শিয়া মসজিদ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGC

বাংলাদেশে শিয়া-সুন্নি ঝগড়া কোনোকালেই প্রকট ছিল না। সেই নবাবি আমলে নয়, ব্রিটিশ আমল, এমন কি পাকিস্তান আমলেও নয়। মুসলমানরা বহুকাল ধরেই বিভিন্ন সম্প্রদায় ও মজহাবে বিভক্ত। কিন্তু তাদের সামগ্রিক পরিচয় ছিল মুসলমান। তাদের মধ্যে কে শিয়া, কে সুন্নি বা কে আহমদিয়া এসব পরিচয় বড় হয়ে উঠত না। মুর্শিদাবাদের নবাব- যেমন আলীবর্দী থেকে সিরাজউদ্দৌল্লা ছিলেন শিয়া। নবাবি আমলে ঢাকায় নিযুক্ত নায়েবে নাজেমদের (গভর্নর) অধিকাংশই ছিলেন শিয়া। হোসনি দালান তারাই প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঢাকায় মহররমের তাজিয়াসহ প্রতি বছর বিরাট মিছিল বের করার সূচনা তারাই করে যান। বাংলাদেশে শিয়া-শাসনকে সবাই মুসলিম শাসন বলে গণ্য করেন। তা নিয়ে সুন্নিদের মধ্যে কোনো আপত্তি ছিল না, এখনও নেই। শিয়া শাসনের বিরুদ্ধে সুন্নিরা কখনও বিদ্রোহী হয়নি। আবার শিয়ারাও সুন্নি শাসনে আপত্তি জানায়নি। বাংলাদেশে মুসলমানদের মধ্যে মজহাবি বিরোধ ছিল; কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছিল না।

 

দুই মজহাবি নেতাদের মধ্যে তর্কযুদ্ধ (বাহাস) ও কলমযুদ্ধ ছিল। বহু আগে বাংলাদেশে হানাফি নামে একটি পত্রিকা ছিল। তাতে মহম্মদিয়া মজহাবের বিরুদ্ধে নানা ধর্মীয় অভিযোগ তোলা হতো। এ অভিযোগের জবাব দিত মোহাম্মদি নামে আরেকটি পত্রিকা, এর সম্পাদক ছিলেন মওলানা আকরম খাঁ। তিনি মহম্মদি বা লামজহাবি সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন।

এ বিতর্কও কখনও হানাহানিতে রূপান্তর হয়নি। বরং ধীরে ধীরে এ মজহাবি ও তর্কগুলো বিলীন হয়ে যায়। মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন দীর্ঘকাল অবিভক্ত বঙ্গেয় মুসলিম লীগের সভাপতি। তার নেতৃত্ব মানতে তো বিশাল সুন্নি মুসলমানরা আপত্তি করেনি। শিয়া-সুন্নি পার্থক্য তো বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যে ও সামাজিকতাতেও কখনও প্রতিফলিত হয়নি। বাঙালি সুন্নি কবি বিশাল মহররম কাব্য লিখেছেন। নজরুল ইসলাম লিখেছেন মহররম নিয়ে অনেক গান ও কবিতা। তার একটি গানের বিখ্যাত লাইন মহররমের চাঁদ এলো ওই কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়। কারবালার যুদ্ধ নিয়ে বাংলায় সব চেয়ে বিষাদ-আক্রান্ত গ্রন্থ বিষাদ সিন্ধু রচনা করেছেন বাঙালি সুন্নি লেখক মীর মশাররফ হোসেন। প্রতি বছর মহররম এলে শিয়া-সুন্নি বাঙালি মুসলমান একসঙ্গে কেঁদেছে। একে অন্যের বুকে ছুরি মারেনি। ছুরি মারার প্রশ্নই ছিল না।

ঢাকার মহররমের মিছিল তো সারা উপমহাদেশ-খ্যাত মিছিল। ঢাকা শহরে সেদিন সর্বধর্মের মানুষের মিলন ও সমাবেশ হয়। আমি ঢাকায় কলেজের ছাত্র থাকাকালে মহররমের মিছিল দেখার জন্য নবাবপুর রোডে কোনো দোকান বা বাড়ির ছাদে উঠে দাঁড়াতাম। সেখানেও থাকত ভিড়। ওদিন বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকাবাইচ দেখেছি। বহু শতকের এ ঐতিহাসিক মিছিলের প্রস্তুতি পর্বে এ বছর হোসনি দালানে বোমাবাজি; এটা কি বিস্ময় ও ক্ষোভের ব্যাপার নয়?

পাকিস্তানে এখন শিয়াদের ওপর নির্যাতন চলছে। শিয়া মসজিদ ধ্বংস করা হচ্ছে; শিয়া নর-নারী হত্যা করা হচ্ছে। অথচ ভারতের দশ কোটি মুসলমানকে পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন একজন শিয়া। তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি পাকিস্তানের স্থপতি, জাতির পিতা। কই তার নেতৃত্ব ও পিতৃত্বকে তো কেউ পাকিস্তানে অস্বীকার করছে না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নবাবজাদা লিয়াকত আলীর নেতৃত্বে যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা গঠিত হয়, তার প্রধান কয়েকটি পদেই ছিলেন শিয়া ও আহমদিয়া মুসলমান। যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে দীর্ঘকাল ছিলেন স্যার মোহাম্মদ জাফরুল্লা। তিনি ছিলেন কাদিয়ানি। তা নিয়ে জিন্না থেকে লিয়াকত আলী, নাজিমুদ্দীন কোনো মুসলিম লীগ নেতাই প্রশ্ন তোলেননি।

বিশ্ব মুসলমানের অখণ্ড ঐক্যে ফাটল ধরানো শুরু হয় সৌদি রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কট্টর ওয়াহাবিজমের আবির্ভাবের পর। তার আগে শিয়া পারসিকদের (বর্তমানে ইরান) সঙ্গে সুন্নি আরবদের মধ্যে বিরোধ তেমন প্রকট ছিল না। ইসলামের প্রথম যুগে উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের মধ্যে ভয়াবহ রক্তপাত হয়েছে, ধর্মতত্ত্বের পার্থক্য নিয়ে ততটা নয়, হয়েছে খেলাফতের বা ক্ষমতার অধিকার নিয়ে। কালক্রমে তার অবসান ঘটে। বিশ্ব মুসলমানের মধ্যে সম্প্রদায়গত কিছু পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এক উম্মাহ হিসেবে তারা পরিচিত হয়।

ওয়াহাবিজম বিশ্ব মুসলমানের এই ঐক্যে প্রথম ফাটল ধরায়। বর্তমানের আল কায়দা, তালেবান, আইএস ইত্যাদি যেমন আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রশ্রয়ে আজ এত শক্তিশালী হয়েছে, অতীতে তেমনি কট্টর সুন্নিবাদ বা ওয়াহাবিজমের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচারের ব্যাপারে গতায়ু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ছিল সক্রিয়। তখন মধ্যপ্রাচ্যে মওলানা জামালুদ্দীন আফগানির দ্বারা প্রবর্তিত প্যান-ইসলামিক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে উঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আধিপত্য ও তেল স্বার্থের জন্য একটা হুমকি হয়ে উঠছিল। তাকে প্রতিহত করার জন্য মুসলমানদের ঐক্যে ভাঙন ধরানো এবং তাদের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ভারতেও ওয়াহাবিজমের বিস্তারে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা সহায়তা জোগান। এ ওয়াহাবিরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও গুরুতর ক্ষতি করেন।

ভারতের হিন্দু ও মুসলমান এক জাতি নয় এবং ভারতীয় পোশাক-আশাক, বেশভুষা, খাদ্য-পানীয়, ভাষা-সংস্কৃতি সবই ইসলাম বিরোধী- এ সর্বনাশা তত্ত্বটির সফল প্রচার চালায় ওয়াহাবিরা। ভারতীয় মুসলমানদের (পরবর্তীকালে পাকিস্তানি মুসলমান) মধ্যেও মজহাবি ও সম্প্রদায়গত পরিচয়কে বড় করে তুলে গৃহবিবাদের সূচনা করে ওয়াহাবিরা। একদিকে তারা ব্রিটিশবিরোধী মনোভাবের মহড়া দেখিয়েছে, অন্যদিকে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতের সর্বধর্মের মানুষের সংগ্রাম ও তার ঐক্যকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়েছে। তাতে লাভবান হয়েছে সাবেক ব্রিটিশ রাজ।

ওয়াহাবিজম দ্বারা প্রণোদিত হয়ে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন মওলানা আবুল আলা মওদুদী। তিনি সৌদি রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। সৌদি রাজারাও ইসলামের নামে তাদের মধ্যযুগীয় স্বৈরতন্ত্র কায়েম রাখার লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা ও আধুনিকতার বিকাশে বাধাদানের নীতি গ্রহণ করেন। এজন্য তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি দরকার। জামায়াতের রাজনীতি তাই প্রথমে সৌদি ব্রিটিশ রাজের আশীর্বাদপুষ্ট হয়েছে এবং বর্তমানে পুষ্ট হচ্ছে সৌদি আরব ও মার্কিন প্রশাসনের যুগল প্রশ্রয়ে।

সারা বিশ্বে পশ্চিমা স্বার্থ ও আধিপত্য রক্ষার দায়িত্ব এখন ব্রিটিশদের পরিবর্তে মার্কিনিদের কাঁধে। এ দায়িত্ব পালনের জন্যই আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে কখনও আরবদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ রোধ করা, কখনও আরব জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করা, কখনও কম্যুনিজমের প্রসার প্রতিহত করার নামে ধর্মান্ধতার কার্ড খেলছে। ধর্মীয় বিভাজন ঘটাচ্ছে এবং একই ধর্মের মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী বিবাদে লিপ্ত রাখছে। তাই দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা এক মুখে বলছে তারা ওয়ার অন টেরোরিজমে লিপ্ত, অন্যদিকে আল কায়দা থেকে আইএস সব টেরোরিস্ট গ্রুপের স্রষ্টা ও প্রশ্রয়দাতা তারা।

পাকিস্তানে প্রথম আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানদের অমুসলমান বলে ঘোষণা করার দাবি জানায় জামায়াত এবং তারা স্যার মোহাম্মদ জাফরুল্লাকে পররাষ্ট্র সচিবের পদ থেকে সরানোর জন্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু করে। এ দাঙ্গায় ৫০ হাজার মুসলমান নিহত হয়। পরবর্তীকালে পাকিস্তানে ভয়ানক জঙ্গিবাদের অভ্যুদয় ঘটে। তাদের টার্গেট হয় এবার শিয়ারা। পাকিস্তান এখন গৃহযুদ্ধের কারণে প্রায় ধ্বংস হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

বাংলাদেশেও জামায়াতিরা পাকিস্তানের প্যাটার্নে প্রথম আহমদিয়া বিরোধী আন্দোলন শুরু করে। তাদের পরবর্তী টার্গেট শিয়া সম্প্রদায়। তাদের এ শিয়া বিরোধী নীতি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মধ্যপ্রাচ্যের রণনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইরানের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ইসলামী বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন্য শিয়া রাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংস করার নামে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে সর্বপ্রকার সাহায্য দিয়ে যুদ্ধে নামানো হয়েছিল। সাদ্দাম হোসেনকে সৌদি আরবসহ সব সুন্নি রাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাহায্য জুগিয়েছিল মার্কিন প্ররোচনায় শিয়া রাষ্ট্র ধ্বংস করার নামে। তা সফল হয়নি। ইরান টিকে যাওয়ায় আমেরিকা ভোল পাল্টেছে। এখন শিয়াদের বন্ধু সেজে সুন্নি আইএস ও তাদের খেলাফত ধ্বংস করার কথা বলছে। কিন্তু তাদের আসল টার্গেট ইরানের বন্ধু রাষ্ট্র সিরিয়ার আসাদ সরকার।

আইএস জুজুর স্রষ্টা আমেরিকা। এখন এই আইএস জুজুর ভয় দেখিয়ে সে মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতি ও আধিপত্য কায়েম রাখতে চায় এবং দক্ষিণ এশিয়াতেও এ নীতির বিস্তার ঘটাতে চায়। বাংলাদেশেও তাই যে শিয়া-সুন্নি বিরোধ কোনোকালে প্রকট ছিল না, সেই বিরোধ বাধানোর চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতিও প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু আইএসের লক্ষ্য বাংলাদেশেও সফল করার জন্য জামায়াত, জেএমবি, হরকত ইত্যাদি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাই যে যথেষ্ট, ঢাকার মহররম মিছিলে হামলা এবং বগুড়ায় শিয়া মসজিদে ঢুকে গুলি চালিয়ে নিরীহ মুসল্লি হত্যা কি তার প্রমাণ নয়? পবিত্র ইসলামের নামে মসজিদে ঢুকে মুসল্লি হত্যার মতো নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড যারা চালাতে পারে, তারা কি মুসলমান?

জামায়াতিরা পাকিস্তানে এ কাণ্ড ঘটাতে পেরেছে শিয়া মসজিদে ঢুকে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে। বাংলাদেশে তা তারা পারবে না কেন? সম্প্রতি বাংলাদেশে দুজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হওয়ায় তারা এখন দিশেহারা। প্রতিহিংসা গ্রহণে উন্মত্ত। নিরীহ শিয়াদের হত্যা করে যদি শিয়া-সুন্নি একটা বিরোধ বাধানো যায় এবং দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা যায়, তাহলে লাভ তো তাদেরই। দোষ চাপানোর জন্য আইএস জুজু তো আছেই। তার সাফাই সাক্ষী আছে মার্কিন মুরুব্বিরা।

সরকার কঠোর হলে বাংলাদেশে শিয়া-সুন্নি বিরোধ বাধানোর এ অপচেষ্টা ব্যর্থ হবে। আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে অতীতে জামায়াতের ষড়যন্ত্র যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি বর্তমানের শিয়া বিরোধী চক্রান্তও ব্যর্থ হবে। কারণ বাংলাদেশের সুন্নি মুসলমানরা ধর্মপ্রাণ কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। দেশের শিয়া সম্প্রদায়কে তারা কখনোই অমুসলমান মনে করবে না, শত্রু বলে গণ্য করবে না। বরং দেশ, জাতি এবং ধর্ম ও মানবতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জামায়াত এবং তার সহযোগী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো। কিছুকাল হয়তো তারা নিরীহ মানুষ হত্যা করবে কিন্তু বাংলার মাটিতে জয়ী হতে পারবে না।

লন্ডন ২৯ নভেম্বর, রোববার, ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment