‘লাঙ্গল টু লন্ডন’ কথাটি নিয়ে জামায়াতীদের মিথ্যা প্রচারণা

 

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

গত মাসের (ডিসেম্বর) ১২ তারিখ ছিল আমার ৮১তম জন্মদিন। পরদিন তেরো তারিখে আমি লন্ডন থেকে ঢাকায় রওনা হবো, তাই লন্ডনের চ্যানেল আই টেলিভিশন তাড়াহুড়ো করে তাদের স্টুডিওতে আমার জন্মদিন পালন এবং তার অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেন। এই অনুষ্ঠানে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা প্রায় সকলেই শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। প্রায় সকলেই বৃহত্তর সিলেটের মানুষ। এই অনুষ্ঠানে আমাকে প্রশ্ন করা হয়, বিলাতে বসে বাংলাদেশের কাগজে আমি যেসব কলাম লিখি, তাতে বাংলাদেশের কথাই বেশি থাকে। আমি কেন বিলাতের বাংলাদেশী কম্যুনিটিকে নিয়ে লেখালেখি করি না?

এই প্রশ্নের জবাবে আমার অনেক কিছুই বলার ছিল, সবটা বলিনি, তাতে অনুষ্ঠান দীর্ঘ হয়ে যাবে এই ভয়ে। দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে বিলাতে বসবাস করছি। এবং যে কম্যুনিটির সঙ্গে বসবাস তাদের শতকরা নব্বই ভাগই সিলেটের মানুষ। তাদের সঙ্গে বাস করতে গিয়ে নিজেও অনেকটা সিলেটি হয়ে গেছি। নিজের জেলা বরিশালের মানুষকে যতটা চিনি ও জানি তার চাইতে বেশি চিনি ও জানি সিলেটের মানুষকে। বিলাতে আমার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধু এবং নিত্যদিনের সঙ্গীরা প্রায় অধিকাংশই সিলেটি। প্রায় সহায়সম্বলহীন অবস্থায় রুগ্ন স্ত্রীকে নিয়ে লন্ডনে এসে চল্লিশ বছরের বেশি সময় আমার থাকা সম্ভব হতো না, যদি অভিবাসী সিলেটিদের সাহায্য, সহযোগিতা ও ভালবাসা না পেতাম।

বিলাতের সিলেটি কম্যুনিটি নিয়ে আমি অনেক লিখেছি। কবিতা, গান, গল্প এবং বিভিন্ন ফিচার ও কলাম। এই গল্পগুলো নিয়ে ঢাকা থেকে আমার দুটি বই বেরিয়েছে। নাম তাৎক্ষণিক ও জীবন থেকে নেওয়া। নিজের জেলার কীর্তনখোলা নদী নিয়ে কোন গান লিখিনি। কিন্তু সিলেটের সুরমা নদী নিয়ে গান লিখেছি। “সুরমা নদীর ঢেউরে তুই পঙ্খী হইয়া আয়, তোরে না দেখিয়া আমার পরান কান্দে হায়।” এই গানটি বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় গেয়ে সিলেটেরই লন্ডন প্রবাসী বিখ্যাত গায়ক হিমাংশু গোস্বামী প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন।

সিলেটে আমার শুধু বন্ধুবান্ধব নয়, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। লন্ডন থেকে আমি সিলেটে বেড়াতে গেছি। হযরত শাহজালাল এবং শাহ পরাণের মাজার জেয়ারত করেছি। সিলেটের একজন সাবেক এমপি শফিক চৌধুরীর উদ্যোগে শহরে আমাকে যে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল তাতে আমি সিলেটবাসীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় অভিভূত হয়েছিলাম। আমার কলামিস্ট জীবনেরও শুরু সিলেটের বিখ্যাত প্রাচীন সাপ্তাহিক যুগভেরী’তে কলাম লেখা শুরু করে। লন্ডন থেকে যখন সাপ্তাহিক ‘সিলেটের ডাক’ প্রকাশিত হয় তখন তাতেও আমি কিছুকাল সাংবাদিকতা করেছি। এই পত্রিকাটি লন্ডন থেকে প্রকাশ করার সময় একটি বিতর্ক উঠেছিল। লন্ডনের মতো একটি আন্তর্জাতিক শহর থেকে বাংলাদেশের একটি জেলার নামে একটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করা সঙ্গত হবে কিনা?

আমি পত্রিকার নাম ‘সিলেটের ডাক’ রাখার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছিলাম। আমার যুক্তি ছিল, আমেরিকার মতো এত বড় মহাদেশে যদি নিউইয়র্ক শহরের নামাঙ্কিত দৈনিক পত্রিকা (নিউইয়র্ক টাইমস) বেরুতে পারে এবং তা উন্নতমানের প্রথম শ্রেণীর দৈনিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তাহলে লন্ডন থেকে ‘সিলেটের ডাক’ নামে পত্রিকা প্রকাশে আপত্তি কিসের? আমার যুক্তিটি গ্রাহ্য হয়েছিল এবং লন্ডনের বাংলা সাপ্তাহিকটির নাম ‘সিলেটের ডাক’ রাখা হয়েছিল (সিলেটেও সিলেটের ডাক নামে একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক রয়েছে)।

রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বকবি, তিনিও বাংলাদেশের কোন জেলা নিয়ে বিশেষভাবে কবিতা লেখেননি, কিন্তু সিলেট বা শ্রীহট্ট নিয়ে লিখেছেন, গত ১২ ডিসেম্বর লন্ডনে আমার জন্মদিনের সময় সিলেটের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বলেছিলাম, যারা বিলাতের সিলেটিদের বলেন, লাঙল টু লন্ডন, তাদের জানা উচিত বিশ্বের সর্বত্র বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়েছেন প্রবাসী সিলেটিরা। তাদের সুবাদে আজ লন্ডনের মতো শহরে ডজনের বেশি বাংলা পত্রিকা এবং অর্ধডজনের বেশি বাংলা ভাষায় সম্প্রচারিত টেলিভিশন রয়েছে। বাংলা কমিউনিটি স্কুল রয়েছে অসংখ্য।

বাংলাদেশের ‘কারি’ ইন্ডাস্ট্রির সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে সিলেটের মানুষ বিশ্বের সর্বত্র। এমনকি সুদূর আলাস্কায় গিয়ে দেখেছি, সেখানে বাংলাদেশের খাবার এমন কি পান বিক্রির দোকান রয়েছে। মক্কায় হজ করতে গিয়ে দেখেছি, মদিনায় সিলেটিদের দ্বারা পরিচালিত রেস্টুরেন্ট। সেখানে প্রাণভরে ভাত, মাছ এমনকি কচুর লতি খেয়েছি। পূর্ব লন্ডনে প্রবাসী সিলেটিরা ইচ্ছা করলেই ব্রিকলেনের নাম সিলেট টাউন রাখার দাবি তুলতে পারতেন, তারা তা করেননি। তারা ব্রিকলেনের নাম রেখেছেন বাংলা টাউন। এর চাইতে বেশি উদারতা ও দেশপ্রেমের প্রমাণ আর কোথায় পাওয়া যাবে!

আশির দশকের দিকে লন্ডনে অভিবাসী সিলেটি কমিউনিটির মধ্য থেকে একটি শিক্ষিত, সাহসী এবং রাজনীতি সচেতন তরুণ সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে। কমিউনিটির উন্নয়নে তারা বেনথ (বেঙ্গলিজ এডুকেশনাল নিডস ইন টাওয়ার হ্যামলেটস) নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলে। আমাকে তার কোঅর্ডিনেটর নিযুক্ত করা হয়েছিল। আমি এদের সঙ্গে কয়েক বছর কাজ করেছি। আমি এই তরুণদের মধ্যে ভবিষ্যতে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নেতৃত্ব গ্রহণের মতো নতুন ব্যক্তিত্বের আত্মপ্রকাশ লক্ষ্য করেছি এবং আগামীতে এদের অনেকেরই যে ব্রিটিশ রাজনীতিতে, এমনকি পার্লামেন্টে আসন গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে সেকথা আমার কলামে লিখেছি। আমার লেখায় এই তরুণেরা উৎসাহিত হয়েছেন এবং প্রেরণা পেয়েছেন। ব্রিটেনের মূলধারার রাজনীতিতে এই সিলেটি তরুণদের অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত। এটা আমারও গর্ব ও আনন্দ।

চল্লিশ বছরের বেশি সময়ের দীর্ঘ প্রবাস জীবনে আমি সিলেটের মানুষের কাছে কতটা কৃতজ্ঞ সে কথাও গত ১২ ডিসেম্বরের জন্মদিনের সভায় বলেছি। সহায় সম্বলহীন অবস্থায় চার দশক আগে লন্ডন শহরে এসে প্রবাসী সিলেটিদের- বিশেষ করে তিনজন কমিউনিটি নেতার (তসাদ্দুক আহমদ, গাউস খান, নূরুল ইসলাম) আর্থিক সাহায্যসহ নানা ধরনের সাহায্য না পেলে আমার পক্ষে এই সুদূর বিদেশে টিকে থাকা দুরূহ হতো। এই তিন কমিউনিটি নেতার মধ্যে পাটনীর নূরুল ইসলাম এখনও বেঁচে আছেন।

চার দশকের বেশি বিলাতে প্রবাসী সিলেটিদের সঙ্গে বাস করে তাদের কাছ থেকে এত সাহায্য ও সমর্থন পেয়ে আমি যাব তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্বেষ প্রচার করতে এবং আমার জন্মদিনের সভায়? যে সভায় অধিকাংশ অতিথি ছিলেন সিলেটের গণ্যমান্য মানুষ এবং সভাটি পরিচালনাও করেছেন সিলেটেরই একজন মানুষ। আমি এই সভায় প্রবাসী সিলেটিদের সম্পর্কে কোন কটূক্তি বা অবমাননাকর উক্তি করলে তারা কি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতেন না? যেহেতু আমি এই সভায় সিলেটের মানুষ সম্পর্কে কোন বক্রোক্তি করিনি, সেজন্যে তারা কোন প্রতিবাদ করেননি, বরং পরে আমার বক্তব্য বিকৃত করে যখন মিথ্যা প্রচার করা হয়েছে, এই সুধীজন তার প্রতিবাদ করেছেন।

আসলে ঘোটটা পাকিয়েছে বিলাতে এসে আশ্রয় গ্রহণকারী এবং পলাতক বাংলাদেশী জামায়াতীরা। দেশে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড হওয়ায় তাদের কোমর ভেঙ্গে গেছে। লন্ডনে এসে বাঙালী অধ্যুষিত হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় ধর্ম প্রচারের আবরণে (জামায়াতি পরিচয় লুকিয়ে) শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। অজস্র্র পেট্রোডলার ছিল তাদের শক্তির ভিত্তি। সম্প্রতি টাওয়ার হ্যামলেটস বারাতে তাদের পছন্দের মেয়র নানা ধরনের দুর্নীতির দায়ে আদালতে দণ্ডিত হয়ে মেয়র পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় লন্ডনেও তাদের ঘাঁটি ভেঙে যাওয়ার মুখে। সুতরাং তাদের একটি ইস্যু চাই, যে ইস্যুকে কেন্দ্র করে তারা আবার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ঘোট পাকাতে পারে।

আমাকে তারা এই ইস্যু বা টার্গেট করার চেষ্টা করেছেন। গত বছর আমি নিউইয়র্কের এক সভায় আরবী ভাষা সম্পর্কে কিছু কথা বলেছিলাম। সেটাকে বিকৃত করে আমি ইসলামের অবমাননা করেছি, সাহাবা কেরামদের নাম নিয়ে তামাশা করেছি ইত্যাদি মিথ্যা প্রচার চালিয়ে আমাকে মুরতাদ, কাফের ইত্যাদি আখ্যা দেয়া হয়। আমার সম্পর্কে মসজিদের ইমাম দিয়ে ফতোয়া দেয়া হয়। আমার বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষ প্রচারের ফলে আমার জীবনের উপর হামলা হতে পারত। সেদিকটি বিন্দুমাত্র বিবেচনা করেনি এই ঘাতক চরিত্রের জামায়াতীরা। যারা দেশে হুমায়ুন আজাদের মতো বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও কথাশিল্পীকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করতে পারে, তাদের কাছে গাফ্ফার চৌধুরীর জীবনের আর দাম কি?

আমাকে সিলেটি বিদ্বেষী বলে যে মিথ্যা প্রচার অভিযান এখন চালানো হচ্ছে তার মূল হোতা বিলাতে বসবাসকারী দু’জন জামায়াতি সাংবাদিক। তাদের একজন এদেশে এসে নাম চেঞ্জ করেছেন। তারা দু’জনেই নিজেদের জামায়াতী বলে পরিচয় দেন না। সাংবাদিক ও কমিউনিটি নেতা সেজে আসলে জামায়াতের প্রচার কার্য চালান বাঙালী তথা সিলেটি কমিউনিটির মধ্যে। আমার প্রতি তাদের প্রচণ্ড রাগের কারণ, আমি জামায়াতী রাজনীতির বিরোধী এবং সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক সব আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং পলাতক যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মঈনুদ্দীনকে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিতে বিলাতে যে আন্দোলন হচ্ছে, আমি তাতে নেতৃস্থানীয় কর্মীর পর্যায়ে রয়েছি। প্রবাসী সিলেটিদের অধিকাংশ মানুষ আমাকে বিশ্বাস করে এবং ভালবাসে। সুতরাং এই জামায়াতীরা ছলে বলে কৌশলে যেভাবে পারে আমাকে সিলেটের মানুষের কাছে অপ্রিয় করে তুলতে চায়। আমাকে ধ্বংস করতে চায়।

গত বছরের মধ্যভাগে এই চেষ্টাটা তারা করেছে আমাকে ইসলাম বিদ্বেষী ও নাস্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা দ্বারা। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সেবার আমাকে নাস্তিক ও ধর্মদ্রোহী প্রমাণ করার জন্য বিলাতের যে জামায়াতী ও জামায়াত সমর্থক চক্রটি সক্রিয় হয়েছিল এবার সেই চক্রটিই আবার আমাকে সিলেট বিদ্বেষী প্রমাণ করার জন্য সক্রিয় হয়েছে। সেই চেনা মুখগুলোই আমার বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ করছে। জন্মদিনের সভায় আমি বলেছি, ‘কেউ কেউ প্রবাসী সিলেটিদের যে বলেন, লাঙল টু লন্ডন, কথাটা যে অর্থে বলা হয় তা সঠিক নয়। আমার এই কথা ছাটকাট করে বলা হয়েছে, আমিই বিলাতের সিলেটিদের লাঙল টু লন্ডন বলে আখ্যা দিয়েছি। আমি জন্মদিনের সভায় বলেছি, সিলেটের মানুষের সুবাদে আজ সুদূর আলাস্কাতেও বাংলাদেশের খাবার এমন কি পান পর্যন্ত পাওয়া যায়। এ কথাটাকে বিকৃত করে প্রচার করা হয়েছে, আমি নাকি বলেছি, সিলেটিরা আলাস্কাতেও পানবিড়ি বিক্রি করে। ওই জঘন্য মিথ্যাচার কেবলমাত্র জামায়াতীদের পক্ষেই করা সম্ভব।

লন্ডনে জন্মদিনের সভায় আমি বলেছি, সিলেটের মানুষ যে ভাষায় কথা বলেন তা বাংলা ভাষার একটি উপভাষা। এ কথা বলে নাকি আমি সিলেটি ভাষার অপমান করেছি। মিথ্যাচার যাদের পেশা, তারা ব্যতীত আর কেউ একথা বলতে পারে না। সিলেটি কথ্যভাষা বস্তুতঃ এখনও একটি উপভাষা। তার ব্যাকরণ নেই, সাহিত্যের প্রমিত ভাষা হিসেবে এখনও গড়ে ওঠেনি। কিন্তু এই উপভাষার মধ্যে পূর্ণ ভাষা হয়ে ওঠার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে- যা বাংলাদেশের অন্য অনেক জেলার ভাষায় নেই। একথা সিলেটের বিখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীও বলেছেন। তিনিসহ সিলেটের বড় বড় আধুনিক লেখক সকলেই বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেছেন। যেমন বার্নার্ড শ’ আইরিশ হয়েও আইরিশ ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেননি। করেছেন ইংরেজী ভাষায়। আইরিশ ভাষা এখনও ইংরেজীর মতো উন্নত ভাষা নয়। এ কথা বলা হলে কি আইরিশ ভাষার অবমাননা করা হয়?

‘লাঙল টু লন্ডন’ কথাটার মধ্যেও অবমাননাকর কিছু নেই। শুধু সিলেটিরা নন, বাংলাদেশ থেকে অন্যান্য জেলার আমরা যে সব মানুষ বিদেশে এসেছি, আমাদের সকলেরই এক জেনারেশন আগের পূর্বপুরুষ ছিলেন কৃষিজীবী। বাঙালী মুসলমানের বড় পরিচয়ই ছিল কৃষিজীবী বা কৃষক হিসেবে। তাতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। বরং এই পরিচয় গর্বের এবং আত্মমর্যাদার। অভিজাত ইংরেজ পরিবারের লোকেরাও নিজেদের ‘সনস অব দা সয়েল’ বলে পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করেন। তারা নামের সঙ্গে বুচার, প্লাম্বার ইত্যাদি পেশাগত বংশ পরিচয় লাগাতেও ভালবাসেন। আমাদের দেশেও অনেকে নামের সঙ্গে চাষী কথাটা (যেমন চাষী নজরুল ইসলাম) যুক্ত করতে গর্ববোধ করেন। তাহলে আমরা লাঙলের সন্তান বলে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করব কেন?

শেরে বাংলা ফজলুল হক নিজেকে চাষাভূষার নেতা বলে পরিচয় দিতে ভালবাসতেন। তাঁর রাজনৈতিক দলের নাম ছিল কৃষক প্রজা পার্টি। তাঁর দলীয় পতাকায় প্রথমে লাঙল আঁকা ছিল। লাঙলকে বলা হতো বাঙালীর জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। রাশিয়ায় কম্যুনিস্টরা যেমন তাদের লাল পতাকায় কাস্তে হাতুড়ির ছবি যোগ করে কৃষক মজুরদের প্রতি সম্মান দেখিয়েছিল, বাংলাদেশের কম্যুনিস্টরাও প্রথমে তাদের পতাকায় হাতুড়ির সঙ্গে লাঙলের ছবি যোগ করেছিল।

কবি নজরুল ইসলাম বিভাগপূর্ব বাংলায় নিজের সম্পাদনায় একটি কাগজ বের করেছিলেন। নাম রেখেছিলেন ‘লাঙল’। তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতার প্রথম লাইন – ‘ওঠরে চাষী জগৎবাসী ধর কষে লাঙল।’ আব্বাসউদ্দীনের একটি জনপ্রিয় গানের প্রথম কলি – চল বাজান চল্ মাঠে লাঙল বাইতে। আমি এরকম অসংখ্য উদাহরণ দিতে পারি, যেখানে লাঙল আমাদের জাতীয় জীবনের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। অসম্মানের নয়। তাহলে লাঙল টু লন্ডন কথাটার মধ্যে অসম্মানের কী রয়েছে? যদিও লন্ডনের জন্মদিনের সভায় কথাটা সেভাবে আমি বলিনি।

লন্ডনের বাংলাদেশী জামায়াতীরা মিথ্যাচারে পটু। এ জন্য বাংলাদেশে এই দলটিকে কেউ কেউ বলেন ‘জামায়াতে ইবলিস’। জামায়াতী-রাজনীতির একমাত্র মূলধন হচ্ছে মিথ্যাচার, চরিত্র হনন, গুপ্ত হত্যা বা চাপাতি হত্যা। আমাকে গত দু’বছর ধরে টেলিফোনে ক্রমাগত জীবন নাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে চলছে চরিত্র হননের প্রয়াস। আমার সৌভাগ্য, আমার প্রতি বিলাতের অধিকাংশ সিলেটি মানুষের ভালবাসা ও বিশ্বাস রয়েছে। তাদের প্রতি আমি যদি কোন অন্যায় করি, তাহলে নিশ্চয়ই তাদের কাছে ক্ষমা চাইব। কিন্তু ঘাতক ও দুর্বৃত্ত জামায়াতীদের মিথ্যাচার ও হুমকির কাছে মাথা নত করতে রাজি নই। আমার বিশ্বাস, তাদের এবারের চক্রান্তও ব্যর্থ হবে। বিলাতেও তাদের মিথ্যা প্রচারের দুর্গটি ইতোমধ্যেই ভাঙতে শুরু করেছে, অচিরেই তা অস্তিত্ব হারাবে। আমি কবি ইকবালের ভাষায় বলি –
‘অসত্যের কাছে নাহি নত হবে শির
ভয়ে কাঁপে কাপুুরুষ, লড়ে যায় বীর।’

লন্ডন ১২ জানুয়ারি, মঙ্গলবার, ২০১৬। – জনকন্ঠ

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment