কালের আয়নায়

আমাদের সবার চাওয়া গণতন্ত্রের চেহারা কি এক?

Image

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

গল্পটা একটু হালকা প্রকৃতির। তবু আমার লেখার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিধায় পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে এখানে উল্লেখ করছি। এক রক্ষণশীল যুবকের ইচ্ছা হয়েছিল তিনি কৌমার্য অক্ষুণ্ন আছে এমন মেয়ে ছাড়া বিয়ে করবেন না। সুতরাং আত্মীয়-স্বজন কুমারী মেয়ের খোঁজে লেগে গেলেন। কিন্তু এ যুগে কুমারী মেয়ে খুঁজে পাওয়া ভার। নানা কারণে অনেক মেয়ে অসতী না হয়েও কৌমার্য হারান। সুতরাং যুবকের আত্মীয়-স্বজনের দীর্ঘ সময় লাগল একজন কুমারী পাত্রী খুঁজে পেতে। ধুমধাম করে যুবকের বিয়ে হয়ে গেল। বাসর রাতে নববধূ এক সময় একটু বিরক্ত হয়ে স্বামীকে বলল, তোমার শরীরে বড় ঘামের গন্ধ। সব পুরুষের শরীরে এমন ঘামের গন্ধ থাকে না। যুবক বলল, তুমি জানলে কী করে? নববধূ বলল, বাহ, আমি বুঝি আর কোনো পুরুষের সঙ্গে মিশিনি?

বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিয়ে সব মহলের অবিরাম চিৎকার শুনে গল্পটি মনে পড়ল। সবাই আদি অকৃত্রিম খাঁটি গণতন্ত্র চান। তাতে ভেজাল থাকলে চলবে না। এই ‘কুমারী গণতন্ত্রের’ জন্য বুদ্ধিজীবীরা টেলিভিশনের টক শোতে গলা ফাটাচ্ছেন, সংবাদপত্রে কলাম লিখছেন। একশ্রেণীর রাজনীতিক যারা দু’দিন আগেও ছিলেন স্বৈরাচারী শাসকদের দোসর, তারা বর্তমান হাসিনা সরকার ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন দ্বারা গণতন্ত্রের কুমারিত্ব ক্ষুণ্ন করেছেন বলে নিত্য অভিযোগ তুলছেন। কিন্তু এই ‘কুমারী’ গণতন্ত্র কোন দেশে কীভাবে কোন অবস্থানে আছে তা কেউ বলছেন না বা বলতে চাইছেন না।

সাধারণত গণতন্ত্র বলতে আমরা ব্রিটেনের ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসির কথা বলি। কিন্তু এই গণতন্ত্রও নির্ভেজাল অবস্থায় আছে কি? টোরি প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের আমলেই অভিযোগ উঠেছিল, থ্যাচার ইলেক্টেড ডিকটেটর। তিনি ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসির মূল বৈশিষ্ট্য কেবিনেট পদ্ধতির বদলে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে সরকার পরিচালনা করছেন। লেবার প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও ক্ষমতায় এসে এই থ্যাচারিস্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন।

আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির গণতন্ত্রের চরিত্রও নিষ্কলুষ আছে কি? রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার ক্ষমতায় থাকাকালে স্বীকার করেছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে এখন আর কোনো ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা পরিচালনা করে একটি ‘ইনভিজিবল গভর্নমেন্ট বা অদৃশ্য সরকার’। পরবর্তীকালে আরও অনেকে স্বীকার করেছেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বটে; কিন্তু তাকে প্রেসিডেন্ট পদে বসান আমেরিকার করপোরেট ব্যবসায়ী, বিশেষ করে ওয়ার ইন্ডাস্ট্রির মালিকরা। তারা তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে বিশাল নির্বাচনী তহবিল জুগিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে সাহায্য করে। অতঃপর নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভোটদাতাদের ইচ্ছায় নয়, অর্থদাতাদের ইচ্ছায় দেশ চালাতে বাধ্য হন।

আমেরিকায় যত যোগ্যতাই থাক, কারও পক্ষে প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানো সম্ভব নয়, যদি তিনি বিশাল নির্বাচন তহবিল গঠন করতে না পারেন। ভোটদাতারা ভোট দেন, টাকা জোগাতে পারেন না। এই টাকা জোগায় আমেরিকার বিগ ক্যাপিটালিস্টরা। সুতরাং ভোটদাতাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রেসিডেন্ট ভোটদাতাদের ইচ্ছায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন না। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেন অর্থ জোগানদারদের ইচ্ছায়। তাদের স্বার্থ ও ইচ্ছার বাইরে গেলে কী হয়, তার সাক্ষ্য বহন করে সাবেক প্রেসিডেন্ট জন কেনেডি এবং তার ভাই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রবার্ট কেনেডির পরিণতি। সুতরাং প্রশ্ন করা চলে, মার্কিন গণতন্ত্রও কি নির্ভেজাল?

ভারতকে বলা হয় বিশ্বের বৃহৎ গণতন্ত্র। পশ্চিমা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের অনুসারী বলে পরিচিত জওহর লাল নেহেরু হন দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তিনি কি নিখুঁত ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র অনুসরণ করতে পেরেছিলেন? না চেয়েছিলেন? কিছুদিনের মধ্যে তিনি একনায়কত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেন এবং কংগ্রেস দলটিকেও সম্পূর্ণ কুক্ষিগত রাখার জন্য কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট পদে বসান। তার হাতেই সূচনা হয় ভারতে গান্ধী-নেহরু ডায়নেস্টির। নানা ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে এই ডায়নেস্টির রাজত্বের এখন অবসান হয়েছে বটে; কিন্তু জনগণের বিশাল সমর্থন ও ভোটে যিনি ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, সেই নরেন্দ্র মোদিও এখন ভোটদাতাদের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিলেন, এখন সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছেন না।

অভিযোগ উঠেছে, নরেন্দ্র মোদির সরকার চালিত হচ্ছে শিবসেনা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ প্রভৃতি উগ্রপন্থি সাম্প্রদায়িক দল দ্বারা। এই শিবসেনা, আরএসএসের পেছনে রয়েছে ভারতের বিগ বিজনেসের মদদ এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থও। ভারতে নেহরুর সমাজবাদী রাষ্ট্রনীতি এবং মিশ্র অর্থনীতি কোনোটাই এখন নেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আছে, কিন্তু তাতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন তেমন নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া-আফ্রিকার সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোতে ওয়েস্টমিনস্টার টাইপ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বহু দেশেই দেখা গেছে, তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরি অনুসরণের উপযোগী নয়। বহু দেশে তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হেরফের ঘটানো হয়েছে। ভারতে নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর আমলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ছিল ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে অনেক বেশি। ইন্দোনেশিয়ায় ব্রিটিশ অথবা ফরাসি ধাঁচের গণতন্ত্র চালু রাখতে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সুকর্ন গণতান্ত্রিক অধিকারের অনেক কাটছাঁট করেছিলেন। তার নাম দিয়েছিলেন কন্ট্রোলড ডেমোক্রেসি বা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। ঘানা ও জিম্বাবুয়েতে যথাক্রমে এনত্রুক্রমা ও মুগাবে যে একদলীয় প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি (ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসি বদল করে) প্রবর্তন করেছিলেন। কেউ কেউ তাকে আখ্যা দিয়েছিলেন লিমিটেড ডেমোক্রেসি বা সীমাবদ্ধ গণতন্ত্র। যুক্তি দেখানো হয়েছিল, আফ্রিকার বর্তমান সামাজিক ও আর্থিক ব্যবস্থায় ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসি অচল।

চীনে মাও জে দুংয়ের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হওয়ার পর দেশটিতে পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়নি। ছোট ভূস্বামী ও ছোট ছোট ব্যক্তিগত শিল্প ব্যবসাকে টিকে থাকতে দেওয়া হয়েছে এবং সমাজতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপ হিসেবে একদলীয় শাসনের ভিত্তিতে এক ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণের ব্যবস্থা হয়েছিল। তার নাম দেওয়া হয় নিউ ডেমোক্রেসি বা নয়া গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্রের চরিত্র ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসির সম্পূর্ণ বিপরীত। এই নয়া গণতন্ত্রকে পশ্চিমা বিশ্ব আদৌ গণতন্ত্র বলে স্বীকার করেনি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির গণতন্ত্র অনুসরণ করেছেন। কিন্তু কিছুকালের মধ্যেই দেখা গেল, গণতন্ত্রের শত্রুরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হলেও রাজনৈতিক পরাজয় বরণ করেনি। বরং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরের সহায়তায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিথিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে তার আবরণে নতুন শাসক ও শোষক শ্রেণী হিসেবে আবির্ভূত হতে চাচ্ছে। গণতন্ত্র যাতে দেশের নব্য ধনীদের দ্বারা আবার হাইজ্যাক হয়ে না যায়, সেজন্য বঙ্গবন্ধুকে শোষিতের গণতন্ত্রের কথা ভাবতে হয়েছিল।

এই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে যে পদ্ধতির উদ্ভাবন করতে হয়েছিল, তা পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রথাগত পদ্ধতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গণতন্ত্রের শত্রু শিবির এরই সুযোগ নিয়েছে। তারা গণতন্ত্রের নামে (পশ্চিমা গণতন্ত্রের জন্য) মায়াকান্না জুড়ে দিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেন এবং জনগণের এই বিভ্রান্তির সুযোগে রক্তাক্ত পথে (গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নয়) বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে কার্যত ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ভোটদাতা জনগণের হাত থেকে নব্য ধনী গোষ্ঠীর কোটারির হাতে চলে যায়। ধর্মান্ধ উগ্রপন্থিরা হয়ে দাঁড়ায় এই কোটারির সহযোগী শক্তি। জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়নি। কিন্তু এই ভোট পেয়ে যারা নির্বাচিত হন, তারা জনগণের ইচ্ছার বদলে নব্য শোষকদের স্বার্থে ও ইচ্ছায় চালিত হতে থাকেন। দেশের মানুষকে বোঝানো হয়, এটাই হচ্ছে আসল গণতন্ত্র। কিন্তু এই গণতন্ত্র যে বহুদিন আগে তার কৌমার্য হারিয়েছে, সেটা আমাদের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী তাদের তত্ত্বের আড়ালে ঢাকা রাখতে চেয়েছেন।

বহু বছর যুদ্ধ করার পর বাংলাদেশের মানুষ নানা বর্ণের নানা চেহারার স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাতে পেরেছে। কিন্তু নব্য শোষকদের কবলমুক্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে কি? হাসিনা সরকারও কি পারবে সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে? এটা পারা খুব শক্ত। জনগণের শত্রুরা বর্তমানে সাময়িক পরাজয় বরণ করে একটু দূরে সরে দাঁড়ালেও তাদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি। সমাজের প্রতি স্তরে তাদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে এবং তা থেকে গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে তারা অনবরত বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

অন্য কোনো স্বৈরাচারী দেশে যা হয়, ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেন না। ফিলিপাইনে তো তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসক মার্কোস দেশে নির্বাচন দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দলের নেতা আকিনোকে দেশে ফেরার পথে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। বাংলাদেশে গত সাধারণ নির্বাচনের সময় কোনো স্বৈরাচারী শাসক ক্ষমতায় ছিলেন না। ক্ষমতায় ছিল একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। তারা বিরোধী দলগুলোর জন্য নির্বাচনে যোগদানের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। বিরোধী দলের জোট নানা বাহানায় নির্বাচনে আসেনি। নির্বাচনে স্বেচ্ছায় না এসে তারা ধুয়া তুলল, এই নির্বাচন অবৈধ, এই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার অবৈধ। দেশে গণতন্ত্র নেই।

সঙ্গে সঙ্গে অনুগত ও সুবিধাভোগী একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ধুয়া তুলেছেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র চাই। কিন্তু কোন গণতন্ত্র চান, তা খুলে বলতে পারছেন না। বঙ্গবন্ধুর শোষিতের গণতন্ত্র তাদের কাছে গণতন্ত্র নয়। শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারও তাদের কাছে বৈধ গণতন্ত্র নয়। তাহলে তারা কোন গণতন্ত্র চান? জিয়াউর রহমানের আমলের ক্যান্টনমেন্টনির্ভর ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’? জেনারেল এরশাদের আমলের রাবার স্ট্যাম্প গণতন্ত্র, না খালেদা জিয়ার আমলের হাওয়া ভবনের গণতন্ত্র? পশ্চিমা গণতন্ত্রেরও এখন কোনো চরিত্র নেই। কিন্তু তার সঙ্গেও এসব ‘গণতন্ত্রের’ মিল কোথায়?

সেই প্রথম ত্রুক্রসেডের পর পশ্চাৎমুখী সামন্তবাদকে কবর দিয়ে উদার ও মানবিক ধনতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। এই ধনতন্ত্র ছিল আধুনিক গণতন্ত্রের বিকাশের শক্তি। পরবর্তীকালে সমাজবাদ এসে গণতন্ত্রের বাহুকে আরও শক্তিশালী করে। গণতন্ত্রের সুফলকে তৃণমূল মানুষের দুয়ারে পেঁৗছে দেয়। কিন্তু এই অবস্থা বেশিদিন চলেনি। ধনবাদ শক্তিশালী হয়ে তার নিরঙ্কুশ শোষণ ও শাসনের স্বার্থে গণতন্ত্র ও মানবতার শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

উন্নত পশ্চিমা বিশ্বেও ফরাসি বিপ্লব, আমেরিকান বিপ্লব গণতন্ত্র ও মানবমুক্তির যে সোপান তৈরি করেছিল, তা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যায়। ধনবাদ আন্তর্জাতিক দানবের চেহারা ধারণ করে প্রথমেই গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরে। পশ্চিমা বিশ্বেও গণতন্ত্রের খোলসটুকু বাঁচিয়ে রেখে প্রতিষ্ঠা করা হয় নির্মম শোষণভিত্তিক গণবিরোধী ব্যবস্থা। সমাজতন্ত্রকে শত্রু ঘোষণা করা হয় এবং মানবতাকে আপ্তবাক্যে পরিণত করা হয়। পশ্চিমা গণতন্ত্র তাই আজ তার প্রথম দিকের উদার মানবতাবাদী চরিত্র হারিয়ে গ্গ্নোবাল ক্যাপিটালিজমের হাতে বন্দি হয়ে মার্চেন্ট অব ডেথের ভূমিকায় অবতীর্ণ।

পশ্চিমা গণতন্ত্রের এই সংহারী চরিত্র দর্শনে এশিয়া-আফ্রিকার বহু জাতীয়তাবাদী নেতা ওই গণতন্ত্রের অবকাঠামো থেকে সরে এসে নিজস্ব ধারায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। পশ্চিমা শক্তিই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাদের হত্যা করেছে। কোনো কোনো দেশে তাদের তৈরি আয়রনম্যান বা লৌহমানবের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রচার চালিয়েছে, গণতান্ত্রিক শাসন দুর্নীতিপূর্ণ। তাদের পছন্দের জেনারেল হচ্ছেন দেশটির ত্রাণকর্তা।

পাকিস্তানে পশ্চিমা শক্তির সাহায্যেই স্বৈরাচারী সামরিক শাসকের নেতৃত্বে যে ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, তাকে নাম দেওয়া হয়েছিল বুনিয়াদি গণতন্ত্র। কেউ কেউ বলতেন বেসিক ডেমোক্রেসি বা মৌলিক গণতন্ত্র। এটা গণতন্ত্রের কৌমার্যহানির পর তাকে কুমারী আখ্যা দেওয়ার মতো (সম্ভবত আমাদের দেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীও এ ধরনের কুমারী গণতন্ত্রের জন্যই এখন মায়াকান্না কাঁদছেন)। এই আইয়ুবি জমানায় বুনিয়াদি গণতন্ত্রের মাথায় ভর করেই পাকিস্তানে এখন মধ্যযুগীয় তালেবানি শক্তির অভ্যুত্থান ঘটেছে এবং দেশটিকে তারা তালেবানি গণতন্ত্র উপহার দিতে চাইছে।

বাংলাদেশেও বর্তমানে হাসিনা সরকারের আমলে পশ্চিমা গণতন্ত্রের অনুকরণে গড়ে ওঠা গণতন্ত্রের যত স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকুক, এর বিকল্প হচ্ছে পকিস্তানের তালেবানি গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি ও জামায়াত কিছুকাল আগে কোমর বেঁধে নেমেছিল এবং আমাদের একটি সুশীল সমাজ গণতন্ত্রের নামে মায়াকান্না কেঁদে তাকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছিল। তারা তাদের সেই ভূমিকা থেকে এখনও সরে আসেনি।

বাংলাদেশে এখন কমিউনিস্ট পার্টি গণতন্ত্র চায়। জামায়াত ও বিএনপিও গণতন্ত্র চায়। সুশীল সমাজ, ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসও গণতন্ত্র চান। তাদের সবার চাওয়া এই গণতন্ত্রের চেহারা ও চরিত্র কি এক? যদি তা বিশ্বের আদি ও অকৃত্রিম কুমারী গণতন্ত্র হয়, তাহলে তা খুঁজে পাওয়া যাবে কি? – সমকাল

লন্ডন, ৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment