কালের আয়নায়

ব্লেয়ার থেকে ক্যামেরন :ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কথাটা অনেক সময় খাটে না, কোনো কোনো সময় দারুণভাবে খেটে যায়। ব্রিটেনের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে কথাটা দারুণভাবে খেটে গেছে মনে হয়। ২০০৩ সালে ব্রিটেনের লেবার সরকারের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশের সঙ্গে ঘোঁট পাকিয়ে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। সাদ্দামের হাতে বিশ্বধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে এবং যে কোনো মুহূর্তে ব্রিটেন আক্রান্ত হতে পারে_ এই মিথ্যা প্রচারের ওপর ভর করে তিনি ব্রিটেনকে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন।
এই সর্বৈব অন্যায় যুদ্ধে ব্রিটেনের মানুষের সচেতন অংশের সায় ছিল না। এমনকি লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্যদের এক বড় অংশেরও ছিল না। যুদ্ধে পার্লামেন্টের অনুমোদন গ্রহণের জন্য ব্লেয়ারকে ডানপন্থি টোরি দলের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। ১২ বছর পর সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গত বুধবার (২ ডিসেম্বর) রাতে। সাবেক লেবার প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারের সেই একই যুক্তি বর্তমান টোরি প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের কণ্ঠে শোনা গেছে। প্যারিসে আইএসের জিহাদিস্টদের হামলার পর ব্রিটেনেও তাদের হামলা আসন্ন_ ব্রিটিশ জনগণের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে তিনি সিরিয়ায় বোমা হামলা চালানোর জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন আদায় করেছেন। বলেছেন, জিহাদিস্টরা ব্রিটেনে আক্রমণ চালানোর আগেই তিনি তাদের প্রতিহত করতে চান।
কিন্তু পার্লামেন্টে প্রদত্ত ভাষণে তিনি এই বোমা হামলার আসল উদ্দেশ্যটি গোপন রাখেননি। ইরাকে হামলা শুরু করার আগে ব্লেয়ার ও বুশ যেমন বলেছিলেন, ইরাকে রেজিম চেঞ্জ বা সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ তাদের লক্ষ্য; তেমনি এবার সিরিয়ায় বোমা হামলা চালানোর ব্যাপারে ক্যামেরন বলছেন, যদিও জিহাদিস্টদের ঘাঁটিতে তারা বোমা হামলা চালাবেন; কিন্তু সিরিয়ায়ও রেজিম চেঞ্জ বা বর্তমান আসাদ সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ তাদের লক্ষ্য। অর্থাৎ আইএস তাদের মূল ও একমাত্র টার্গেট নয়।
প্যারিসে টেররিস্ট হামলায় এমনিতেই ব্রিটিশ জনগণ ভীত ও সন্ত্রস্ত এবং এর সুযোগ নিয়ে টোরি সরকার তাদের বোমা হামলার প্রস্তাব পার্লামেন্টে সহজেই পাস করিয়ে নিতে পারত। কিন্তু লেবার পার্টির ৬৭ জন ডানপন্থি এমপি ও ছায়ামন্ত্রী টোরি সরকারের যুদ্ধ সম্প্রসারণ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
এখানেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কথাটা খেটে গেছে বলে আমি এ আলোচনার শুরুতেই উল্লেখ করেছি। ২০০৩ সালে ব্লেয়ার সরকারের যুদ্ধবাদী নীতিতে সমর্থন জুগিয়েছিল বিরোধী টোরি দল। এবার ক্যামেরন সরকারের যুদ্ধ সম্প্রসারণ নীতিতে সমর্থন জুগিয়েছেন বিরোধী লেবার দলের এক বিরাটসংখ্যক ডানপন্থি এমপি এবং ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্য।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গত বুধবারের ভোটাভুটিতে একটা সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, টনি ব্লেয়ার যদিও এখন লেবার দলের নেতৃত্বে নেই এবং ইরাক যুদ্ধে তার ভূমিকা নিন্দিত; কিন্তু তার ম্যাকিয়াভেলিয়ান রাজনীতির অশুভ প্রভাব থেকে লেবার পার্টি সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি। এমনকি বর্তমান টোরি ক্যামেরন সরকারকেও ব্লেয়ারের যুদ্ধবাদী নীতি যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে। গত বুধবার পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের কণ্ঠে টনি ব্লেয়ারের কণ্ঠই শোনা যাচ্ছিল বলে অনেকে মনে করেন।
বুশ ও ব্লেয়ার মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্য, তেল ও অস্ত্র ব্যবসায়ের স্বার্থে ইরাক ও লিবিয়ায় দুটি শক্তিশালী সেক্যুলার গভর্নমেন্টকে ধ্বংস করার জন্য যে ধর্মীয় সন্ত্রাসের বীজ বপন করেছিলেন, তা আজ মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ইউরোপের বুকেও তার কালো ছায়ার বিস্তার ঘটেছে। শিয়া-সুন্নি বিরোধ বাধিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যে আগুন জ্বালানো হয়েছে, তা সহজে নির্বাপিত হওয়ার নয়। বোমা মেরে নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যা করা যাবে; কিন্তু আইএস সন্ত্রাসীদের দমন করা যাবে না। যেমন আফগানিস্তান থেকে উচ্ছেদ করা যায়নি তালেবান এবং ইরাক থেকে আল কায়দাকে।
আইএস আল কায়দার চেয়েও বড় অপশক্তি। তারা সৌদি অর্থ, ইসরায়েলি ট্রেনিং এবং সর্বাধুনিক মার্কিন অস্ত্রে বলশালী। ইরাককে বিভক্ত করে এবং সিরিয়া ও ইরানকে কাবু করার জন্য আমেরিকা তাদের তৈরি করেছিল। এখন মার্কিন অস্ত্র দ্বারাই তারা আমেরিকা ও ন্যাটোর বিরুদ্ধে লড়ছে। ইরাক ও সিরিয়ার এক বিরাট অংশ, যা ব্রিটেনের আয়তনের চেয়েও বড়, তা এখন আইএসের দখলে। আমেরিকা একদিকে তাদের ওপর বোমা ফেলছে (কার্যকর গ্রাউন্ড ফোর্স ব্যবহার করছে না), অন্যদিকে মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে চড়া দামে অস্ত্র বিক্রি করছে এবং সস্তায় তাদের কাছ থেকে তেল কিনছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইএস জিহাদিস্টদের দমনে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে আমেরিকার দ্বিমুখী নীতি বুঝতে পেরে রাশিয়া আসাদ সরকারকে রক্ষা ও জিহাদিস্ট দমনে কার্যকর সামরিক কার্যক্রম গ্রহণ করার পর পশ্চিমা জোটের টনক নড়ে। প্রেসিডেন্ট ওবামা রাশিয়ার বিরুদ্ধে মুখ খোলেন এবং তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে বিরোধ বাধানোর চেষ্টা হয়। বর্তমানে ব্রিটেনকে ইরাকের পর সিরিয়ায়ও বোমা হামলায় জড়িয়ে ফেলা পশ্চিমা জোটের একই উদ্দেশ্যপ্রসূত কার্যক্রম মনে হয়। সাইমন জেনকিন্সের মতো বিখ্যাত ব্রিটিশ কলামিস্টও মনে করেন, সুন্নি জিহাদিস্টদের সম্পূর্ণ পরাজিত করা পশ্চিমা রাজনীতির লক্ষ্য নয়। তাদের উদ্দেশ্য জিহাদিস্টদের ক্ষমতা কিছু খর্ব করে সিরিয়ায় আসাদবিরোধী সৈন্যবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা, তাদের সাহায্যে আসাদ সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ এবং মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তার বন্ধ করা।
ব্রিটিশ জনগণ ক্যামেরন সরকারের যুদ্ধ সম্প্রসারণ নীতিতে বিশ্বাসী নয়। পার্লামেন্টের সামনে তারা বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে এবং লেবার পার্টির সাধারণ নেতাকর্মী ও এমপিরা ঘোরতরভাবে ব্লেয়ার নীতি ও যুদ্ধ সম্প্রসারণের বিরোধী। এ জন্যই তারা এবার জেরেমি করবিনের মতো একজন পরীক্ষিত বাম নেতাকে দলের প্রধান পদে নির্বাচিত করেছেন এবং করবিন তার দলের ব্লেয়ারপন্থিদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও পার্লামেন্টের ভেতরে ও বাইরে ক্যামেরন সরকারের যুদ্ধবাদী নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছেন। যদিও ভোটযুদ্ধে তিনি হেরেছেন; কিন্তু ব্রিটেনের যুদ্ধবিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতের সমর্থন রয়েছে তার পেছনে। অদূর ভবিষ্যতে যদি দেখা যায়, সিরিয়ায় বোমা হামলা দ্বারা জিহাদিস্টদের দমন করা যায়নি, ব্রিটেনের মানুষের নিরাপত্তা বিধান করা যায়নি, তাহলে ইরাক যুদ্ধের জন্য ব্লেয়ার যেমন এখন ধিক্কৃত হচ্ছেন, ভবিষ্যতে সিরিয়ান অ্যাডভেঞ্চারের জন্যও ক্যামেরন ব্রিটিশ জনগণের কাছে ধিক্কৃত হতে পারেন।
গত বুধবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সিরিয়ায় বোমা হামলার প্রস্তাবের ওপর বিতর্কের সময় লেবার পার্টির যুদ্ধবিরোধী এমপিরা বারবার একই প্রশ্ন তুলেছেন_ সিরিয়ায় বোমা হামলা চালিয়ে লন্ডনসহ অন্যান্য ব্রিটিশ শহরে টেররিস্টদের বোমা হামলা কীভাবে নিবারণ করা যাবে? তার গ্যারান্টি কোথায়? বরং সিরিয়ায় বোমাবর্ষণে ব্রিটেনের অংশগ্রহণ জিহাদিস্টদের ব্রিটিশ শহরগুলোতেও ভয়াবহ হামলা চালাতে প্ররোচিত করতে পারে।
এই একই কথা বলেছেন একজন বিখ্যাত গ্রিক রাজনীতিক ও সাবেক এমপি ইয়ানিশ ভ্যারোসকিজ। জিহাদিস্টদের সন্ত্রাস সম্পর্কে তার একটি মন্তব্য প্রকাশ করেছে গার্ডিয়ান পত্রিকা গত ২৮ নভেম্বর উইকএন্ডের ম্যাগাজিনে। সাবেক গ্রিক এমপি বলেছেন, ‘জিহাদিস্টদের কাছে এটা যুদ্ধ। রাশিয়ানরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে; সুতরাং তারা পাল্টা হামলা চালিয়ে রাশিয়ান প্লেন ধ্বংস করেছে। ফরাসিরা তাদের ওপর বোমা মারছে। সুতরাং তারা প্যারিসে হামলা চালিয়েছে। একটি মার্কিন বিমান হামলায় সিরিয়ায় ১৫০ জন নিরীহ মানুষ মারা গেছে। অনুরূপভাবে জিহাদিস্টদের হামলায় প্যারিসে প্রায় একই সংখ্যক নিরীহ মানুষ মরেছে। এটা টিট ফর ট্যাট। কোনটিকে আমরা নিন্দা জানাব?’
এই জিহাদিস্টরা যে মানবতার শত্রু এবং অবিলম্বে এদের দমন করা দরকার, এ সম্পর্কে বিশ্বের যুদ্ধবাদী ও যুদ্ধবিরোধী উভয় মহলই একমত। কিন্তু যুদ্ধবিরোধীরা বলেন, কেবল বোমাবর্ষণ দ্বারা সিরিয়া ও ইরাক দুটি দেশকেই ধ্বংস করা যাবে, জিহাদিস্টদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা যাবে না। পরাজিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণকে এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করতে হবে এবং গ্রাউন্ড ফোর্স জনযুদ্ধের সহায়তায় নামিয়ে এই যুদ্ধকে সফল করতে হবে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ও দেখা গেছে, নাৎসি ফ্যাসিবাদের বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রথম গেরিলা যুদ্ধে নেমেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জনগণ। পরে মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনী তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। কেবল বোমাবর্ষণ দ্বারা নাৎসি ফ্যাসিবাদকে ইউরোপের মাটি থেকে উচ্ছেদ করা যেত না। আমেরিকা ও ব্রিটেনের আরেকটি বড় ভুল, রেজিম চেঞ্জ দ্বারা সিরিয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে না। ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা স্বার্থে রেজিম চেঞ্জ করতে গিয়ে দুটি দেশকেই তারা ধ্বংস করেছে। উপহার দিয়েছে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। সিরিয়ায় একই ভুল করলে যুদ্ধ সম্প্রসারণ নীতি তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এখন দেখার রইল হাওয়া কোনদিকে বয়। ক্যামেরন সরকার পার্লামেন্টে ভোটযুদ্ধে জিতেছে; কিন্তু সিরিয়ায় বোমা হামলা সম্প্রসারণ দ্বারা নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দমনে তারা সফল হবে_ এ আশা পোষণ করা কষ্টকর। এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ দমনের জন্য গণজাগরণ ঘটানো প্রয়োজন; কিন্তু এই দায়িত্বটি কারা এবং কখন গ্রহণ করবেন? – সমকাল
লন্ডন, ৪ ডিসেম্বর শুক্রবার, ২০১৫

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment