কালের আয়নায়

এই জিহাদ কার বিরুদ্ধে?

AGC

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –
জিহাদ কথাটি ইসলাম ধর্মে একটি অত্যন্ত সম্মানিত কথা। ইংরেজি ক্রুসেড দ্বারা জিহাদের মর্মার্থ বোঝানো যাবে না। যদিও প্রাচীন ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়ন হার্টের সঙ্গে মিসরের সুলতান সালাউদ্দিনের যে যুদ্ধ হয়েছিল, পশ্চিমা ইতিহাসবিদরা তাকে ক্রুসেড বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু সেই যুদ্ধে জয়ী মুসলমানরা তাকে জিহাদ বলে মনে করেন না। জিহাদের অর্থ আরও বিস্তৃত এবং ব্যাপক। জিহাদ শুধু ধর্মের জন্য যুদ্ধ নয়; যে কোনো অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ জিহাদ। জিহাদে মৃত্যু হলে হওয়া যায় শহীদ। জয়ী হলে হওয়া যায় গাজি।
ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হওয়ার দেড় হাজার বছরের মধ্যে এই জিহাদের অর্থ, সংজ্ঞা, চরিত্র সব বদলে ফেলা হয়েছে। বদলে ফেলেছে অত্যাচারী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলো দ্বারা অনুসৃত যে কোনো প্রকাশ্য ও গুপ্ত হত্যা, নিরীহ-নির্দোষ নারী-পুরুষ নির্যাতন, মসজিদ, গির্জা নির্বিশেষে ধর্মস্থান ধ্বংস করা, এক কথায় শিশুঘাতী-নারীঘাতী বর্বরতাকেও জিহাদ আখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং এই বর্বরতার যারা ঘটক, তাদের নাম জিহাদিস্ট।
জিহাদের অর্থ এখন ন্যায় ও মানুষের কল্যাণের জন্য যুদ্ধ নয়। জিহাদ মানে সন্ত্রাস এবং জিহাদিস্ট মানে বর্বর সন্ত্রাসী। জিহাদ কথাটির এই অপব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ ইসলাম ধর্মের জন্যও একটা অবমাননার ব্যাপার। আমেরিকায় তাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এক নব্য ফ্যাসিস্ট প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয়ে বলার সাহস দেখান যে, তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেবেন। এই একই হুঙ্কার দিয়েছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে জার্মানির ফ্যাসিস্ট নায়ক হিটলার। তিনি জার্মানিসহ ইউরোপ থেকে ইহুদি বিতাড়ন, নির্যাতন এবং বর্বর পন্থায় তাদের হত্যার নীতি অনুসরণ করেছিলেন।
ইসলামের নাম ভাঙিয়ে এবং জিহাদের উদ্দেশ্য ও আদর্শ সম্পূর্ণ বিকৃত করে বর্তমানে যে ইসলামী জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা আসলে প্রকৃত ইসলাম নয়, এমনকি জিহাদও নয়। এটা বর্বর ফ্যাসিবাদ এবং মানবতা ও সব মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় এরা লিপ্ত। এরা খেলাফত কথাটির অর্থ এবং সংজ্ঞাও বিকৃত করেছে। সিরিয়া ও ইরাকের কিছু এলাকা দখল করে তারা যে ইসলামিক খেলাফত প্রতিষ্ঠার কথা বলছে, তার সঙ্গে ইসলামের প্রাথমিক যুগের খেলাফতের কোনো সম্পর্ক নেই। এদের খেলাফত মধ্যযুগীয় একটি বর্বর শাসন ব্যবস্থা, যা মানবতা এবং মানব সভ্যতার সব মূল্যবোধের বিরোধী।
এই জিহাদিস্টদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চলছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি মুসলিম দেশগুলোতে ও তাদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে মূলত মুসলমানরাই এবং তাদের নারী-পুরুষ। পাকিস্তান শুধু একটি ইসলামী রাষ্ট্র নয়, জেনারেল জিয়াউল হকের আমল থেকে একটি শরিয়া রাষ্ট্রও। এই শরিয়া রাষ্ট্রেও চলেছে জিহাদিস্ট তালেবান ও আল কায়দার ভয়াবহ হত্যাভিযান। আর তাতে প্রত্যহ নির্মমভাবে মারা যাচ্ছে অল্পবয়সী স্কুল ছাত্রছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীও। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, এই জিহাদ তা হলে কার বিরুদ্ধে, এই জিহাদের লক্ষ্য কী?
গতকাল (বৃহস্পতিবার) লন্ডনের ‘টাইমস’ পত্রিকা খবর ছেপেছে, আগের দিন (বুধবার) পাকিস্তানের চরসাদ্দা শহরে বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালানো হয়। যদিও সরকারি হিসাবে ৩০ জন নিহত এবং ৬০ জন আহতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি পেশোয়ার থেকে মাত্র ৩০ মাইল দূরে অবস্থিত। এর আগে ২০১৪ সালে একটি স্কুলগৃহে জিহাদিস্টরা হামলা চালায় এবং ১৩২ শিশু ছাত্রছাত্রীকে হত্যা করে। তাদের শোকার্ত পিতা-মাতার কান্নায় পাকিস্তানের আকাশ-বাতাস গুমরে উঠেছিল।
চরসাদ্দার বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব স্বীকার করেছে পাকিস্তানের তালেবানদের এক কমান্ডার উমর মনসুর। পেশোয়ারে শিশু হত্যারও পরিকল্পনাকারী তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের হত্যা করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জিহাদিস্টরা ওয়েস্টার্ন স্টাইলের শিক্ষা ব্যবস্থার বিরোধী। এই ব্যবস্থায় নারী-পুরুষ সহশিক্ষা লাভ করে। আফগানিস্তানে তালেবানরা মার্কিন মদদে কিছুকালের জন্য ক্ষমতা দখলের পর নারী শিক্ষা বন্ধ করা হয়েছিল। নারী শিক্ষক, নারী ডাক্তার, নারী ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরি থেকে তাড়িয়ে গৃহবন্দি করা হয়েছিল। পুরুষদের দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বেতার-টেলিভিশনে গান-বাজনা বন্ধ করা হয়েছিল। আফগানিস্তানের হাজার হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছিল। মনে হয়েছিল, মানব সভ্যতা বুঝি আফগানিস্তানে কয়েকশ’ বছর পিছিয়ে গিয়ে তার সব অগ্রগতি হারিয়েছে।
আফগানিস্তানে যদি এই তালেবানি রাজত্ব স্থায়ী হতো, তাহলে এত দিনে তার সম্প্রসারণ ব্যাপকভাবে ঘটত পাকিস্তানে। পাকিস্তান শরিয়া রাষ্ট্র হয়েও বাঁচত না। তাকে পুরোপুরি তালেবান রাষ্ট্র হতে হতো। ওসামা বিন লাদেন শুধু পাকিস্তানের আশ্রয়ে বেঁচে থাকতেন না, তার নির্দেশে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও সন্নিহিত মুসলিম এলাকাগুলো নিয়ে তালেবান কনফেডারেশন গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেত। তার অগ্রতিরোধ্য প্রভাব পড়ত উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে। জামায়াত এবং হেফাজত বাংলাদেশকে তালেবান রাষ্ট্র বানানোর জন্য এক পায়ে খাড়া ছিল। হাসিনা সরকারের কাছে বছর তিনেক আগে দেওয়া হেফাজতিদের ১৩ দফা দাবি তার প্রমাণ।
বিস্ময়ের কথা, এই ১৩ দফা সমর্থনে প্রায় প্রত্যক্ষভাবে এগিয়ে গিয়েছিলেন বিএনপির খালেদা জিয়া এবং জাতীয় পার্টির জেনারেল এরশাদ। বাংলাদেশে পাকিস্তানের মতো অবস্থার উদ্ভব ঘটতে পারত এবং নওয়াজ শরিফের সরকারের মতো ঠুঁটো জগন্নাথ গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারত, যদি বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মতো সাহসী এবং কৌশলী নেতৃত্ব না পেত। হাসিনা সরকারের হাজারটা ভুলত্রুটি থাকতে পারে; কিন্তু এ কথাটা তাদের অতি বড় সমালোচকও স্বীকার করবেন, বাংলাদেশে এই সংকট মুহূর্তে শেখ হাসিনা এবং তার সরকার ক্ষমতায় না থাকলে দেশটা পাকিস্তানের মতো রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হতো।
পাকিস্তানে তালেবানি সন্ত্রাস এখন প্রাত্যহিক। গত মঙ্গলবার পেশোয়ারে জিহাদিস্টরা ১১ জন নিরাপত্তা কর্মচারীকে হত্যা করেছে। কোয়েটায় গত সপ্তাহে সুইসাইড বোমারুর হামলায় ১৪ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার (২০ জানুয়ারি) আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে দেশটির পপুলার টিভি চ্যানেল টোলোর (ঞঙখঙ) ৭ জন স্টাফ তালেবানি হামলার শিকার হয়। কাবুলে রাশিয়ান দূতাবাসের কাছে বোমা হামলায় কমপক্ষে ২৫ জন সাধারণ মানুষ গুরুতর আহত হয়েছে। এছাড়া প্রায় শুক্রবারই পাকিস্তানে চলছে শিয়া মসজিদে হামলা এবং শিয়া মুসল্লি হত্যা।
প্রশ্ন হলো, প্রত্যহ যাদের এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে তারা তো অধিকাংশই সাধারণ মুসলমান। তারা কি ইসলামের শত্রু? ২০১৪ সালে স্কুলগৃহে হামলা চালিয়ে ১৩২ শিশু ও কিশোরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো, তারা কি ধর্মের শত্রু ছিল? তাদের হত্যা করে জিহাদের কোনো লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে? ইসলামে জিহাদের নামে নারী হত্যা ও শিশু হত্যা কি বৈধ? চেঙ্গিস, হালাকুর আমলেও নির্বিচার নারী-শিশু হত্যাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। তাহলে বর্তমানের এই বর্বরতার দেহে জিহাদের তকমা লাগালেই কি তা জিহাদ হয়ে যাবে? এই জিহাদ তো আসলে মানবতা ও মানব সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আধুনিক জিহাদিস্টরা আসলে মানবতার শত্রু।
গত শতকের ইউরোপে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট বিপ্লব ধ্বংস করার জন্য জার্মানি ও ইতালিতে ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থানে সাহায্য জুগিয়েছে এবং পরে সেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। বর্তমানেও তেমনি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতন্ত্রী বিশ্বকে ধ্বংস করার জন্য তালেবান, আল কায়দা থেকে শুরু করে আইএস পর্যন্ত অসংখ্য অতীতমুখী ধর্মান্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে তারা। বর্তমানে সেই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অসিলায় প্রায় সারাবিশ্বেই নিজেদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। এক হাতে আইএসকে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য দান এবং অন্য হাতে তাদের ওপর ড্রোন হামলা চালানো এ যুগের বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রহসন।
কথাটা কি কনফুসিয়াসের? আমার ঠিক স্মরণ হচ্ছে না। কথাটা হলো ‘ধর্ম ও আগুন নিয়ে খেলা করতে নেই। দুটিই মানুষের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন। কিন্তু তার অতি ব্যবহার বা অপব্যবহার বিপজ্জনক।’ এ কথাটা ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। তোমাদের আগে বহু জাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়ে গেছে।’ ধর্ম নিয়ে এই বাড়াবাড়ি করতে গিয়েই আজ পাকিস্তানের এই অবস্থা। সৌদি আরবের রাজতন্ত্র প্রকৃত ইসলামের বদলে কট্টর ওয়াহাবিজমের সন্ত্রাসবাদী ভূমিকাকে সাহায্য ও সমর্থন জোগাতে গিয়ে শুধু মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের বিনাশ নয়, নিজেদের জন্যও বিপদ ডেকে এনেছে। এখন শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী বিবাদ বাধিয়ে, আরব মুসলমানদের শত্রু ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শিয়া মুসলিম রাষ্ট্র ইরানকে শায়েস্তা করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে তাদের। কিছুকাল আগে লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকার প্রেডিকশন ছিল, হাউস অব সৌদের দিন ফুরিয়ে এসেছে।
আধুনিক বিশ্বে ধর্ম দ্বারা যে জাতি ও দেশ গঠন করা যায় না এবং করতে গেলে বিপজ্জনক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে – এ কথা গত শতক ধরে বহু মনীষী বলেছেন। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগের বিপদ সম্পর্কে অবিভক্ত ভারতের মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকেও তার অনেক রাজনৈতিক বন্ধু সতর্ক করেছেন। তিনি তাদের কথা কানে তোলেননি। তবে ভারত ভাগ করে তিনি ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন, তাও চাননি। তিনি চেয়েছিলেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু নিজের অজ্ঞাতসারেই ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের যে বীজ তিনি পুঁতেছিলেন, তা থেকে আধুনিক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটতে পারে না।
জিন্নাহর জীবিতকালেই পাকিস্তানে রাষ্ট্রের ধর্মীয়করণ এবং মোল্লাবাদের শক্তি সঞ্চয় শুরু হয়ে যায়। জামায়াত নেতা মওলানা মওদুদি, যিনি এতদিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন, তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিল্লী থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে লাহোরে এসে আস্তানা গাড়েন। শুরু হয় সৌদি রাজাদের ওয়াহাবিজমের মন্ত্রে পুষ্ট এবং অর্থে লালিত জামায়াতের শিয়া ও আহমদিয়াদের অমুসলমান আখ্যা দিয়ে জার্মানির নাৎসিদের ইহুদিবিদ্বেষ প্রচারের মতো পাকিস্তানে আহমদিয়া ও শিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচার। অথচ পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও ছিলেন একজন শিয়া। তিনি পাকিস্তানের জাতির পিতাও।
জিন্নাহ-পরবর্তী পাকিস্তানে দ্রুত মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি অ্যালায়েন্স তৈরি হয়। দেশটিকে পুরোপুরি সুন্নি-শরিয়া রাষ্ট্রে পরিণত করার পদক্ষেপ নেন একজন সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হক। পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আর যত ব্যর্থতা থাক, তারা দেশটাকে মধ্য যুগে ফিরিয়ে নিতে চাননি। মধ্য যুগে প্রত্যাবর্তনের এই কাজটি শুরু হয় জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে। তিনি চুরি করার জন্য হাত কাটা, ব্লাসফেমির জন্য প্রাণদণ্ড, নারী শিক্ষা সংকোচন, পর্দাপ্রথার কঠোরতা বৃদ্ধিসহ নানা কট্টর বিধিনিষেধ জারি করেন। জিয়াউল হকের পাশাপাশি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার রাষ্ট্রীয় আদর্শ হত্যা করে যিনি সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের বিধান ঢোকান, তিনিও একজন সামরিক শাসক  – জেনারেল এরশাদ।
জেনারেল জিয়াউল হক এবং জেনারেল এরশাদ দু’জনেই ক্ষমতায় বসে দেদার সৌদি অনুগ্রহ লাভ করেছেন। সৌদি অর্থে ও সমর্থনে বাংলাদেশে জামায়াত শক্তি বৃদ্ধি করে, বহু মাদ্রাসা ও মসজিদে জামায়াতি ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মীয় শিক্ষার আবরণে এসব মসজিদ-মাদ্রাসায় ভবিষ্যতের জঙ্গি তৈরির কারখানা চালু হয়। শেষ পর্যন্ত জেনারেল জিয়াউল হককে বিমান দুর্ঘটনা ঘটিয়ে হত্যা করা হয় এবং জেনারেল এরশাদও গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু দু’জনেই দু’দেশে বিষবৃক্ষের যে চারা রোপণ করে গেছেন, তাকে মহীরুহ হয়ে গজিয়ে উঠতেই আমরা এখন দেখছি। পরবর্তীকালে বিএনপির সস্নেহ প্রশ্রয়ে এই মহীরুহ থেকেই অনেক শাখা-প্রশাখা গজিয়েছে। এরা সকলেই পরিচয়ে ইসলামের গার্জেন। কিন্তু প্রকৃত ইসলামের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই।
গত শতকের ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের মতো বর্তমান শতকের জিহাদিজমও একটি ফ্যাসিবাদ। এই ফ্যাসিবাদ মানবতা ও মানব সভ্যতার শত্রু। কিন্তু পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের ড্রোন হামলার নাট্যাভিনয় দ্বারা এই ফ্যাসিস্টদের পরাস্ত করা যাবে না। পরাস্ত করতে এই ফ্যাসিবাদের উৎসমূলে হাত দিতে হবে। গত শতকের মাওবাদী সন্ত্রাস বিশ্বের বহু দেশে, বিশেষ করে উপমহাদেশে দারুণভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। তার পেছনে মাওবাদী চীনের সমর্থন ও সাহায্য ছিল কি-না তা জানা যায় না। কিন্তু এটা দেখা গেছে, চীনে মাওপন্থি চার নেতার (gang of four) পতন এবং কট্টর মাওবাদী থেকে চীন সরে আসার পর থেকেই দেশে দেশে এমনকি উপমহাদেশেও মাওবাদী সন্ত্রাস দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক মাওবাদী সংগঠন সন্ত্রাস ত্যাগ করে। নেপালের মতো দেশে যেখানে সশস্ত্র মাওবাদী বিপ্লবীরা ছিল শক্তিশালী ও জনপ্রিয়, তারাও সন্ত্রাসের পথ ত্যাগ করে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে এসেছে।
এটা বর্তমান জিহাদিস্ট নামধারী সন্ত্রাসী দলগুলোর ব্যাপারেও ঘটতে পারে। সৌদি রাজতন্ত্র যদি চীনের শাসকদের কট্টর মাওবাদ ত্যাগ করার মতো কট্টর ওয়াহাবিজম থেকে সরে আসে, আইএসের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গঠনে অর্থ ও সাহায্য না দেয়, শিয়া ও আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচার না করে, শিয়া রাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংস করার জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে না রাখে, সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আত্মঘাতী ভ্রাতৃবিরোধ জিইয়ে রাখার কাজ থেকে আমেরিকার প্রশাসন ও তার ওয়ার ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে বিরত রাখা যায়; তাহলে এই জঙ্গি দমন অনেক সহজ হবে। ধর্মীয় উস্কানির সঙ্গে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য না পেলেই জিহাদিস্টরা নিজেরাই ক্রমশ সন্ত্রাসের পথ থেকে সরে আসবে। কথা হলো, সৌদি আরব ও আমেরিকার মাথায় এই সুবুদ্ধির উদয় সহসা হবে কি? – সমকাল
লন্ডন, ২২ জানুয়ারি শুক্রবার, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment