কালান্তরের কড়চা

রিয়াদ-তেহরান বিবাদ এবং ঢাকার অবস্থান

AGC

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

সমাজতন্ত্রী বিশ্বশিবিরকে সামরিক শক্তিতে ধ্বংস করতে না পেরে গত শতকের সত্তরের দশকে আমেরিকা দুটি সমাজতন্ত্রী বড় শক্তি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং নয়া চীনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির জন্য যে শীতল যুদ্ধের (Cold War) আশ্রয় গ্রহণ করেছিল, বর্তমান শতকে সেই একই কৌশল সে গ্রহণ করেছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি আধিপত্য এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দুটি বড় আঞ্চলিক শক্তি ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে বিবাদ বাধিয়ে দিয়ে। ইরান ও সৌদি আরব দুটি দেশই মুসলিম দেশ। কিন্তু তাদের ধর্ম পালনে কিছুটা পার্থক্য আছে। ইরানে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমান এবং সৌদি আরবে সুন্নি সম্প্রদায়ের মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিয়া-সুন্নি বিবাদ আগেও ছিল। কিন্তু তাকে রাষ্ট্রীয় সংঘর্ষে এবং সশস্ত্র যুদ্ধে পরিণত করতে চায় আমেরিকার চাতুরী।

 

এই চাতুরীকে আমেরিকা কাজে লাগিয়েছিল সত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে বিবাদ বাধানোর জন্য। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন দুটিই কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। কিন্তু কমিউনিজমের তত্ত্ব অনুসরণ করতে গিয়ে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের মার্ক্সবাদ নয়া চীনে রূপান্তরিত হয় মাওবাদ নামে। ইসলাম ধর্মে শিয়া-সুন্নি মতপার্থক্যের মতো কমিউনিজম নিয়েও মার্ক্সবাদ ও মাওবাদের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা দেয়।

এই পার্থক্য থেকেই কমিউনিস্ট বিশ্বশিবির দ্বিধাবিভক্ত হয়। মাওবাদী নামে এক নতুন কমিউনিস্ট শিবিরের উদ্ভব ঘটে। আমাদের উপমহাদেশেও কমিউনিস্ট আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী (পেইচিংপন্থী) নামে দুই বিভক্ত কমিউনিস্ট শিবির জন্মলাভ করেছিল এবং তাদের এই বিরোধে কৌশলে ইন্ধন জোগাতে থাকে আমেরিকা। শিগগিরই এই বিবাদ মস্কো ও পেইচিংয়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বিরোধে পরিণত হয়। অধিকতর শক্তিশালী সোভিয়েত-শিবিরকে ধ্বংস করার জন্য নয়া চীনকে (কিসিঞ্জার-পরিকল্পনা অনুযায়ী) আমেরিকা কোলে তুলে নিয়েছিল। ওয়াশিংটন ঘোষণা করেছিল, চীন তাদের ‘মোস্ট ফেভারিট ট্রেড পার্টনার’। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যে সহযোগিতা নয়, সামরিক মহড়াতেও চীনকে সঙ্গী করেছিল আমেরিকা।

সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপর্যস্ত হয়। এবার নয়া চীনকে বধ করার পালা। এ জন্য সহসা পাকিস্তানকে সুয়োরানির ভূমিকা থেকে সরিয়ে দিয়ে ওয়াশিংটন ভারতের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলে এবং আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতাকে প্রচণ্ড বিবাদে পরিণত করে চীনের শক্তি খর্ব করার চেষ্টা চালায়। এই একই খেলা আমেরিকা খেলছে এখন মধ্যপ্রাচ্যেও। আঞ্চলিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা নিয়ে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা আছে। এই প্রতিযোগিতাকে উসকে দিয়ে আমেরিকা প্রথমে চেয়েছে ইরানকে শায়েস্তা করতে। ইরান-ইরাক যুদ্ধ বাধিয়ে, দীর্ঘকাল ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ চালিয়েও সফল না হওয়ায় আমেরিকা তার কৌশল পরিবর্তন করে।

সহসা ওবামা প্রশাসন ইরানের দিকে আপসের হাত বাড়ায় এবং তেহরানের সঙ্গে একটা নিউক্লিয়ার চুক্তি সম্পাদনে সম্মত হয়। তাতে বেজার হয় সৌদি আরব ও ইসরায়েল। তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানাচ্ছিল, আমেরিকা যাতে শক্তি প্রয়োগে রিয়াদ ও তেল আবিবের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে ধ্বংস করে। আমেরিকা এই দাবির মুখে যে কৌশল গ্রহণ করে তা হলো ‘বরের ঘরের পিসি এবং কনের ঘরের মাসি’ সাজা। একদিকে আমেরিকা আল-কায়েদা ও আইএস গঠনের জন্য প্রথমে সৌদি আরবকে সাহায্য জুগিয়েছে। পরে সেই আইএস সন্ত্রাসীদের দমনের জন্য ইরানের সহযোগী সেজেছে। কিন্তু মূল লক্ষ্য রেখেছে ইরানের মিত্র সিরিয়ার আসাদ সরকারকে ধ্বংস করার দিকে। এটা সৌদি আরব ও ইসরায়েলেরও লক্ষ্য। সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে ধ্বংস করা গেলে তাদের পরবর্তী টার্গেট ইরান।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শত্রুতার নীতি অনেকটাই সফল হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিনিদের মুক্তিসংগ্রাম সফল করার কাজে সাহায্য জোগানোর কথা ছিল, সেখানে তারা ধর্মীয় ও গোত্রগত নানা বিবাদে লিপ্ত হয়ে পরস্পর যুদ্ধে জড়িত হয়ে নিজেদের ধ্বংস করছে। বেড়েছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং রক্ষা পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকায় তেলস্বার্থ ও অস্ত্র বিক্রির বাজার। এই শিয়া-সুন্নি বিরোধ এবং ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য ধ্বংস করা হয়নি, এই বিরোধ ভারত ও পাকিস্তানেও ছড়িয়ে দিয়ে এবং বাংলাদেশেও তা ছড়ানোর চেষ্টা করে প্রকারান্তরে জঙ্গি ও জেহাদিস্টদেরই শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই প্রয়াসের পেছনেও রয়েছে সৌদিদের সমর্থন। তাদের সমর্থনপুষ্ট জামায়াত বাংলাদেশে আহমদিয়া ও শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে।

এই শিয়া-সুন্নি বিরোধেরই সাম্প্রতিক পরিণতি রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে সৌদিদের মিত্র অন্য কয়েকটি দেশও। ঘটনার সূত্রপাত গত ২ জানুয়ারি। এই দিন সৌদি আরবে ৪৭ জনের প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই ৪৭ জনের মধ্যে ছিলেন সৌদি আরবের প্রখ্যাত শিয়া নেতা ও আলেম শেখ নিমর আল-নিমর। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি এবং সৌদি আরবে নির্যাতিত ও বৈষম্যপীড়িত শিয়াদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন। এই আন্দোলন সৌদি রাজতন্ত্রের সহ্য হয়নি। সন্ত্রাসী এবং রাজতন্ত্র উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত—এই অভিযোগ তুলে তারা শেখ নিমরকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করে।

এখানে প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলি। সৌদি আরবে এ মাসে এক দিনে ৪৭ জনের প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাতে পশ্চিমা মানবতার দরদি সংস্থাগুলোর মুখে টুঁ শব্দটি নেই। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা সবাই নীরব। কিন্তু বাংলাদেশে ৪০ বছর পর দীর্ঘ বিচারের শেষে একাত্তরের কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীকে প্রাণদণ্ড দেওয়ায় (তা-ও একসঙ্গে নয়) বিশ্বব্যাপী মানবতাদরদিদের সে কী মায়াকান্না! বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মাত্র চার-পাঁচজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। আর সৌদি আরবে এক দিনে কার্যকর করা হয়েছে একসঙ্গে ৪৭ জনের প্রাণদণ্ড। এখন মানবতার দরদিরা বাক্শক্তি হারিয়ে বসে আছেন কেন?

সৌদি আরবে এই শিয়া ধর্মীয় নেতাকে প্রাণদণ্ড দেওয়ার ফলেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শিয়া সম্প্রদায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ইরানের রাজধানী তেহরানে বিক্ষুব্ধ শিয়া জনতা সৌদি দূতাবাসে হামলা চালিয়ে সেটি পুড়িয়ে দেয়। এই দূতাবাস পোড়ানোর জের ধরেই তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে রিয়াদ। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। তাতে যে পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে তা যুদ্ধাবস্থার শামিল।

সৌদি আরব ও ইরান এই দুটি দেশেরই মিত্র বাংলাদেশ। এখন দুটি মিত্র দেশের মধ্যে এই বিরোধে বাংলাদেশের করণীয় কী? বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই সন্ত্রাস দমনের যুদ্ধে সহযোগী সাজার জন্য সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত অ্যালায়েন্সে যোগ দিয়ে বসে আছে। এই অ্যালায়েন্স অনেকটা সামরিক জোটের মতো। বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত নীতি ছিল কোনো সামরিক জোটে যোগ না দেওয়া। বাংলাদেশের অনেকে মনে করেন, বর্তমানে কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ সৌদি জোটে যোগ দিয়েছে। কৌশলটি হলো এই অ্যালায়েন্সে যোগ দিয়ে সম্প্রতি ঘোষিত একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির আদেশ বহাল রাখার রায়ের ব্যাপারে সৌদিদের বিরূপতা হ্রাস করা এবং এই রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত ও তাদের মিত্র দলগুলোর আন্দোলন করার শক্তি খর্ব করা। এই অনুমান কতটা সঠিক, তা আমি জানি না। আমাকে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘জাতিসংঘের নির্দেশ ও নিয়মকানুনের বাইরে বাংলাদেশ অ্যালায়েন্সের কোনো পক্ষপাতদুষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে না।’ তা যদি হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান গ্রহণের কারণটি আরেক মিত্র দেশ ইরানকে বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন। ভারতে সরকার পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও দেশটির সঙ্গে মৈত্রী রক্ষা ও বাড়ানোর কাজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনীতি সফল হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতেও ইরান ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় শেখ হাসিনা ভারসাম্য সৃষ্টিতে সক্ষম হবেন বলে আশা করা যায়। জঙ্গিবাদ নির্মূল করার ব্যাপারে বাংলাদেশ অবশ্যই সবার সঙ্গে সহযোগিতা করবে। তাই বলে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে তৈরি সাম্প্রতিক শিয়া-সুন্নি বিরোধে জড়ানো কিংবা আরেকটি শক্তিশালী মুসলিম দেশ ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটানো কিছুতেই উচিত হবে না।

রিয়াদ-তেহরান বিরোধ উসকে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ইরান এত উত্তেজনার মধ্যেও মাথা ঠাণ্ডা রেখেছে। ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেছেন, ‘সৌদিরা স্বর্গীয় প্রতিশোধের (Divine Revange) সম্মুখীন হবে।’ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রতিশোধাত্মক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের কথা তিনি বলেননি। অন্যদিকে ইরানের মিত্র রাশিয়া ও চীনও এই বিরোধে মধ্যস্থতার ভূমিকা গ্রহণ করতে চেয়েছে। তারা বিরোধের অবসান ঘটাতে চায়। তা নইলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের নতুন যুদ্ধচক্রান্ত সফল হবে বলে তারা আশঙ্কা করে।

সৌদি আরবও দীর্ঘদিন এই উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে চাইবে অথবা পারবে, তা মনে হয় না। সৌদি রাজতন্ত্রের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভালো নয়। নতুন এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাজতন্ত্রের অবসান চাইছে। ওয়াহাবিজমের সন্ত্রাসবাদী নীতিকে সাহায্য জোগানোর অভিযোগে সৌদি আরব ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে। ইসরায়েলের ওপর তার নির্ভরতা বাড়ছে। যে আল-কায়েদা ও আইএসের জন্ম দিয়েছে সৌদি আরব, তা এখন তাদের জন্যও ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় বিরোধ পরিহার করে ইরানের কাছাকাছি তাকে আসতেই হবে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ইরানের সাহায্য তাকে চাইতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর বৃহত্তর স্বার্থেই শিয়া-সুন্নি বিরোধ মেটাতে হবে। বর্তমান বিরোধ এই সম্ভাবনাকে একটু বিলম্বিত করবে; কিন্তু ব্যর্থ করতে পারবে, তা মনে হয় না। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ১১ জানুয়ারি ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment