ঢাকায় দু’দিন ব্যাপী জাতীয় আদিবাসী নারী সম্মেলন শুরু

ডেস্ক রিপোর্ট –

Women

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নারীদের অধিকার বাস্তবায়ন করতে হলে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)।

তিনি বলেন নারী অধিকার বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও নারী অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন করতে হবে। নারী মুক্তি আন্দোলন হচ্ছে রাজনৈতিক আন্দোলন। তাই আদিবাসী নারীদের রাজনৈতিক আন্দোলনে সামিল হতে হবে। নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে বর্তমানে দেশে বিষয় ভিত্তিক আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু কেবল বিষয় ভিত্তিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নারী মুক্তি সংগ্রাম আন্দোলনকে যথাযথভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। সেজন্য বিষয় ভিত্তিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলনেও জোরালোভাবে নারীদের অংশ গ্রহণ করতে হবে।

শনিবার রাজধানী ঢাকায় দু’দিন ব্যাপী তৃতীয় জাতীয় আদিবাসী নারী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সন্তু লারমা এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক-এর সমন্বয়কারী ফাল্গুনী ত্রিপুরার স্বাক্ষরিত এক প্রেস বার্তায় বলা হয়, ‘আদিবাসী নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে আসুন’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে রাজধানীর আসাদগেট সংলগ্ন সিবিসিবি মিলনায়তনে দু’দিন ব্যাপী তৃতীয় জাতীয় আদিবাসী নারী সম্মেলন মোমবাতি প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করেন  বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম।

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক ও কাপেং ফাউন্ডেশন -এর যৌথ উদ্যোগে এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর আর্থিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক মিনু ম্রং-এর সভাপতিত্বে সম্মেলনে  বিশেষ অতিথি ছিলেন চাকমা সার্কেলের চাকমা রাণী য়েন য়েন, ইকনমিক সিকিউরিটি এন্ড রাইটস, ইউএন ওমেন-এর প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর তপতী সাহা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কোর্ডিনেটর ওয়াসিউর রহমান তন্ময়, , আদিবাসী নারী পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের যুগ্ম আহ্বায়ক বাসন্তী মুর্মু । স্বাগত বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক-এর যুগ্ম আহ্বায়ক ও কাপেং ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারপার্সন চৈতালী ত্রিপুরা।  অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা।

উদ্বোধনী অধিবেশনের পর বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের গত দুই বছরের কার্যক্রম তুলে ধরেন নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফাল্গুনী ত্রিপুরা। এরপর পার্বত্য চট্টগ্রাম, উত্তরবঙ্গ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম উপকূল এবং ঢাকা অঞ্চলের আদিবাসী নারী প্রতিনিধিরা তাদের স্ব-স্ব অঞ্চলের নারীদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন তুলে ধরেন।

দু’দিন ব্যাপী সম্মেলনে পাহাড়, সমতল এবং ঢাকায় অবস্থানরত চাকমা, সাঁওতাল, মারমা, ত্রিপুরা, উরাও, রাখাইন, গারো, হাজং, খাসি, পাহাড়িয়া, রবিদাস, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, মাহাতো, বর্মন, খিয়াং, মুন্ডা, চাকসহ বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর প্রায় দু’শতাধিক আদিবাসী নারী  অংশ গ্রহণ করেছেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সন্তু লারমা আরও বলেন, রাষ্ট্র এদেশের আদিবাসীদের বাঙালি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। যার মধ্য দিয়ে এ দেশ যে বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ সেটি অস্বীকার ও আদিবাসীদের আত্মপরিচয়কে নস্যাৎ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। মুক্তিযুদ্ধসহ এদেশের সকল আন্দোলন সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণ থাকলেও রাষ্ট্র এখনো নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এজন্য তিনি আদিবাসী নারীসহ সকল নারীকে একাত্ম হয়ে তাদের অধিকার আন্দোলনকে আরো জোরদার করার আহ্বান জানান। পুরুষদেরও নারীদের পাশে গিয়ে দাড়ানোসহ নারী অধিকার আন্দোলনে সামিল হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

সম্মেলনের উদ্বোধক আয়েশা খানম বলেন, বাংলাদেশের নারী আন্দোলন এবং নারী অধিকার কখনই পূর্ণতা পাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আদিবাসী নারীদের সম্পৃক্ততা থাকবে না ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে না। তিনি বাজেটে আদিবাসী নারীদের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখারও প্রস্তাব জানান।

তিনি আরও বলেন, আদিবাসী নারীদেরকে যেমন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে যুদ্ধ করতে হয়, তেমনি নিজেদের সমাজেও যুদ্ধ করতে হয়ে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আদিবাসী নারীদের অধিকার আন্দোলনের সাথে সবসময় আছে এবং থাকবে। আদিবাসী নারী, বাঙালি নারী সেতুবন্ধন রচনা করে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনকে বেগবান করার আহ্বান জানিয়ে তিনি সকল নারীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই সম্মেলন থেকে আদিবাসী নারীদের অধিকারের প্রশ্নে যে সুপারিশগুলো উঠে আসবে তা মহিলা পরিষদ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তাদের মূল আন্দোলনের সাথে অবশ্যই যুক্ত করবে।

চাকমা রানী য়েন য়েন বলেন, আদিবাসী নারীরা দুইভাবে নির্যাতিত। একটি হচ্ছে তারা জাতিগত নিপীড়ণের শিকার ও দ্বিতীয়তঃ নারী হিসেবে তারা অন্য নারীদের তুলনায় বেশী নির্যাতিত। বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থায় আমাদের যেমন লড়াই করে অধিকার আদায় করতে হয় তেমনি নিজেদের সমাজেও যেসব প্রতিবন্ধকতা ও বৈষম্যগুলো রয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধেও লড়াই করে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। তবে আশার কথা হলো প্রথাগত শাসন ব্যবস্থায় কার্বারী বা হেডম্যান হিসেবে দিনদিন আদিবাসী নারীদের সংখ্যা বাড়ছে।

তপতী সাহা বলেন, জাতিসংঘ নারীদের জন্য বিশেষ করে আদিবাসী নারীদের অধিকারের জন্য সর্বদা সচেষ্ট। তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর পাশে গিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।

সম্মেলনে অনুষ্ঠিতব্য বিভিন্ন অধিবেশনে আরও যোগ দেয়ার কথা রয়েছে চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বাংলাদেশ আদিবাসী  ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা, কাপেং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন রবীন্দ্রনাথ সরেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সোমা দে, আচিক মিচিক সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সুলেখা ম্রং প্রমুখ।

আগামীকাল রোববার আদিবাসী নারী অধিকারের ঘোষণাপত্র পাঠের মধ্য দিয়ে দু’দিন ব্যাপী এই সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটবে বলে প্রেস বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment