বিষাদ মিশ্রিত স্বস্তি : জাতীয় মানস গ্লানিমুক্ত হল

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

Sakaসাকা চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর দেশে এবং বিদেশে থাকেন এমন অনেক বন্ধুর কাছ থেকে টেলিফোন পাচ্ছি। সবাই মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধের জন্য এই দুই যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে জানতে চাইলেন, এই ব্যাপারে আমার প্রতিক্রিয়া কী? আমি তাদের সত্য কথাটাই জানিয়েছি। বলেছি, বিষাদ মিশ্রিত স্বস্তি পেয়েছি। এতদিনে আমাদের জাতীয় মানস গ্লানিমুক্ত হল।

কোনো কোনো বন্ধু জিজ্ঞাসা করেছেন বিষাদ মিশ্রিত স্বস্তি কেন? বলেছি, মানুষ শত্রুমিত্র সবার মৃত্যুতেই কম-বেশি শোক অনুভব করে। সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ যত বড় অপরাধই করে থাকুন, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে তাদের এই নির্মম মৃত্যু ক্ষণকালের জন্য হলেও কারও কারও মনে বিষাদের ছায়া ফেলবে। তারপর মানবতার বিরুদ্ধে তাদের জঘন্য অপরাধের কথা স্মরণ হলে সেই বিষাদের ভাব মুছে গিয়ে স্বস্তি ও আনন্দ মনে জাগবে। এটাই স্বাভাবিক।

দুই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর প্রাণদণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়ার খবর শুনে আমার মনেও এটাই ঘটেছে। বিশেষ করে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্য। তার পিতা একজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীও একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোলাবরেটর হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলার কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন। একটি রাজনৈতিক পরিবারের উপর্যুপরি এই দুই ট্রাজেডির কি কোনো দরকার ছিল?

ফজলুল কাদের চৌধুরী রাজনৈতিক মতামতের আমি ছিলাম ঘোর বিরোধী। তথাপি ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। পাকিস্তান আমলে যখনই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় তার দিলু রোডের বাসায় আসতেন, আমার জন্য পতেঙ্গার তরমুজ নিয়ে আসতেন। সে সময় তার চট্টগ্রামের গুডহিলের এবং ঢাকার দিলু রোডের বাসায় তরুণ সালাহউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বহুবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। তখনই তাকে আমার অবিনয়ী, অসহিষ্ণু এবং উদ্ধত স্বভাবের তরুণ বলে মনে হয়েছে। তার সম্পর্কে আমার এ ধারণা কখনও পাল্টায়নি। পাল্টানোর কোনো কারণ ঘটেনি।

আমার বিস্ময় লাগে, একাত্তর সালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াত নেতারা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদেরই হত্যা করেননি, অকাতরে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষও হত্যা করেছেন। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এমন কোনো নৃশংসতা নেই যা তারা করেননি। কিন্তু অপরাধ করার পর চুয়াল্লিশ বছরেও তারা সেজন্য কিছুমাত্র অনুতপ্ত হননি। ভুলেও একবার শোচনা প্রকাশ করেননি। বরং নিজেদের অতীত নিয়ে রহস্য কুড়াতে চেয়েছেন। সাকা চৌধুরীর ঔদ্ধত্যের তো কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। আমার মনের বিস্ময়কর প্রশ্নটা তাই, এদের মনে কি কোনো প্রকার মানবিকতার বোধ ছিল না? নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তারা কি কোনোদিন কোনো প্রকার অনুশোচনা বোধ করেননি?

অথচ আশপাশে তাকালেই দেখা যায়, নিজ দেশে নয়, পরের দেশেও যারা অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছেন, এমন অনেক মানুষ পরে অনুশোচনার আগুনে জ্বলেছেন। প্রকাশ্যে অনুতাপ প্রকাশ করে নির্যাতিতদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে অতর্কিতে পোল্যান্ড আক্রমণ করে দেশটির নিরীহ মানুষের ওপর হিটলারের জার্মানি যে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিল, সেজন্য পরবর্তীকালে জার্মানির এক চ্যান্সেলর পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ার্সতে ছুটে গিয়ে জার্মান সেনাদের অত্যাচারে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের স্মৃতিস্তম্ভে গিয়ে মাথা নত করে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। পোল্যান্ডের মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা শহরে আনবিক বোমা ফেলেছিলেন যে মার্কিন বৈমানিক, হিরোশিমার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি এতই অনুতপ্ত হন যে- মানসিক ভারসাম্য হারান। গুরুতরভাবে মানসিক রোগগ্রস্ত হলে তার দীর্ঘ চিকিৎসার দরকার হয়েছিল। আর বিস্ময়ের কথা এই যে, ৭১ সালে জামায়াতিরা এবং সাকা চৌধুরী হত্যা নির্যাতন চালিয়েছেন বিদেশীদের ওপর নয়, স্বদেশের নিরীহ মানুষের ওপর। এমনকি নারী ও শিশুদের ওপরেও। পুত্রের সামনে পিতাকে হত্যা কিংবা মাতার সামনে তার কুমারী কন্যার ওপর বীভৎস অত্যাচার চালানোর সময় কিংবা গ্রামের পর গ্রামের হিন্দুবসতি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়ার পরও তাদের মনে একবারও অপরাধবোধ কিংবা মানবিক অনুশোচনা কি জাগেনি? চুয়াল্লিশ বছর ধরে দেখা গেছে তাদের মনে কোনো মনুষ্যত্ববোধ নেই। অনুতাপ ও অনুশোচনা নেই। অতীতের মানবতাবিরোধী কাজকর্মের জন্য তারা অনুতপ্ত ও লজ্জিত নন, বরং চরম ঔদ্ধত্য প্রকাশে আগ্রহী।

একাত্তরের এই যুদ্ধাপরাধীরা যদি সামান্যতম মনুষ্যত্ববোধের অধিকারী হতেন, তাহলে চুয়াল্লিশ বছর ধরে তারা রাজনীতির প্রকাশ্য মাঠে বুক ফুলিয়ে হাঁটতে পারতেন না। অন্তত একবারের জন্য হলেও তারা দেশবাসীর কাছে করজোড়ে দাঁড়াতেন। মাথা নত করে তাদের কাছে অনুতাপ প্রকাশ করতেন। যেসব বধ্যভূমিতে তারা নৃশংস হত্যা-নির্যাতন চালিয়েছেন, সেসব বধ্যভূমিতে গিয়ে শহীদদের আত্মার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতেন। তারা তা করেননি। বরং দীর্ঘ চার দশক পর যখন তাদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় এবং বিচার শুরু হয়, তখন এই বিচার বানচাল করার জন্য তাদের সমর্থকরা আন্দোলনের নামে নতুন করে নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যা শুরু করে। এই সেদিন সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের প্রাণদণ্ডাদেশ আপিল আদালতে বহাল থাকার রায় ঘোষণার আগে-পরে যে বিদেশী নাগরিক হত্যা করা হয়, তার পেছনেও দেশে অরাজকতা সৃষ্টি ও বিদেশী হস্তক্ষেপ ডেকে এনে এই বিচার বানচাল করার চেষ্টা হয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন।

তাই এই দুই প্রধান যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়ায় আমার মতো অনেকের মনেই সামান্য বিষাদের ছায়া দেখা দিয়েই তা মিলিয়ে যাবে। সেখানে স্বস্তি ও উল্লাস দেখা দেবে। বাংলাদেশে তা দেখাও দিয়েছে। ৭১-এর মানবতাবিরোধী কাজের প্রধান অপরাধীদের অধিকাংশের বিচার ও দণ্ড হওয়ায় জাতির মন ও মানসিকতা গ্লানিমুক্ত হল। চুয়াল্লিশ বছর ধরে এই গ্লানি জাতি বহন করেছে। বর্তমান হাসিনা সরকার- বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এজন্যই বড় রকমের অভিনন্দন লাভের যোগ্য যে, যেখানে কয়েক বছর আগেও বিশ্বাস করা যায়নি, বাংলাদেশে কখনও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড দেয়া সম্ভব হবে, সেই অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য কাজটি শেখ হাসিনা সম্পন্ন করেছেন।

বাধা তো শুধু দেশের ভেতর থেকেই আসেনি, বাইরে থেকেও এসেছে। আমেরিকার মতো পরাশক্তিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যাপারে খুশি নয় এবং রোববারের দুই ফাঁসি নিয়েও তাদের মনের অসন্তোষ গোপন রাখেনি। মার্কিন গোয়েন্দা চক্র সিআইএর হাতে যখন অসংখ্য বিদেশী রাষ্ট্রনায়কের রক্তের দাগ লেগে আছে এবং সন্ত্রাস দমনের নামে যে দেশটি এখনও সারা বিশ্বে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে বেড়াচ্ছে, তাদের মুখে বাংলাদেশে দীর্ঘ বিচারের শেষে অপরাধীদের শাস্তিদান নিয়ে প্রশ্ন শুধু হাস্যকর নয়, নিন্দনীয়ও।

রোববারের দুই ফাঁসিতে দেশের মানুষ গ্লানিমুক্ত হয়েছে এবং স্বস্তি লাভ করেছে। কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি কোথাও। কেবল রাউজানের গ্রামে সাকা চৌধুরীর মৃতদেহ কবরস্থ হওয়ার পর ঢাকায় ফেরার পথে টেলি সাংবাদিকদের একটি গাড়ির ওপর কিছু দুষ্কৃতকারী হামলা চালায়। একজন টেলি সাংবাদিক তাতে আহত হয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াত আজ সোমবার দেশে হরতাল ডেকেছে। এই হরতালে কেউ সাড়া দেবে মনে হয় না। হয়তো সন্ত্রাসের ভয়ে রাস্তায় যানবাহন চলাচল কমবে এবং কিছু দোকানপাট বন্ধ থাকবে। জামায়াতিরা হরতালের নামে সাধারণ মানুষের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে পারে। বাসে-লরিতে আগুন দিতে পারে। তাতে মুখরক্ষার হরতাল করা ছাড়া তারা আর কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।

সাকা চৌধুরী ছিলেন বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ছিলেন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক। এই দুই প্রাণদণ্ড তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ডেকে আনতে পারে। মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে দুই দলেরই দুই শীর্ষ নেতাই চরম দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পর এই দুই দলের ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে, তারা দেশের মানুষের কাছে কী বক্তব্য নিয়ে দাঁড়াতে চাইবেন বা পারবেন তা এখন দেখার বিষয়।

এই দণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়ার সময়েই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দেশে ফিরেছেন। দল গোছানো ও আন্দোলনে নামার কী কর্মসূচি নিয়ে তিনি দেশে ফিরেছেন তা এখনও জানা যায়নি। দলের এক শীর্ষ নেতার ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানোর ভয়ানক আঘাত সহ্য করে দলটি আবার কীভাবে দাঁড়ায় অথবা আদৌ দাঁড়াতে পারবে কিনা, এ প্রশ্নটি এখন স্বাভাবিকভাবে সামনে এসে যাবে। – যুগান্তর

লন্ডন ২২ নভেম্বর, রোববার ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment