বরকলে ভুয়া সেনা কর্মকর্তাসহ ১৬ জনকে জেল হাজতে প্রেরণ

রাঙ্গামাটি রিপোর্ট –

Barkal 2

রাঙ্গামাটির বরকলে বিজিবি কর্তৃক আটক এক ভুয়া সেনা কর্মকর্তা ও ৩ বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সরকারি গোপন আইনে থানায় মামলা দায়েরের পর শনিবার তাদের আদালতে তোলা হয়েছে।

চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে আটককৃতদের হাজির করে পুলিশ ৫ দিনের রিমান্ড চাইলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন কবিরের আদালত রোববার মামলার পরবর্তী দিন নির্ধারণ করে আটককৃতদের জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

আটকৃতরা হলেন, রাঙ্গামাটির রাজবন বিহারের শান্তপ্রিয় স্থবির (৩৮), গ্রীমানন্দ ভিক্ষু (৩৫), বুদ্ধ জ্যোতি শ্রমণ (২০), ভূয়া সেনা কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী বিভাষ দেওয়ান(২১), পিতা- বিনয় কৃঞ্চ দেওয়ান, মাতা-কণিকা দেওয়ান, রাঙ্গামাটির বিজন স্মরণী, রিটেন চাকমা (২২), পিতা – নীহার বিন্দু চাকমা, মাতা -ঊষাদেবী চাকমা, পিটিআই রাঙ্গামাটি, সুনীতি বিকাশ চাকমা (২৩), পিতা – জগৎ চন্দ্র চাকমা, মাতা -কালাচোগি চাকমা, তংতুল্লে বন্দুক ভাঙ্গা, রাঙ্গামাটি, রিপেন চাকমা (২২), পিতা – নয়ন বিকাশ চাকমা, উত্তর সার্বোতুলি বাঘাইছড়ি, রাঙ্গামাটি, রিগেন চাকমা (১৮), পিতা-সুরেন ময় চাকমা, নানিয়ারচর রাঙ্গামাটি, ছন্দসেন চাকমা (৩৯), পিতা -প্রতাপ চন্দ্র চাকমা, রাজদ্বীপ, রাঙ্গামাটি সদর, মুক্তবীর চাকমা (২২), পিতা – প্রদীপ কুমার চাকমা. ছোট্ট কাট্টলী, লংগদু, রাঙ্গামাটি, রুহিত চাকমা (২১), পিতা-নীহার বিন্দু চাকমা বনরূপা, রাঙ্গামাটি সদর ও জ্যাকসন চাকমা (২০) পিতা – দেবরঞ্জন চাকমা, কলেজ গেইট, রাঙ্গামাটি।

বিজিবি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার ১২ জনের একটি দল রাঙ্গামাটির বরকল সদরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় এসএস টিলায় (ফালিট্যাঙা চুগ) বেড়াতে যান। দলের মধ্যে বিভাষ দেওয়ান নামে একজন সেখানকার বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডারের কাছে নিজেকে একজন সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট পরিচয় দেন। এতে বিজিবি ক্যাম্পে তাদেরকে বেশ আপ্যায়নও করা হয়। পরে পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসার সময় তাদের গতিবিধি ও আচরণ সন্দেহজনক হলে বিজিবি’র বরকল জোনে বিষয়টি অবহিত করা হয়। এতে যাওয়ার পথে গিরিছড়া নামক ক্যাম্পে বিজিবির সদস্যরা তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সেনা কর্মকর্তার পরিচয় ভুয়া নিশ্চিত হলে ১২ জনকে আটক করে গত শুক্রবার রাতে বরকল পুলিশের কাছে সোপর্দ করে বিজিবি।

আটকের পর বরকল বিজিবি জোনে নিয়ে গিয়ে তাদের ব্যাগে তল্লাশী চালিয়ে ১৯টি মোবাইল সেট, ৩টি ক্যামেরা, ১টি ক্যামেরার ল্যান্সসহ বিভাষ দেওয়ানের কাছ থেকে ১টি সেনাবাহিনীর পোশাক ও সেকেন্ড ল্যাফটেন্যান্টের ১টি পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। বরকল বিজিবি জোনে একদিন একরাত জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদেরকে শুক্রবার রাতে বরকল মডেল থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে বিজিবি।

এদিকে, জিজ্ঞাসাবাদে ভুয়া সেনা কর্মকর্তা বিভাষ দেওয়ানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার রাতে র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার একটি বাড়ীতে অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করে। এরা হলেন, জ্ঞান লাল চাকমা (২১), পিতা – বিন্দু কুমার চাকমা, হাজাছড়া,বালুখালী, সুহেল চাকমা (২৩), পিতা- অজিত কুমার চাকমা, চুরাখালী, বাঘাইছড়ি, রিটেন চাকমা (২২), পিতা – আনন্দ কুমার চাকমা, সার্বোতুলি, বাঘাইছড়ি, স্মৃতি বিকাশ চাকমা, পিতা – নীহার কান্তি চাকমা, হুমুরো আদরকছড়া, বাঘাইছড়ি, রাঙ্গামাটি। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি সেনা পোশাকও উদ্ধার করা হয়।

তাদেরকে শনিবার রাঙ্গামাটির কোতোয়ালী থানায় সোর্পদ করে র‍্যাব। আটকৃত ১৬ জনের বিরুদ্ধে বরকল থানায় সরকারি গোপন আইনের ১৯২৩ -এর ৬ -এর১(ক)/৯ এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫এর ১(ক) ধারা-১৪১/১৭১ দণ্ডবিধিতে মামলা রুজু করা হয়েছে।

বিজিবি’র বরকল জোনের জোন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল মোঃ আলাউদ্দিন আল মামুন জানান, আটককৃতরা বরকল সদরের শীর্ষ পাহাড় এসএস টিলায় (ফালিট্যাংঙা চুগ) যায়। তাদের মধ্য থেকে একজন সেনাবাহিনীর ল্যাফটেন্যান্ট পরিচয় দেয়। কথাবার্তায় সন্দেহ হলে তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে বিজিবির পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

আটক ভুয়া সেনা কর্মকর্তা বিভাষ দেওয়ান ও তার সঙ্গী ৩ বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সরকারি গোপন আইনে বরকল থানায় মামলা দায়ের করার পর শনিবার তাদের আদালতে তোলা হয়। চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে আটককৃতদের হাজির করে পুলিশ ৫ দিনের রিমান্ড চাইলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন কবিরের আদালত রোববার মামলার পরবর্তী দিন নির্ধারণ করে আটককৃতদের জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন বলে বরকল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নীলু কান্তি বড়ুয়া জানান।

কে এই বিভাষ দেওয়ান –

barkal

গত বৃহস্পতিবার বরকলে যে ১২ জনকে আটক করা হয় তার মধ্যে অন্যতম বিভাষ দেওয়ান। বাড়ি রাঙ্গামাটি শহরের উত্তর কালিন্দীপুর বিজন সারণী এলাকায়। বিভাষ দেওয়ান সব সময় নিজেকে সেনাবাহিনীর অফিসার পরিচয় দিয়ে বেড়াতো। নিজেকে কখনও সেনাবাহিনীর সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট, কখনও লেফট্যানেন্ট পরিচয় দিতো। এলাকার মানুষ বিভাষের সেনা পদবী না জানলেও তাকে সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে জানে।

তার পোশাক, চুল কাটার ধরণ, চলন বলন সবই ছিল সেনা অফিসারের মত। সময় সুযোগে সে সেনা পোশাক পড়তো।

গত বৃহস্পতিবার বিজিবির হাতে আটকের পর বিভাষের সাথে থাকা ১১ জন ছাড়াও স্থানীয়দের আত্মবিশ্বাস ছিল বিভাষ দেওয়ান নিজের ক্ষমতাবলে নিজেকেসহ বাকী ১১ জনকে বিজিবি-র হাত থেকে ছাড়িয়ে আনবে। কিন্তু বিজিবি অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয় বিভাষ সেনা অফিসার নয়। সে এতদিন সেনাবাহিনীর নাম ব্যবহার করে মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলোর তথ্যমতে বিভাষ নিজেকে সেনা অফিসার পরিচয় দিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করত। রাঙ্গামাটি শহরের বিভাষের বাড়িতে তল্লাশী করে ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে। তার ব্যবহৃত ক্যামরাসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পাওয়া গেছে। তার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুসারে জানা যায় বিভাষের পিতার নাম ডা. বিনয় কৃঞ্চ দেওয়ান। তিনি চাকুরী থেকে অবসরে গেছেন। বিজিবির হাতে আটক বিভাষ দেওয়ান পিতা মাতার পালিত সন্তান। সে চট্টগ্রামের পড়াশুনা করে। এইচএসসি পাস করার পর থেকে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট পরিচয় দিয়ে বেড়াতো। একদিকে বাইরে পড়াশুনা অন্যদিকে সেনাবাহিনীর পরিচয় সবকিছু মিলে স্থানীয়রা সত্যিই মনে করতেন বিভাষ আসলে সেনাবাহিনীতে চাকুরী করে।

মোবাইলে বিভাষের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলে বিভাষ আসলে সেনাবাহিনী চাকুরী করে কিনা তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তার মা কনিকা দেওয়ান বলেন, বিভাষ পরীক্ষার খারাপের পর মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। সে অনেকদিন ধরে চাকুরী খুঁজছিল। আসলে সে সেনাবাহিনীর চাকুরী করে কিনা সেটিও আমার জানা নেই। তার পছন্দ ছিল সেনাবাহিনীতে চাকুরী করা।

উল্লেখ্য গত বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে তাদের আটক করা হয়। এর আগে আটক ১২জনের দলটি বরকলের শীর্ষ পাহাড় ফালিটাঙ্যা মোন নামে পরিচিত পাহাড়ে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তাঁদের দলের বিভাষ দেওয়ান ফালিটাঙ্যা মোনের বিজিবি ক্যাম্পে গিয়ে নিজেকে সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট পরিচয় দেয়। এই পরিচয়ের কারণে বিজিবির সদস্যরা সেখানে যত সাধ্য তাঁদের আপ্যায়ন করেন। তবে ভূয়া সেনা কর্মকর্তার কথাবার্তায় সন্দেহ হয়ে বরকলের বিজিবিকে খবর দেন।

১২ জনের দলটি পাহাড় থেকে নেমে আসলে বরকল সদরের বিজিবি চেকপোষ্ট এলাকাটি তাঁরা বিচ্ছিন্নভাবে পার হচ্ছিলেন। এতে বিজিবির আরো সন্দেহ বাড়ে। তাছাড়া যিনি নিজেকে সেনা অফিসার পরিচয় দিয়েছিলেন সংশিষ্ট দপ্তরে খবর নিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এজন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে বিভাষ দেওয়ানের কাছ থেকে সেনাবাহিনীর একটি পোশাক পাওয়া গেছে। এছাড়া তাদের কাছ থেকে একাধিক ক্যামেরাও পাওয়া গেছে। যা বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment