কালের আয়নায়

কুলদীপ নায়ারের বঙ্গ দর্শন-২

Column

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বামুনের কাঁধের কচি পাঁঠাকে কুকুর শাবক প্রমাণ করে উপকথার চার ঠগ যেমন পাঁঠাটি দখল করার চেষ্টা করেছিল, তেমনি বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম ধরে রাখার জন্য কঠোর সংগ্রামরত শেখ হাসিনাকে স্বৈরতন্ত্রী প্রমাণ করে বাংলাদেশে যারা প্রকৃত স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় চক্রান্তে রত, ভারতে বসে কুলদীপ নায়ারের মতো প্রখ্যাত বর্ষীয়ান কলামিস্ট কেন তাদেরই সহায়তাদানে রত এটা বুঝতে আমার কষ্ট হয়।

প্রোপাগান্ডার জোরে কী না হয়। তা না হলে আমেরিকার যে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ জুনিয়র তার দেশের নিকৃষ্টতম প্রেসিডেন্ট বলে এখন বিশ্বময় পরিচিত এবং হিটলারের চেয়েও যে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ তিনি বিশ্বে সৃষ্টি করে গেছেন, তার মুখে কী করে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে হিটলার বলা শোভা পায়? আর ব্রিটেনের যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এখন গোয়েবলসের চেয়েও বড় মিথ্যাবাদী বলে প্রমাণিত, তিনি কী করে বিচার ও শাস্তি এড়িয়ে বিশ্ববাসীর সামনে এখনও নিজের কৃতকর্মের সাফাই গান?

বাংলাদেশেও যে শেখ হাসিনা দেশে সামরিক শাসনের অবসান ও গণতন্ত্র ধরে রাখার জন্য ৩০ বছর ধরে সংগ্রাম করছেন, ১৪ বার গ্রেনেড হামলাসহ তার জীবন নাশের ভয়াবহ হামলার সম্মুখীন হয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচার করেছেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের দ্বারা জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন, ঢাকার একটি সুশীল সমাজ এবং তাদের বিদেশি মুখপাত্র কুলদীপ নায়ারের মতে, তিনি হলেন স্বৈরতন্ত্রী। আর যে খালেদা জিয়া ক্যান্টনমেন্টে বসে তার সরকার চালিয়েছেন, যার আমলে দেশের সবক’টি বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও বুদ্ধিজীবী হত্যা হয়েছে, যার অকালকুষ্মাণ্ড সন্তান হাওয়া ভবন প্রতিষ্ঠা করে দেশে হত্যা, সন্ত্রাস, লুটপাটের ইতিহাস তৈরি করে এখন বিদেশে ফেরার, তিনি হলেন কুলদীপ নায়ার ও তার ঢাকাইয়া বন্ধুদের মতে শেখ হাসিনার ‘স্বৈরতন্ত্রী রাজনীতির ভিকটিম’। এটা তো বামুনের পাঁঠার বাচ্চাকে কুকুরশাবক প্রমাণ করার চেয়েও বড় ঠগামি।

কলকাতার দৈনিক স্টেটসম্যানে ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রকাশিত কুলদীপ নায়ারের প্রবন্ধটির শিরোনামেই বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের বিপ্লবী আবেগ হারিয়েছে।’ এটা গোটা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নায়ারের ঢালাও অভিযোগ। তিনি বর্ষীয়ান কলামিস্ট। কিন্তু সুবিধামতো ভুলে গেছেন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, মধ্যপ্রাচ্যের একটি মধ্যযুগীয় ওয়াহাবি রাজতন্ত্র ও পাকিস্তানের সামরিক জান্তার সম্মিলিত চক্রান্তে পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং ‘৭১-এর পরাজিত স্বাধীনতার শত্রুদের ক্ষমতায় বসানো হয়। এই স্বাধীনতার শত্রুরা ক্ষমতায় বসেই মুক্তিযুদ্ধের সব মূল্যবোধ ও আবেগ জনমন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার জন্য অভিযান শুরু করে।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এই আবেগ বাংলার মানুষের মন থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। কুলদীপ নায়ার সেই আবেগ দেখতে পাচ্ছেন না। কারণ বাংলাদেশে পঁচাত্তরে যে গণবিরোধী শক্তির অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তিনি তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থক একটি তথাকথিত সুশীল সমাজ ও তার দুটি মুখপত্রের অন্ধ বন্ধুত্ব দ্বারা প্রভাবিত। তিনি তাদের চর্বিত কথাই নিজের প্রবন্ধে চর্বণ করেন।

বাংলাদেশের মানুষ যদি সত্য সত্যই মুক্তিযুদ্ধের আবেগ হারাত, তাহলে এত দেশি-বিদেশি বিরুদ্ধ প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রের মুখে শেখ হাসিনার পক্ষে ক্ষমতায় ফিরে আসা এবং একটানা দু’দফা ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হতো না। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভোটারবিহীন জালিয়াতির নির্বাচন অনুষ্ঠান দ্বারা খালেদা জিয়ার পক্ষে তো ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। ২০১৪ সালে হাসিনার আমলের নির্বাচনটি যদি অনুরূপ নির্বাচন হতো, তাহলে হাসিনার পক্ষেও ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হতো কি? জনগণের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তাই কি এই নির্বাচনের পক্ষে তাদের অনুমোদনের বড় প্রমাণ নয়?

২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশ গ্রহণে বিএনপিকে বাধা দেওয়া হয়নি। তারা অবাস্তব দাবি তুলে নিজেরাই নির্বাচনে আসেনি। তাতে যদি নির্বাচনটি অবৈধ হয়ে যায়, তাহলে আফ্রিকার জিম্বাবুয়েকে (সাবেক রোডেশিয়া) স্বাধীনতা দানের প্রাক্কালে ব্রিটিশ সরকার যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছিল, তাতে প্রধান বিরোধী দলের নেতা রবার্ট মুগাবেকে (বর্তমান প্রেসিডেন্ট) তার দলসহ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি এবং তারাও অংশ গ্রহণ করেনি। তারপরও সেই নির্বাচনকে বৈধ ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার কেমন করে তাদের পছন্দের নেতা বিশপ মুজারেওয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল? কুলদীপ নায়ার এসব ইতিহাস জানেন। কিন্তু যে লোক জেগে ঘুমান, তাকে জাগাবে কে?

কুলদীপ নায়ার বাংলাদেশ সম্পর্কে অযথা মাথা না ঘামিয়ে নিজের দেশের কথা ভাবুন। প্রায় ৭০ বছর আগে ভারত স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন বারবার ব্যাহত হয়েছে। বন্দুকের জোরে গণতন্ত্র উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু ভারতে তা কখনও হয়নি। ৭০ বছর পর গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক ভারত কী করে তার চরিত্র এবং গান্ধী-নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের আবেগ হারায়? কী করে ভারতের এক বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জঘন্য হিন্দুত্ববাদী সংঘ পরিবারের প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে বিজেপিকে কেন্দ্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হতে দেয়?

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। তবু তারা মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িকতার আবেগ হারায়নি। হারালে তারা ভারতের মতো বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জামায়াতকে ক্ষমতায় আনত। বাংলাদেশে এই জামায়াতের ভোট ছয় কি সাত শতাংশের বেশি নয়। সম্ভবত এখন তাও নেই। বিএনপির সমর্থন এখনও আছে। ভোটবাক্স এখনও অক্ষত আছে কি? তাই বলছি, কুলদীপ নায়ার সাহেবরা নিজের দেশ নিয়ে মাথা ঘামান। বাংলাদেশ নিয়ে তাদের ভাবতে হবে না। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সাময়িকভাবে হলেও স্বাধীনতা আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক আবেগ হারিয়েছে, উগ্র হিন্দুত্ববাদের জোয়ারে ভেসে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ পেট্রোল বোমায় পুড়ে মরেছে, শিশু মায়ের কোলে আগুনে দগ্ধ হয়ে মরেছে। কিন্তু তালেবান, আল কায়দা, জামায়াত, হেফাজতকে দেশে মাথা তুলতে দেয়নি।

কুলদীপ নায়ারের মতে, শেখ হাসিনা স্বৈরতন্ত্রী। এই স্বৈরতন্ত্রের সংজ্ঞাটা নায়ার সাহেবের কাছে জানতে ইচ্ছা করে। পাকিস্তানে আমরা স্বৈরতন্ত্র দেখেছি। তারা হাত মিলিয়েছিল ধর্মান্ধ মৌলবাদ ও অসৎ নব্যধনীদের সঙ্গে। দেশে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিয়েছিল গণঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য। বাংলাদেশে স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদ একই কাজ করেছেন। তারা দেশের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে পর্যন্ত হত্যা করেছেন। জেনারেল এরশাদ তো ক্ষমতায় থাকাকালে সরকারি মদদে হিন্দু বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও বাধিয়েছিলেন।

ফ্যাসিস্ট জার্মানি ও ইতালিতে সরকারের ব্লাক শার্ট ও ব্রাউন শার্ট নামধারী গুপ্তঘাতক বাহিনী দেশময় খুন, জখম, ধর্ষণ ইত্যাদি অবাধে চালাত। বাংলাদেশেও এই খুন, জখম, ধর্ষণ ইত্যাদি আছে। কিন্তু তা সরকার বা সরকারের কোনো গুপ্ত সংস্থা চালায় না; চালায় জামায়াত, শিবির এবং তাদের ধর্মান্ধ উগ্র হিংসাশ্রয়ী উপদলগুলো, যেমন জেএমবি, হুজি, হরকত প্রভৃতি। হাসিনা সরকার এই সন্ত্রাস দমনের জন্য অবিরাম চেষ্টায় রত এবং ভারতের চেয়েও অনেকটা সফল। অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষেও রয়েছে এই সরকারের ঘোষিত অবস্থান। তারপরও শেখ হাসিনাকে কী করে কুলদীপ নায়ার স্বৈরতন্ত্রী আখ্যা দেন? বাংলাদেশে যে খুন, হত্যা, ধর্ষণ চলছে তা যে উগ্র ধর্মান্ধ দলগুলোর কাজ তা সবাই জানে। কুলদীপ নায়ার লিখতে পারতেন, এই সন্ত্রাস দমনে হাসিনা সরকার এখনও সর্বতোভাবে সফল হয়নি। তাই বলে এই সন্ত্রাসের দায়দায়িত্ব তিনি কী করে এই সন্ত্রাস দমনে রত একটি সরকারের ঘাড়ে চাপান? ভারতে মাওবাদী সন্ত্রাস এখনও চলছে। এই সন্ত্রাসের দায়দায়িত্বও কি ভারত সরকারের? কুলদীপ নায়ার কেন তার ঢাকাইয়া বন্ধুদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে আগ্রহী?

কুলদীপ নায়ারের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, ‘যে সামরিক বাহিনী শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, তিনি সেই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একটা সন্ধি করে নিয়েছেন। তিনি সামরিক বাহিনীর লোকজনের বেতন বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং সামরিক বাহিনীকে এ কথা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তারা যদি রাজনীতি থেকে দূরে থাকে এবং পেশাদার সেনাবাহিনী হয়, তাহলে তারা আরও কর্তৃত্ব ও জনগণের সমীহের অধিকারী হবে। বস্তুত বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এখন পেশাদার হয়ে উঠেছে এবং শক্তিশালী বলে গণ্য হচ্ছে।’

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, উপরের কথাগুলো লিখে কুলদীপ নায়ার শেখ হাসিনার সমালোচনা করলেন, না প্রশংসা করলেন। প্রথম কথা, শেখ হাসিনা যদি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কোনো সন্ধি করে থাকেন, তাহলেও বঙ্গবন্ধুর কিলার সামরিক বাহিনীর লোকজনের সঙ্গে তিনি আপস করেননি। তাদের তিনি বিচারের পর চরম দণ্ড দিয়েছেন। এটা কি বিরাট সাফল্য নয়? দ্বিতীয় কথা, তিনি যদি সামরিক বাহিনীকে এ কথা বোঝাতে সক্ষম হয়ে থাকেন যে, রাজনীতিতে তাদের নাক গলানো উচিত নয়, বরং পেশাদার শক্তিশালী বাহিনী হওয়া উচিত এবং তারা সে কথা মেনে নিয়ে থাকে, তাহলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাসিনার সন্ধি করার দরকারটা কী?

পাকিস্তানে যেখানে মার্কিন সেনাদের পাহারা এবং সমর্থন থাকা সত্ত্বেও নওয়াজ শরিফের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার সামরিক বাহিনীর আজ্ঞা মেনে চলছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে ডিঙিয়ে সেনাপ্রধান তার পদ ও ক্ষমতার দাপট দেখান, সেখানে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছেড়ে পেশাদার সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিতে শেখ হাসিনা যে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছেন, এটা কি সারা দক্ষিণ এশিয়াতেই তার এক বিরাট সাফল্য নয়? তিনি তো পাকিস্তান বা থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতাদের মতো সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেননি, ক্ষমতার পার্টনার করেননি। এ কথাটা কুলদীপ নায়ারই বলছেন। তাহলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সন্ধির কথাটা আসে কোথা থেকে? সেই সন্ধির শর্তগুলো কী? খালেদা জিয়ার মতো ক্যান্টনমেন্টে বসে সেনা পাহারায় ও সেনা পরামর্শে দেশ চালানোর চেয়ে শেখ হাসিনার গণভবনে বসে একটি নির্বাচিত সংসদ নিয়ে দেশ চালানো কি অনেক বেশি গণতান্ত্রিক নয়?

আমরা চাই বা না চাই, এটা আজ একটি বড় বাস্তবতা যে, উন্নয়নশীল বহু দেশেই সশস্ত্র বাহিনী এখন একটি রাজনৈতিক শক্তি। এমনকি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও। ষাটের দশকেই আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার স্বীকার করেছিলেন, ‘তার দেশ একটি অদৃশ্য সরকার (invisible government) দ্বারা চালিত হচ্ছে।’ কথাটা তিনি ব্যাখ্যা করে না বললেও কারও বুঝতে বাকি থাকেনি, তিনি ওয়ালস্ট্রিট ও পেন্টাগনের মিলিত ক্ষমতার দিকেই ইঙ্গিত করছেন।

এখন যে কমিউনিস্ট শাসন পদ্ধতি, তাতেও লাল ফৌজের একটা গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে। গত শতকে ক্রুশ্চেভকে ক্ষমতা থেকে হটানোর জন্য সেনাপ্রধান মার্শাল জুকভ চেষ্টা করেছিলেন। প্রথম চেষ্টায় তিনি ব্যর্থ হন। কিন্তু কিছুকাল পরেই ক্রুশ্চেভকে ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য করা সম্ভব হয়। জানা যায়, এর পেছনে রুশ লাল ফৌজের সমর নেতাদের অনেকের বড় ভূমিকা ছিল।

পাকিস্তানে এবং তুরস্কে উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসাররা শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতার সিংহভাগ দখল করা নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প প্রতিষ্ঠানেও তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশে অতীতের একদল সেনা কর্মকর্তা পাকিস্তানের অনুকরণে দেশের বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্যে অনুপ্রবিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেছেন। বাজারে জোর গুজব, তারেক রহমান হাওয়া ভবনে অধিষ্ঠিত হয়ে একশ্রেণীর সেনা কর্মকর্তার ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাগ বসাতে গিয়েই নিজের পতন টেনে আনেন। এই গুজবের সত্য-মিথ্যা কখনও যাচাই করে দেখার সময় হয়নি। আমেরিকা তাঁবেদার দেশগুলোকে সামরিক সাহায্যের নামে যে বিশাল অর্থ দেয়, সেই অর্থে সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি ক্ষমতাশালী প্রিভিলেজড ক্লাস গড়ে ওঠে। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে গণতন্ত্রের নামে এই প্রিভিলেজড ক্লাসই দেশ শাসন করছে।

এই অবস্থার পরিবর্তন কোনো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশেও সহজ নয়। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার কৃতিত্ব, তিনি দেশটিতে পাকিস্তান বা কোরিয়া ও তাইওয়ানের অবস্থার উদ্ভব ঘটতে দেননি। বরং সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক ভূমিকা ত্যাগে ও পেশাদারিত্বে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত করতে অনেকটাই সফল হয়েছেন। আবার ভবিষ্যতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ঠেকাতে কঠোর আইনও করেছেন। এ জন্য আমাদের সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমমূলক ভূমিকাকে অভিনন্দনও জানাতে হয়। গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই হাসিনা সরকারের এই সাফল্যের তুলনা বিরল; কিন্তু কুলদীপ নায়ার এর মধ্যে ‘সন্ধির’ গন্ধ আবিষ্কার করেছেন।

ভারতের সঙ্গে যে বাংলাদেশের সম্পর্ক যথেষ্ট উন্নত হয়েছে এবং দু’দেশের মধ্যে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান হয়েছে, সে জন্য কুলদীপ নায়ার খুশি নন। তিনি নির্লজ্জের মতো লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনার বড় শক্তি হলো দিল্লি। দিল্লি তার বাক্সে সব ডিম ভরে দিয়েছে।’ তিনি এ ব্যাপারে বিএনপির প্রচারণাকে সমর্থন জানিয়ে লিখেছেন, ‘হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করে ভারত তার ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে।’ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা সেই বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমল থেকেই শুরু হয়েছে। দু’দেশের জনগণের স্বার্থেই এটা দরকার। বিএনপি দীর্ঘকাল ধরে এটা হতে দেয়নি। বরং ভারতবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে প্রক্সি ওয়ারও চালিয়েছে।

শেখ হাসিনার কৃতিত্ব, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও ভারতের সঙ্গে বহু কাঙ্ক্ষিত এই সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। গঙ্গার পানি বিরোধ থেকে স্থল সীমান্ত সমস্যা পর্যন্ত বহু বিরোধের অবসান ঘটিয়েছেন। দু’দেশেরই সম্পর্ক ও সহযোগিতার ভিত্তি উভয় দেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। কুলদীপ নায়ার কি চান, গণতান্ত্রিক ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে মৈত্রী প্রতিষ্ঠা না করে বাংলাদেশ ধর্মান্ধতা ও সামরিক জান্তা দ্বারা প্রভাবিত পাকিস্তানের সঙ্গে অতীতের ক্ষতিকর সম্পর্ক রক্ষা করুক এবং উপমহাদেশে সন্ত্রাস ও অশান্তি জিইয়ে রাখার জন্য পাকিস্তানের শাসকদের অবিরাম চেষ্টার শরিক হয়ে থাকুক? নায়ার সাহেব কাদের স্বার্থে বাংলাদেশ ও হাসিনা সরকার বিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছেন, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কোনো কারণ আছে কি?

‘বাংলাদেশে আর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না’ বলে কুলদীপ নায়ার মন্তব্য করেছেন। এটা বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে একটি সুশীল সমাজেরও প্রচারণা। এই প্রচারণায় গলা মিলিয়ে কুলদীপ নায়ার আসলে কাদের লোক, সেটা আরও স্পষ্টভাবে সবাইকে জানিয়ে দিলেন। আমার চেয়ে তিনি বয়সে বড় এবং তার জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য বেশি। তবু তাকে সবিনয়ে স্মরণ করিয়ে দিই, তার বয়সটা বানপ্রস্থে যাওয়ার বয়স। এ বয়সে পরের ঢাক পেটানো তার মতো মানুষের পক্ষে উচিত নয়।  – সমকাল

লন্ডন, ১০ মার্চ বৃহস্পতিবার, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment