তিনি কেন আমাদের ইতিহাসের অদ্বিতীয়া নেত্রী

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGC

ফাঁসিতো হয়ে গেল। একাত্তরের মানবতার শত্রুদের দুই পালের গোদা সা.কা. চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। মইত্যা রাজাকার নামে পরিচিত মতিউর রহমান নিজামীর আপীল মামলার শুনানি চলছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীও পুনর্বিচারের সম্মুখীন হতে পারেন। নাটের গুরু মীর কাশেম এবং আরও দু’একজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার শেষ হতে বেশি দেরি হবে মনে হয় না।
লন্ডনে আমরা কয়েকজন বাংলাদেশী বন্ধু এ কথাটাই আলোচনা করছিলাম। একটা ব্যাপারে আমরা একমত হলাম যে, ইতিহাসে শেখ হাসিনার জন্য একটি স্থায়ী আসন তৈরি হয়ে গেল। ভবিষ্যতে একদিন শেখ হাসিনা ও তার সরকারের ভালোমন্দ দু’দিক নিয়েই আলোচনা হবে। কিন্তু এ কথাটি সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত হবে যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং দণ্ডদানের মতো অসম্ভব কাজটি করে তিনি ইতিহাসে নিজের নামটি চিরকালের জন্য স্থায়ী করে গেলেন। বাংলাদেশের তিনি অদ্বিতীয়া নেত্রী। মানবতার শত্রু এই জঘন্য স্বদেশদ্রোহীদের বিচার এবং চরম দণ্ডদানের সাহস, ধৈর্য ও বিচক্ষণতা বাংলাদেশে আর কোন নেতানেত্রীর মধ্যে নেই। হাসিনা না হলে এই বিচার কখনো হতো না। বাংলার ইতিহাস কলঙ্কমুক্ত হতো না।

পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে আমি সাংবাদিকতা করছি। আমার এই সুদীর্র্ঘকালের সাংবাদিক অভিজ্ঞতাতেও একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া শেখ হাসিনার তুল্য দ্বিতীয় সাহসী নেতা দেখি না বাংলাদেশে। তার অনেক কাজ অনেক ত্রুটির সমালোচনা করতে পারি; কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের অধিকাংশের বিচার ও দণ্ড হওয়ার পর নতমস্তকে বলছি, শেখ হাসিনা, তোমার কোনো তুলনা নেই। তোমার তুলনা তুমি-ই।

আজ অকপটে স্বীকার করছি, শেখ হাসিনার সাহস ও দৃঢ়চিত্ততার কথা জানা সত্ত্বেও আমিও বিশ্বাস করতে পারিনি, বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের কোনোদিন বিচার ও দণ্ড হবে। দুই সামরিক শাসক বিএনপির জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জাতীয় পার্টির জেনারেল এরশাদের আমলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সদম্ভ কথাবার্তা শুনেছি। কাজ দেখেছি। ‘শেখ হাসিনারও তার পিতার মতো পরিণতি ঘটানো হবে’ বলে বহুবার হুমকি দিয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম হোতা কর্নেল ফারুকের ফ্রিডম পার্টি। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য ঘাতকদের উচ্চ সরকারী পদ দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন এবং জেনারেল এরশাদ তো খুনী কর্নেল ফারুককে দেশের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন।

সদ্য প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে প্রথম মন্ত্রীপদে বসান জেনারেল এরশাদ। তারপর বিএনপির বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতার শত্রু, যুদ্ধাপরাধীদের তার সরকারের মন্ত্রী বানিয়ে ষোলকলা পূর্ণ করেন। যে মতিউর রহমান নিজামী মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলার পতাকা দু’পায়ে দলেছেন; বিএনপি নেত্রীর কৃপায় তাকেই মন্ত্রীপদে বসে গাড়িতে সেই পতাকা উড়িয়ে ঢাকার রাজপথে সদম্ভে ঘোরাফিরা করতে দেখা গেছে।

তখন চরম হতাশায় আরো দশজন দেশপ্রেমিক মানুষের মতো ভেবেছি, চুয়াল্লিশ বছর ধরে ভেবেছি, মানবতার এই জঘন্য শত্রুদের কোনোদিন বিচার ও দণ্ড হবে না। এদের বিচার ও দণ্ডের ব্যবস্থা করার মতো কোনো সাহসী নেতা ও দল নেই বাংলাদেশে। আমি বেঁচে থাকতে এদের শাস্তি দেখে যাব না। বরং বাংলাদেশে এই নরপশুদের সদম্ভ ক্ষমতা ভোগ দেখেই এবং তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাবার্তা সহ্য করেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। যে সুখী, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলার স্বপ্ন দেখেছি যৌবনে এবং সংগ্রাম করেছি, সেই স্বপ্ন ও সংগ্রাম ব্যর্থ হয়ে যাবে।

১৯৯৬ সালে দীর্ঘ একুশ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন আবার ক্ষমতায় আসে, তখন মনে একটু ক্ষীণ আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু বেশি আশা করতে পারিনি। রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ এই অল্প বয়সী গৃহবধূ সরকার গঠন করতে পারলেও কী করতে সক্ষম হবেন? চারদিকে অসম্ভব বাধার প্রাচীর। তার নিজের দলের মধ্যে কয়েকজন প্রবীণ নেতা, মায় তার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘বিগ আঙ্কলও’ তলে তলে তার বিরুদ্ধে ক্ষুর শানাচ্ছেন। তার চারপাশে রয়েছে শুধু কিছু অনভিজ্ঞ ইয়ং টার্কস্।

সিভিল এবং মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসিতেও তখন আওয়ামী বিরোধী গ্রুপ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ক্যান্টনমেন্টে বসে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করছেন বিএনপি-নেত্রী খালেদা জিয়া। সুবিধাভোগী এলিট শ্রেণীর মধ্যে একটি সুশীল সমাজ গড়ে উঠেছে, নব্যধনীদের মধ্যে একাধিক মিডিয়া মোগল তৈরি হয়েছে যারা চরমভাবে হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বিরোধী। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও আমেরিকার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হস্টালিটি সর্বজনবিদিত। চলছে হাসিনা-বিরোধী গোপন ও প্রকাশ্য চক্রান্ত, প্রোপাগান্ডা, তার জীবনের উপরেও চলেছে একাধিক ভয়াবহ হামলা। আওয়ামী লীগের বহু প্রবীণ নেতা ও মুক্তবুদ্ধির লেখক ও বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে। কী করবেন একা এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে নেতৃত্বে উঠে আসা শেখ হাসিনা? আবার কি বাংলাদেশে পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি হবে?

ভয় হয়েছে। ভেবেছি ঘরে বাইরে এই প্রচণ্ড বাধা ও বিরোধিতার অচলায়তন ভেঙ্গে শেখ হাসিনা এগুতে পারবেন না। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়েছে, শেখ হাসিনা নিজেও এগুতে চান কি? তার বিরোধিতাকারীদের চাইতেও সন্দেহবাদীরা তার কাজে বেশি বাধা সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে অঢেল টাকা ঢালা হয়েছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য। আমেরিকাসহ কয়েকটি শক্তিশালী দেশ এই বিচার বন্ধ করার চেষ্টা করেছে বিচারে স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলে। দেশে আন্দোলনের নামে প্রথমে নিরীহ জনগণের ওপর পেট্রোল বোমা হামলা, তারপর ব্লগার ও বিদেশী নাগরিক হত্যা করা হয়েছে। এই পর্যন্ত পর্বতপ্রমাণ বাধার সঙ্গে, দেশী-বিদেশী প্রচণ্ড চাপের মুখে শেখ হাসিনা ধীরে হেঁটেছেন; কিন্তু গন্তব্য স্থানে পৌঁছতে মনোবল হারাননি। শত্রুদের চাইতেও তার কাজে বেশি বাধার সৃষ্টি করেছি আমরা সন্দেহবাদীরা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে হাসিনা সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা সন্দেহ প্রকাশ করেছি। এই সন্দেহ জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। এই বিভ্রান্তি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানে আরও বড় বাধার সৃষ্টি করতে পারত।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন ও তাদের গ্রেফতার শুরু হতেই সন্দেহবাদীরা বলতে শুরু করলেন, লোক দেখানোর জন্য বিচার শুরু করা হয়েছে। কাউকে চরম শাস্তি দেয়া হবে না। গোলাম আযমকে গ্রেফতার করার সাহস সরকার কখনো দেখাবে না। গোলাম আযম গ্রেফতার হলেন; শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের মুখে কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়ে গেল। তারপরও রটানো হলো জামায়াতের সঙ্গে সরকারের একটা গোপন চুক্তি হয়ে গেছে। আর কারও চরম দণ্ড হবে না। সন্দেহবাদীদের এই সন্দেহও পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন সন্দেহবাদীদের অনেকে প্রকাশ্যেই বলতে শুরু করেছিলেন, সা.কা. চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের এতোই ঘনিষ্ঠতা যে, সা. কা. চৌধুরীর সাতখুন মাফ হয়ে যাবে। তাকে বড়জোর কয়েক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হতে পারে। ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়ার পরও সন্দেহবাদীরা বলেছেন, সুপ্রীম কোর্টের আপীল ডিভিশন তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়তো বহাল রাখবে না। সব সন্দেহের নিরসন ঘটিয়ে সা.কা, চৌধুরীরও ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।

অকপটে স্বীকার করছি, এই সন্দেহবাদীদের প্রচারণা দ্বারা আমিও প্রভাবিত হয়েছিলাম এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি হয়েছে এই খবর পাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ভেবেছি এই বুঝি খবর আসে, কোনো অজুহাতে তার দণ্ড কার্যকর করা স্থগিত হয়ে গেছে। কিন্তু তা হয়নি। আমাদের সন্দেহবাদীরা যে কতো ভ্রান্ত তা উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে এটাও উপলব্ধি করেছি, ক্ষমাযেথা ক্ষীণ দুর্বলতা, সেখানে নিষ্ঠুর হতে শেখ হাসিনা জানেন। আমরা অনেকে তার ধৈর্য ধারণ ও বিচক্ষণতাকে আপস বলে ভেবেছি। আমারও এই ভ্রান্তি ও সন্দেহবাদিতা কবুল করছি। হ্যাট অফ্স্ টু শেখ হাসিনা। নিজের জীবদ্দশায় স্বাধীনতা ও মানবতার শত্রুদের বিচার দেখে গেলাম (যা দেখার আশা আমার ছিল না) এবং বাংলার ইতিহাসে এক অতুলনীয়া অদ্বিতীয়া নেত্রীরও অভ্যুদয় দেখে গেলাম; এটাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ এবং শেষ সান্তনা।

যুদ্ধাপরাধীদের এই বিচার ও দণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনবে। পাকিস্তান এখন মুসলিম তালেবানদের কবলে। ভারতেও হিন্দু তালেবানদের উত্থান ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে একটি ব্রিটিশ পত্রিকা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। এই সময়ে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বই আমাদের শেষ আশা ও ভরসা। বাংলাদেশে জামায়াত ও হেফাজতের সন্ত্রাসী অভ্যুত্থান হাসিনা সরকার ব্যর্থ করতে সক্ষম হয়েছেন। মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের দমনেও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বাংলাদেশে বর্বর আইএসের সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করার সম্ভাব্য সকল ব্যবস্থা করেছেন।

বাংলাদেশে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ দমনে হাসিনা সরকারের সম্ভাব্য সাফল্য সারা উপমহাদেশে প্রভাব ফেলবে। আশা করা যায়, পাকিস্তানে তালেবানি অভ্যুত্থান প্রতিহত হবে এবং ভারতেও হিন্দু তালেবানদের (শিবসেনা ও আরএসএসের মাধ্যমে) অভ্যুত্থান চেষ্টা নিরুৎসাহিত হবে। বিহার রাজ্যে বিজেপির বিশাল নির্বাচনী পরাজয় এবং গো-মাংস খাওয়া নিয়ে একজন সংখ্যালঘুকে হত্যা ও সর্বত্র সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারে হিন্দুত্ববাদী উগ্র দলগুলোর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দেশটির শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের সম্মিলিত প্রতিরোধ উপমহাদেশে এই আশাই জাগিয়ে তুলছে যে, উগ্র ও সন্ত্রাসী মৌলবাদের উত্থান অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিহত হবে। বাংলাদেশ সেক্ষেত্রে পথ প্রদর্শন করছে এবং শেখ হাসিনা সেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এটাই আমার এবং বাংলাদেশের মানুষের সবচাইতে বড় গর্ব। – জনকন্ঠ

[লন্ডন ২৪ নবেম্বর, মঙ্গলবার, ২০১৫]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment