তৃতীয় মত

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

BP

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

কথাটা সম্ভবত আমেরিকার দার্শনিক পণ্ডিত মারডেলের। তিনি বলেছিলেন, ‘যতদিন ইসরাইল ও পাকিস্তানের মতো দুটি রাষ্ট্র টিকে থাকবে, ততদিন পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোনো আশা নেই।’ মনে হয় কথাটা সঠিক প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। ইসরাইল এবং পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে ও তত্ত্বাবধানে কৃত্রিমভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং দুটি রাষ্ট্রেরই ভিত্তি ধর্ম। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের মদদে দুটি রাষ্ট্রই এখন পর্যন্ত টিকে আছে এবং একটি রাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে এবং অন্যটি উপমহাদেশে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যেখানে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসরাইলের আধিপত্যবাদী আগ্রাসন রুখে দেয়া এবং ফিলিস্তিনি আরবদের মুক্তি সংগ্রামে পাশে দাঁড়ানোর কথা, সেখানে এই দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদীদের উস্কানিতে পরস্পরের বিরুদ্ধে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত এবং সৌদি আরবের মতো ‘ইসলামের রক্ষক’ দাবিদার দেশটি ইসরাইলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরান, সিরিয়া ইত্যাদি মুসলিম দেশকেই ধ্বংস করার প্রয়াসে জড়িত।

আমাদের উপমহাদেশেও একই অবস্থা বিরাজমান। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান দুটিই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। অতীতে এই দুই দেশের সম্পর্ক যাই থাকুক, বর্তমানে এই দুটি মুসলিম দেশের মধ্যে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক ও সহযোগিতা গড়ে ওঠার কথা। কিন্তু সে সম্পর্কটি গড়ে উঠতে পারছে না পাকিস্তানের শাসকদের ঔদ্ধত্য ও আত্মঘাতী নীতির কারণে। কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সঙ্গে একটা বড় বিরোধ অমীমাংসিত থাকা সত্ত্বেও দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ইসলামাবাদ এখন অতি সচেষ্ট। সম্প্রতি লাহোরে অপ্রত্যাশিতভাবে মোদি ও নওয়াজ শরিফের মধ্যে গলাগলি হয়েছে এবং পাকিস্তান সরকার তাদের দেশে ভারতবিরোধী ও ভারতবিদ্বেষী কথাবার্তা যাতে না হয় সেজন্য কঠোর নির্দেশ জারি করেছে।

অন্যদিকে ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে গায়ে পড়ে ঝগড়া করার নীতি গ্রহণ করেছে পাকিস্তান সরকার। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের অসংখ্য এবং বড় বড় অমীমাংসিত সমস্যা এখনও বিরাজমান। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য পাকিস্তানের কোনো সরকারই কখনও আগ্রহ বা সদিচ্ছা দেখায়নি। বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অস্তিত্বকে ধ্বংস করার জন্য দেশটির জন্ম থেকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে এবং এখনও পাকাচ্ছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের কাছে পাওনা অর্থ, সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ভাগ পাওয়ার কথা ছিল। পাকিস্তান তা দেয়নি। বাংলাদেশে আটকে পড়া কয়েক লাখ অবাঙালি পাকিস্তানি নাগরিককে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেয়ার কথা ছিল। পাকিস্তান নানা গড়িমসির পরও তাদের সবাইকে ফেরত নেয়নি। বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদারদের এতো ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটনের পরও বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতা লাভের আড়াই বছরের মধ্যে পাকিস্তানের দিকে মৈত্রীর হাত বাড়ান এবং দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি সব তিক্ততা ভুলে লাহোরে ছুটে গিয়েছিলেন এবং পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন। ভুট্টোকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, খরাব and let live- তোমরা বাঁচো এবং আমাদেরও বাঁচতে দাও।

বাংলাদেশের এই উদারতা ও মহত্ত্বের প্রতিদান ভুট্টো এবং পাকিস্তান কীভাবে দিয়েছেন? ঢাকা সফরে এসেই ভুট্টো বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন, জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাতে প্রথমে যেতে চাননি। ঢাকায় এসেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী মহলটির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা চক্রের গোপন ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেন।

বাংলাদেশে ’৭৫ সালের ট্রাজেডি ঘটানো এবং বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্রের পেছনে যে ভুট্টোর সক্রিয় হাত ছিল সেই পুরনো ইতিহাস ঘাঁটার আজ আর কোনো প্রয়োজন নেই। ভুট্টো তার পাপের শাস্তি পেয়েছেন এবং নিজের দেশেই বিচার প্রহসনে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ক্ষমতার উদগ্র লোভে সেনাবাহিনীতে যে কালোসাপ তিনি পুষেছিলেন, সেই কালোসাপই তাকে মরণ ছোবল হেনেছে। তার কন্যা বেনজির, দুই পুত্র সবারই মৃত্যু অত্যন্ত ট্রাজিক।

পাকিস্তানের অবস্থা আজ ভালো নয়। আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধে দেশটি জর্জরিত। সেখানে মার্কিন ড্রোন হামলা চলেছে বহুকাল। শিয়া-সুন্নি বিরোধ এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে জিহাদিস্টদের যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে, তা আরও কয়েক বছর চলতে থাকলে পাকিস্তান মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হবে। রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারবে কিনা সন্দেহ। তারপরও পাকিস্তানের বর্তমানের শাসকদের চৈতন্যের উদয় হয়নি। দীর্ঘকাল বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রাদর্শ ধ্বংস করা এবং স্বাধীনতার শত্রুদের ক্ষমতায় রাখার ষড়যন্ত্রে সর্বপ্রকার সাহায্য জুগিয়েও তাদের ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধস্পৃহা মেটেনি। এখন বাংলাদেশে আবার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা ফিরে আসার পর তাকে ধ্বংস করার নতুন ষড়যন্ত্রে তারা লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রেও তারা সফল হবে কি?

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানের যে হানাদার সেনাবাহিনী বর্বর গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা ঘটিয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিধান মেনেই তাদের বিচার করতে পারত; কিন্তু উদারতা ও মহত্ত্ব দেখিয়ে তা করেনি। হানাদারদের আত্মসমর্পণের পরও সিমলা চুক্তি মেনে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘকাল পর বিচার ও দণ্ড দেয়ার ব্যবস্থা করেছে তার নিজের দেশের কোলাবরেটর, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার শত্রুদের। পাকিস্তানের শাসকদের এখানেও আপত্তি।

বাংলাদেশকে এখনও তারা তাদের খাস তালুক মনে না করলে দেশটির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোর সাহস তারা পেত না। বাংলাদেশে বিএনপি ও স্বাধীনতার শত্রু জামায়াতিদের ক্ষমতা দখলের সর্বপ্রকার ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সংশ্লিষ্টতা এখন আর কোনো অনুমানের বিষয় নয়। বাংলাদেশে অতি সম্প্রতি বিএনপি ও জামায়াত যে সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করতে চেয়েছে তার পেছনেও মদদ ছিল পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর।

এই শাসকদের বাংলাদেশবিরোধী চেহারাটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঢাকায় ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার বিচার ও দণ্ডদানের সময়। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে এই মৃত্যুদণ্ডদানের নিন্দাপ্রস্তাব পাস করা হয় এবং কাদের মোল্লাকে পাকিস্তানের মিত্র বলে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ পাকিস্তানের শাসকরা স্বীকার করে নেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু ঘাতক দলটি তাদের মিত্র এবং বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের তারা মিত্র নন।

সম্প্রতি বাংলাদেশে একাত্তরের গণহত্যার দায়িত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পাকিস্তানের শাসকরা মিথ্যাচারের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তার দ্বিতীয় উদাহরণ বর্তমান বিশ্বে নেই। গত মহাযুদ্ধে পোল্যান্ডে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালানোর অপরাধের জন্য পরবর্তীকালে জার্মানির এক চ্যান্সেলর সেই দেশের রাজধানীতে গিয়ে নতজানু হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন। জাপান দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বন্দি নির্যাতনের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে চেয়েছে। একমাত্র পাকিস্তান ’৭১ সালে বাংলাদেশে বর্বর গণহত্যা চালানোর জন্য আজ পর্যন্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। কোনো প্রকার ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলেনি। পাকিস্তানের শাসকরা মানবতার বিরুদ্ধে তাদের এই জঘন্য অপরাধের জন্য আজ পর্যন্ত অনুতপ্ত হননি, বিবেকপীড়া বোধ করেননি এবং বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেননি।

আরও বিস্ময়ের কথা, পাকিস্তানের এই নির্লজ্জ মিথ্যাচারকে সমর্থন দানের জন্যই যেন বাংলাদেশে একই সময়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া একাত্তরের ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং বিতর্ক সৃষ্টি করে পাকিস্তানের নির্লজ্জতা ঢাকা দিতে চাইছেন। পাকিস্তানের শাসকদের এই ধৃষ্টতায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির সবচেয়ে নিচে এসে নেমেছে এবং অনেকে আশংকা করেছিলেন পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক হয়তো ছিন্ন হবে। হাসিনা সরকারের ধৈর্য ও দূরদর্শিতায় সম্পর্কটি ছিন্ন হয়নি। পাকিস্তানের শাসকরাও এখন পর্যন্ত এ সম্পর্ক ছিন্ন করতে পদক্ষেপ নেয়নি। কারণ জাতে মাতাল হলেও চালাকিটা তারা এখনও ভোলেননি।

বাংলাদেশে একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের সামরিক ও অসামরিক কোনো সরকারই ক্ষমা প্রার্থনা না করলেও দেশটির অনেক বিবেকবান বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতা এজন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষও এখন বাংলাদেশে তাদের এককালের শাসকদের বর্বরতার কথা জানেন (যা তাদের কাছে বহুকাল গোপন রাখা হয়েছিল) এবং সেজন্য বাংলাদেশের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। বাংলাদেশের বিবাদ তাই পাকিস্তানের জনগণের সঙ্গে নয়; এই বিবাদ তাদের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে। যে শাসকগোষ্ঠী গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের স্বার্থে তাদের নিজেদের দেশেও আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে রেখেছে।

এই অবস্থা থেকে পাকিস্তানের জনগণকে মুক্ত হতে সাহায্য দানে বাংলাদেশেরও একটা ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সফল হওয়ায় পাকিস্তানের জনগণও উপকৃত হয়েছিল। তাদের মাথায় জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা সামরিক শাসনের অবসান ঘটেছিল এবং কিছুকালের জন্য হলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে এসেছিল। এজন্যই বর্তমানেও পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন না করে দেশটির জনগণকে সাম্প্রতিক জঙ্গিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী শাসকচক্রের কব্জা থেকে মুক্ত হওয়ার কাজে বাংলাদেশের উচিত সর্বপ্রকার নৈতিক সাহায্য প্রদান করা।

ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত বহু সমস্যা সমাধানে এবং মৈত্রী সম্পর্ক উন্নয়নে হাসিনা সরকার যে দক্ষতা, ধৈর্য ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ দেখিয়েছেন, পাকিস্তানের বর্তমান শাসকদেরও সর্বপ্রকার উস্কানির মুখে সেই একই ধৈর্য ও দূরদর্শিতা দেখিয়ে হাসিনা সরকার পাকিস্তানের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, উন্নয়ন এবং বর্তমান শাসকদের ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতার মোকাবেলা করতে পারবেন বলে আমার ধারণা। সেটা তারা কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করেও পারবেন। – যুগান্তর

লন্ডন ১৭ জানুয়ারি, রোববার, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment