কপ-২১

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা ২ সেলসিয়াসের কম রাখার লক্ষ্য নির্ধারিত

অনলাইন ডেস্ক –

COP 21

বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে প্যারিস সম্মেলনে স্বাক্ষরিত চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে।  এটি আগামী কয়েক দশকের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর বিশ্ব অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি রুখে দিবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে।
শনিবার প্রায় দুইশ দেশের সম্মতিতে স্বাক্ষর হওয়া চুক্তিটি নিয়ে বিশ্ব নেতারা উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া দেখালেও কিছু বিরূপ সমালোচনাও শোনা যাচ্ছে।   জলবায়ু চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, যে একটি মাত্র গ্রহ আমাদের আছে তাকে বাঁচাতে এটিই সেরা সুযোগ।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির সফলতায় ফ্রান্সের কূটনৈতিক অভ্যুত্থানের দারুণ উদাহরণ স্থাপিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রায় ২ সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত হওয়া জলবায়ু সম্মেলনের শেষদিন শনিবার জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বিশ্বের ১৯৫টি দেশ। এর আগে ১৯৯৭ সালের জাপানে অনুষ্ঠিত জলবায়ু বিষয়ক প্রটোকল ‘কিয়োটো প্রটোকল’ ব্যর্থ হওয়ার পর বিশ্ব তাকিয়ে ছিল ২০০৯ সালের কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের দিকে। কিন্তু পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাগড়ায় সে আশাও ভেস্তে যায়। কিন্তু এবার ফ্রান্স ২০১৫ সালের কপ-২১ সম্মেলনের আমন্ত্রণ রাষ্ট্র হতে পারায় দেশটিতে ‘কূটনৈতিক অভ্যুত্থান’ হয়েছে বলে রোববার এএফপির এক বিশ্লেষণে প্রকাশ পেয়েছে।

জলবায়ু বিষয়ক চুক্তির বাস্তবায়নে ফ্রান্সকেই অন্যতম কৃতিত্বের আসনে বসাতে চান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর।

বিবিসি জানায়, নিম্ন-কার্বনের ভবিষ্যৎ গড়ার চ্যালেঞ্জে এই চুক্তি বিশ্বের জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুষণকারী দেশ চীনও চুক্তিটিকে স্বাগত জানায়। তবে কয়েকটি পরিবেশবাদী গোষ্ঠী চুক্তিটি  পৃথিবীকে রক্ষায় খুব বেশি দূর যেতে পারবে না মন্তব্য করে এর সমালোচনা করেছে।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা ২ সেলসিয়াসের নিচে ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। ফ্রান্সের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ২১তম কনফারেন্স অব পার্টিজ বা কপ-২১ সম্মেলনে প্রায় দুইশ দেশের প্রতিনিধি দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চেষ্টা করেন। অবশেষে সব দেশের সম্মতিক্রমে প্রথমবারের মতো কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
কিছু অংশ পালন করার জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা ও কিছু অংশ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে পালন করার বিধান সম্বলিত চুক্তিটি ২০২০ সাল থেকে কার্যকর হবে। চুক্তিটিকে ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ বর্ণনা করে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, বিশ্ব একত্রিত হলে কী সম্ভব হয় তা আমরা সবাই মিলে দেখালাম। সংক্ষেপে বললে, চুক্তিটি বলতে কম কার্বন দূষণ বোঝাবে যা আমাদের গ্রহকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং নিম্ন-কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে আরো কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটাবে। তবে চুক্তিটি ‘পরিপূর্ণ’ নয় বলে স্বীকার করেন তিনি।
সম্মেলনে অংশ গ্রহণকারী চীনা প্রতিনিধিদলের প্রধান আলোচক শি ঝেনহুয়াও প্যারিস চুক্তিটি ‘যথাযথ’ নয় স্বীকার করে বলেন, ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া থেকে এটি আমাদের বিরত করতে পারবে না। এর আগে চীন বলেছিল, ধনী উন্নত দেশগুলোর উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরো আর্থিক সমর্থন প্রস্তাব করার দরকার ছিল।
বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোটের চেয়ারম্যান গিজা গ্যাসপার মার্টিন্স বলেন, আমরা যা আশা করতে পারি এটি (প্যারিস চুক্তি) তার সেরা প্রতিফলন, শুধু স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্যই নয়, বিশ্বের নাগরিকদের জন্যও।
কিন্তু গ্লোবাল জাস্টিস নাউ এর পরিচালক নিক ডিয়ারডেন বলেন, চুক্তিটিতে বিশ্বের সবচেয়ে অরক্ষিত জাতিগুলোর অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য জলবায়ু নিশ্চিত করার জন্য প্রায় কোনো বাধ্যবাধকতাই রাখা হয়নি। তবুও চুক্তিটিকে সাফল্য হিসেবে জাহির করা হচ্ছে যা ভয়ানক।
এই চুক্তিতে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনার বিষয়ে দেশগুলো নিজেরা আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি পূরণে দেশগুলোর ওপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা প্যারিস চুক্তিতে রাখা হয়নি।
জলবায়ু চুক্তিতে যা আছে :

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্বন নিঃসরণ কমানো ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে শনিবার ঐতিহাসিক জলবায়ু চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি না মানা হলে ২১০০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে দাঁড়াতে পারে। তবে চুক্তি মানলে ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব। প্যারিসে দুই সপ্তাহ ধরে চলা জলবায়ু সম্মেলনে প্রায় ২ শতাধিক দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। খবর এএফপি, বিবিসি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার।

জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য –

চলতি শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে যত দ্রুত সম্ভব কার্বন নির্গমন কমানো এবং এই গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য আনা।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, সম্ভব হলে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হবে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ২০২০ সালের মধ্যে ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়ন।

পরবর্তীতে কী হবে –

কার্বন নির্গমনের বিষয়ে উন্নত বিশ্বের মতের সঙ্গে উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন-২০১৫ (কপ-২১)-তে যোগ দেয়া সব দেশ এখন পর্যন্ত খসড়া চুক্তি অনুমোদন দেয়নি।

কারণ বিশ্বের সমুদ্র উপকূলের দেশগুলো বিশেষ করে দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে করণীয় দিক না গ্রহণের ফলে প্যারিস চুক্তিতে ‘খটকা’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মালদ্বীপের পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিক ও দেশটির প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা মার্ক লিনাস।

প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষর কেন –

১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটোতে ‘কিয়োটো প্রটোকল’ চুক্তিতে ১২৯টি দেশ সমর্থন দিয়েছিল। তবে ওই চুক্তি থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় কানাডা। এরপর প্যারিস চুক্তিই প্রথম আন্তর্জাতিক চুক্তি।

অর্থ কী চুক্তির প্রতিবন্ধকতা?

জলবায়ু সম্মেলনের প্রথম থেকেই অর্থের জোগান নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন। এ দরকষাকষির ফলে চুক্তিতে অনুমোদিত ২০২০ সাল নাগাদ প্রতিবছরে ১শ’ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্র“তিতে অনেক দেশই সন্তুষ্ট নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবি, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বাদ দিয়ে সরাসরি নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের দিকে যেতে তাদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ড. ইলান কেলম্যান বলেন, আর্থিক সহায়তা দেয়ার সংক্ষিপ্ত সময়সীমা উদ্বেগের কারণ। তিনি বলেন, ‘শুরু হিসেবে বছরে ১০০ বিলিয়নের অর্থ তহবিল বেশ কাজে দেবে। যদিও সেটা এখনও বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে প্রতিশ্রুত অর্থের তুলনায় ৮ শতাংশের কম’।

বৈশ্বিক উষ্ণতা ও কার্বন নির্গমন প্রক্ষেপণ –

যদি কোনো দেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে কাজ না করে তাহলে ২১০০ সালে বিশ্বের উষ্ণতা ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে পৌঁছবে। এদিকে, চলতি বছর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমায় কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমেছে দশমিক ৬ শতাংশ। ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর বার্ষিক ২-৩ শতাংশ হারে বিশ্বে কার্বন নির্গমন বেড়েছে।

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment