কালান্তরের কড়চা

গণতন্ত্র বনাম ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

 

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

AGC

আমি যখন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’ ছবিটি তৈরি করি, তখন মুর্শিদাবাদ গিয়েছিলাম নবাব আলিবর্দি ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার কবরস্থানে শুটিং করার জন্য। ক্যামেরার কাজ শেষে যখন ভাগীরথী নদীর তীরে একটা চায়ের স্টলে বসে চা খাচ্ছি, তখন আমার এক স্থানীয় সহকর্মী, বিজয়েশ্বর রায় চৌধুরী বললেন, আপনার কি কাশিমবাজার কুঠি দেখার ইচ্ছা আছে? ইচ্ছা থাকলে আজ নয়, আরেক দিন যেতে হবে। আমি সাগ্রহে রাজি হলাম। মুর্শিদাবাদ থেকে একটু দূরে কাশিমবাজার কুঠি। এই কুঠির ইতিহাস জানি। এত কাছে এসে সেই কাশিমবাজার কুঠি দেখে যাব না, তা কি হয়? পরের দিন কাশিমবাজার কুঠিতে গিয়ে কিছুক্ষণ ছিলাম। এই সেই অভিশপ্ত কুঠি, যেখানে বসে বাংলার তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যার চক্রান্ত করা হয়েছিল। মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, জগেশঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ এই কুঠিতে গোপন বৈঠক করতেন। মাঝেমধ্যে আসতেন নবাবের আত্মীয়া ঘসেটি বেগমও। আসতেন ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির রবার্ট ক্লাইভও। নবাবের গোয়েন্দাদের দৃষ্টি এড়াতে তিনি মাঝেমধ্যে পালকিতে চড়ে নারী বেশে আসতেন। বলা হতো, মীর জাফরের পরিবারের মহিলারা বেড়াতে কাশিমবাজারে যাচ্ছেন।

মুর্শিদাবাদের বিজয় চৌধুরী ইতিহাসের শিক্ষক। আবার বাস করেন ইতিহাসের এক পীঠস্থান মুর্শিদাবাদেই। বাংলার ইতিহাস তাঁর নখদর্পণে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘গাফ্ফার সাহেব, বাংলার ইতিহাস একদিকে পরম গৌরবের, অন্যদিকে পরম অগৌরবের। এই অগৌরব হলো, বাংলার রাজনীতি কখনো চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত ছিল না, সেই যদু বংশের রাজত্বকাল থেকে আজ পর্যন্ত। এই যে কাশিমবাজার কুঠি দেখছেন, এই কুঠির বিস্তার কোথায় ছিল না নদিয়া থেকে সোনারগাঁ এবং ঢাকা পর্যন্ত? মোগল আমলে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ যখন বাংলার মোগল-গভর্নর, তখন তাঁকে হত্যার চক্রান্ত হয়েছিল ঢাকার হোসেনী দালান এলাকায়। আত্মরক্ষার জন্য তিনি ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে নিয়েছিলেন মকসুদাবাদে এবং জায়গাটার নতুন নাম করেছিলেন মুর্শিদাবাদ।

বিজয় বাবুর কাছে বাংলাদেশে চক্রান্তের রাজনীতির ইতিহাস শুনতে শুনতে মনে পড়ল হাল আমলের বাংলাদেশের কথা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার জন্যও চক্রান্তের ঘাঁটি কাশিমবাজার থেকে সরে এসেছিল ঢাকায় আগামসিহ লেনের একটি বাড়িতে। মীর জাফরের ভূমিকাটি নিয়েছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তাঁর বাড়িতে গভীর রাতে চক্রান্তকারীদের গোপন বৈঠক বসত। তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর একশ্রেণির ‘একনিষ্ঠ অনুসারীও’ ছিলেন। মাঝেমধ্যে এই বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বোস্টারও আসতেন। পরিচয় গোপন রাখার জন্য তিনি সাধারণ গাড়িতে আসতেন। রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে আসতেন না। তাঁর গাড়িতে রাষ্ট্রদূতের পতাকা থাকত না।

কাশিমবাজার কুঠিতে যেমন তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুসারী আমির চাঁদ বা উমিচাঁদ এসে যোগ দিতেন, নবাব সম্পর্কে বিভিন্ন গোপন খবর চক্রান্তকারীদের জানাতেন, তেমনি বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রেও ঢাকার আগামসিহ লেনের চিহ্নিত বাড়িটির গোপন বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর একজন অত্যন্ত স্নেহের ঘনিষ্ঠ অনুসারী তাহেরউদ্দীন ঠাকুর এসে নিয়মিত হাজিরা দিতেন। দিনে তিনি ছিলেন মুজিবভক্ত, রাতে মোশতাকের অনুসারী। পরে খন্দকার মোশতাক আহমদ যেমন দ্বিতীয় মীর জাফর নামে পরিচিত হয়েছিলেন, তেমনি তাঁর আগামসিহ লেনের বাড়িটিও পরিচিত হয়েছিল দ্বিতীয় কাশিমবাজার কুঠি হিসেবে।

হালে ঢাকায় আরেকটি কাশিমবাজার কুঠির খবর লোকের মুখে মুখে প্রচারিত হচ্ছে। এটি কারওয়ান বাজারে অবস্থিত। ঢাকার এক সাংবাদিক বন্ধুর মুখে কারওয়ান বাজারে এই নতুন কুঠির খবরটা শুনি। তারপর আরো অনেকের মুখে। তাঁরা বলছেন, প্রথম কাশিমবাজার কুঠির ষড়যন্ত্র ছিল একজন নবাবকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য। আর ঢাকার তৃতীয় কাশিমবাজার কুঠির ষড়যন্ত্র হচ্ছে শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নয়, গণতন্ত্রের গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই। বাংলাদেশ এই একুশ শতকেও গণতন্ত্র বনাম ষড়যন্ত্রের রাজনীতি থেকে মুক্ত হয়নি।

এই সাংবাদিক বন্ধুরা বলেন, কারওয়ান বাজারের এই কাশিমবাজার কুঠির একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে চক্রান্তকারীরা বা তাঁদের পরামর্শদাতাদের রাতের গভীর অন্ধকারে আসতে হয় না। তাঁরা দিনে-রাতে সব সময়ই নিজস্ব পরিচয়ে এই কুঠিতে আসেন। কুঠিটা একটি মিডিয়াকেন্দ্র। সুতরাং লোকজনের প্রকাশ্য আসা-যাওয়ায় কোনো অসুবিধা নেই। ফলে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, সংস্কৃতিকর্মী—সবাই আসেন এখানে। তাঁদের মধ্যে মিশে চক্রান্তকারীরা আলাদাভাবে তাঁদের গোপন শলাপরামর্শের কাজটি সারেন। টার্গেট হাসিনা সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারলেই তাঁরা আরেকটি পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেন।

কারওয়ান বাজারের এই কাশিমবাজার কুঠিতে যাঁরা আসেন, তাঁরা সবাই চক্রান্তকারী, তা নয়। বেশির ভাগই আসেন বিভিন্ন কাজকর্মে জড়িত মানুষ। তাঁদের আড়ালে থেকে যাঁরা আসেন তাঁরা হলেন সুজন, কুজন, স্বচ্ছতা বা নীতিনির্ধারক সংলাপ ইত্যাদি নামে পরিচিত সংস্থার কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী হিসেবে খ্যাত ব্যক্তিরা; আসেন নিরপেক্ষতার দাবিদার সম্পাদক, কলামিস্ট ও অর্ধ-নোবেলজয়ীর অনুসারীরা এবং একশ্রেণির বিগ এনজিওর পৃষ্ঠপোষকতায় যাঁরা বিভিন্ন সভা-সেমিনার করে অনবরত সরকারের ছিদ্রান্বেষণ করেন এমন আয়োজকরা। তাঁরা সুধীসমাজ নামেও পরিচিত। একদা পশ্চিমা কূটনীতিকদের দ্বারা গঠিত টিউসডে ক্লাবের সঙ্গেও তাঁদের নিবিড় সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়।

ষড়যন্ত্র পুরনো। কিন্তু যুগে যুগে তার চেহারা পরিবর্তিত হয়। ২০০ বছর আগে ষড়যন্ত্র ছিল স্বাধীনচেতা এক নবাবের বিরুদ্ধে; যিনি দেশি বণিকতন্ত্র ও তাদের বিদেশি পৃষ্ঠপোষক ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কাছে দেশের স্বাধীনতা বিক্রি করতে রাজি ছিলেন না। এ যুগের ষড়যন্ত্র শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে; যে সরকার বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ, বিশ্ব ধনবাদ ও তাদের প্রতিভূ বিশ্বব্যাংকের কাছে সর্বতোভাবে আত্মসমর্পণ করে দেশ চালাতে রাজি নয়। ফলে এই সরকারের বিরুদ্ধে নব্য ধনিক শ্রেণির একটি বিরাট অংশ, বিগ এনজিও, তাদের অনুগৃহীত সুধীসমাজ ও একটি মিডিয়া গ্রুপ অক্সিস গঠন করেছে। পেছনে রয়েছে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের মদদ। বিস্ময়করভাবে এই অক্সিসের সহায়ক শক্তি হিসেবে মাথা তুলছে উগ্র মৌলবাদ।

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়ও দেখা গিয়েছিল এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির প্রকাশ্য চেহারা। বঙ্গভবন ও তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পর্যন্ত এই ষড়যন্ত্র প্রভাবিত করেছিল। তখনো এই ষড়যন্ত্রের কাশিমবাজার কুঠি ছিল কারওয়ান বাজারে। ২০০১ সালে তাদের ষড়যন্ত্র সফল হয়েছিল বলে দেশে গণতন্ত্রের ছাপমারা বিএনপি-জামায়াতের আধা-তালেবানি শাসন দেশের বুকে নেমে এসেছিল। বাংলা ভাইদের অভ্যুত্থান ঘটেছিল। মনে হয়েছিল, বাংলাদেশ বুঝি আরেকটি আফগানিস্তান হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের কপাল ভালো। শত নির্যাতনের মুখে শেখ হাসিনার অনড় অবস্থান কারওয়ান বাজারের কাশিমবাজার কুঠির সব ষড়যন্ত্র ভেস্তে দেয় এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিশাল বিজয়ের অধিকারী হয়। গণতন্ত্রের রাজনীতি ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকে পরাজিত করে।

আশা করা গিয়েছিল, বাংলাদেশে এরপর গণতন্ত্রের রাজনীতি নিরাপদ হবে। বিএনপি নেতারা জামায়াতের বাহুবন্ধন মুক্ত হয়ে নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসবেন এবং দেশে দ্বিদলীয় রাজনীতির সুস্থধারা দেখা দেবে। জনগণের সে প্রত্যাশা পূর্ণ হতে পারেনি। গণতান্ত্রিক বিরোধিতার পথে নয়, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির দ্বারা কিভাবে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় সেই লক্ষ্যে কারওয়ান বাজারের কাশিমবাজার কুঠি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রচারণার মাসলশক্তির জোরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন দোষত্রুটির তিলকে তাল করে কখনো সূক্ষ্ম, কখনো স্থূল প্রচার চালাতে থাকে। উদ্দেশ্য এই সরকারের সব ক্রেডিবিলিটি ধ্বংস করা। পাশাপাশি চলে বিভিন্ন নামে পরিচিত জয়ঢাকগুলোর অবিরাম প্রচারণা।

হাসিনা সরকার এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির মুখে পেছনে না হটে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় কারওয়ান বাজারের কাশিমবাজার কুঠির তত্পরতা এখন প্রকাশ্য অবস্থান থেকে একটু পেছনে সরেছে। কিন্তু উদ্দেশ্য সাধনে তাদের স্থির লক্ষ্য থেকে সরেনি। হাসিনা সরকার একাই লড়ে যাচ্ছে এবং একটার পর একটা সমস্যা ও সংকটের পাহাড় ডিঙাচ্ছে। এই সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে দেশে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বিরোধী দল দরকার। যারা গণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করবে। ষড়যন্ত্রের দ্বারা গণতান্ত্রিক সরকারকে উত্খাতের চেষ্টা চালাবে না।

কাশিমবাজার কুঠির ইতিহাস ও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা যে এখনো চলছে ঢাকার কারওয়ান বাজারের নতুন কুঠি থেকে, এ সম্পর্কে দেশের মানুষকে সচেতন করে তোলা দরকার। দেশের সচেতন মানুষ অবশ্যই চায়, দেশে আওয়ামী লীগের বিকল্প আরেকটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দল গড়ে উঠুক, যে দল সময় হলে আওয়ামী লীগের হাত থেকে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা গ্রহণ করবে। কিন্তু এই ধরনের দল বা জোটের অনুপস্থিতিতে ষড়যন্ত্রের দ্বারা হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো হলে দেশের সামনে বিকল্প কী? দেশে তালেবানি শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশটিকে আফগানিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো বধ্যভূমিতে পরিণত হতে দেওয়া নয় কি?

বাংলাদেশকে যদি এই অভিশপ্ত পরিণতি থেকে রক্ষা করতে হয়, তাহলে ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত তৃতীয় কাশিমবাজার কুঠির ষড়যন্ত্র আমাদের অবশ্যই ঠেকাতে হবে। নিরপেক্ষতার আলখেল্লায় ঢাকা সম্পাদক, কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবী ও সুজন-কুজন, স্বচ্ছতা ও নীতিসংলাপের প্রতিভূদের প্রচারণা ও সভা-সেমিনারের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে দেশের মানুষকে অবিলম্বে সচেতন করে তোলা দরকার। কারওয়ান বাজার কুঠির ষড়যন্ত্রের রাজনীতির হোতাদের মুখোশও জনসমক্ষে উদ্ঘাটিত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অস্তিত্বের স্বার্থেই ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকে গণতন্ত্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে দেওয়া যাবে না। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ১১ এপ্রিল ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment