তৃতীয় মত

নারী নির্যাতন নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করা উচিত নয়

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGC

ভদ্রমহিলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। নামের আগে ডক্টরেটও লাগানো আছে। তাই মাঝে মাঝে তার লেখা-জোখা বা বক্তব্য কাগজে দেখলে পাঠ করি। ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। মনে করেছিলাম, দেশের উচ্চ বিদ্যাপীঠের তিনি যখন শিক্ষক, তখন তিনি যে রাজনৈতিক মতাদর্শেরই অনুসারী হন, তার লেখায় অথবা বক্তব্যে দেশ সম্পর্কে একটা শিক্ষকসুলভ, সুচিন্তিত, দল-নিরপেক্ষ মতামত পাব। আমার এই আশাটি পূর্ণ হয়নি। তিনি যে ঘোর আওয়ামী লীগ বিরোধী এবং বিএনপি ঘরানার শিক্ষক অথবা বুদ্ধিজীবী তা বুঝতে দেরি হয়নি। পরে ঢাকার বন্ধুদের কাছে তার পারিবারিক পরিচয়ও জেনেছি। সম্প্রতি তিনি দেশে তনু নামের এক তরুণীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যে বক্তব্য রেখেছেন, সেটিই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। নাম উল্লেখ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি তাকে।

এই অধ্যাপক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি প্রশ্ন রেখেছেন। বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরে কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার পর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন; তাহলে তনু হত্যার বেলায় কেন নামছেন না?’ এটা হল তার বক্তব্যের প্রথমার্ধ, দ্বিতীয়ার্ধে তিনি বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা তো এখন ক্ষমতায়। তাহলে কুমিল্লা সেনানিবাসে এই ধর্ষণ ও হত্যার কেন বিচার করছেন না প্রধানমন্ত্রী?’ তনুর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের ভূমিকারও তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন। ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘সুশাসনের জন্য নারী’ সংগঠনের আয়োজনে যে মানব-বন্ধন হয় তাতে এই অধ্যাপক তার বক্তব্য রাখেন।

তনু হত্যা বাংলাদেশের জন্য এক লজ্জাজনক নির্মম ঘটনা। এই ঘটনা নিয়ে দেশে তোলপাড় হবে এটা স্বাভাবিক এবং হওয়া উচিত। কিছুকাল আগে এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সারা ভারত বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল। এই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে শুধু ধর্ষকদের গ্রেফতার ও শাস্তি দেয়া নয়, ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দানের মতো কঠোর আইন প্রণয়নে সরকার বাধ্য হয়েছিল। প্রতিবেশী ভারতের মতো বাংলাদেশেও এখন নারী নির্যাতন ও নারী ধর্ষণ ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরা পড়ছে অথবা চরম শাস্তি পেয়েছে, তার নজির খুবই কম।

ঢাকায় সাম্প্রতিক মানববন্ধনে বক্তারা তনু হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করে ধরার ব্যাপারে সরকার এখন পর্যন্ত যে গাফিলতির পরিচয় দিয়েছে তার সমালোচনা করে ভালো কাজ করেছেন। শুধু প্রতিবাদ জানানো নয়, তনু হত্যাকারীদের শনাক্ত করা ও তাদের শাস্তি দান সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশব্যাপী উত্তাল প্রতিবাদ, সভা, মিছিল চলতে থাকা উচিত। শুধু তনু হত্যা নয়, বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ও নারী ধর্ষণ বন্ধ করার জন্য সরকার যাতে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকর করে, সেজন্য দেশে বড় ধরনের আন্দোলনও গড়ে তোলা উচিত।

কিন্তু ঢাকার নারী নির্যাতন সম্পর্কিত সাম্প্রতিক মানববন্ধন এবং এই সমাবেশে বক্তাদের বক্তব্য কাগজে পাঠ করে মনে হল, তনু হত্যার বিচার কিংবা দেশে নারী নির্যাতন বন্ধ করা তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য, এই নির্যাতনকে মূলধন করে বিএনপির সুরে সুর মিলিয়ে সরকারকে একহাত নেয়া। নারী নির্যাতনকে কেন্দ্র করে পছন্দের রাজনৈতিক দলের জন্য ফায়দা তোলা। নইলে আমাদের অধ্যাপক তার বক্তব্যের দ্বিতীয় কথাটি আগে বলতেন, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তনু হত্যার বিচার অবিলম্বে শেষ করার জন্য জোর দাবি জানাতেন। কিন্তু এই দাবি জানানোর আগেই তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন হত্যার বিচার দাবিতে শেখ হাসিনা রাস্তায় নামতে পারলে এখন নামছেন না কেন?

একটি হাস্যকর প্রশ্ন। একজন অধ্যাপকের জ্ঞান-বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিশোরী ইয়াসমিনের হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল ১৯৯৫ সালে খালেদা জিয়া সরকারের আমলে। শেখ হাসিনা তখন বিরোধী দলের নেত্রী। ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার জন্য দায়ী পুলিশকে শাস্তি দিতে যখন খালেদা জিয়া গড়িমসি করছিলেন, এমনকি কিশোরী ইয়াসমিনকে পতিতা হিসেবে চিত্রনের অপচেষ্টা হচ্ছিল, তখন সরকারি নীতির প্রতিবাদে শেখ হাসিনা জনতার সঙ্গে রাজপথে নেমেছিলেন।

এখন শেখ হাসিনা নিজেই প্রধানমন্ত্রী। তিনি তনু হত্যার বিচার কার কাছে দাবি করতে রাস্তায় নামবেন? তার কাছে এই বীভৎস অপরাধের অবিলম্বে বিচার দাবি করতে হবে। আর সেই দাবি জানাতে খালেদা জিয়ারই তো উচিত ছিল সবার আগে রাস্তায় নেমে আসা। কিন্তু তিনি কোথায়? ক্ষমতায় থাকাকালে ইয়াসমিন হত্যার ব্যাপারে তিনি প্রথমে যে নিরাসক্ত ভাব দেখিয়েছিলেন, বর্তমানে তনু হত্যার ব্যাপারেও তার মধ্যে একই মনোভাবের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তার দল তনু হত্যার মতো পাশবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হোক তা চাওয়ার চেয়েও এটাকে তাদের ক্ষমতার রাজনীতির ইস্যু করার ব্যাপারে অধিক আগ্রহী। ঢাকায় নারী নির্যাতন সম্পর্কিত সাম্প্রতিক মানববন্ধনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকসহ সভাপতির কণ্ঠেও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার সুর বেশি ধ্বনিত হয়েছে; নারী নির্যাতনের প্রতিবাদের সুর ততটা জোরালো নয়।

দেশে নারী নির্যাতন, নারী হত্যা ও ধর্ষণ ক্রমাগত বাড়ছে। এ সম্পর্কে দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষের সোচ্চার হওয়া উচিত এবং সম্মিলিতভাবে আন্দোলনে নেমে সরকারকে বাধ্য করা উচিত নারী নির্যাতন বন্ধ করার ব্যাপারে সব শৈথিল্য বর্জন করে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে। ঢাকার প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনের সমাবেশের বক্তাদের বক্তব্য জেনে মনে হল, এটা সম্মিলিত প্রতিবাদ মঞ্চের বক্তব্য নয়, বরং একটি দলীয় সমাবেশে দলীয় প্রোপাগান্ডামূলক বক্তব্য।

একটি উদাহরণ দিই- মানববন্ধনে সভাপতি ছিলেন আমানুল্লা রুবি। তিনি তার বক্তব্যের শুরুতেই বলেছেন, ‘সরকার একটার পর একটা ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। কোনো ঘটনারই বিচার হচ্ছে না। ন্যায়বিচার বানচাল করতেই এসব করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ব্যানার ছাড়া কেউ নিরাপদ নয়। আমরা কেউ নিরাপদ নই।’ এটা কি কোনো নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ সভার বক্তব্য, না সরকারকে সব ব্যাপারে দায়ী করার জন্য বিরোধী দলীয় মঞ্চের প্রোপাগান্ডা?

সাম্প্রতিক তনু হত্যার ঘটনাটি যদি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ঘটিয়ে থাকে, তাহলে ১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন হত্যার ঘটনাটি কি তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার ঘটিয়েছিল? মানববন্ধনের বক্তারা ইয়াসমিন হত্যার ঘটনাটি সভায় সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। কিন্তু কাদের শাসনামলে ঘটনাটি ঘটেছিল, দোষী পুলিশদের বাঁচানোর জন্য সরকারি উচ্চপর্যায়ে কী ধরনের তৎপরতা চলেছিল, কিশোরী ইয়াসমিনকে পতিতা প্রমাণ করার জন্য কী ধরনের জঘন্য প্রচারণা চালানো হয়েছিল এবং কারা চালিয়েছিল, সে সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষকসহ মানববন্ধনের সভাপতি পর্যন্ত নীরব।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত অনেক হত্যা, গুম, ধর্ষণের হোতাদের ধরা এবং শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে ব্যর্থতা আছে। অমীমাংসিত সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড তার একটি। এই ব্যর্থতার কথা অনেকেই বলেন, কিন্তু সরকার এগুলো ঘটিয়েছে এমন কথা বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক ছাড়া আর কেউ বলেন না। হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাসের পেছনে বিএনপির আমলে সরকারি দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকের সংশ্রব ছিল, তা আজ ওপেনসিক্রেট। ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা, আওয়ামী লীগ নেতা কিবরিয়া ও আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যার পেছনে যে বিএনপির কোনো কোনো শীর্ষ নেতার সংশ্লিষ্টতা ছিল তা নিয়ে আদালত পর্যন্ত তো মামলা গড়িয়েছে।

বিএনপির আমলে সংঘটিত অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের কোনটির বিচার এবং দোষীদের শাস্তি হয়েছে? জাতির জনকের হত্যাকারীদের বিচার পর্যন্ত বিএনপি সরকার বছরের পর বছর ঠেকিয়ে রেখেছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দূরের কথা, ক্ষমতায় শরিক করেছে। যাদের আমলে আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করার ব্যবস্থা হয়েছিল, বাবরের মতো এক চিহ্নিত তস্করকে এনে স্বরাষ্ট্র্রমন্ত্রী করা হয়েছিল, তাদের সমর্থকদের মুখে বর্তমান আমলের ছোট-বড় কিছু ব্যর্থতাকে সামনে এনে ন্যায়বিচার বানচাল করা হচ্ছে বলা কি শোভা পায়? বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের আমলে হলমার্ক, ডেসটিনি, বেসিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক সংক্রান্ত যে কেলেংকারি ঘটেছে, তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বিলাতে বসে বিএনপি নেতা তারেক রহমান দেশে ডাকাতি হচ্ছে বলে চিৎকার ছুড়েছেন। কিন্তু দেশে মাতা-পুত্রের রাজত্বের সময়ে দেশে কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে কিছু বলছেন না।

প্রতিবেশী ভারতের মতো নিষ্ঠুর নারী নির্যাতন বাংলাদেশেও আজ একটি বড় সমস্যা। উগ্র ধর্মান্ধতা এই নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সমস্যাটির মোকাবেলা এবং বাস্তবে নারী নির্যাতন বন্ধ করার জন্য রাজনীতি নিরপেক্ষভাবে সর্বদলীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত এবং সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারকে সাহায্য দানে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানানো দরকার। সরকার যদি এগিয়ে না আসে তাহলে সর্বদলীয় ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তোলা আবশ্যক। তা না করে ক্ষুদ্র, খণ্ড মিছিল-সমাবেশ করে এবং দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের ইস্যু করে নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।

নারী নির্যাতন একটি বড় সামাজিক সমস্যা। এই নির্যাতন বন্ধ করার জন্য একটি বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলন দরকার। নারী মুক্তির জন্য বেগম রোকেয়া থেকে বেগম সুফিয়া কামাল পর্যন্ত নেত্রীদের প্রদর্শিত পথে সংঘবদ্ধ নারী আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নারী সংগঠন এবং শহর কেন্দ্রিক নারী সংগঠনগুলোর দ্বারা নারী নির্যাতনের ব্যাপকতা এবং সহিংসতা সম্পর্কে জনমনে সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলের বহু নারী স্বামী, পরিবারের সদস্য এবং ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা আরও বেশি নির্যাতিত। বহু নারী হয় ফতোয়াবাজির শিকার।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যৌতুক প্রথা, বাল্যবিবাহ রোধসহ নির্যাতন থেকে নারীকে রক্ষা করার বহু সরকারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ হয়নি। একসময় তো কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে অসহায় তরুণীর চোখে-মুখে এসিড নিক্ষেপ নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইভটিজিং এবং তরুণী গৃহ পরিচারিকাকে নির্যাতন ও হত্যা এখনও আমাদের একটি বড় সামাজিক ব্যাধি। তাই নারী নির্যাতনের সমস্যাটিকে সামগ্রিক অর্থে গ্রহণ করে তার প্রতিকারের জন্য সামাজিক চেতনা ও শক্তিকে জাগ্রত এবং সক্রিয় করতে হবে। সরকারের ভূমিকা সেখানে হবে নারীদের রক্ষার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়ন। এই দাবিতেই দল-মত নির্বিশেষে আমাদের সোচ্চার হওয়া দরকার। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা ওঠানোর চেষ্টা করা হলে তা নারী সমাজের কল্যাণের বদলে অকল্যাণই ডেকে আনবে। – যুগান্তর

লন্ডন ১০ এপ্রিল, রোববার, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment