কালের আয়নায়

ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগ এবং একটি আশঙ্কা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

BB

বার্নার্ড শ একবার একটা চমৎকার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অতি ভালো হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক’ (It is too dangerous to be too good)। কথাটা অনেক সৎ ও সজ্জন ব্যক্তি সম্পর্কেই সঠিক হতে দেখা গেছে। ভালো মানুষ হয়েও তাদের গ্রিক ট্র্যাজেডির হিরোর ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। কথাটা আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য পদত্যাগী গভর্নর ড. আতিউর রহমান সম্পর্কেও সত্য বলে মনে করি। তার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘গভর্নরের পদত্যাগ সাহসের দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ লোপাট নিয়ে সমালোচনার মধ্যে পদত্যাগ করে তিনি সৎ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। এই পদত্যাগ নৈতিক বল ও সৎ সাহসের বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের সঙ্গে আমি কেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ সহমত পোষণ করবেন। তার সম্পর্কে দেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিশিষ্টজনের অভিমতই তার প্রমাণ। কিছু মুষ্টিমেয় লোক তার বিরূপ সমালোচনাও করেছেন। তাদের মধ্যে সাবেক গভর্নরের অনুগ্রহভোগী একজন রাজনীতিকও রয়েছেন। তিনি ‘উপকারীরে বাঘে খায়’ কথাটা সত্য প্রমাণ করেছেন। আতিউর রহমান সম্পর্কে বিএনপি ও জামায়াতি নেতা ও কাগজগুলোর নিন্দা আমি গণনার মধ্যে ধরি না। সদ্য পদত্যাগী গভর্নরের দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবিচল নিষ্ঠা সকলের কাছে সুবিদিত। সুতরাং তা বিএনপি ও জামায়াতের নেতা ও মুখপত্রগুলোর গাত্রদাহের অবশ্যই কারণ হবে।

ড. আতিউর রহমান যখন বয়সে খুবই তরুণ এবং লন্ডনে অধ্যয়ন করেন তখন থেকেই তাকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনি। লন্ডনে তার সঙ্গে কিছুদিন একসঙ্গে সাংবাদিকতাও করেছি। তিনি নিজেকে ভূমিপুত্র বলেন। কথাটা সর্বাংশে সত্য। দারিদ্র্য ও সর্বপ্রকার সামাজিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কেবল অদম্য মনোবল, পরিশ্রম ও সততার জোরে তিনি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার শীর্ষপদে উঠে আসতে পেরেছিলেন।

২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয়ের অধিকারী হয়ে যখন শেখ হাসিনা তুলনামূলকভাবে খুবই তরুণ বয়সী ড. আতিউর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে বসান, তখন আমার মনেও সন্দেহ ছিল, পারবেন কি এই তরুণ গভর্নর দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অবস্থা দূর করে তাকে গতিশীল করে তুলতে এবং ব্যাংকিংয়ের সেবাকে নিম্ন আয়ের মানুষ, এমনকি একেবারে কৃষকের দুয়ারে পর্যন্ত পৌঁছে দিতে? আমার মতো অনেকের মনেই এই সন্দেহ ছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তিনি আমাদের মন থেকে এই সন্দেহটি দূর করেন এবং প্রমাণিত হয় শেখ হাসিনা যোগ্য লোক বাছাই করতে জানেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তার সাফল্য একটি নয়, অনেক। দেশে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির তিনি লাগাম টেনে ধরে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বহুগুণ বাড়িয়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেন। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে কৃষকবান্ধব করেছেন। টাকার মূল্যমান স্থিতিশীল রেখেছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়েছেন। এক কথায় হাসিনা সরকারের জাদুকরী অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার ভূমিকাটি উল্লেখযোগ্য। অনেকেই স্বীকার করেন, ড. আতিউর রহমান সুদের হার কমিয়ে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তার সাফল্য যখন সর্বজনস্বীকৃত এবং সেরা এশিয়ান গভর্নর হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিকভাবেও সম্মানিত সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮১ মিলিয়ন বা আট কোটি ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে লোপাট হওয়ার ঘটনায় তার পদত্যাগ শুধু দুঃখজনক নয়, দেশের জন্য ক্ষতিকরও। দেখেশুনে মনে হয়, তিনি গ্রিক ট্র্র্যাজেডির হিরোদের মতোই- কোনো সুনিপুণ চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এই চক্রান্তটি কাদের? এই চক্রান্তকারীরা কি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে এবং বাইরে এবং সরকারের শীর্ষ মহলেও রয়েছে? এই প্রশ্নের জবাব আজ না হোক কাল একদিন পাওয়া যাবেই। এ জন্য অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করা দরকার।

এই রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গভর্নর কোনোভাবে দায়ী তা তার অতি বড় সমালোচকরাও বলেন না। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, ঘটনাটি ঘটার পর দীর্ঘ সময় তিনি তা সরকারকে জানাননি। কেন জানাননি এটাই প্রশ্ন। এই ব্যাপারে আমার নিজের ধারণা এবং ব্যক্তিগতভাবে উচ্চমহলে অনুসন্ধান করে যা জেনেছি তা এখানে উল্লেখ করতে চাই। সাবেক গভর্নর ঘটনাটি জানার পর প্রধানমন্ত্রীকে তার আভাস দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি। তার আশা ছিল ব্যাপারটি জানাজানি হওয়ার আগেই এই চুরির অর্থ সবটা না হলেও সিংহভাগ ফেরত আনতে পারবেন। আগে জানাজানি হলে লোপাট অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তাছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে তার একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মহল আছেন। যারা এই চুরিকে মূলধন করে গভর্নরকে আরও বিব্রত করার জন্য উঠেপড়ে লাগতে পারেন।

বস্তুত এই লোপাট অর্থের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাক খবর ছেপেছে, অধিকাংশ অর্থই উদ্ধার করা সম্ভব হবে। এই একটি সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই সাবেক গভর্নর সম্ভবত তার একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করেছেন। সেটি হলো চুরির ঘটনাটি তিনি সঙ্গে সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে জানাননি। অর্থ উদ্ধারের পর জানাবেন ভেবেছিলেন। এটি হয়তো একটি ভুল সিদ্ধান্ত, কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু সরকারেরই কোনো কোনো মহল থেকে এমনভাবে প্রচারণা চালানো হলো, যেন সাবেক গভর্নর একটা বড় ধরনের অপরাধ করেছেন।

রিজার্ভ চুরির ঘটনা সাবেক গভর্নর ঠেকাতে পারেননি এটাও তার অপরাধ নয়। তার অনেক বড় বড় সাফল্যের মধ্যে একটি ব্যর্থতা। এই ধরনের অর্থ হ্যাকিং বা অর্থ চুরি অধুনা ইউরোপ-আমেরিকায় অহরহ ঘটছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এই হ্যাকিং বন্ধ করার ব্যাপারে বড় বড় পশ্চিমা ব্যাংক হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই বৈজ্ঞানিক চুরির শিকার হয়েছে। তথাপি ড. আতিউর রহমান নীতি-জ্ঞানের পরিচয় দিয়ে পদত্যাগ করেছেন। তার এই আত্মমর্যাদাবোধ ও সাহসিকতার জন্য আমিও তাকে অভিনন্দন জানাই। তবে তার এই পদত্যাগে সরকারের শীর্ষ মহলের যারা আনন্দ লুকিয়ে রাখতে পারছেন না, তাদের উচিত ছিল সাবেক গভর্নরকে তার মেয়াদ শেষ করে সম্মানের সঙ্গে বিদায় গ্রহণ করতে দেওয়া। আর চার মাস পরই তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এই চার মাস এই মহলটি ধৈর্য ধরতে পারেননি।

আমি জানি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ড. আতিউর রহমানের সাহসী ও স্বাধীন ভূমিকার জন্য সরকারের একটি ক্ষমতাশালী মহল তাকে গভর্নর পদ থেকে সরানোর জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তারাও বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছেন। নানা চক্রান্তের মুখে ড. আতিউর যে গভর্নর পদে এতকাল থাকতে পেরেছেন এবং স্বাধীনভাবে নানা পদক্ষেপ নিতে পেরেছেন তার কারণ ছিল সাবেক গভর্নরের পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অকুণ্ঠ সমর্থন। রিজার্ভ চুরির ঘটনার পরও সাবেক গভর্নরের প্রতি শেখ হাসিনার এই সমর্থন ও আস্থা যে অটুট আছে, পদত্যাগী গভর্নর সম্পর্কে তার মন্তব্যই তার প্রমাণ।

আমার বিস্ময় লাগে, আট কোটি ডলার হ্যাকিংয়ের ঘটনায় সরকারের ভেতরের যে শীর্ষ মহলটি এত উদ্বেগ প্রকাশ করে নানা ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন, তারা কিন্তু দেশে ভয়াবহ শেয়ারবাজারের ধস, হলমার্ক, ডেসটিনি, বেসিক ব্যাংকের বিশাল অর্থ কেলেঙ্কারিকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাননি। এই ব্যাপারে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে তাদের কেউ পদত্যাগ করেননি; বরং উল্টো মন্তব্য করেছেন, ‘লোপাট হওয়া আড়াই হাজার কোটি টাকা আবার টাকা নাকি?’

আমার ধারণা, ড. আতিউর রহমানের বড় অপরাধ, তার দেশপ্রেম এবং দেশের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে অনমনীয় ভূমিকা। বিশ্বব্যাংক যখন দুর্নীতির অসত্য ধুয়ো তুলে বাংলাদেশের পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নে অসম্মতি জানায় এবং সরকারের শীর্ষস্থানীয় কোনো ব্যক্তি বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন অসম্ভব; তখন এ সাবেক গভর্নরই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে সমর্থন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের নিজস্ব অর্থায়নেই এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে এ অর্থায়নে প্রস্তুত।’

সাবেক গভর্নরের এ ভূমিকাও দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল এবং বিশ্বব্যাংকের অনুগত একটি মহলকে অসন্তুষ্ট করেছিল। তার বিরুদ্ধে তাই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ জোট গড়ে উঠতে দেরি হয়নি। এ জোটই এখন তার সমালোচনায় মুখর এবং তার পদত্যাগে আনন্দিত। এ পদত্যাগটি বড় কথা নয়। ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন এবং একদিন থাকবেন না। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু তাকে এমন সময়ে এবং এমনভাবে পদত্যাগ করতে হলো যা হাসিনা সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে আমার আশঙ্কা এবং সরকারের শত্রুপক্ষেরও এটাই লক্ষ্য।

অতীতে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য একই ধরনের চক্রান্ত হয়েছিল। দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে এত অর্থ ব্যয় হয়েছিল যে, এক সময় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিপজ্জনকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। এ সময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। হঠাৎ বাজারে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে কমে গেছে, তাজউদ্দীন আহমদ তা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের কাছে গোপন রেখেছিলেন, তাকে জানতে দেননি। তার উদ্দেশ্য ছিল, দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা থেকে সরানো।

বঙ্গবন্ধু কি এই রটনা বিশ্বাস করেছিলেন? আমার জানা মতে, করেননি। তথাপি এই রটনার পর তাজউদ্দীন আহমদ বেশিদিন অর্থমন্ত্রী পদে থাকতে পারেননি। পদত্যাগ করেছিলেন। তাতে অবশ্যই বঙ্গবন্ধু সরকারের ক্ষতি হয়েছিল এবং সেই সরকারের শত্রুপক্ষ উল্লসিত হয়েছিল।

অতীতের এ ঘটনাকে স্মরণে রেখে হাসিনা সরকার সতর্ক থাকবেন এবং ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগকে পুঁজি করে বর্তমান সরকারের শত্রুপক্ষ এবং বিশেষ করে স্বাধীনতার শত্রুরা যাতে নতুন করে ঘোট পাকাতে না পারে, সরকার সেদিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখবেন বলেই আমার আশা। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করাই এখন হাসিনা সরকারের বিরোধী জোট ও জোটগুলোর লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু বাইরের এই শত্রু নয়, তার সরকারের ভেতরের শত্রু (enemy within) সম্পর্কেও সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন, এটা আমার একান্ত প্রত্যাশা। – সমকাল

লন্ডন, ১৮ মার্চ, শুক্রবার ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment