কালান্তরের কড়চা

‘কার নিন্দা করো তুমি এ আমার এ তোমার পাপ’

AGC

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

হুজুগে বাঙালি বলে একটা কথা বহুকাল ধরে প্রচলিত। কথাটা মাঝেমধ্যে সঠিক প্রমাণিত হয়। চিলে কান নিয়েছে কথাটা শোনামাত্র সবাই চিলের পেছনে ছোটে। কানটা ঠিক জায়গায় আছে কি না আগে তার খোঁজ নেয় না। ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের সম্পর্কেও তাই হয়েছে মনে হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টক শোতে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের দেওয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি খবর যাচাই-বাছাই না করেই ছাপা একটি ভুল বলে স্বীকারের পর মাহফুজ আনাম বিরাট এক বিপাকে পড়েছেন।

ঢাকার কাগজে দেখলাম, তাঁর বিরুদ্ধে ছয় দিনে ৩৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ মামলায় ৫০ হাজার ৬২৩ কোটি টাকার মানহানির অভিযোগ আনা হয়েছে। অনেক আদালতই মামলাটি আমলে নিয়ে মাহফুজ আনামকে সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের হুকুম। মাহফুজ আনাম যত বড় সম্পাদক হন, তাঁকে এ নির্দেশ মানতেই হবে। আর মানতে গেলে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের আদালতে তাঁকে চরকির মতো ঘুরে বেড়াতে হবে।

জাতীয় সংসদের কয়েকজন সদস্য ডেইলি স্টার বন্ধ করা এবং মাহফুজ আনামের বিচার দাবি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মানহানিসহ রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হয়েছে। একজন সম্পাদক, তিনি যত বড় ভুল বা অপরাধ করে থাকুন, এটা কি তাঁর বিরুদ্ধে একটা বড় হুজুগ সৃষ্টি করা নয়? এটা যদি ব্রিটেনে কিংবা ইউরোপের আর কোনো দেশে হতো, তাহলে একে ‘উইচ হান্টিং’ আখ্যা দেওয়া হতো। মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হয়েছে, তার গুণাগুণ আমি বিচার করছি না। তা আমার এখতিয়ারের বাইরে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন আদালত। আদালতের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। আমার কথা, সারা দেশে হুজুগে মেতে যাঁরা মামলাগুলো করেছেন, তাঁরা কি একবারও ভেবে দেখেছেন, এই হুজুগে পড়া দ্বারা তাঁরা কি বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন, না বিরাটভাবে ক্ষতি করছেন? সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় হাসিনা সরকারের যে অকলঙ্ক রেকর্ড, তা কি এই পাইকারি মামলা দ্বারা কলঙ্কিত করা হবে না?

মাহফুজ আনাম ভুল করার দায় স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছেন। কেউ তাঁকে স্বীকার করার জন্য জোর করেনি। তার পরও তাঁকে বিচার করার দাবি উঠতেই পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে কয়েকজন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ডেইলি স্টার পত্রিকাটি বন্ধ করার দাবি তুলতে পারেন, এটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য। ক্ষমতা কি মানুষকে এতটাই অন্ধ করে ফেলে যে তারা অতীতের ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নিতে পারে না?

অনেকটা এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের স্বৈরাচারী শাসনের সময়। হামিদুল হক চৌধুরী তখন মুসলিম লীগ সরকারের বিরোধিতা করছেন এবং তাঁর পত্রিকা পাকিস্তান অবজারভারও। হঠাৎ একদিন পত্রিকাটির মালিক হামিদুল হক চৌধুরী এবং সম্পাদক আবদুস সালামকে গ্রেপ্তার করা হলো এবং অবজারভারের প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রোহের। এবং তখন আবদুস সালামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ধর্মদ্রোহের। পাকিস্তান অবজারভার সরকারি আদেশে দীর্ঘকাল বন্ধ ছিল। ১৯৫৪ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকারের পতনের পর কাগজটি পুনরায় প্রকাশিত হয়। ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের চেয়ে অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালামের ভাগ্য ভালো ছিল। তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে বৈকি; কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অর্ধশতের মতো মামলা হয়নি এবং ৫০ হাজার কোটিরও বেশি টাকার মানহানি মামলার সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়নি। জানি না, আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগ আমলের ধিকৃত কোনো পন্থার অনুসরণ করতে চায় কি না?

বাংলাদেশে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার নামে ডেইলি স্টার তার বাংলা জুটি প্রথম আলোসহ যে পক্ষপাতিত্ব এবং আওয়ামী লীগ ও হাসিনাবিদ্বেষের পরিচয় দেখিয়েছে, তাকে আমি মোটেও ছোট করে দেখছি না। দীর্ঘদিন ধরে আমি আলো-স্টারের বিরুদ্ধে অসৎ সাংবাদিকতার অভিযোগ এনেছি এবং মাহফুজ আনামেরও বহু লেখার তীব্র প্রতিবাদ করে কলাম লিখেছি। তাই বলে পত্রিকা দুটি বন্ধ করে দেওয়া হোক এমন দাবি কখনো করিনি, এখনো করি না। কোনো সংবাদপত্র সৎ সাংবাদিকতার নীতিমালা বিচ্যুৎ হলে পাঠকদের কাছে তার স্বরূপ তুলে ধরা প্রয়োজন এবং সংবাদপত্রটি দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে (সরকারের বিরুদ্ধে নয়) কোনো ক্ষতিকর ভূমিকা গ্রহণ করলে তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় অবশ্যই নেওয়া যেতে পারে। তবে তা শয়ের কাছাকাছি এলোপাতাড়ি হুজুগে মামলা করে নয়। নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মামলা দায়ের করার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। তাহলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপের অভিযোগটি ওঠে না।

মাহফুজ আনাম তাঁর সম্পাদক জীবনের যে ভুলটির কথা স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছেন, সেটি ঘটেছে আজ থেকে কয়েক বছর আগে এবং দেশে জরুরি অবস্থা চলাকালে। এ সময় ডিজিএফআইয়ের দ্বারা যে খবরগুলো সংবাদপত্রে পাঠানো হতো তা ছাপানো ছিল বাধ্যতামূলক এবং অধিকাংশ পত্রিকাই তা ছাপতে বাধ্য হয়েছে। এই খবর বা খবরগুলো ছাপানো যদি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকে বা কোনো ষড়যন্ত্রের শামিল হয়ে থাকে, তাহলে একজন সম্পাদক নয়, আরো অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হতে হবে। একজন দীর্ঘকাল পর ভুল স্বীকার করায় তাঁর ওপর একযোগে হামলে পড়া সমর্থনযোগ্য কাজ নয়।

একটু সাহস করে আরো বলব, যাঁরা মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে এলোপাতাড়ি মামলা করেছেন, তাঁরা অনেকেই নিজেদের একটা অর্বাচীনতার প্রমাণ দিয়েছেন। মাহফুজ আনামের যে সাংবাদিকতাকে আজ তাঁরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করছেন, তা হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। হাসিনাবিরোধী এসব খবর কি বর্তমান মামলা দায়েরকারী ব্যক্তিদের চোখে তখন পড়েনি? তাঁরা অর্বাচীন নন, এ খবর যে সঠিক নয় তা তাঁরা নিশ্চয়ই তখন জানতেন। তাহলে তখন তাঁরা এই খবরের কেন প্রতিবাদ করেননি বা যেসব কাগজ এ খবর ছেপেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেননি?

ধরে নেওয়া যাক, এক-এগারোর জরুরি অবস্থা চলাকালে এ খবরের প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ ও অবকাশ ছিল না। কিন্তু এরপর সাত বছর ধরে তো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ডেইলি স্টারও আওয়ামী লীগের বিরোধিতার নীতি থেকে সরে আসেনি। এই অবস্থায় এ পত্রিকায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অসত্য খবর প্রকাশ এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে শামিল হওয়ার অভিযোগ তুলে কেন এত দিন মামলা করা হলো না? তখন এই মামলাকারীদের সাহস ও বিচক্ষণতা কোথায় লুকিয়েছিল? এখন একজন সম্পাদক স্বেচ্ছায় ভুল স্বীকার করায় তাঁর ওপর একযোগে হামলে পড়াটা কি বিচক্ষণতা? এ তো দেখছি চোর গেলে বুদ্ধি বাড়ে প্রবাদটির সত্যতা প্রমাণ করছে।

জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অসত্য খবর প্রকাশ এবং এক-এগারোর সময় মাইনাস টুর তথাকথিত সংস্কার পরিকল্পনা সমর্থন করা যদি গুরুতর অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে এই অপরাধের যারা উৎস ডিজিএফআইয়ের তত্কালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কি বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত নয়? যাঁরা এই ‘অপরাধের’ জন্য এখন পাইকারি হারে মামলা করছেন, তাঁরা কেন আসল অপরাধীদের বাদ দিয়ে অপরাধীদের আদেশ মান্যকারী কেবল একজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছেন? এটা কি সৎসাহসের পরিচয় দিচ্ছেন?

শুধু ডিজিএফআই নয়, তখন আওয়ামী লীগের ভেতরে বসে হাসিনা-নেতৃত্বকে এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে পেছন থেকে যাঁরা ছুরি মারতে চেয়েছেন, পরবর্তীকালে তো তাঁরা কেউ অতীতের ভুল বা অপরাধ স্বীকার করেননি। তা সত্ত্বেও তাঁদের অনেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে মন্ত্রিত্বও লাভ করেছেন। এ ক্ষেত্রেও মাহফুজ আনাম কি ভুল স্বীকার করেই অপরাধ করে ফেললেন?

আমি জানি, শেখ হাসিনা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। যদি বিশ্বাস করতেন, তাহলে বহুদিন আগেই তাঁর সম্পর্কে অসত্য খবর প্রকাশের চেয়েও দেশের জন্য আরো ক্ষতিকর সাংবাদিকতার জন্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো দুটি কাগজের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতেন। তিনি তা করেননি। তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার তো শুধু ডেইলি স্টার চালায়নি; আরো কোনো কোনো মিডিয়া এবং তথাকথিত সুধীসমাজের কিছুসংখ্যক চাঁইও চালিয়েছেন। বিদেশে বসে অনেকে দেশে সরকার উচ্ছেদের চেষ্টা করেছেন। বিদেশি হস্তক্ষেপ টেনে আনার চক্রান্ত করেছেন। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ করেছেন। কেউ কেউ সরকার উচ্ছেদের জন্য হেফাজতি অভ্যুত্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। এগুলো আরো বড় ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহ ও জাতিদ্রোহ। হাসিনা সরকার যদি এগুলো উপেক্ষা করতে পারে, কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করেও জনগণের সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে, তাহলে মাহফুজ আনামের আত্মস্বীকৃত ভুল বা অপরাধের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে যে ‘উইচ হান্টিং’য়ের সমতুল্য ব্যবস্থা গ্রহণে মত্ত হয়ে উঠেছে কিছু লোক, তাদের নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন। ভুল স্বীকার করার পরও একজন সম্পাদককে এভাবে হয়রানি করা তাঁকে নির্যাতন করার শামিল।

দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে অনেক বড় বড় অপরাধ আমরা নিজেরাও করছি। নিজেদের জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে। এই ভুল বা অপরাধ আমরা স্বীকার করি না এবং সংশোধনও করি না। আজ বাংলাদেশে যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার বড় অবক্ষয় চলছে সে জন্য আমরা সবাই দায়ী। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ওরে ভাই, কার নিন্দা করো তুমি। মাথা করো নত।/এ আমার এ তোমার পাপ।’ মাহফুজ আনাম যে ভুল করেছেন তার ভেতরে আমাদের সবার ভুলের প্রতিফলন রয়েছে। মাহফুজ আনামকে একা দায়ী করে বা নির্যাতন করে এ ভুলের সংশোধন করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, তিনি যেন তাঁর দলের এবং দলের বাইরেরও কিছু অতিউৎসাহী লোককে এই ‘উইচ হান্টিং’ থেকে নিবৃত্ত করার ব্যবস্থা নেন। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, মঙ্গলবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment