কালান্তরের কড়চা

অপরাধের মাত্রায় এই দণ্ডদান অপরিহার্য ছিল

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

অপরাধের মাত্রায় এই দণ্ডদান অপরিহার্য ছিল

দুই দিন আগেও যে দুজন ছিলেন অত্যন্ত তরতাজা মানুষ, প্রৌঢ়ত্ব এখনো চেহারায় তেমন ছাপ ফেলেনি; একজন পরিচিত ছিলেন বিএনপির গর্জনকারী নেতা, অন্যজন ছিলেন জামায়াতের তর্জনকারী সাধারণ সম্পাদক, তাঁরা দুজনই আজ নেই। গত রবিবারের প্রথম প্রহরে তাঁরা দুজনই প্রয়াত অথবা মরহুম হয়ে গেছেন। রবিবার (লন্ডন সময়) সকাল না হতেই যখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে মৃত্যুবরণের খবরটি পাই তখন কৈশোরে পাঠ্যপুস্তকে পড়া কবিতার একটি চরণ মনে পড়েছে। ‘আয়ু যেন পদ্মপত্রে নীর’।

সাকা চৌধুরী যত দিন বেঁচে ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর ছিল সগর্জন উপস্থিতি। কারাগারে বসেও তিনি গর্জন করেছেন। অশালীন কথাবার্তা বলেছেন। শেখ হাসিনা, এমনকি খালেদা জিয়া সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন তা ছিল অকহতব্য। অতীতের মানবতা বিরোধী জঘন্য অপরাধের জন্য তাঁর মনে কোনো অনুতাপ ছিল না। কোনো অনুশোচনা কোনো দিন ভুলেও প্রকাশ করেননি। হয়তো ভাবতে পারেননি, শেষের সেদিন এমন ভয়ংকর হবে। ৪৪ বছর বিচার ও দণ্ড এড়িয়ে চলতে পারলেও শেষ পর্যন্ত ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হবে।

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদও ছিলেন একই চরিত্রের লোক। একাত্তরে চরম যুদ্ধাপরাধ করে এই সেদিনও তর্জন করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই!’ অদৃষ্টের কী পরিহাস, বিচারে প্রমাণিত সেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবেই তাঁকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছে। সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদ দুজনই রোমান ইতিহাস পাঠ করেছিলেন কি না জানি না। এই ইতিহাস পাঠ করে থাকলে তাঁরা নিশ্চয়ই জানতেন, প্রাচীনকালে দিগ্বিজয়ী রোমান সেনাপতিরা অন্য দেশ জয় করে সে দেশের মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে যখন স্বদেশে ফিরতেন তখন তাঁদের ঘোড়ার পাশে আরেক ঘোড়ার ওপরে একজন সাধারণ সৈনিককে রাখতেন। ওই সৈনিকের কাজ ছিল সেনাপতির কানে কানে বলা-বেহবৎধষ, ুড়ঁ ধৎব ধ সড়ৎঃধষ (হে সেনাপতি, আপনাকেও একদিন মরতে হবে)। রোমান সেনাপতিরা নিজেরাই এই সাধারণ সৈনিককে পাশে রাখতেন এই বক্তব্য শোনার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল, নিজেদের কৃত অপরাধ সম্পর্কে তাঁরা যেন গর্বিত হয়ে না ওঠেন।

মানবতার বিরুদ্ধে যে জঘন্য অপরাধ করেছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীরা, ৪৪ বছর ধরে তার কোনো বিচার ও দণ্ড না হওয়ায় তারা গর্বিত হয়েছে, অহংকারে স্ফীত হয়েছে। তার প্রকাশ ঘটেছিল সাকা চৌধুরী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ সব অপরাধীর মধ্যেই। তাদের কয়েকজন বিচারে দণ্ডিত হওয়ার পর জামায়াতের আরেক পালের গোদা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যু দণ্ডাদেশের আপিলের এখন শুনানি চলছে। দেশবাসী সাগ্রহে অপেক্ষা করছে তাঁর আপিলের রায় শোনার জন্য।

১৯৭১ সালে ‘মইত্যা রাজাকার’ হিসেবে কুখ্যাত এই মতিউর রহমান নিজামীও অন্যান্য জামায়াত নেতার সঙ্গে ৪৪ বছর ধরে বিচার ও দণ্ড এড়াতে পারায় (এমনকি বিএনপির কৃপায় স্বাধীন বাংলাদেশে মন্ত্রী হতে পারায়) গর্বে স্ফীত হয়ে শুধু নিজেদের অপরাধ অস্বীকার করা নয়, জামায়াতের অভিভাবকত্বে বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমান নামে যে ভয়াবহ ঘাতকরা গজিয়ে উঠেছিল, তাদের পক্ষেও সাফাই গাইতে শুরু করেছিলেন মন্ত্রী পদে বসে। তিনি গলা উঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো বাংলা ভাই নেই। এটা সাংবাদিকদের আবিষ্কার।’ এর কিছুকাল পরেই নরপশু বাংলা ভাই ধৃত হয় এবং তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়।

এখন মতিউর রহমান নিজামীও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ‘মইত্যা রাজাকার’ হিসেবে আদালতের বিচারের সম্মুখীন। তাঁর অপরাধের যে দীর্ঘ ফিরিস্তি, তা সাংবাদিকদের আবিষ্কার করতে হয়নি, ৪৪ বছর ধরে তা লুকিয়ে রাখা গেলেও দেশবাসীর স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যায়নি। শেষের সেদিন বড়ই ভয়ংকর। আজ হয়তো এই কথাটি একাত্তরের সব যুদ্ধাপরাধীর মন ও মানসকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তুলছে। কিন্তু রোমান সেনাপতিদের অনুকরণে তাঁরা যদি নিজেদের কৃত অপরাধ সম্পর্কে মানুষের ধিক্কারধ্বনিকে কিছুটাও গুরুত্ব দিতেন ও জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হতেন, তাহলে জাতি হয়তো তাঁদের লঘুদণ্ড মেনে নিত। তাঁদের চরম দণ্ডের দাবিতে ঢাকার শাহবাগ চত্বরে বিশাল গণ জমায়েত হতো না।

আজ বিএনপি ও জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের জন্য কাঁদার কেউ নেই। বরং সাধারণ মানুষ গভীর স্বস্তি ও উল্লাস প্রকাশ করছে। গতকাল (সোমবার) এই ফাঁসির প্রতিবাদে জামায়াত যে হরতাল ডেকেছিল, কয়েক দিন আগে ডাকা হরতালের মতো জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। একমাত্র আপত্তি ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান সরকার। ১৯৭১ সালে ওই দেশের সামরিক জান্তা বাংলাদেশে ভয়াবহ গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা চালিয়েছে এবং বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধাপরাধীরা ছিল তাদের কোলাবরেটর। সুতরাং একই অপরাধের মাসতুতো ভাইদের বিচার ও চরম দণ্ডলাভের খবরে অবশ্যই তাদের পাকিস্তানি বেরাদরদের মনে শোক উথলে উঠবে।

তবে পাকিস্তানের বর্তমান সরকারের কাছ থেকে এটা আশা করা যায়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা ও গণধর্ষণ চালিয়েছে পাকিস্তানের একটি সামরিক সরকার। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার (তাদের দাবি অনুসারে) একাত্তরের গণবিরোধী ইয়াহিয়া-জান্তার উত্তরাধিকার বহন করে না। বরং পাকিস্তানের বহু মানুষ এখন বলছে, ‘১৯৭১ সালের বর্বরতার জন্য পাকিস্তানের উচিত বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া।’ প্রশ্ন হলো, তা না করে বর্তমান পাকিস্তান সরকার কেন খুনি ইয়াহিয়া সরকারের দায় নিজেদের কাঁধে গ্রহণ করতে চাচ্ছে?

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ের হিটলারের নাৎসি সরকারের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ভার যুদ্ধ পরবর্তী কালের গণতান্ত্রিক জার্মান সরকার গ্রহণ করেনি। জার্মানির মাটিতেই (ন্যুরেমবার্গে) নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক জার্মান সরকার তাতে সমর্থন দিয়েছে। নাৎসি দলকে তারা জার্মানিতে নিষিদ্ধ করেছে। নাৎসিদের পরাজয় ও পতনের দিবসটি তারা ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার সঙ্গে মিলে পালন করে। আর বর্তমান পাকিস্তান চাচ্ছে ৪৪ বছর পরও তাদের যুদ্ধাপরাধী একটি গণবিরোধী সরকারের দায়ভার এখনো বহন করতে। এটা কি বিস্ময়ের ব্যাপার নয়?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হওয়ায় পাকিস্তানও সামরিক শাসনের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছিল-এ কথা কি তারা ভুলে গেছে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় এবং দেশটিতে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় বসে। এ জন্য পাকিস্তানের পরবর্তী সরকারের উচিত ছিল বাংলাদেশের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, ১৯৭১ সালের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পাকিস্তানের মাটিতেই পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যবস্থা করা। পাকিস্তান তা করেনি। ফলে একাত্তরের পাপের বোঝা এখনো তাদের বইতে হচ্ছে। একাত্তরে যে ধ্বংসযজ্ঞ বাংলাদেশে চালাতে চেয়েছিল পাকিস্তান, এখন সেই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে পাকিস্তানের বুকের ওপরে।

বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদান নিয়ে আমেরিকার আপত্তি ‘সন্তান শোকে মাছের মায়ের কান্না’র মতো। আমেরিকার সচেতন বুদ্ধিজীবীরাই এখন বলছেন, হিটলার ও মুসোলিনির যুদ্ধাপরাধের চেয়েও ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধের জন্য বুশ ও তাঁর কোহর্টদের (ব্রিটেনের টনি ব্লেয়ার সাহেবেরও) বিচার ও দণ্ড হওয়া উচিত। বিশ্বজুড়ে এখন যে ধ্বংস ও তাণ্ডব চলছে তার জন্য মূলত দায়ী বুশ ও ব্লেয়ার। নিজ দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যবস্থা যাঁরা করতে পারেননি, অন্য দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তাঁদের চক্ষুঃশূল তো হবেই। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে বিচার প্রহসনে ও গাদ্দাফি ও লাদেনকে বিনা বিচারে হত্যায় নির্বাক থাকার পর বাংলাদেশে প্রকৃত মানবতার শত্রুদের দণ্ডদানে আমেরিকার আপত্তি জানানোর নৈতিক অধিকার আছে কি?

বিশ্বে এখন মৃত্যুদণ্ড প্রথা রদ করার পক্ষে জনমত প্রবল। কিন্তু এই জনমতই আবার নারীহত্যা, শিশুহত্যা ও গণহত্যার মতো বর্বরতার নায়কদের চরম দণ্ডদানের পক্ষে সরব। পৃথিবীতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের মতো মানবতার বর্বর শত্রুদের যত দিন অবস্থান থাকবে তত দিন মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা সম্ভব হবে না, হয়তো উচিতও হবে না।

লন্ডন, সোমবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment