২ ডিসেম্বর উপলক্ষে রাঙ্গামাটিতে গণসমাবেশ করেছে জেএসএস

রাঙ্গামাটি রিপোর্ট –

JSS

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করতে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে হরতাল অবরোধ, অফিস আদালত বর্জন, ভূমি অধিগ্রহণ প্রতিরোধ ও পর্যটন প্রতিরোধ-সহ ১০ দফা আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা।

শান্তি চুক্তির দেড়যুগ পুর্তি উপলক্ষে আজ ২ ডিসেম্বর বুধবার দুপুরে রাঙ্গামাটিতে জন সংহতি সমিতি আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এ ঘোষণা দেন। সমাবেশে দ্রুত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা ।

শান্তিচুক্তির ১৮তম বর্ষপূর্তিতে জন সংহতি সমিতির উদ্যোগে প্রতিবছরের মতো এবারও রাঙ্গামাটিতে গণ সমাবেশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। রাঙ্গামাটির জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গনে আয়োজিত এই গণসমাবেশে রাঙ্গামাটি খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান থেকে হাজার হাজার পাহাড়ি নারী পুরুষ যোগ দিয়েছে। রাঙ্গামাটি শহরের জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গন থেকে শুরু করে রাঙ্গামাটি চট্টগ্রাম সড়কের উপর অবস্থান নেয় যোগদানকারীরা। সমাবেশে যোগ দেয়ায় রাঙ্গামাটি শহরে সকাল থেকে দূরপাল্লার সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সমাবেশে পার্বত্য চ্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা প্রধান অতিথি হিসাবে যোগ দিয়েছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য সাধুরাম ত্রিপুরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাহমান নাসির উদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান, বাংলাদেশ জাতীয় আদিবাসী ফোরামের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা, সহসাংগঠনিক সম্পাদক কে এস মং মারমা, কেন্দ্রীয় সদস্য উদয়ন ত্রিপুরা প্রমুখ।

এ সমাবেশ থেকে ১০ দফা আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা করেন সন্তু লারমা। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের মধ্যে একটি অংশ আছে যারা রাজনৈতিক দালালি ও তোষামোদি করে জুম্মস্বার্থ পরিপন্থী কাজে যুক্ত রয়েছে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে আন্দোলনের অংশ হিসাবে সেসব ব্যক্তিদের বয়কট করা, তাদের রাজনৈতিকভাবে বর্জন করা, চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হরতাল, অবরোধ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও পর্যটন কাজে বিরোধিতা করা। অবৈধ পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন প্রতিরোধ করা । পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি ও স্বায়ত্ব শাসিত অফিস বর্জন করা। জুম্ম জনগণ কর্তৃক আদালত বর্জন করা। তবে পাহাড়িদের সামাজিক আদালতে বিচার কাজ চলবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ছাত্র সমাজের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারী ছাত্র ধর্মঘট পালন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ বিরোধী কার্যক্রম প্রতিহত করা এবং অবৈধভাবে ভূমি অধিগ্রহণ ও বেদখল প্রতিরোধ করা ।

সমাবেশে সন্তু লারমা অভিযোগ করেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে গত আঠারো বছরে কেবল টালবাহানাই হয়েছে। চুক্তি পরবর্তী দীর্ঘ ১৮ বছরেও জুম্ম জনগণ মুক্তি লাভ করেনি। সরকার যে সমস্যার জন্ম দিয়েছে তা সরকারকেই সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, পাহাড়ের জুম্ম জনগণের বুকের উপর অশান্তি বিরাজ করছে। জুম্ম জনগণ ভূমি হারাচ্ছে। অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষা, সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণ সমস্যা রয়ে গেছে। চুক্তি বাস্তবায়নের পরিবর্তে পার্বত্য অঞ্চলে জুম্ম স্বার্থ বিরোধী পরিচলিত মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার ষড়যন্ত্র ও সেই ষড়যন্ত্র এগিয়ে নিতে চলছে সামরিকী করণ। অনেকগুলো ক্যাম্প আছে, ক্যান্টমেন্ট করা হয়েছে, বিজিবি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইসলামী করণ ও সামরিকীকরণ চলছে, এতে জুম্ম জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে সিভিল প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য সেনাবাহিনী রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনী অতি দাপটে চলছে। বাংলাদেশের জন্ম লগ্ন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে সেনা শাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’ এবং ১৯০০ শাসন বিধি পরিবর্তন না করে এ শাসনের নামে পার্বত্য অঞ্চলে ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সরকারের আমলে ৫ লক্ষ বাঙালিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে দেয়া হয়েছে।  তিন পার্বত্য জেলায় প্রশসানিক ব্যবস্থা , সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনা, বহিরাগতদের ভূমি বেদখল, সেনা ক্যাম্প, ভূমি বেদখল চলছে তা আমরা উপলব্ধি করছি, বিজিবি ক্যাম্প সম্প্রসারণের নামে ভূমি বেদখল করা হচ্ছে, অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, তা মেনে নেয়া যায় না। জেলা পরিষদ দলীয়করণ করে শেখ হাসিনা চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। মিথ্যা মামলা ও দমন নিপীড়ন করে চুক্তি বিরোধী সরকারি কার্যক্রম অব্যাহত ভাবে চলছে বলে অভিযোগ করেন সন্তু লারমা। তিনি বলেন সরকার বাস্তবতা অনুভব করছে না, আমাদের দায়িত্ব তাদেরকে বুঝতে বাধ্য করা। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে সন্তু লারমা বলেন, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, এই চুক্তির মধ্যে দিয়ে আপনি স্বীকার করেছেন পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব স্বাধীকার অধিকার সব কিছু স্বতন্ত্র। কিন্তু বাস্তবতা থেকে সরে গিয়ে উল্টো কথা বলছেন, চুক্তির সমস্যা সমাধান না করে চুক্তিকে গলাটিপে মেরে ফেলছেন। আপনার সরকার পার্বত্য অঞ্চলকে ইসলামি করণে নেমেছে।

এসময় সমাবেশে রাজনৈতিক এবং পাহাড়ি নেতারা পার্বত্য এলাকার বর্তমান অসহনীয় পরিস্থিতি দূর করতে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণা করে সময় নির্ধারণের জন্য সরকারকে পরামর্শ দেন।  পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে চলমান অসহযোগিতার আন্দোলন জোরদার করার জন্য  বক্তারা আহ্বান জানান।

পার্বত্য অঞ্চলে চলমান সেনা ‘অপারেশন উত্তরন’ বন্ধের দাবি তুলে জন সংহতি প্রধান বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার পূরণে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা না হলে চলমান অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করে যাবে এ অঞ্চলের মানুষ। পাহাড়িদের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সরকার ও শাসক গোষ্ঠী জুম্ম জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র করছে বলেও অভিযোগ সন্তু লারমার।

রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকা থেকে হাজারো নারী-পুরুষ যোগ দেয় এই সমাবেশে। পরে একটি র‍্যালি শহরের প্রধান সড়ক ঘুরে জন সংহতি সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment