত সময় নির্ধারণ করেন।

সূত্র জানায়, সার্বিক নিরাপত্তা, কারাগারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও লাশ পরিবহনের সুবিধাজনক সময়সহ আনুষঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সময়টি রাত সাড়ে ১২টার পর নির্ধারণ করা হয়।

এর আগে অবশ্য রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে একাধিকবার জল্লাদরা ফাঁসির মহড়ায় অংশ নেন। ফাঁসির মঞ্চ, ম্যানিলা রোপসহ ফাঁসি কার্যকরে ব্যবহৃত উপকরণ পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট দেন প্রধান কারা তত্ত্বাবধায়ক।
একজন কারা কর্মকর্তা জানান, দণ্ড কার্যকরের পর সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে ধর্মীয় রীতি মাফিক কাফনে মোড়ানো দুটি লাশ কাঠের কফিনে ভরে কারা ফটকের ভেতরে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেয়া হয়। কারাবিধি অনুযায়ী ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের প্রতিটি পর্যায় সমাপ্তের পরপরই বিশেষ সাইরেন বা বেল বাজানো হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ফাঁসি কার্যকরের সময়টুকুতে মঞ্চের কাছাকাছি দায়িত্বপালনকারী কারা রক্ষীদের সেখান থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয়া হয়।
সূত্র জানায়, বন্দিকে ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে সংকেত হিসেবে লাল রুমাল ব্যবহারের রীতিটি ব্রিটিশ আমল থেকেই অনুসরণ করা হয়। কারা কর্মকর্তারা জানান, যাতে নিঃশব্দে ফাঁসি কার্যকর করা যায় সে কারণেই কোনো ধরনের মৌখিক নির্দেশ না দিয়ে রুমাল ফেলে দেয়ার সাংকেতিক নিয়মটি অনুসরণ করা হয়ে থাকে।
জানা গেছে, রীতি অনুযায়ী যে কোনো ফাঁসি কার্যকরের পর ব্যবহৃত ম্যানিলা রোপটি সংরক্ষণ করা হয়। সাধারণত এ দড়িটি অন্য কোনো ফাঁসি কার্যকরের জন্য আর ব্যবহৃত হয় না। এটিকে ইতিহাসের চিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করাই রেওয়াজ। – যুগান্তর

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment