সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন আতিউর রহমান

অনলাইন ডেস্ক –

Bankসংগৃহীত ছবি

রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় মাথা উঁচু করে বীরের বেশে নৈতিক দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর ড. আতিউর রহমান।

তিনি দাবি করেছেন, তার (ড. আতিউর) পদত্যাগপত্র তুলে দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চোখ দিয়ে পানি পড়েছে।

মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় রাজধানীর গুলশানে গভর্নরের সরকারি বাসায় অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

এর আগে বেলা সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ড. আতিউর।

তিনি বলেন, ‘আমি তৃপ্তির সঙ্গে, বীরের বেশে মাথা উঁচু করে চলে যাচ্ছি। আমি চাইনি আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে কোনো বিতর্ক হোক, আমি চাইনি বাংলাদেশের কোনো ভাবমূর্তির সমস্যা হোক, আমি চাইনি আমার প্রধানমন্ত্রীর কোনো বিতর্ক হোক; সেজন্যে আমি স্বেচ্ছায়, মোর‌্যাল রেসপন্সিবিলিটি নিয়ে আমি পদত্যাগ করেছি।’

‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন। তার হাতেই আমি পদত্যাগপত্র দিয়েছি। তার চোখ দিয়ে পানি পড়েছে। তিনি বলেছেন – বাংলাদেশে এমন সংস্কৃতি নেই’ যোগ করেন বিদায়ী গভর্নর।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ থেকে জালিয়াতি করে সুইফট কোডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গোপন রাখা নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বিতর্কের জের ধরে পদত্যাগ করে সরে যেতে হয় ড. আতিউরকে।

পদত্যাগের প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের সামনে আসেন তিনি। এতে রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে নিজের অবদানের কথা তুলে ধরেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ড. আতিউর বলেন, ‘আমি চাই- যারা এ ঘটনার সঙ্গে দেশে কিংবা বিদেশে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হোক এবং সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হোক। আমার ধারণা, সেটা করতে তদন্ত হচ্ছে এবং সেই ব্যবস্থা হবে।’

এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে খুবই কৃতজ্ঞ, আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। আমাকে তিনি এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনি আমাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন, ২৮ বছর যাবত আমি তার সঙ্গে কাজ করছি। আমি তার গাইডেন্স নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক চালিয়েছি।’

এ সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সাত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক কোথা থেকে কোথায় এসেছে রিপোর্টার হিসেবে আপনারা দেখেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি কোথা থেকে কোথায় এসেছে আপনারা সকলই জানেন। প্রধানমন্ত্রীর এরকম নিরঙ্কুশ সমর্থন না পেলে আমি এ কাজগুলো করতে পারতাম না।’

ড. আতিউর বলেন, ‘আমি খুবই কৃতজ্ঞ এই কারণে যে, আমি যখন চলে যাচ্ছি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরশিপ থেকে, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। এ বছর অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় দ্রুততম দেশ হবে বলে সকল মহল থেকে বলা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি এমন সময়ে যাচ্ছি যখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৮ বিলিয়নের ওপরে আছে। আমি যখন জয়েন করেছিলাম, তখন রিজার্ভ সাড়ে ৬ বিলিয়নের মতো ছিল। আমি যখন যাচ্ছি তখন এই মাসে এই প্রথম মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। আমি যখন যাচ্ছি তখন টাকা অত্যন্ত শক্তিশালী আছে।’

বিদায়ী গভর্নর আরও বলেন, ‘আমি যখন যাচ্ছি তখন দেখতে পাচ্ছি প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের কোনো না কোনোভাবে ব্যাংকিং সেবা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।’

দেশের গরিব মানুষকে ব্যাংকিং খাতে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে নতুন ধারার কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা চেপে রাখার ব্যাখ্যা দেন ড. আতিউর। তিনি বলেন, ‘এটা এমন এক এ্যাটাক, এটা সাইবার এ্যাটাক। সাইবার এ্যাটাকটা কোত্থেকে এসেছে, কেমন করে এসেছে, আমরা এখনও পুরোপুরি জানি না। এখন তদন্ত হচ্ছে। তবে এইটুকু বুঝা যাচ্ছে- এটা একটা হাইটেক সাইবার এ্যাটাক। যেটা অনেকটা আমাদের টেরোরিস্ট এ্যাটাকের মতো একটা ঘটনা।’

বিদায়ী গভর্নর বলেন, ‘এটা কোন দিক থেকে আসছে, কেমন করে আসেছে আমরা প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি। আমরা খানিকটা বিহ্বল ছিলাম যে, এটা কী হচ্ছে, কোত্থেকে হচ্ছে। মনে রাখতে হবে- এ্যাটাক এমন এক সময়ে এসেছে, যখন এটিএমের ওপর এ্যাটাক এসেছে। আবার তারপরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর এ্যাটাক এসেছে।’

সব মিলিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝবার চেষ্টা করছিলাম। সেই কারণে বিদেশ থেকে এক্সপার্ট নিয়ে এসেছি, র‌্যাবকে ডেকেছি, এনএসআইকে ডেকেছি, তারা সকলে মিলে চেষ্টা করছে যে, ঘটনাটা কোথায় থেকে ঘটল।’

তবে ঘটনা বোঝার আগে রিজার্ভের অর্থ নিরাপদ করতে চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন বাংলাদশে ব্যাংকের পদত্যাগী গভর্নর। তিনি বলেন, ‘আগে আমাকে সাবধান হতে হয়েছে যে, যে কয়টা টাকা আমার আছে, এটার মধ্যে যেন কোনো হাত দিতে না পারে। সে জন্য তাড়াতাড়ি আমি বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করেছি, যাতে করে আগে ব্যাংকটাকে নিরাপদ করি, সেন্ট্রাল ব্যাংকটাকে নিরাপদ করি। যে টাকা বের হয়ে গেছে সেই টাকা ফেরত আনার চেষ্টা করি এবং সেজন্য ফেরত আনতে গিয়ে আমাদের একটা সময় লেগেছে।’

আতিউর বলেন, ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক আপনারা জানেন, এটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট একটা প্রতিষ্ঠান। তার নিজস্ব কিছু প্রটোকল আছে। এক সেন্ট্রাল ব্যাংকের সঙ্গে আরেক সেন্ট্রাল ব্যাংকের এমইউ আছে। ফলে এগুলো সেইফ রুলস এবং আমরা রুলসের মধ্যেই কাজ করি।’

তিনি বলেন, ‘কাজ করে আমরা যখন পরিস্থিতি খানিকটা নিয়ন্ত্রণে এনেছি যখন বুঝতে পেরেছি টাকাগুলো ফেরত আসবে, বাকিগুলো এসে গেছে আসবে এবং আমরা যাদের সঙ্গে ব্যবসা করি, তাদের সঙ্গে আমরা নতুন করে প্রটোকল সাইন করেছি, তখন আমরা জানিয়েছি সরকারকে।’

তিনি বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীকে আমি লিখিত দিয়েছি, প্রধানমন্ত্রীকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি। আমরা প্রতিনিয়িত র‌্যাব ও এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি।’

বাংলাদেশের রিজার্ভের অর্থের নিরাপত্তায় নিজের উদ্যোগের পক্ষেও সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন বিদায়ী গভর্নর। তিনি বলেন, ‘এখন আমি মনে করি যে, যে ধরনের ওয়েলফেয়ার নীতি স্থাপন করতে পেরেছি বাংলাদেশ ব্যাংকে এবং ভবিষ্যতে যে কাজগুলো করব বলে আমি পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলাম, আমার উত্তরসূরি সে কাজগুলো করবেন বলে আশা করছি।’

অর্থ পাচারের ঘটনায় বিতর্ক হলেও এর মধ্যে ইতিবাচক দিক আছে বলেও মন্তব্য করেন ড. আতিউর। তিনি বলেন, ‘আমি বলবো- যেই ঘটনার জন্য আজকে এত বিতর্ক হয়েছে, সেখানে অনেকগুলো ইতিবাচক দিক আছে, আমরা সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে চাই।’

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment