কালের আয়নায়

স্বাধীনতা কি কেবল টাকায় ছবি বদল?

AGC 2

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় কুড়ি বছর পরের কথা বলছি। বরিশাল শহর থেকে বেশ কিছু দূরে রহমতপুরে একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম। বরিশালের স্কুলে ছাত্র থাকাকালে রহমতপুরে প্রায়ই যেতাম। তখন যে বাম ছাত্র সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত ছিলাম, তার একটা বড় ঘাঁটি ছিল রহমতপুরে। প্রয়াত সাংবাদিক নির্মল সেন তখন ছাত্রনেতা। তার সঙ্গে এই রহমতপুরে যেতাম। তারপর দীর্ঘকাল বরিশালে যাইনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার বছর কুড়ি পর বরিশালে যেতেই খবর পেলাম, রহমতপুরে আমার পুরনো বন্ধু-বান্ধবের কেউ কেউ এখনও বসবাস করছেন।

তাদের একজনের আমন্ত্রণেই রহমতপুরে গিয়েছিলাম। সেখানেই ৯০ বছরের বৃদ্ধ প্রাথমিক শিক্ষক আসগর মাস্টারের সাক্ষাৎ পাই। আমি স্কুলছাত্র থাকাকালে যখন রহমতপুরে যেতাম, তখন আসগর মাস্টার বুড়ো হননি। পরনে লুঙ্গি, গায়ে একটা পাঞ্জাবি, মাথায় গোল টুপি, বেত হাতে ছাত্র পড়াতেন। আমরা ছাত্র জীবনেই রাজনীতি করি জেনে খুব একটা পছন্দ করতেন না। কিন্তু কাছে গেলে আদর করে বাজার থেকে গরম জিলিপি এনে খাওয়াতেন।

দীর্ঘকাল পর রহমতপুরে গিয়ে আসগর মাস্টার এখনও বেঁচে আছেন দেখে খুশি হয়েছিলাম। বয়সের জন্য জরাজীর্ণ শরীর। শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। শত দারিদ্র্যের মধ্যে এখনও বেঁচে আছেন। তার একমাত্র ছেলে বরিশাল শহরে একটি সরকারি অফিসে কেরানির চাকরি করেন। এতকাল পর আমাকে তার চেনার কথা নয়। পুরনো দিনের কথা তুলে পরিচয় দিতেই স্মৃতি খুঁড়ে আমাকে আবিষ্কার করলেন। বললেন- ওহ তুমি, সেই যে নির্মল সেনের সঙ্গে আসতে। কোথায় থাক, কী মনে করে রহমতপুরে এলে? বললাম, থাকি লন্ডনে। দেশ এখন স্বাধীন। তাই পুরনো বন্ধুরা কে কেমন আছে তা একবার দেখে যাওয়ার জন্য রহমতপুরে এসেছি।

বৃদ্ধ শিক্ষক তার ছানিপড়া চোখ তুলে আমার দিতে তাকালেন। বললেন, লন্ডনে আছ? তাহলে তো বেশ ভালোই আছ। স্বাধীন দেশে আমরা কেমন আছি তা দেখতে এলে? বললাম, নিশ্চয়ই ভালো আছেন? আসগর মাস্টার সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ভালো আছি বলছ! যখন প্রাইমারি টিচার হয়ে স্কুলে ঢুকি, তখন বেতন ছিল পাঁচ টাকা। চালের মণও ছিল পাঁচ টাকা। চাকরি থেকে রিটায়ার করার সময় বেতন ছিল পঞ্চাশ টাকা। কিন্তু চালের মণই ছিল চারশ’ টাকা। সরকারি শিক্ষক। সামান্য পেনশন, তাও ছয় মাসে-নয় মাসেও পাই না। স্বাধীনতা তো তোমাদের জন্য।

একটু থেমে বৃদ্ধ প্রাইমারি টিচার জিজ্ঞেস করেছিলেন, স্বাধীনতার অর্থ কি রাজা বদল, না মানুষের ভাগ্য বদল? তার মনের ক্ষোভ টের পেয়েছিলাম। বললাম, এখন তো আর রাজরাজড়ার দিন নেই। আসগর মাস্টার বললেন, কে বলছে রাজরাজড়ার দিন নেই? আগে বাংলাদেশের রাজা ছিলেন নবাব সরফরাজ খাঁ। তাকে মেরে রাজা হলেন নবাব আলিবর্দী খাঁ। নবাব আলিবর্দীর নাতি নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে মেরে রাজা হয়েছিলেন মীর জাফর খাঁ। এখন দেখছি, শেখ মুজিবকে হত্যার পর দেশের রাজা হয়ে বসলেন জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানকেও নাকি হত্যা করিয়েছেন জেনারেল এরশাদ। তারপর তিনি রাজা হন। তুমি দেশে রাজাদের দিন নেই বলছ! কিন্তু রাজায় রাজায় যুদ্ধই তো চলছে এখনও দেশে। তাতে উলুখড়দের অবস্থা কী, তার খোঁজ কে রাখে?

দারিদ্র্যপীড়িত এই বৃদ্ধ শিক্ষকের মনের ক্ষোভ প্রশমন করতে পারব না জেনে চুপ রইলাম। আমি যখন তার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি, তখন তিনি স্বগতোক্তি করলেন, ‘স্বাধীনতার অর্থ শুধু কাগজের টাকায় রাজার ছবি বদল, আমাদের ভাগ্য বদল নয়।’

বহু বছর আগের কথা। রহমতপুরে তারপর আর যাইনি। আসগর মাস্টারের কথাও আর স্মরণ ছিল না। হঠাৎ করে মনে পড়ল আজ ২৫ মার্চ, স্বাধীনতার ৪৫টি বছর পার হওয়ার দিনটিতেই। মনে পড়ল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের (১৯৭১) ঐতিহাসিক ভাষণটি শুনতে গিয়ে। আমার ছোট মেয়ে ইন্দিরা দু’দিনের জন্য আমার কাছে এসেছে। সে সকালে ঘুম থেকে উঠেই ভাষণটি বাজাতে শুরু করেছে। পরদিন (২৬ মার্চ) স্বাধীনতা দিবস। তাই এই ভাষণটি বাজাতে তার এত আগ্রহ। ভাষণটি তার খুব প্রিয়।

বঙ্গবন্ধু যেদিন রমনার সোহরাওয়ার্দী ময়দানে (তখন ছিল রমনা রেসকোর্স) এই ভাষণটি দেন, সেদিন আমিও ময়দানে উপস্থিত ছিলাম। তারপর বহুবার ক্যাসেটে ধারণকৃত এই ভাষণটি শুনেছি। কবি নির্মলেন্দু গুণের অভিধা অনুযায়ী এই ভাষণটি একটি অমর মহাকাব্য। আর এই মহাকাব্যের মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গতকালও (শুক্রবার) এই ভাষণটি শুনছিলাম। তার ভাষণের বহুবার শোনা একটি কথায় এসে হঠাৎ মনটা স্তব্ধ হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু বলছেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

প্রথম যখন এই বাক্যটা শুনি, তখন মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধু তার মহাকাব্যে ছন্দ মেলানোর জন্য মুক্তি এবং স্বাধীনতা দুটি শব্দই ব্যবহার করেছেন। নইলে একটি ব্যবহার করলেই হতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একদিন আমরা কয়েকজন সাংবাদিক যখন ঘরোয়া আলাপ করছিলাম, তখন সুযোগ পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি তার ৭ মার্চের ভাষণে কেন মুক্তি এবং স্বাধীনতা দুটি কথাই ব্যবহার করেছিলেন? কেবল স্বাধীনতার কথা বলেই ক্ষান্ত থাকেননি? বঙ্গবন্ধু এ কথার জবাব সঙ্গে সঙ্গে দিয়েছিলেন। তার এই বক্তব্যের মধ্যেই নিহিত ছিল পরবর্তীকালে আসগর মাস্টার এবং তার মতো হয়তো আরও অনেকের মনে জেগে ওঠা একটি প্রশ্নের জবাব, ‘স্বাধীনতার অর্থ কি কেবল কাগজের মুদ্রায় রাজার ছবি বদল?’

স্বাধীনতা লাভের প্রথম বছরেই হয়তো বঙ্গবন্ধুর চোখে বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তনের স্বপ্ন ধরা দিয়েছিল। কারণ, স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতেই তার মনে এই প্রশ্নটি দেখা দিয়েছিল, দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা দ্বারা কারা লাভবান হবে- দেশের উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত, সুবিধাভোগী শ্রেণীগুলো নয় কি? অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া এই স্বাধীনতা সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থবহ হবে না। আসগর মাস্টারদের পর্যায় পর্যন্ত এই স্বাধীনতার সুফল গিয়ে পেঁৗছাবে না। এ জন্য ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেও সংগ্রামের কথা বলেছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এই কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি জনগণের জীবনে এনে দিতে পারেনি। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন তার প্রথম বিপ্লব। অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তিনি যখন নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তখন তার নাম দিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লব। এই দ্বিতীয় বিপ্লব, যাকে তিনি আরেকটি নাম দিয়েছিলেন ‘শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম’। সেই সংগ্রামে জয়ী হতে পারলে আসগর মাস্টার কেন, একেবারে হতদরিদ্র মানুষের জীবনেও স্বাধীনতা অর্থবহ হয়ে উঠত। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে আত্মাহুতি দিয়েছেন।

প্রায় একই সময়ে এশিয়ার আরেক মহানায়ক তার দেশের শ্রেণী সংগ্রামের দ্বিতীয় পর্যায়ে তার কমিউনিস্ট দলের ভেতরেরই নতুন গড়ে ওঠা কায়েমি স্বার্থবাদীদের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হন। বঙ্গবন্ধুর বাকশালের মতো তার ‘লীগ ফরোয়ার্ড’ আন্দোলন ব্যর্থ হয়। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার প্রধান চার সহকর্মীকে (বাংলাদেশের চার জাতীয় নেতার মতো) ‘গ্যাঙ অব ফোর’ আখ্যা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়। মাওয়ের অনুগত সেনাপ্রধান লিন পিয়াওকে বিমান দুর্ঘটনা ঘটিয়ে হত্যা করা হয়। এখন চীনে কমিউনিজমের রাজনৈতিক ছাতার আড়ালে ধনতন্ত্রের তথাকথিত মুক্তবাজার আরও মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এখন বিশ্বের শীর্ষ ধনীর সংখ্যা চীনেই বেশি।

মাও সে তুং চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর বলেছিলেন, ‘আমরা সমাজতন্ত্রে পৌঁছার লক্ষ্যে গণতন্ত্রের প্রাথমিক যুদ্ধে জয়ী হয়েছি। সমাজতন্ত্রে পৌঁছাইনি। সমাজতন্ত্রে পৌঁছা, শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের যুদ্ধ সামনে।’ এজন্যই নয়াচীনকে বলা হয় জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। সমাজতন্ত্রে পৌঁছা এবং শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে মাও শেষ বয়সে কালচারাল রেভলিউশন নামের দ্বিতীয় বিপ্লব শুরু করেছিলেন। ততদিনে তার দলের অভ্যন্তরেই একটি নতুন কায়েমি স্বার্থবাদী শ্রেণী গড়ে উঠেছে। তারা প্রকাশ্যে মাওকে মাথায় রেখে নেপথ্যে মাওবাদ উচ্ছেদের চেষ্টা শুরু করে।

পশ্চিমা ধনতন্ত্রের অনবরত প্রচারণা এবং তার সঙ্গে চীনের নব্য কায়েমি স্বার্থ ও ‘কমিউনিস্ট সুশীল সমাজের’ চেষ্টা যুক্ত হয়ে অচিরেই মাও সে তুংয়ের কালচারাল রেভলিউশন একটি ‘স্বৈরাচারী ও নিন্দিত পদক্ষেপ’ হিসেবে বিশ্বময় প্রচারিত হয়। ঘটা করে এখন বলা হচ্ছে, ধনতন্ত্রের উদার বাজারনীতি গ্রহণ করার ফলেই চীনের আজ এই অর্থনৈতিক রমরমা অবস্থা। এই রমরমা অবস্থা একদা জাপানে ঘটেছিল। চীনেরও অভূতপূর্ব ধনবাদী অর্থনীতির উন্নতির আড়ালে সামাজিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে; দুর্নীতির প্রাবল্যে অর্থনীতির শিকড়েও পোকা ধরেছে। তার লক্ষণ এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। কেবল সামরিক শক্তির দ্বারা কি এই অর্থনৈতিক উন্নতি টিকিয়ে রাখা যাবে? সামরিক শক্তি দ্বারা পশ্চিমা ধনতন্ত্রে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধস তো ঠেকিয়ে রাখা যায়নি।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা-পরবর্তী দ্বিতীয় বিপ্লবের পদক্ষেপকেও পশ্চিমা ধনতন্ত্রের প্রচার ডঙ্কা, দেশের ভেতরে গড়ে ওঠা নব্য কায়েমি স্বার্থ এবং সুযোগ-সুবিধাভোগী একটি সুশীল সমাজের সম্মিলিত চেষ্টায় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে একদলীয় স্বৈরাচারী ব্যবস্থা হিসেবে। যদিও এর লক্ষ্য ছিল দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর তার আর্থ-সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া।

ধনবাদী ব্যবস্থায় বর্তমানে বাংলাদেশের অভাবিত অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু তা তৃণমূল মানুষের কাছে তেমনভাবে পৌঁছেনি। বরং সামাজিক অবক্ষয় ও পচন আরও দ্রুততর হয়েছে। সন্ত্রাস ও দুর্নীতির প্রাবল্যে অর্থনৈতিক উন্নতির সব শাঁস খেয়ে ফেলছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কায়েমি স্বার্থবাদী শ্রেণী। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো পর্যন্ত এখন তাদের হাতের মুঠোয়। মিডিয়া তাদের আজ্ঞাবহ। স্বাধীনতাকে আসগর মাস্টারদের জীবনে অর্থবহ করে তোলার সংগ্রাম তাই এখনও আমাদের শেষ হয়নি। ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবসে এই কথাটি আবার নতুন করে আমরা যেন স্মরণ করি। – সমকাল

লন্ডন, ২৫ মার্চ শুক্রবার, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment