কালের আয়নায়

বিশ্ব পরিস্থিতি কোন দিকে

House

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –
জাকার্তায় জঙ্গিগোষ্ঠী আবার বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। জঙ্গিদের এই হামলা থেকে বিশ্বের কোনো দেশই এখন আর নিজেদের নিরাপদ মনে করছে না; তা ফ্রান্স, তুরস্ক বা অন্য যে কোনো দেশ হোক। সিরিয়া ও ইরাকের এক বিশাল এলাকা এখন তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএসের কবলে। আফগানিস্তানের এক বিশাল এলাকা তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। পাকিস্তানও জঙ্গিদের সঙ্গে যুদ্ধরত। দেশটিতে চলছে ভয়াবহ শিয়া-সুন্নি সংঘর্ষ; এক কথায় শিয়াদের ওপর নির্যাতন।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির আশা সুদূরপরাহত। পশ্চিমা শক্তির সম্মিলিত হামলায় নিরীহ মানুষ মরছে। জনপদের পর জনপদ ধ্বংস হচ্ছে। কিন্তু আইএসের চূড়ান্ত পরাজয়ের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে হটাতে গিয়ে পশ্চিমা হামলা এবং তৎসহ তাদের সৃষ্ট আইএসের অভিযান দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ বাঁচানোর জন্য সিরিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোতে, বিশেষ করে ইউরোপের অনেক দেশে গিয়ে ভয়াবহ শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
মনে হয়েছিল, ইরানের প্রতি ওবামা প্রশাসনের কিছুটা নমনীয় মনোভাব এবং দেশটির সঙ্গে একটি পরমাণু চুক্তি সম্পাদনে এগিয়ে যাওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে হয়তো শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে; তা হয়নি। বরং সৌদি আরব ও ইরানের সাম্প্রতিক বিরোধ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। আমেরিকার ভূমিকা এ ব্যাপারেও নারদ মুনির। কিন্তু রাশিয়া ও চীন তেহরান ও রিয়াদের এই বিবাদ মেটাতে সচেষ্ট। গত শতকের ষাটের দশকেও পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধের সময় আমেরিকা দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখেছে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করে যুদ্ধবিরতি ঘটিয়েছিল এবং তাসখন্দ চুক্তি দ্বারা দুই দেশের মধ্যে আবার শান্তি ফিরিয়ে এনেছিল।
এবারও মধ্যপ্রাচ্য সংকটে রাশিয়ার নিজস্ব স্বার্থ যা-ই থাক, ভূমিকাটি মোটামুটি শান্তিকামীর। গত শতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপেই ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলা থেকে মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের বেঁচে গিয়েছিলেন এবং সম্মিলিত হামলা ব্যর্থ হয়েছিল। এবারও তেমনি আমেরিকাসহ পশ্চিমা শক্তি এবং সৌদি আরব, ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র, পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ হামলার মধ্যে সিরিয়ায় আসাদ সরকার এখনও ক্ষমতায় টিকে আছে রাশিয়া ও চীনসহ কতিপয় মিত্র দেশের সমর্থনে। ইরানেও সৌদি আরব ও ইসরায়েলের চাপে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন সামরিক হামলা চালাতে সাহস পায়নি রাশিয়ার প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখে।
কেউ কেউ বলছেন, আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামার অবস্থা এখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেনের মতো। ইউরোপে তখন নাৎসিবাদের অভ্যুত্থান ঘটছে। যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে ইউরোপের আকাশে। চেম্বারলেন আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন এই বিশ্বধ্বংসী যুদ্ধ ঠেকাতে। তিনি জার্মানির মিউনিখ শহরে ছুটে গিয়ে হিটলারের সঙ্গে ২০ বছর মেয়াদি শান্তি চুক্তি করেছেন। কিন্তু তার দেশসহ ইউরোপের যুদ্ধবাদীদের চক্রান্তে তার চেষ্টা সফল হয়নি। জার্মানির ফুয়েরার হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করে বসেন। ব্রিটেন যুদ্ধ ঘোষণা করে জার্মানির বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। শান্তিকামী চেম্বারলেন ব্যর্থ, আপসবাদী দুর্নাম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দেন। তার সেই সময়ের ‘এপিজমেন্ট পলিসির’ দুর্নাম এখনও ঘোচেনি।
বর্তমান বিশ্বধ্বংসী পরিস্থিতি যিনি সৃষ্টি করে গেছেন, আমেরিকার সেই যুদ্ধবাদী প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ জুনিয়র ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর সারা পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রচণ্ড আশা জাগিয়ে হোয়াইট হাউসে ঢুকেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ওবামা। তিনি তার দেশের শ্বেতাঙ্গ এস্টাবলিশমেন্টের যুদ্ধবাদী ও সম্প্রসারণবাদী নীতির রাশ খুব একটা টেনে ধরতে পারেননি। তবু চেম্বারলেনের মতো তিনি চেষ্টায় ত্রুটি করেননি। তিনি বুশের সৃষ্ট যুদ্ধ থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে আনতে পারেননি; কিন্তু তার সম্প্রসারণ ঠেকিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ হয়তো তৃতীয় মহাযুদ্ধে পরিণত হতো, যদি ওবামা ইরাক ও সিরিয়ায় যুদ্ধকে আরও বিস্তার লাভ করতে দিতেন; আফগানিস্তান থেকে পর্যায়ক্রমে মার্কিন সৈন্য ফিরিয়ে আনার প্রাথমিক কাজ শুরু না করতেন; সৌদি আরব ও ইসরায়েলের চাপ অগ্রাহ্য করে ইরানের সঙ্গে পরমাণু সংক্রান্ত বিরোধের অবসান ঘটানোর পদক্ষেপ না নিতেন। কিউবার সঙ্গে দীর্ঘকালের বিরোধ মেটানো ওবামার পররাষ্ট্রনীতির একটা বিরাট সাফল্য।
তবু ওবামাকে হয়তো ব্রিটেনের চেম্বারলেনের মতো আপসবাদী, ব্যর্থ শান্তিবাদী ইত্যাদি আখ্যা নিয়ে এখন হোয়াইট হাউস থেকে বিদায় নিতে হবে। তিনি আরও সাহসী হয়ে প্রকৃত শান্তিবাদী প্রেসিডেন্টের ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেননি। মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের যুদ্ধবাদী ও সম্প্রসারণবাদী নীতি ঠেকাতে পারেননি; বরং এস্টাবলিশমেন্টের কাছে বারবার নতি স্বীকার করেছেন – এসবই সত্য। কিন্তু তার বদলে জর্জ বুশের পর যদি রিপাবলিকান দলের কোনো বুশপন্থি প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আসতেন, তাহলে আজকের পৃথিবীর চেহারা অন্যরকম হতো। আরও ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীকে এগোতে হতো। হোয়াইট হাউস থেকে শিগগিরই বিদায় নেওয়ার পর বারাক ওবামা ইতিহাসের কাছ থেকে এই কৃতিত্বটুকুর স্বীকৃতি পাবেন কি-না আমি জানি না।
ওবামার পর কে আসবেন আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হয়ে হোয়াইট হাউসে? হিলারি ক্লিনটন, না ডোনাল্ড ট্রাম্প? যদি হিলারি আসেন, ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ওবামার ধীরে চলো নীতি কমবেশি অনুসরণ করতে পারেন। কিন্তু ট্রাম্প যদি রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন পেয়ে সত্যি হোয়াইট হাউসে আসেন? কোনো কোনো মার্কিন পর্যবেক্ষকের ধারণা, তাহলে পৃথিবী আরেকটি বিয়োগান্ত ঘটনার সম্মুখীন হবে; যেমন হয়েছিল আল গোরকে হারিয়ে জর্জ বুশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর।
মাঝে মধ্যে মার্কিন নির্বাচকমণ্ডলী এমন ভুল করেন, যাতে শুধু তাদেরই ক্ষতি হয় না, ক্ষতি হয় সারাবিশ্বের। কারণ, আমেরিকা এখন বিশ্বনেতা। পঞ্চাশের দশকের আগে ওয়েন্ডেল উইলকির মতো বিজ্ঞ ও পণ্ডিত রাজনীতিবিদ মার্কিন ভোটারদের কাছে পাত্তা পাননি। পঞ্চাশের দশকে আদলাই স্টিভেনসনের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের বদলে মার্কিন ভোটাররা বেছে নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট পদে জেনারেল আইসেন হাওয়ারের মতো এক সামরিক নেতাকে। তার আমলেই রুশ-মার্কিন সম্পর্কের অবনতি নিম্নতম ধাপে নামে এবং ইউ-টু কেলেঙ্কারি ঘটে।
আইসেন হাওয়ারের যুদ্ধবাদী ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে একবার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে প্রত্যাখ্যান করে মার্কিন ভোটাররা দ্বিতীয় দফায় আবার ভোট প্রদান করেন। এই নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটির কীর্তিকাণ্ড আজ বিশ্ববাসীর অজানা নয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হয়ে ইম্পিচমেন্টের সম্মুখীন নিক্সনকে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়তে হয়েছিল। পরবর্তীকালে আল গোর এবং জন কেরির মতো দু’জন দক্ষ রাজনীতিবিদকে প্রত্যাখ্যান করে মার্কিন নির্বাচকমণ্ডলী জর্জ বুশের মতো ব্যক্তিকে দু’দুবার প্রেসিডেন্ট পদে বসিয়েছেন – এটা মার্কিন মুল্লুকের অনেকের কাছে একটা বিস্ময়। বুশের কাণ্ডকীর্তিতে আমেরিকা সারা গণতান্ত্রিক বিশ্বের নৈতিক নেতৃত্ব হারিয়েছে। গ্গ্নোবাল অর্থনীতি ত্রিশের মন্দার চেয়েও চরম বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল।
এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্যই আমেরিকাকে আগের অনেক ভুল শুধরে ওবামার মতো এক কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টকে হোয়াইট হাউসে বসতে দিতে হয়েছিল। ওবামা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে একটি অতি রক্ষণশীল প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে খুব একটা সামনে এগোতে পারেননি। কিন্তু বিপর্যয়ের প্রথম ধাক্কাটা সামলেছেন। এখন মার্কিন রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করে ওবামার পর যিনি হোয়াইট হাউসে আসবেন তার ওপর। তিনি যদি বিশ্বনেতা হওয়ার মতো প্রাজ্ঞ, দূরদৃষ্টির অধিকারী হন, তাহলে আমেরিকা বাঁচবে এবং বিশ্ববাসীও ভবিষ্যতের আরও বড় বিপর্যয় এড়াতে পারবে। নইলে গত শতকের মধ্যভাগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেনের শান্তিবাদী ভূমিকা ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্বে যে বিরাট বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল, তা আবারও দেখা দিতে পারে।
তেহরান ও রিয়াদের বিবাদ আজ আছে, কাল থাকবে না, যদি আমেরিকা পেছনে দাঁড়িয়ে আগুনে ঘৃতাহুতি না দেয়। সৌদি রাজতন্ত্র এখন খুবই সংকটের মুখে। তেলের দাম কমায় পেট্রো-ডলার অর্থনীতিতেও ধাক্কা লেগেছে। রাজপরিবারে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বও প্রবল। ফলে হাউস অব সৌদ কখনও কট্টর ওহাবিজমকে আঁকড়ে ধরে, কখনও শিয়া-সুন্নি বিরোধ উস্কে দিয়ে বাঁচতে চাইছে। আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য জঙ্গিবাদ উস্কে দিয়ে এখন তারা সেই জঙ্গিবাদেরই হুমকির সম্মুখীন।
তবে প্রকৃত অর্থেই বর্তমান সংকট থেকে বেরোতে হলে সৌদি রাজাদের তেহরানের সঙ্গে আপস-আলোচনায় বসতে হবে। বিশ্বে জিহাদিস্ট বা আইএস নামে যে নয়া ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তাকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করার জন্যও তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। এই সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাশিয়া উদ্যোগ নিয়েছে। আমেরিকাও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। উপমহাদেশের কাশ্মীর বিবাদে এতদিন আগুনে ঘি ঢেলেছে আমেরিকাই। এখন গরজ বড় বালাই। তাই আমেরিকার চাপেই ভারতের নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফের সঙ্গে লাহোরে বৈঠকে বসেছেন। কাশ্মীর বিবাদের মীমাংসার একটা প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে।
আমেরিকা এটা যদি পারে, তাহলে তেহরান ও রিয়াদের বিবাদ মেটাতেও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব। আমেরিকা যদি তা নেয় তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি এক শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে মোড় নেবে। আর মার্কিন নেতৃত্ব যদি সেই ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু বিশ্ব পরিস্থিতি অধিকতর বিপর্যয়ের দিকে মোড় নেবে না, আমেরিকাও সেই বিপর্যয় এড়াতে পারবে না। – সমকাল
লন্ডন, ১৫ জানুয়ারি শুক্রবার, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment