আগামীকাল শনিবার আর্যশ্রাবক বনভান্তের চতুর্থ পরিনির্বাণ বার্ষিকী

বিশেষ রিপোর্ট –

Bonobhante

দেশের প্রধান বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু আর্যশ্রাবক শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তের শনিবার চতুর্থ পরিনির্বাণ বার্ষিকী। এ উপলক্ষে রাঙ্গামাটির রাজ বন বিহারে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

মহাসাধক বনভান্তে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১২ সালের ৩০ জানুয়ারি পরিনির্বাণ লাভ করেন। এর আগে ২৭ জানুয়ারি বনভান্তেকে রাঙ্গামাটি থেকে মুমূর্ষ অবস্থায় হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় নেয়া হয়। বার্ধক্যজনিত রোগ ছাড়াও বনভান্তের উচ্চ রক্তচাপ, ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা এবং ফুসফুসে সমস্যা ছিল। পরিনির্বাণ লাভের পরদিন ৩১ জানুয়ারি রাতে পরিনির্বাণপ্রাপ্ত বনভান্তের মরদেহ রাঙ্গামাটি পৌছার পর হাজার হাজার ভক্ত ও পূণ্যার্থী তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। বর্তমানে রাঙ্গামাটির রাজ বন বিহারে বনভান্তের ধাতু (মরদেহ) বিনয় সম্মতভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, শ্রাবকবুদ্ধ বনভান্তের চতুর্থ পরিনির্বাণ বার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার রাঙ্গামাটি রাজ বন বিহারে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সকালে পঞ্চশীল গ্রহণ, অষ্টপরিস্কার দান এবং দুপুরের দিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও স্মরণ সভার আয়োজন ছাড়াও বিকালে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হবে। অনুষ্ঠানে হাজার হাজার ভক্ত ও পূণ্যার্থী অংশ গ্রহণ করার আশা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এ বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির (বন ভান্তে) ১৯২০ সালের ৮ জানুয়ারি রাঙ্গামাটি জেলা সদরের মগবান ইউনিয়নের মুরোঘোনা গ্রামের সাধারণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বনভান্তের প্রব্রজ্যা গ্রহণের আগে তাঁর গৃহী নাম ছিল রথীন্দ্র লাল চাকমা। তার পিতার নাম স্বর্গীয় হারু মোহন চাকমা এবং মাতার নাম স্বর্গীয় বীরপুদি চাকমা। তিনি ৫ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সকলের বড় ছিলেন। বনভান্তের জন্ম স্থানটি ১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধের ফলে রাঙ্গামাটি হ্রদের পানিতে ডুবে যায়।

১৯৪৯ সালের ফ্রেরুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের নন্দন কানন বৌদ্ধ বিহারে ফাল্গুনী পূর্নিমা তিথিতে শ্রীমৎ দীপংকর ভিক্ষুর কাছে তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। প্রব্রজ্যা গ্রহণের পর তিনি বৌদ্ধ ধর্মের সত্যের সন্ধান করতে থাকেন। তিনি নিজের প্রজ্ঞাবলে উপলদ্ধি করেন যে মনুষ্য লোকে অবস্থান করে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি নিজের জন্ম স্থানের পাশে ধনপাতা নামক স্থানে ফিরে এসে গভীর জঙ্গলে অবস্থান করে নিজেকে শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার ধ্যান সাধনায় নিয়োজিত করেন।

অবশেষে দীর্ঘ ১২ বছর কঠোর ধ্যান সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের সত্য দর্শন ও মার্গফল লাভ করেন এবং তিনিই সর্বপ্রথম চিরাচরিত ধর্ম আচরণের পরিবর্তে তথাগত গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত লোকাত্তর সাধনার প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে তার জন্ম স্থান রাঙ্গামাটি হ্রদের পানিতে ডুবে যাওয়ার পর ১৯৬১ সালে তিনি খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা বনাশ্রমে ভিক্ষু জীবন যাপন শুরু করেন।

পরে রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার তিনটিলা বন বিহারে ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্ষন্ত অবস্থান করেন। পরবর্তীতে বনভান্তে ১৯৭৪ সালে রাঙ্গামাটির সদরে চাকমা রাজার আমন্ত্রনে চাকমা রাজার দান করা ৩৩ একর জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা রাঙ্গামাটি রাজ বন বিহারে স্থায়ীভাবে অবস্থান করেন। তিনি ১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মহাথেরো হিসেবে উপসম্পদা লাভ করেন।

জীবদ্দশায় বনভান্তে মহামতি বুদ্ধের পদাংক অনুসরণ পূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সর্বত্র এবং চট্টগ্রামের অনেকাংশই লোকোত্তর জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়ার কর্ম সম্পাদন করেছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালে মহাপূন্যবতী বিশাখা প্রবর্তিত কঠিন চীবর দান (তুলা থেকে সূতা, সূতা রং করা, সূতা থেকে কাপড় বোনা এবং পরে চীবর প্রস্তুত করা) উৎসব শুরু করেন রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলা থেকে। একই বছর বনভান্তের রাঙ্গামাটি আসার পর থেকে রাঙ্গামাটি রাজ বন বিহারে এই পদ্ধতি অনুসরণ পূর্বক দানোত্তম কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান অায়োজিত হয়ে আসছে।

প্রতি বছর তিন পার্বত্য জেলার ৩৪টি শাখা রাজ বন বিহারে এই অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে। আড়াই হাজার বছর আগে ভগবান গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশায় মহাপূণ্যবতী বিশাখা কর্তৃক প্রবর্তিত ২৪ ঘন্টার মধ্যে সূতা কাটা শুরু করে কাপড় বয়ন, সেলাই ও রং করাসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দান করা হয়ে থাকে বলে একে কঠিন চীবর দান হিসেবে অভিহিত করা হয়।

এ পদ্ধতিতে দান করলে কায়িক-বাচনিক এবং মানসিক পরিশ্রম অধিকতর ফলদায়ক হয় বলে বৌদ্ধ শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৯৬ সালে শ্রীমৎ বন ভান্তের উপদেশ অনুসারে তাবোতিংশ স্বর্গ এবং দীপামেরু পূজা প্রচলন শুরু হয় রাজ বন বিহারে।


শীল পালনের মাধ্যমে বস্তুগত সম্পদ অর্জন সম্ভব বলে তিনি উপদেশ দিতেন। তিনি এ কথাও বলতেন যে পূণ্য এবং শীল পালন করা গেলে পৃথিবীতে সুখ লাভ করা যাবে এবং নির্বাণ প্রাপ্তির পথ সুগম হবে।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment