দশ দিগন্তে

ফাঁসিতো হলো, তারপর ?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGCএকাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের আরো দু’জনের ফাঁসি হয়ে গেল। একজন বিএনপি’র এবং অন্যজন জামায়াতের শীর্ষ নেতা। মতিউর রহমান নিজামীসহ অন্যদের বিচারও দ্রুত শেষ হবে এমনটাই আশা করা যায়। এই ফাঁসি পরবর্তী যেসব সহিংস ঘটনা দেশে ঘটছে তা খুব ব্যাপক নয় এবং সরকার এই সন্ত্রাসীদের অনুসন্ধান ও দমনে ব্যস্ত। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির লক্ষ্যে শিয়া-সুন্নি বিরোধ বাধানোরও চেষ্টা হচ্ছে মনে হয়। ঢাকার মহরমের মিছিলে বোমা এবং বগুড়ায় শিয়া মসজিদে গোলাগুলি তার আলামত অবশ্যই। ইতিপূর্বে জামায়াতিরা দেশে আহমদীয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিবাদ বাধানোর চেষ্টা করেছিল। তা সফল হয়নি। এখন শিয়া, সুন্নি বিরোধ বাধানোর চেষ্টাও সফল হবে তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।

এখন প্রশ্ন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের কাজটি ভালোয় ভালোয় শেষ হয়ে গেলেই কি দেশে স্বস্তি ও শান্তি ফিরে আসবে? দেশ সন্ত্রাসমুক্ত হবে এবং রাজনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে? এই প্রশ্নের জবাব পাওয়ার সময় সম্ভবত এখনো আসেনি। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড যা ছিলো এতোদিন মানুষের কল্পনায় অসম্ভব ব্যাপার, তা সম্ভব হওয়ায় দেশের রাজনীতিতে তার একটা বিরাট প্রভাব বর্তাবে এটা স্বাভাবিক। রাজনীতির নতুন মেরুকরণও শুরু হতে পারে। তবে সেটা কিভাবে হবে সেটাই এখন বিবেচ্য।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড হওয়ায় বাংলাদেশে জামায়াতের শিরদাঁড়া ভেঙে গেছে একথা সত্য। জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা বিএনপি’র অবস্থা অগোছালো ও লক্ষ্যভ্রষ্ট। এখন এই ফাঁসি পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াতের মৈত্রীয় যুগের অবসান ঘটবে, না দু’টি দল দুর্দিনে পরস্পরকে প্রকাশ্যে অথবা অপ্রকাশ্যে আরও বেশি জড়িয়ে ধরবে তা এখন দেখার বিষয়। জামায়াত যদি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা নতুন নামে দল গঠন করবে, না বিএনপি’র মধ্যে মিলেমিশে যাবে এই প্রশ্নটিও এখন সামনে চলে এসেছে।

সাম্প্রতিক দু’টি ফাঁসি কার্যকর হয়ে যাওয়ার পরই দেশে মিডিয়া যে খবরটিকে প্রাধান্য দিচ্ছে তা হলো জামায়াতের নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। সরকার বিষয়টি নাকি এখন সিরিয়াসলি চিন্তা-ভাবনা করে দেখছেন। স্বাধীনতা বিরোধী সন্ত্রাসী দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণার জন্য দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতি সেবী ও রাজনীতিকরা বহুদিন যাবত্ দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকারের ভেতরে এই দাবির সমর্থক অনেক আছেন। আবার অনেকে জামায়াতকে বেআইনি করার ভালো-মন্দ দুই দিক খতিয়ে দেখছেন।

জামায়াতকে যদি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হয় তাহলে এটাই সরকারের জন্য চূড়ান্ত সময়। এই সন্ত্রাসী দল ও তার স্প্লিন্টার্স গ্রুপগুলোকে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেয়া ঠিক হবে না। তবে জামায়াত নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেই দেশে গণতন্ত্রের বিপদ ঘুচবে তা নয়। এ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত। মিডিয়ায় তাদের মতামত দেখে বোঝা যায়, কেউ কেউ ভাবছেন, জামায়াত নিষিদ্ধ হলে দলের নেতাকর্মীরা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে নানা ধরনের নাশকতামূলক কাজ চালাবে অথবা তাদের একটা বড় অংশ বিএনপি’তে যোগ দিয়ে এই দলটিকে তাদের রাজনীতির প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য কাজে ব্যবহার করার সুযোগ নেবে। জামায়াত বিএনপি’র গর্ভে নয়, বিএনপি জামায়াতের গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে রাজনীতির মেরুকরণটা নতুন আকার ধারণ করতে পারে। নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে জামায়াত যদি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আনুকূল্যে বিএনপি’তে এসে মিশে যায় তাহলে দলটির প্রবীণ ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক অংশ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন দল গঠন করতে পারেন। তার সূচনা ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার তৃণমূল বিএনপি গঠনের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। অনেকের ধারণা, জামায়াতকে সম্পূর্ণ বর্জন দ্বারাই খালেদা জিয়া বিএনপি’কে নতুনভাবে সংগঠিত করতে পারেন। তাহলে দেশের রাজনীতিতে সুস্থ মেরুকরণ ঘটবে। অন্যথায় জামায়াতকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বিএনপি বিভক্ত ও আরো দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

জামায়াত নিষিদ্ধ না হলে তাদের পুরনো ধর্মীয় আবরণের সন্ত্রাসী রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারে এবং আরো বড় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে (যেমন আইএস) তাদের সম্পর্ক জোরদার করে তুলতে পারে। কিন্তু দলটি যদি নিষিদ্ধ হয় তাহলে নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা মিলে নতুন নামে, এমনকি ধর্মনিরপেক্ষ নাম গ্রহণ করে কি নতুন দল তৈরি করবে? এই ব্যাপারে অতীতের দিকে তাকানো যেতে পারে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জামায়াতসহ সাম্প্রদায়িক দলগুলো নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে জামায়াতের একজন সাবেক আমির মওলানা আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে একটি নতুন দল আত্মপ্রকাশ করেছিলো।

ভারতে রয়েছে এর আরও প্রকৃষ্ট নজির। মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর আততায়ী নাথুরাম গডসে হিন্দু মহাসভার লোক বলে চিহ্নিত হওয়ায় নেহেরু সরকার হিন্দু মহাসভাকে নিষিদ্ধ দল ঘোষণা করেন। মনে হয়েছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ভারতে খতম হয়ে গেছে। তা হয়নি। অল্পদিনের মধ্যে হিন্দু মহাসভার সমর্থক, নেতাকর্মীরাই মিলে অসাম্প্রদায়িক নামে নতুন রাজনৈতিক দল খাড়া করেন। তার নাম ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। বিজেপি’র সহযোগী আরও উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আর,এম,এস ও শিবসেনা সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

সেই বিজেপি আজ ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। কয়েক বছর আগেও কি কেউ ভাবতে পেরেছিলেন, গান্ধী নেহেরু-ইন্দিরার ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতে হিন্দুত্ববাদের গৈরিক পতাকা এখন সগর্বে আকাশে উড়তে পারবে? ভারতে তবু গণতান্ত্রিক সেকুলার শিবিরের একটা শক্ত ঘাঁটি আছে। তারা উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিপদ সম্পর্কে ইতোমধ্যেই সতর্ক ও সরব হয়ে উঠছেন। আশা করা যায় ভারতে উগ্র ধর্মান্ধতার এই আত্মপ্রকাশ সাময়িক। বিহার রাজ্যের মানুষের মতো সারা ভারতের মানুষ তা প্রতিহত করবে।

প্রশ্ন, বাংলাদেশের ব্যাপারে কি হবে? এখানে সেকুলারিজমের ভিত্তি খুবই দুর্বল এবং গণতন্ত্র বারংবার বিপর্যয়ে পঙ্গু। দেশটির গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র টিকিয়ে রাখার একমাত্র ভরসা হাসিনা সরকার। এই সরকারকে একা বহু ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের মতো অসম্ভব কাজটিও তারা সম্ভব করেছে। কিন্তু এরপর জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, অথবা না করে কি তারা দেশের অসাম্প্রদায়িক ভিত্তি ও গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে পারবে। দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে পারবে?

জামায়াতকে যদি দেশের রাজনীতিতে বেআইনি না করা হয়, তাহলে তারা বর্তমান বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে মুক্ত হতে, নতুনভাবে সংগঠিত হতে পথ খুঁজবে। দেশের মসজিদ, মাদ্রাসাগুলোতে আরও শক্তভাবে আস্তানা গাড়ার চেষ্টা করবে। ধর্মের নামে উগ্র ধর্মান্ধতা ছড়াবে। আর দলটিকে নিষিদ্ধ করা হলে তারা কি করবে সে সম্পর্কে নানা জনের নানা অভিমতও উপরে তুলে ধরেছি। আমার ধারণা, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলে তারা এই মুহূর্তে আন্ডারগ্রাউন্ডে যাবে না। যেতে পারবে না। আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে মাওবাদীদের বা নকশালদের মতো নাশকতামূলক কাজ চালাবার মতো শক্তি ও জনবল তাদের এখন নেই। তাদের একটা অংশ বিএনপিতে মিশে যাবে। বড় অংশ হয়তো ভারতের হিন্দু মহাসভার সমর্থক ও সদস্যদের মতো নতুন নামে আত্মপ্রকাশের জন্য অপেক্ষা করবে। সউদি আরব এবং পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও তারা এই ব্যাপারে সাহায্য ও গাইডেন্স চাইবে।

দেশকে যদি ধর্মান্ধতার সন্ত্রাস থেকে মুক্ত করতে হয়, তাহলে একটি মাত্র  ধর্মান্ধ দলকে নিষিদ্ধ করে সাফল্য লাভ করা যাবে না। দেশের রাজনীতিকে ধর্মান্ধতার কালচার থেকে আগে মুক্ত করা প্রয়োজন। এই কালচার আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের মধ্যেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এখন অনেক নেতার চেহারা, পোশাক-আসাক দেখে বোঝা মুশকিল তারা জামায়তি, না জামায়াত বিরোধী?

ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সমস্যা এই যে, ধর্ম ও ধর্মান্ধতার মধ্যে ব্যবধান সাধারণ মানুষকে বোঝানো মুশকিল। বেশির ভাগ মানুষ ধর্মান্ধতাকেই ধর্ম বলে ভাবে। ফলে ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গেলে মানুষ ভাবে ধর্মের উপর আঘাত হানা হচ্ছে। এখানে এসেই অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক নেতারা আটকে যান, তারা আর আগাতে পারেন না। এই সমস্যাটিতে বহু উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিক নেতারা ভুগছেন। তাদের অনেকে আপস করে একটা মধ্যপথ আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। পারেননি। তাদের অনেকের আপসবাদিতার জন্য পতনও ঘটেছে।

ধর্মান্ধতা ও ধর্ম যে এক নয় এই সত্যটা সাধারণ মানুষকে বুঝতে দেয় না ধর্মান্ধতাভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোই। জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে তারা দেশে বিদেশে প্রচার করেছিল, বাংলাদেশে ইসলামিস্কলার ও শাস্ত্রবিদদের দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ধর্মান্ধতায় এই রাজনৈতিক শক্তি ও প্রচার শক্তিকে আগে প্রতিহত করা দরকার। তা একটি ধর্মান্ধ দলকে নিষিদ্ধ করা হবে না। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দলগুলোকে (আওয়ামী লীগসহ) যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে হবে। রাজনৈতিক বিরোধটাকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব হিসাবে না রেখে এটাকে সেকুলারিজমপন্থি ও সেকুলারিজম বিরোধী শিবিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখতে হবে, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধও যে দ্বন্দ্বটির সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি।

ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শিবিরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনগণের কাছে এই সত্যটা তুলে ধরতে হবে যে, মুক্তিযুদ্ধের মৌল আদর্শগুলো ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। একাত্তরের পরাজিত শক্তি ধর্মকে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের কাজে বিকৃতভাবে ব্যবহার করছে। সেকুলার শিবিরের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া ধর্মান্ধতার দানবকে প্রতিহত করার দ্বিতীয় কোনো পন্থা নেই। একটি মাত্র দলকে নিষিদ্ধ করে এই দশানন দানবকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। – ইত্তেফাক

লন্ডন ২৮ নভেম্বর, শনিবার, ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment