তৃতীয় মত

পান্তা-ইলিশ খাওয়া নিয়ে কুতর্ক কেন?

আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

AGC

বিতর্ক হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। কুতর্ক হচ্ছে তার উল্টোপিঠ; যা কোনো জাতির প্রাণশক্তি হরণ করে। ব্রিটেনে বলা হয় ডিবেট এবং ডেমোক্রেসি অবিচ্ছেদ্য। কুতর্ক তা নয়। বাংলাদেশে বিতর্কের নামে যা চলে তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কুতর্ক। যে কুতর্ক জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে দেয় না, উন্নত হতে দেয় না। বাংলার প্রাচীন কবি তাই বলেছেন, ‘কুতর্কে কুরঙ্গে মজে বঙ্গ।’ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কুতর্কের দাপট বেড়েছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল তো কুতর্ককেই তাদের রাজনীতির মূলধন করে টিকে আছে।

কুতর্ক আমাদের জাতীয় জীবনের কোথায় নেই? জাতির পিতা, স্বাধীনতার ঘোষক থেকে শুরু করে জাতীয় জীবনের স্বীকৃত ও সম্মত ইস্যুগুলোকেও নিয়ে আমরা কুতর্ক সৃষ্টি করে রেখেছি এবং জাতীয় ঐকমত্য গড়ে উঠতে দিচ্ছি না। গণতন্ত্রের সঠিক বিকাশের জন্য এই জাতীয় ঐকমত্য আমাদের বিশেষ প্রয়োজন।

হালে বাংলা নববর্ষ- পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়েও কুতর্ক শুরু হয়েছে। নববর্ষের উৎসব পালনের সঙ্গে পান্তাভাত ও ইলিশ ভাজা খাওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা অথবা পান্তা ও ইলিশ খাওয়া বাংলা নববর্ষ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য কিনা তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। এটিকেও কুতর্ক বলা চলে। অথচ তা নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে বড় বড় কলাম লেখা হয়ে গেছে। কেউ কেউ যুক্তি দেখিয়েছেন, পান্তাভাত ও ইলিশ মাছ খাওয়ার সঙ্গে বাংলা নববর্ষ উৎসবের কোনো সম্পর্ক নেই।

কেউ কেউ আবার বাংলা নববর্ষ উৎসবে পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ না খাওয়ার পক্ষে অর্থনৈতিক যুক্তি দেখিয়েছেন। বলেছেন, এ সময় ইলিশের চাহিদা এমনভাবে বাড়ে যে, দাম দশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজারে উঠে যায়। ব্যাপকভাবে জাটকা মাছ নিধন শুরু হয়ে যায়। গরমভাতে পানি ছিটিয়ে তাকে পান্তাভাত হিসেবে দশগুণ দামে বিক্রি করা হয়। আমার কথা, এই অর্থনৈতিক সমস্যা ও ব্যবসায়িক দুর্নীতির সঙ্গে নববর্ষে উৎসবের ঐতিহ্যের সম্পর্কটা কি?

বাংলাদেশে কোরবানির ঈদে গরুর দাম অসম্ভব বেড়ে যায়। বাংলাদেশে গরুর অভাব। ভারত থেকে গরু আমদানি করতে হয়। অনেক সময় চোরাপথে গরু আমদানি করতে গিয়ে সীমান্ত রক্ষীদের গুলিতে চোরা আমদানিকারকরা নিহত হয়। তাই বলে এই দাবি তো ওঠেনি যে, কোরবানির ঈদে বাংলাদেশে গরু কোরবানি দেয়া বন্ধ করে দেয়া হোক। একথাও বলা হয়নি যে, ঈদুল আজহার ঐতিহ্য গরু কোরবানি দেয়া নয়। আরবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে উট, দুম্বা ইত্যাদি পশু কোরবানি দেয়া হয়। এই ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আমরা তো বাংলাদেশে উট বা দুম্বা আমদানি করি না। গরু কোরবানি দেয়াটাই রেওয়াজ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষে ইলিশ ভাজা সহযোগে পান্তাভাত খাওয়াটাও একটা রেওয়াজ। উৎসবের অঙ্গ বা ঐতিহ্য নয়। আসলে পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালনও বাঙালির জীবনে একটা নবপ্রবর্তিত উৎসব। আগে এই উৎসব ছিল না। ছিল চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি। এসবের সঙ্গে আবার পূজা-পার্বণেরও একটা যোগ ছিল। ফলে বাঙালি মুসলমান তা পালন করত না।

বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠার পর তাদের ভেতর স্বদেশীয়ানা ও লোকায়ত কৃষ্টির প্রতি আকর্ষণ দেখা দেয়। তারা আগের বৈশাখী মেলা, নবান্ন উৎসব, বসন্ত উৎসব, শারদোৎসব ইত্যাদিকে পূজা-পার্বণের মিশ্রণ থেকে সরিয়ে এনে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেয়। এজন্য ইউরোপীয় কিছু উৎসবও তারা আমদানি করে। ইংরেজি নববর্ষ পালনের কায়দাতেই বাংলা নববর্ষ পালন শুরু হয়। বাঙালি মুসলমানের জীবনে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ ছিল না। ব্রিটিশদের অনুকরণে তা পালন শুরু হয়। এখন মাদার্স ডে (মাতৃদিবস) থেকে শুরু করে ভালোবাসার দিবস পালনেরও ধুমধুমাক্কার দেখা যায়। কেবল ভাই ফোঁটা এবং হোলি খেলার উৎসবটি বাঙালি মুসলমান গ্রহণ করেনি। কারণ সম্ভবত তাতে পূজা-পার্বণের মিশ্রণটা একটু বেশি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই বাঙালি মুসলমান বাংলা নববর্ষের দিনে একে অন্যের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শুরু করে। ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এটাকে ভালো চোখে দেখেননি। তারা বাংলা নববর্ষ পালনকেও ইসলামবিরোধী প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করার পর পাকিস্তানি হানাদাররা বাংলা নববর্ষ উৎসব পালন নিষিদ্ধ করেছিল। তাদের কোলাবয়েটর বাঙালি নেতা, খুলনায় আবদুল সবুর খান ঢাকা বেতার থেকে আবেদন জানিয়েছিলেন, বাঙালি মুসলমানরা যেন বাংলা নববর্ষ পালন না করে। কারণ এটা ইসলামবিরোধী।

এই প্রচারণা ধোপে টেকেনি। বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানি ভাষা বলে প্রচার করতে গিয়ে পাকিস্তানি শাসকরা যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি বাংলা নববর্ষকেও হিন্দুস্তানি উৎসব প্রমাণ করতে গিয়ে তারা ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা নববর্ষ উৎসব পালনে আরও রূপান্তর ঘটে। এ ব্যাপারে ছায়ানট প্রতিষ্ঠান এবং তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হকের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলা নববর্ষ একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় উৎসব হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পুরনো রেওয়াজের সঙ্গে কিছু নতুন রেওয়াজও যোগ হয়। পান্নাভাত খাওয়াটা গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের অভ্যাস ছিল এককালে। বাঙালিয়ানার এই প্রতীকের সঙ্গে বাংলার মাছ ইলিশ খাওয়াকে যুক্ত করে বাংলা নববর্ষ পালন শুরু করে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তরা। তাতে বাংলা নববর্ষ উৎসবের ঐতিহ্যের হানি হয়নি, বরং তার শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে।

তবে এই উৎসব উপলক্ষে ইলিশ মাছের দাম যদি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় কিংবা অবৈধ জাটকা নিধন শুরু হয় তাহলে ইলিশ সহযোগে পান্তা খাওয়ার ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যেতে পারে। কিন্তু পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ ভাজা খাওয়া নববর্ষ উৎসবের অপরিহার্য অংশ কিনা, এ উৎসবের ঐতিহ্য কিনা তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি আসলে কুতর্কে জড়িত হওয়া, যা উৎসবের আনন্দ মাটি করবে, আনন্দ বাড়াবে না।

বাংলা নববর্ষ পালন নিয়ে এই কুতর্ক একশ্রেণীর উগ্র মৌলবাদীকে আবার উৎসাহিত করেছে। তারা আবার বাংলা নববর্ষ উৎসবকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে এই উৎসব পালন বন্ধ করার দাবিতে মুখর হয়েছেন। পাকিস্তানের হানাদারদের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন। বাঙালির নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, উৎসব সবকিছুকেই এরা ইসলামবিরোধী, ধর্মবিরোধী বলে প্রচার করছেন। অথচ মহানবী (সা.) নিজে বলেছেন ‘হক্কুল ওয়াতানে মিনাল ইমান’ (স্বদেশ প্রেম হচ্ছে ঈমানের অঙ্গ)।

এই স্বদেশ প্রেম শুধু দেশের মাটিতে ভালোবাসা নয়, দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকেও ভালোবাসা। সৌদি আরবের মুসলমানের তাই তাদের প্রাচীনকালের অনেক উৎসব পালন করে। পুরনো কালের বাদ্যযন্ত্র ‘দড়’ বাজিয়ে গান-বাজনা করে। ইরানের মুসলমানরা তাদের ইসলাম-পূর্ব যুগের নওরোজ উৎসব (ইরানি নববর্ষ) সাড়ম্বরে পালন করে। ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা হিন্দু ধর্মগ্রন্থের ‘গরুড়’ পাখিকে তাদের জাতীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাতে এসব দেশের মুসলমানদের মুসলমানিত্বের কোনো প্রকার হানি হয়েছে কি?

বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন এখন নানা কুতর্কে জর্জরিত। এই কুতর্কের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত হতে না পারলে আমাদের জাতীয় জীবনে সংহতি ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হবে না। এবং যে সংহতি ও সমঝোতা ছাড়া বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি কিছুতেই শক্তিশালী হতে পারবে না।

বাংলাদেশের সংকটমুক্তি ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য এখন প্রয়োজন জাতীয় আর্থ-সামাজিক উন্নতির কর্মসূচি ও পন্থা নিয়ে সুস্থ বিতর্ক। দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু এখন দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গি মৌলবাদ। এ অভিশাপ থেকে জাতিকে কীভাবে মুক্ত করা যায় তার কর্মপন্থা নির্ধারণ নিয়ে সুষ্ঠু বিতর্ক এবং বিতর্ক শেষে একটি সম্মিলিত কার্যক্রম প্রয়োজন। সেদিকে আমাদের দৃষ্টি কোথায়?

বিতর্কের বদলে আমরা কুতর্কে মেতে উঠেছি। দেশ কী করে অভাব ও দারিদ্র্যমুক্ত হবে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা না করে আমরা অতীতের কিছু ইস্যু- কে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিলেন, কে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং নববর্ষের উৎসব পালন ধর্মবিরোধী কিনা, পান্তাভাত ও ইলিশ ভাজা খাওয়া নববর্ষ উৎসবের ঐতিহ্য কিনা ইত্যাদি নিয়ে কুতর্কে জড়িয়ে রয়েছে। এই কুতর্কের অক্টোপাসের বাঁধন আমাদের চিন্তায় মুক্তি এবং কর্মের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পান্তাভাত ও ইলিশ মাছ খাওয়া নিয়ে কুতর্কে নামাটা হচ্ছে আমাদের চিন্তাভাবনার দৈন্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মনীষীরা বলেন, অর্থসম্পদের দৈন্য একটি জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে চিন্তাভাবনার দীনতা। আমাদের জাতীয় মানস এখন এই দীনতায় ভুগছে। দেশের সচেতন বুদ্ধিজীবীরা এ দৈন্যমুক্তির উপায় খুঁজে বের করুন। নইলে কুতর্কের বেড়াজালে আমাদের সব উন্নতি ও অগ্রগতি বন্দি হয়ে থাকবে। একটি সুস্থবুদ্ধির গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের প্রয়াস সহজে সফল হতে পারবে না। – যুগান্তর

লন্ডন ১৭ এপ্রিল, রোববার, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment