তৃতীয় মত

জামায়াত কি নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে?

Jamat

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

ঢাকার একটি দৈনিকের খবর বাংলাদেশে জামায়াত আবার পুনর্গঠিত হচ্ছে, তবে নতুন নামে। দলের যেসব নেতা জেলের বাইরে আছেন, তারা জেলের ভেতরের দু’-একজন শীর্ষ নেতা ও সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন অথবা ইতিমধ্যেই নিয়েছেন বলে জানা যায়। এরকম একটি সম্ভাবনার কথা আমি বহু আগেই বলেছিলাম। এটা বলার জন্য কোনো জ্ঞানবুদ্ধি বা পাণ্ডিত্যের দরকার নেই। অতীতের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড হওয়ার সময়েই দেশে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবিটি তুঙ্গে ওঠে। সরকারও এ বিষয়ে নিজেরা কিছু না করে আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে দেবে বলে আভাস দেন। এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, জামায়াত যেহেতু নিজ নামে ও দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, সেহেতু তারা এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রার্থী দিলেও একটা নতুন দলীয় নাম ও নির্বাচনী প্রতীক তাদের দরকার হবেই। বর্তমানে তারা সে পথেই এগোচ্ছে মনে হয়।

জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জন্য যখন দেশে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি প্রবল হয়ে ওঠে, তখন জনমত এ দাবির পক্ষে জেনেও আমি এ দাবির বিরোধিতা করেছি। আমার বক্তব্য ছিল, জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ হলে হয় তারা প্রকাশ্য রাজনীতি বর্জন করে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে আরও নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত হবে; অথবা জামায়াতি আদর্শে নতুন দল গঠন করে নতুনভাবে সংগঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে তাদের সুবিধা হবে- জামায়াতের অতীতের পাপের বোঝা তাদের টানতে হবে না। জনসাধারণের সামনে নতুন নামে, নতুন পরিচয়ের ধুয়া তুলে এসে দাঁড়াতে পারবে। বিএনপির বর্তমানে যে ভগ্নদশা, তাতে তাদের ঘোষিত মিত্র না হয়েও বিএনপির ভোট ব্যাংকে জামায়াত ভাগ বসাতে পারবে।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও দেখা গেছে, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা দলকে বেআইনি করা হলে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে তাদের নাশকতামূলক কাজ অনেক বেড়েছে, অথবা নতুন নামে সংগঠিত হয়ে নতুন পরিচয়ে জনসমর্থন অর্জন করেছে। তাদের শক্তি বেড়েছে বৈ কমেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কমিউনিস্ট পার্টিকে (কমিউনিস্ট পার্টি তখন অবিভক্ত) নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলন দুর্বল না হয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছিল। কমিউনিস্ট নেতারা, মনি সিং থেকে শুরু করে শহীদুল্লা কায়সার পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিলেন। মনি সিং তো একটানা আঠারো বছর আন্ডারগ্রাউন্ডে বাস করে সমাজে কিংবদন্তির পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন।

যেসব কমিউনিস্ট নেতা ও কর্মী গ্রেফতার হননি বা আন্ডারগ্রাউন্ডে যাননি, তাদের অনেকে গণতন্ত্রী পার্টি বা এ ধরনের নামে নতুন দল গঠন করে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখেন। অনেক নেতা ও সমর্থক আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে কমিউনিস্ট পার্টির ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে তারা হক-ভাসানীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগবিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠনে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৫৭ সাল পর্যন্ত বামপন্থীদের সমর্থনেই আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে মতানৈক্যের দরুন কাগমারি সম্মেলনের পর অতীতের অনেক বাম ও কমিউনিস্ট নেতা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (অবিভক্ত) গড়ে তোলেন। এ দল এক সময় আওয়ামী লীগের মতো শক্তিশালী দল হয়ে উঠেছিল এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেছে। বর্তমানে বিভক্ত ন্যাপ দুর্বল ও অসংগঠিত, সেটা অন্য ব্যাপার। কমিউনিস্ট পার্টির উপরেও তো এখন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু দলটির সেই আগের শক্তি ও জনসমর্থন নেই।

বর্তমানে জামায়াত নিষিদ্ধ হলে নতুন নামে সংগঠিত হওয়ার কৌশল গ্রহণ করতে পারে। এটা তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরও গ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে যখন জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামসহ সব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন জামায়াতের এক দল নেতা (যারা গ্রেফতার হননি) তাদের তৎকালীন আমীর মওলানা আবদুর রহিমের নেতৃত্বে একটি নতুন দল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। দলটির নাম আমার এখন মনে নেই। সম্ভবত ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এ-জাতীয় কিছু হবে। ইসলামিক কথাটি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করবে না বলে ঘোষণা করেছিল। যেমন জার্মানিতে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আছে। কিন্তু তাদের রাজনীতি রক্ষণশীল হলেও ধর্মভিত্তিক নয়।

এরপর অবিভক্ত বাংলার জাঁদরেল মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিমকে নেতা হিসেবে সামনে খাড়া করে নিষিদ্ধ জামায়াত; মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ইত্যাদি দলের একশ্রেণীর নেতা সেক্যুলার নাম দিয়ে একটি ধর্মভিত্তিক দল গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। বলা হয়েছিল, তাদের দল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করবে না। নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে এ দলটি পরে খাড়া হতে পারেনি।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে সদ্যমুক্ত যশোর শহরে প্রথম মুজিবনগর সরকারের নেতারা জনসভা করেন। সভায় যাওয়ার আগে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, যশোরের সভাতেই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেবেন। আমি তখনও প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেবল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে কোনো লাভ হবে কিনা? তারা নতুন সেক্যুলার নাম নিয়ে রাজনীতিতে আবির্ভূত হবে। তার বদলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নয়, ধর্মভিত্তিক রাজনীতিই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা দরকার।

বিলাতে তা-ই করা হয়েছে। এ দেশে ন্যাশনাল ফ্রন্ট, ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি ইত্যাদি বর্ণবাদী দলকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু বর্ণবাদ প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাতে ব্রিটেনে বর্ণবাদ কি সম্পূর্ণ উচ্ছেদ হয়েছে? তা হয়নি। কিন্তু বর্ণবাদ প্রচার বা রাজনীতিতে বর্ণবাদ ব্যবহার কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ভারতে গান্ধী হত্যার পর হিন্দু মহাসভা দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই হিন্দু মহাসভা ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এ সেক্যুলার নামের আড়ালে নতুন দল গঠন করে এবং সেই বিজেপি এখন ভারতে ক্ষমতায় এবং প্রকাশ্যেই উগ্র হিন্দুত্ববাদী নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে বিএনপির নামটিও তো সেক্যুলার। কিন্তু তাদের রাজনীতি কি অতীতের মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নয়?

বাংলাদেশেও তাই জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইপ্সিত ফল পাওয়া যাবে না। তাদের নতুন নামে সংগঠিত হওয়ার খবরটি সঠিক হতে পারে। তাছাড়া জামায়াতের অনেক আন্ডাবাচ্চা সংগঠন আছে। যেমন জেএমবি, হিজবুত, আনসারুল্লা ইত্যাদি। এগুলোর কোনো কোনোটিকে নিষিদ্ধ করে কোনো লাভ হয়নি। তার সাম্প্রতিক প্রমাণ পঞ্চগড়ের মঠের অধ্যক্ষ যজ্ঞেশ্বর রায়ের নির্মম হত্যা। জামায়াত শুধু উগ্র মৌলবাদী ভূমিকা গ্রহণ করে দেশে সন্ত্রাসী রাজনীতির প্রবর্তন করেনি, বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায় আস্তানা গেড়ে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে এমনভাবে ধর্মান্ধতার কালচার দ্বারা প্রভাবিত করে ফেলেছে যে, তার প্রভাব থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিও এখন মুক্ত নয়। শর্ষের মধ্যেই এখন ভূত ঢুকে পড়েছে। এ ভূত নিধন করা খুবই দুঃসাধ্য।

জামায়াত তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এখন নানা কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করবে। দেশের অনেক মসজিদ-মাদ্রাসা তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। বিএনপির একটি অংশ তাদের সহায়। আওয়ামী লীগেও বহু জামায়াত নেতা ও কর্মী ঢুকে পড়েছে। প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা তাদের সমর্থকের সংখ্যা কম নয়। এখন নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেই তারা যে অস্তিত্ব হারাবে সে সম্ভাবনা খুব কম। বরং নতুন সেক্যুলার নামে আত্মপ্রকাশ করতে পারলে তারা আরও শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। ভারতে শিবসেনা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ তথা বজরং পরিবারের উত্থান দেখে অনেকে বাংলাদেশ সম্পর্কেও শংকা পোষণ করেন। তবে আমার ধারণা, বাংলাদেশে যাই ঘটুক, ভারতের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটার আশংকা কম।

কিন্তু তাই বলে এ আশংকাটি সম্পর্কে সরকার এবং গণতান্ত্রিক দলগুলো যদি অসতর্ক থাকে, তাহলে ভয়ানক ভুল করবে। জামায়াতকে তোল্লা দেয়ার বহু অশুভ শক্তি আছে দেশে ও বিদেশে। সরকার একটু সাহস করে জামায়াতকে নয়, দেশে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চর্চা নিষিদ্ধ করুক। আওয়ামী লীগসহ কোনো সেক্যুলার আদর্শের দলেও যে ধর্মান্ধতার কালচার প্রভাব বিস্তার করেছে, তা থেকে মুক্ত হওয়ার কঠোর ব্যবস্থা নিক। ধর্মের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বন্ধ করার আইন করুক। সংবিধানকে বাহাত্তরের ধর্মনিরপেক্ষতার চরিত্রে ফিরিয়ে আনুক।

এ পদক্ষেপ গ্রহণে বর্তমান হাসিনা সরকারকে যথেষ্ট সাহস দেখাতে হবে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানে এই সরকার যে সাহস দেখিয়েছে, তাতে দেশের রাজনীতিকে ধর্মান্ধতার কালচারমুক্ত করা এবং সংবিধানকে বাহাত্তরের চরিত্রে ফিরিতে আনার ব্যাপারে তাদের সাহসের অভাব হওয়ার কথা নয়। জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিষবৃক্ষের চারা রোপণ করেছে, তাকে সমূলে উচ্ছেদ করা না গেলে কেবল জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কোনো লাভ হবে না।

আমার ধারণা, জামায়াত নিষিদ্ধ ঘোষিত হোক বা না হোক, বর্তমান অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য তারা নতুন নামে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করবে। এমনকি একটি সেক্যুলার নাম গ্রহণ করে বিরোধী দল হিসেবে বিএনপিকে কোণঠাসা করে তারাই প্রধান বিরোধী দল হওয়ার চেষ্টা চালাবে। বিএনপি তখন তাদের সঙ্গে থাকতে চাইলে হয়তো জুনিয়র পার্টনার হয়ে থাকতে হবে।

জামায়াত এখন নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে। অধিকাংশ সিনিয়র নেতাই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডিত। নতুন দল হিসেবে জামায়াত আত্মপ্রকাশ করতে চাইলে কী ধরনের নতুন নেতৃত্ব এ দলে উঠে আসবে তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে সৌদি ও পাকিস্তানি-কানেকশন তাদের থাকবেই। সরকার ও দেশের গণতান্ত্রিক দলগুলো এ সম্পর্কে সতর্ক থাকুক। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে কীভাবে দেশের গোটা রাজনীতি থেকে জামায়াতকে উচ্ছেদ করা যায়, তার সঠিক কর্মপন্থার কথা ভাবুক। – যুগান্তর

লন্ডন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, রোববার

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment