কালের আয়নায়

কুলদীপ নায়ারের বঙ্গ দর্শন

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

Column

কুলদীপ নায়ার ভারতের একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সারা উপমহাদেশেই তার পাঠকের ছড়াছড়ি। তিনি একজন কূটনীতিবিদও। কংগ্রেস এবং কংগ্রেস বিরোধী দিল্লির দুই সরকারের আমলেই তিনি ফায়দা লুটেছেন। কংগ্রেসের শাস্ত্রী সরকারের আমলে তিনি ছিলেন প্রধান শাস্ত্রীর একান্ত সচিব অথবা প্রেস সচিব। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধবিরতি চুক্তির সময় লালবাহাদুর শাস্ত্রী যখন রাশিয়ার তাসখন্দে মারা যান, তখন কুলদীপ নায়ারও তার সঙ্গে তাসখন্দে ছিলেন। আবার কংগ্রেস বিরোধী মোরারজি দেশাইয়ের সরকার যখন দিল্লিতে ক্ষমতায় আসীন, তখন ওই সরকার নায়ারকে ব্রিটেনে ভারতের রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগ দিয়েছিল।

পাকিস্তানে সামরিক ও অসামরিক দুই ধরনের সরকারের সঙ্গেই তার মাখামাখি। পাকিস্তানের পত্রিকাতেও কলাম লেখেন। তিনি ভারতের বিজেপির বিরুদ্ধে না হলেও তাদের হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু কংগ্রেসের ইন্দিরা সরকার থেকে মনমোহন-সোনিয়ার সরকার পর্যন্ত সব সরকারের কট্টর সমালোচক। কংগ্রেস গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থক হলেও তার টানটা কংগ্রেসের দিকে নয়। তিনি কংগ্রেস ও বিজেপিকে প্রায় একই দাঁড়িপাল্লায় রেখে ওজন করেন।

তবে একটা ব্যাপারে কুলদীপ নায়ারের লেখায় কনসিসটেন্সি দেখা যায়। সেটা হলো, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম থেকেই তিনি আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর সরকারের সমালোচনা করে আসছেন। এখন এই সমালোচনা হাসিনা সরকারের ঘাড়ে বর্তেছে।

আমাকে দিল্লির সাংবাদিক বন্ধুদের কেউ কেউ বলেছেন, কুলদীপ নায়ারের মনে যে ইন্দিরা-ফোবিয়া রয়েছে, সেটাই পরে মুজিব-ফোবিয়া ও হাসিনা-ফোবিয়ায় পরিণত হয়। কারণ, ইন্দিরা গান্ধীর সরকারই বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য জুগিয়ে ছিল।

আমি কুলদীপ নায়ারের লেখার ভক্ত পাঠক নই। কিন্তু হাতের কাছে তার লেখা পেলেই পড়ি এবং লেখা পড়তে পড়তে ভাবি, কী করে ভারতের একজন অত্যন্ত প্রবীণ ও বহুদর্শী কলামিস্ট বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে অবসেসনে ভুগতে পারেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী পক্ষ যে কথাগুলো রটায় সে কথাগুলোকে নিরপেক্ষতার মোড়কে মুড়ে নিজের কলামে সাজাতে পারেন? বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমি তার লেখায় এই প্রবণতাটা লক্ষ্য করি।

সত্তরের দশকে বাংলাদেশ যখন সবে স্বাধীন হয়েছে, তখন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন কাজে দেশ পরিচালনায় অনভিজ্ঞ প্রথম সরকারের অনেক স্বাভাবিক ভুলত্রুটি ছিল। এই ভুলত্রুটিগুলোকে ফরাসি দার্শনিক আন্দ্রে মালরো (ঢাকা সফরে এসে) পর্যন্ত সহানুভূতির চোখে দেখেছেন। কিন্তু কুলদীপ নায়ার দেখেননি। সরেজমিন বাংলাদেশের অবস্থা দেখা ও বোঝার আগেই তিনি মুজিব সরকারের তিল পরিমাণ ত্রুটিকেও তাল বানিয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু করেন। তার তখনকার সব যুক্তিতর্কের সূত্র ছিল ঢাকার ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘হলিডে’ পত্রিকা।

এই পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত এনায়েতুল্লাহ খান কট্টর আওয়ামী লীগ বিরোধী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ওই পত্রিকাটি তখন কেবল সরকারের ভুলত্রুটি আবিষ্কারে ব্যস্ত ছিল। তখন বাংলাদেশ সম্পর্কে লেখার ব্যাপারে নায়ারের একমাত্র যোগসূত্র ছিল হলিডে পত্রিকা। তার প্রত্যেক লেখায় থাকত হলিডে এবং এনায়েতুল্লাহ খানের লেখার উদ্ধৃতি। বর্তমানে এনায়েতুল্লাহ খান বেঁচে নেই। কুলদীপ নায়ারও তার ঢাকার যোগসূত্র বদল করেছেন। এখন তার নতুন যোগসূত্র ঢাকার দুটি ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকা। তাদেরও আওয়ামী লীগ ও হাসিনা-ফোবিয়া সুবিদিত এবং ইংরেজি দৈনিকটির সম্পাদক প্রয়াত এনায়েতুল্লাহ খানেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সম্ভবত তার সাংবাদিকতারও একজন উত্তরসূরি। কুলদীপ নায়ার এখন ঢাকার এই দুটি কাগজের কাঁধে ভর করেছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সম্পর্কে কুলদীপ নায়ারের একটি লেখা প্রকাশ হয়েছে ভারতের কাগজে। তার মূল ইংরেজি লেখাটি পড়ার সুযোগ আমার হয়নি। কিন্তু তার বাংলা অনুবাদ পড়ার সুযোগ হয়েছে কলকাতার বাংলা দৈনিক স্টেটসম্যান পত্রিকায়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার লেখাটি দৈনিক স্টেটসম্যানে বেরিয়েছে। লেখাটির শিরোনাম- ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপ্লবী আবেগ হারিয়েছে বাংলাদেশ, দেশের ভাগ্য এখন দুই বেগমের হাতে’। এই লেখায় বাংলাদেশের দুই বেগমের নয়, এক বেগমের (শেখ হাসিনার) যে চরিত্র তিনি তুলে ধরেছেন, সেটি বিএনপি ও জামায়াতের স্থূল প্রচারণা এবং দেশের একটি তথাকথিত সুশীল সমাজ ও তাদের দুটি পত্রিকার সূক্ষ্ম প্রচারণা।

দীর্ঘদিন ধরেই দেশের মানুষ ও বহির্বিশ্বের কাছে হাসিনা সরকারের ক্রেডিবিলিটি নষ্ট করার জন্য এই প্রচারণাটি চালানো হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর এই প্রচারণাটি স্তিমিত হয়েছিল। এখন পরিস্থিতি একটু বদল হতেই এবং আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন জয়ী হতে পারেন- এই সম্ভাবনা সামনে রেখে বাংলাদেশে হাসিনা বিরোধী সম্মিলিত চক্রটি আবার নড়েচড়ে উঠেছে বলে অনেকে মনে করেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক সংক্রান্ত বিরোধে হিলারি ড. ইউনূসের পক্ষে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়েছিলেন এবং শেখ হাসিনা সম্পর্কে তার মনোভাব ভালো নয় বলে বাজারে একটা গুজব রটেছে। হিলারি হোয়াইট হাউসে ঢুকলে হাসিনা সরকারের অনুকূলে অবস্থান নেবেন না- এই আশায় ঢাকায় সরকার বিরোধী চক্রগুলো এবং ঝিমিয়ে পড়া সুশীল সমাজও নবআশায় উদ্দীপ্ত হয়েছে বলে মনে হয়।

শুধু দেশেই ঢাকার বেইলি রোডে নতুন কাশিমবাজার কুঠিতে আবার প্রাণের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, তা নয়; বিদেশেও তারা সরকার বিরোধী নানা বার্তা পাঠাচ্ছেন। ভারতের দৈনিকে কুলদীপ নায়ার শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে যে কঠোর সমালোচনা করেছেন, তার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কমিশনের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে। প্রায় একই সময়ে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে এই তোপ দাগানো দেখে মনে হয়, এর পেছনে একটা কনসার্টেড অ্যাফোর্ড আছে এবং তার উদ্দেশ্য অভিন্ন। উদ্দেশ্যটি হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করা।

দৈনিক স্টেটসম্যানে প্রকাশিত কুলদীপ নায়ারের প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপ্লবী আবেগ বাংলাদেশ হারিয়েছে। আরও খারাপ ব্যাপার হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠেছেন। … হাসিনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একটা সন্ধি করে নিয়েছেন। এই বাহিনীই একদা তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। হাসিনা সামরিক বাহিনীর লোকজনের বেতন বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তারা যদি পেশাদারি মনোভাব নিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে থাকে, তাহলে তারা সমীহ ও কর্তৃত্বের অধিকারী হবে। বস্তুত এখন সামরিক বাহিনী পেশাদারই হয়ে উঠেছে এবং একটা শক্তি হিসেবে গণ্য হচ্ছে।’

কুলদীপ নায়ার এখানেই তার বক্তব্য শেষ করেননি। বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে মনে হয় না। যদি হয় তাও আগাম বলে দেওয়া যায়, শেখ হাসিনা পরাজিত হবেন না। তবে হাসিনা ও খালেদা উভয়ের সম্পর্কেই জনগণের মোহভঙ্গ ঘটেছে।’ কুলদীপ নায়ারের এই প্রবন্ধটি পাঠ করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, তিনি তথাকথিত সুশীল সমাজ ও ইউনূস শিবিরের সেই পুরনো মাইনাস টু থিওরির যুক্তিগুলো আবার তুলে ধরেছেন এবং হয়তো আশা করছেন, তার এই যুক্তি বাংলাদেশের মানুষকে আবার প্রভাবিত করবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কমিশন তাদের প্রতিবেদনে হাসিনা সরকারকে একটি ফ্যাসিবাদী সরকার হিসেবে চিত্রিত করেছে। এই প্রতিবেদনটি পাঠ করলে মনে হবে, আমরা হয়তো গত শতকের সালাজারের পর্তুগাল বা পিনোচেটের চিলি সম্পর্কে একটি ভয়ানক রিপোর্টের কথা জানছি। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে হত্যা, সন্ত্রাস, গুম, খুন নিত্যদিনের ব্যাপার। বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ লুপ্ত। জনগণ ত্রাসের রাজত্বে বাস করছে। আর এই হত্যা, সন্ত্রাস ও গুম-খুনের জন্য সরকার দায়ী।

দেশে ও বিদেশে এই যে মিথ্যার ঢক্কানিনাদ, এর আসল বাজনাদাররা বাংলাদেশেই বসে আছেন। ভারতে নরেন্দ্রনাথ মোদির নির্বাচন বিজয়ের পর তারা বড় আশায় বুক বেঁধেছিলেন, মোদিই বুঝি তাদের হয়ে ঢাকার ক্ষমতার ওলটপালট ঘটাবেন। তাদের আশা পূর্ণ করেননি মোদি। বরং হাসিনা সরকারের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এটাও কুলদীপ নায়ারের একটা ক্ষোভের কারণ।

এবার হোয়াইট হাউস দখলের যুদ্ধে হিলারি যদি জয়ীও হন, তাহলে ঢাকার কাশিমবাজার কুঠির নায়কদের আশা পূর্ণ হবে কি? মনে হয় না। হিলারি হোয়াইট হাউসে বসতে পারলে নরেন্দ্রনাথ মোদির মতোই পাল্টে যাবেন বলে অনেক মার্কিন পর্যবেক্ষকের ধারণা। তখন তাকে গোটা আমেরিকার স্বার্থ ও ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে। ঢাকার ইউনূস-শিবির ও সুশীল সমাজ নিয়ে তার ভাবনাচিন্তার সময় থাকবে কোথায়? দেখা যাবে প্রেসিডেন্ট হিলারিই হয়তো বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনার বড় বন্ধু হয়ে উঠেছেন।

তবু দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার, বিশেষ করে শেখ হাসিনার যে স্বৈরতন্ত্রী চেহারা তুলে ধরার চেষ্টা চলছে, তা যে কত বড় মিথ্যা; তাদের দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার। বাংলাদেশ সরকার এ সম্পর্কে অবহিত হোক। কুলদীপ নায়ার এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কমিশন বর্তমান বাংলাদেশ সম্পর্কে যে অভিযোগগুলো তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত গুরুতর। এই অভিযোগগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে আগামী সপ্তাহে বিশদভাবে আলোচনার ইচ্ছা রইল। – সমকাল

(শেষাংশ আগামী শনিবার)

লন্ডন, ৪ মার্চ শুক্রবার, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment