তৃতীয় মত

‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি’

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –
Column

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?’ এই একুশ শতকে যখন মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধির মুক্তি চরম উৎকৃষ্টতায় পৌঁছেছে, তখন দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো সেক্যুলার গণতন্ত্রের দেশেও ভ্রমটারে রোখার নামে দরোজা বন্ধ করে দিয়ে সত্য খোঁজার পথই বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। তাতে ক্ষতি হচ্ছে মানবসমাজ এবং মানব সভ্যতার। তার প্রগতির পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্ধ পশ্চাৎমুখিতা বাড়ছে। মানুষ একটা ভীতির মধ্যে বাস করছে; এই বুঝি মুক্তমনে কোনো আলোচনা করতে গেলে ধর্ম বা রাষ্ট্রের গায়ে আঘাত লাগে। ধর্ম বা রাষ্ট্রের কঠিন পীড়নে পীড়িত হতে হয়।

এই ভয়টা গত শতকেও এত ব্যাপক ছিল না। বিশেষ করে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে তো নয়ই। মানুষ রাজার বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার লাভ করেছিল। চার্চের সমালোচনা করার অধিকার অর্জন করেছিল। অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে মুক্তবিজ্ঞান চর্চা সমাজের অগ্রগতি দ্রুততর করেছিল। ধর্ম ও রাষ্ট্রের পীড়নশক্তি শিথিল হয়ে পড়েছিল এবং জ্ঞান ও বুদ্ধির মুক্তি মানবতা ও মানব সভ্যতার জন্য এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চলেছিল।

বাংলাদেশ তথা গোটা উপমহাদেশ দীর্ঘকাল ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিল। তথাপি এদেশেও ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব এবং উদার সাংস্কৃতিক রেনেসাঁমুক্ত ও আধুনিক জীবনবোধের বিস্তার ঘটিয়েছিল। ধর্মান্ধতা, রাষ্ট্রের পীড়ন তখনও ছিল। কিন্তু পাশাপাশি ছিল শক্তিশালী বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলন। রাষ্ট্রের পীড়নকে অগ্রাহ্য করার মতো জনগণের সামাজিক চেতনা ও ঐক্যের শক্তি। রাষ্ট্রও তখন এমন গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা চালিত হতো, যারা মুক্তবুদ্ধির চর্চার অধিকারকে নাগরিক অধিকারের অপরিহার্য অংশ হিসেবে সুরক্ষা দিয়েছে। অন্ধ বিশ্বাসের হাতে নির্যাতিত হতে দেয়নি। ভোট বা ক্ষমতার লোভে গণতন্ত্র তার চরিত্র নষ্ট হতে দেয়নি।

সে যুগ এখন বাসি হয়েছে। কয়েক শতক আগে ধনতন্ত্রতার প্রাথমিক বিকাশের যুগে উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের সূচনা ঘটেছিল। প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধের পরই ধর্মান্ধতা-আশ্রিত সামন্তযুগের অবসান সূচিত হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিস্তার শুরু হয়। এ ব্যবস্থায় সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমানাধিকার, মতপ্রকাশের অধিকারসহ সব নাগরিক অধিকারের স্বীকৃত দেয়া হয়। একজন ইউরোপীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী (অনেকে বলেন ভল্টেয়ার) ঘোষণা করেন, ‘আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত হতে না পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে প্রাণ দেব।’ এ ঘোষণাই ছিল বহুকাল পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভিত্তি ও শক্তি।

পশ্চিমা ধনতন্ত্রের ক্রমশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হওয়া এবং বিশ্বময় আধিপত্য বিস্তারের পর গণতন্ত্রের মূল্যবোধগুলোকে সুরক্ষা দেয়া তাদেরও স্বার্থ ও অস্তিত্বের জন্য প্রতিকূল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শুরু হয় অতি কৌশলে গণতন্ত্রেরও চরিত্র ও প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটানো। এখন গণতন্ত্রের মুখোশে উন্নত অনেক দেশেও গণতন্ত্রের যে চেহারা আমরা দেখি তা প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। ‘গণতান্ত্রিক বিশ্বের’ নেতা বলে পরিচিত যে দেশটি, সেই আমেরিকা শাসিত হয় কর্পোরেট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং ওয়ার ইন্ডাস্ট্রির মালিকদের সিন্ডিকেট দ্বারা।

পার্লামেন্ট এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। জনগণকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডান বা বাম কোনো দল পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন, সেসব প্রতিশ্রুতি তারা রাখেন না। তারা পরিচালিত হন তাদের পৃষ্ঠপোষক কর্পোরেট বাণিজ্যের ডিরেক্টর বোর্ড দ্বারা। বর্তমান বিশ্বের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের ভোট দেয়ার অধিকার আছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা নেই। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও তাদের ম্যান্ডেট মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন না।

যুদ্ধ ঘোষণা বা অপরের দেশ আক্রমণের জন্য এখন পার্লামেন্টের অনুমতি নেয়া লাগে না। গত শতকে মিথ্যা প্রচারের জন্য নাৎসি জার্মানির গোয়েবলস ক্ষমা পাননি। এ যুগে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার জার্মানির গোয়েবলসের চেয়েও জঘন্য মিথ্যা প্রচার দ্বারা ইরাকে জেনোসাইড ঘটিয়ে কোনো বিচারের সম্মুখীন হননি। গলা উঁচিয়ে এখনও তার দেশের মানুষকে শান্তি ও গণতন্ত্রের বাণী শোনাচ্ছেন। গত শতকেও এটা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এ শতকে পশ্চিমা ধনবাদী সভ্যতার চরম অবক্ষয়ের যুগে এটা সম্ভব হচ্ছে।

এ অবক্ষয় ও পতন ঠেকাতে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা বিশ্ব ধনবাদ আমেরিকার নেতৃত্বে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। যুদ্ধাস্ত্র ব্যবসায়ের ওপর এখন গোটা ধনবাদী অর্থনীতি টিকে আছে। ফলে কখনও সন্ত্রাস দমন, কখনও গণতন্ত্র রক্ষার নামে সর্বত্র যুদ্ধ ছড়াচ্ছে আমেরিকা। যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির বাজার সম্প্রসারণ তাদের লক্ষ্য। নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য রক্ষা তাদের উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্য অর্জন ও উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তারা ধর্ম ও রাষ্ট্রকে এমনভাবে ব্যবহার করছে, যাতে ধর্মের শক্তি ও রাষ্ট্রের শক্তি দুই-ই জনগণের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার বদলে আধিপত্যবাদীদের স্বার্থ ও আধিপত্য রক্ষার সহায়ক হয়।

এজন্যই অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে সামরিক বা স্বৈরাচারী শাসন প্রবর্তনে বহুকাল ধরে সহায়তা জুগিয়েছে পশ্চিমা গণতন্ত্র। জনগণকে বিভক্ত রাখা এবং বিভ্রান্ত করার কাজে ধর্মের বিকৃতি সাধন করে তাকে ব্যবহার করছে। ধর্মের নামে ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয়দানে রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করছে। বিভ্রান্ত জনগণ ধর্ম ও ধর্মান্ধতার পার্থক্য বুঝতে পারেনি। গণতন্ত্রের ছদ্মবেশের আড়ালে রাষ্ট্রের ধর্মান্ধতার চেহারাটি অনেক সময় ধরতে পারেনি। ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি দ্বারা ভয়াবহ সংঘাত বাধানো খুবই সহজ। পশ্চিমা ধনবাদ আজ সেই সংঘাত বিশ্বময় ছড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব ও আধিপত্য রক্ষার চেষ্টা করছে। একদিকে তারা বলছে মুক্তচিন্তার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা; অন্যদিকে এই স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচারী রাষ্ট্রগুলোয় তারা সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি।

আজ যে মধ্যপ্রাচ্যের রক্তাক্ত শিয়া-সুন্নি বিরোধ, তালেবান, আল কায়দা, আইএস প্রভৃতি সন্ত্রাসী শক্তির অভ্যুত্থান, তার পেছনের নিয়ামক শক্তি পচনশীল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। তারা নির্লজ্জভাবে সেকুলার ইরান ও লিবিয়া ধ্বংস করে, সেকুলার সিরিয়াকে ধ্বংস করতে চায়। অন্যদিকে স্বৈরাচারী ও ধর্মান্ধ ওয়াহাবি রাষ্ট্র সৌদি আরবকে, যে দেশে বাক-স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন, তোল্লা দেয়। ইয়েমেনে নারী শিশু হত্যাকারী সৌদি বোমা হামলায় অস্ত্র জোগায় ব্রিটেন।

ধর্মান্ধতা ও রাষ্ট্রশক্তির সমন্বয়ে কী হতে পারে তা আমরা প্রত্যক্ষ করছি পাকিস্তানে। এ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠালাভের সঙ্গে সঙ্গে দুটি স্লোগান তোলা হয়েছিল। একটি ইসলাম ইন ডেঞ্জার (ইসলাম বিপন্ন) এবং অন্যটি ইনফ্যান্ট স্টেট। এই শিশু রাষ্ট্রের সম্পর্কে কোনো কথা বলা যাবে না। জনগণকে বিভক্ত রাখা এবং তাদের অধিকার বঞ্চিত রাখার জন্যই এই দুটি স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছিল। এর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল সরকারের বিরুদ্ধে সব সমালোচনা বন্ধ করে দেয়া। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা। বিনা বিচারে ৪২ হাজার রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে, শুধু পূর্ব পাকিস্তানেই।

এই একুশে শতকে সভ্যতার অগ্রগতির চরম উৎকর্ষের দিনেও ধর্মান্ধতাকে এমন উত্তুঙ্গে তোলা হয়েছে এবং বহু দেশে ধর্মের নামে জনগণের এক বিশাল অংশকে ধর্মান্ধতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে যে, অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও এই ধর্মান্ধতাকে ভয় পায় এবং গণতন্ত্রের খোলস রক্ষা করেও এই ধর্মান্ধতার সহায়ক রাষ্ট্রশক্তির ভূমিকা নেয়। কখনও রাষ্ট্রের অবমাননা, কখনও ধর্মের অবমাননার নামে মানুষের বাক-স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করে। শুধু হরণ করেই ক্ষান্ত থাকে না, রাষ্ট্রের কঠোর পীড়ন শক্তি প্রয়োগ করে বুদ্ধির মুক্তি ও মুক্তচিন্তার বিকাশ রুদ্ধ করার জন্য।

যে রাষ্ট্র বা সরকার গণতন্ত্রের কথা বলে, সব ধর্মের সমানাধিকারের কথা বলে, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, তারা কি ধর্ম নয়, ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয়দানের জন্য, মুক্তচিন্তায় বিকাশ রোধের জন্য পীড়ক শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে? ধর্মান্ধতার সমালোচনাকে ধর্মের অবমাননা বলে গণ্য করতে পারে? রাষ্ট্রশক্তির বা সরকারের কোনো ভ্রান্ত ভূমিকার সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে আখ্যা দিয়ে নিজের নাগরিকদের শাস্তি দিতে পারে? এই প্রশ্নগুলো সম্প্রতি খুব বড় ভাবেই উঠেছে।

প্রশ্নগুলো ওঠার কারণও আছে। একদিকে ধর্মান্ধতা সন্ত্রাসী বিশ্বশক্তিতে পরিণত হওয়ার পর উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে বিশ্বের সর্বত্র ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে প্রচণ্ডভাবে। ধর্ম ও ধর্মান্ধতার পার্থক্য বুঝতে না দিয়ে সাধারণ মানুষকে রাখা হয়েছে বিভ্রান্তির ঘোরে। ধর্মান্ধতার সমালোচনা যে ধর্মের সমালোচনা নয়, এটা উন্নয়নশীল এশিয়া-আফ্রিকার মানুষকে বুঝতে দেয়া হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক বলে পরিচিত অনেক সরকারও তাই ধর্মভীরু জনগণের ভোট হারাবে এই ভয়ে ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অপারগ।

একদিকে তারা ধর্মান্ধতায় সন্ত্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে, অন্যদিকে সেই ধর্মান্ধতারই প্রশ্রয়দাতা থেকে স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার মানুষের ওপর পীড়ন চালায়। আর এই পীড়ন চালানোর জন্য কখনও রাষ্ট্রদ্রোহ এবং কখনও ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ তোলে। কোনো কোনো রাষ্ট্রের গণবিরোধী পীড়ক শক্তিও ক্ষমতায় থাকার জন্য ধর্ম ও রাষ্ট্রের কল্পিত অবমাননাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। সমাজ-প্রগতির জন্য অত্যাবশ্যক মুক্ত ও স্বাধীন চিন্তার পথ রুদ্ধ করে দেয়। সেই রুদ্ধ জানালার দেশে সত্য তার প্রবেশের খোলা পথ পায় না।

গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় সচেতন মানুষ এখন একটা প্রচণ্ড ভীতির মধ্যে বাস করছে। রাষ্ট্রের পীড়ন এবং ধর্মান্ধতার সন্ত্রাস আজ মানুষের বিবেক, বুদ্ধি-জ্ঞান ও স্বাধীন চিন্তাকে দলিত-মথিত করছে। গণতন্ত্রের নামধারী রাষ্ট্র তাকে কোনো সাহায্য জোগাতে পারছে না অথবা চাচ্ছে না। কারণ ভোট হারানোর ভয়। পশ্চিমা গণতন্ত্র যত ভালো কথাই বলুক, এখন এ গণতন্ত্র কেবল ভোটের ব্যবসা, জনগণের অধিকার ও কথা বলার স্বাধীনতা রক্ষার ব্যবস্থা নয়। যে ধর্মোন্মদনার প্রচণ্ড হুমকির মুখে আজ প্রকৃত গণতন্ত্র ও বিশ্বমানবতা কাঁপছে, তার ছায়া পড়েছে বাংলাদেশেও। কেবল সন্ত্রাস নয়, এই ভীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জনও সব দেশের মানুষের জন্যই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। – যুগান্তর

লন্ডন ২১ ফেব্রুয়ারি, রোববার ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment