জিয়াউর রহমানের কবর স্থানান্তর নিয়ে বিতর্ক

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGC

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’। বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলে এখন এই খই ভাজার কাজ চলছে মনে হয়। দেশের জনজীবনে সমস্যার অন্ত নেই। এসব সমস্যার যে কোন একটিকে ইস্যু করে বিএনপি রাজনীতির মাঠে নতুন করে নামতে পারে। দেশের মানুষও তা আশা করে। কিন্তু জনগণের এই আশা পূরণের পরিবর্তে বিএনপি নন ইস্যু, মৃত ইস্যু, বানানো ইস্যু নিয়ে তর্জন-গর্জনমূলক কথা বলে তাদের ভাঙা হাট সরগরম রাখতে চায়। তাতে দেশে কি সত্যই কোন সুস্থ রাজনীতি গড়ে উঠবে?

বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে বড় বড় সমস্যা সেগুলো এড়িয়ে গিয়ে জিয়াউর রহমান দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন কিনা, তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন কিনা ইত্যাদি অলীক এবং কষ্টকল্পিত ইস্যু নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতারা এখন ব্যস্ত। বিলাতে তারেক রহমানের অনাদিকালের চিকিৎসা শেষ হবে না। তার কাছে মনে হয় আলাদীনের চেরাগ আছে। বিলাতে বছরের পর বছর ধরে তিনি যুবরাজের মতো বিলাসব্যসনে জীবন যাপন করছেন এবং মাঝে মাঝে লন্ডনের কোন ব্যয়বহুল হলে সভা ডেকে পরিষদ পরিবেষ্টিত অবস্থায় তার নিহত পিতার গুণগান করেন। আগে বলা হয়েছিল, জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক। এখন তার পুত্র আবিষ্কার করেছেন, তার পিতা ছিলেন দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। মূর্খের ইতিহাস চর্চাই হচ্ছে বিএনপির এখন একমাত্র রাজনীতি।

আমি লন্ডনে বিএনপির এক নেতা এবং তারেক রহমানের এক ঘনিষ্ঠ সহকর্মীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বিলাতে গাড়ি-বাড়ি, সিক্যুরিটির ব্যবস্থাসহ সপরিবারে থাকার যে বিরাট খরচ, বছরের পর বছর ধরে তারেক রহমান তা পাচ্ছেন কোথা থেকে? তিনি কোন জবাব দিতে পারেননি। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইসকান্দার মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বিলাতে চলে আসতে বাধ্য হন। বছরখানেক বিলাত বাসের পরই অর্থাভাবে তিনি তার এক ভারতীয় বন্ধুর রেস্টুরেন্টে ম্যানেজারের চাকরি নেন। নাইজিরিয়ার এক প্রেসিডেন্ট সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর লন্ডনে পালিয়ে আসেন। তাকেও রেস্টুরেন্টে বাসন কোসন মাজার চাকরি করতে দেখেছি।

কিন্তু বাংলাদেশের তারেক রহমান বিলাতে বছরের পর বছর যেভাবে আছেন তাতে মনে হয় তিনি কুবেরের ধনের অধিকারী। বছরের পর বছর ধরে সপরিবারে আছেন, কিন্তু তিনি বা তার পরিবারের কেউ কোন ধরনের চাকরি-বাকরি বা ব্যবসা করেন বলে কারো জানা নেই। কথায় বলে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। কোন কাজকর্ম না থাকায় তারেক রহমানের অলস মস্তিষ্কও সম্ভবত ইতিহাসের নামে নানা মিথ্যা তথ্য আবিষ্কারে ব্যস্ত। তার হাওয়া ভবনের আমলের দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে তিনি এখন আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি ও সন্ত্রাস বলে চালাতে চাচ্ছেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সন্ত্রাস ও দুর্নীতি আছে। কিন্তু তা হাওয়া ভবনের রেকর্ড ভাঙতে পেরেছে কি?

হালে বিএনপি একটা নতুন ইস্যু তৈরি করার চেষ্টা করছে। এটা হলো ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে জিয়াউর রহমানের কবর স্থানান্তরের একটা প্রস্তাব। এটা এখনো চিন্তাভাবনার স্তরে রয়ে গেছে। জিয়াউর রহমানের প্রতি অসম্মান দেখানোর জন্য নয়, একটি বাস্তব কারণেই তার সমাধি বর্তমান স্থান থেকে সরানোর কথা উঠেছে। স্থপতি লুই কান জাতীয় সংসদ ভবনের জন্য বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নক্সা প্রণয়ন করেছিলেন, সেই নক্সাকে অগ্রাহ্য করে জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ চট্টগ্রামের প্রথম কবর থেকে তুলে এনে তড়িঘড়ি জাতীয় সংসদের পরিকল্পিত এলাকায় দাফন করা হয় এবং সেই কবরকে কেন্দ্র করে একটা কমপ্লেক্সও গড়ে তোলা হয়। তাতে লুই কানের মূল পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য দুই-ই নষ্ট করা হয়েছে। সুতরাং, জিয়াউর রহমানের কবর যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে অন্যত্র সরানোর কথা উঠেছে। বিএনপি এটা নিয়েই এখন হৈ চৈ শুরু করেছে।

প্রথম কথা, জাতীয় সংসদ ভবনের জন্য পরিকল্পিত এলাকায় জিয়াউর রহমান কেন, কারো স্মৃতিসৌধ তৈরি করা উচিত নয়। উচিত মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের যে বিশেষ ভূমিকা ছিলো, সে জন্যে রাজধানীর অন্য কোনো স্থানে অথবা মুক্তিযুদ্ধে তার অন্য সহকর্মীদের জন্যও একটা সমাধিস্থল নির্দিষ্ট করে সেখানে জিয়াউর রহমানকেও সমাহিত করা। প্যারিসে যারা ‘ন্যাশনাল পেনথিউ’ দেখেছেন, তারা জানেন, রুশো, ভল্টেয়ার থেকে শুরু করে ফ্রান্সের বহু জাতীয় বীর ও মনীষীর সমাধি এখানে রয়েছে। পাশেই নেপোলিয়নের সমাধিসৌধ। এই মনীষী ও জাতীয় বীরদের মৃত্যুর পর কবর হয়েছিল ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে। পরে তাদের কবর তুলে এনে ন্যাশনাল পেনথিউতে স্থাপন করা হয়। এটি এখন প্যারিসের একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

বাংলাদেশেও এমনটাই হওয়া উচিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সমাধিস্থল হিসেবে প্যারিসের ন্যাশনাল পেনথিউর মতো একটি জাতীয় সমাধিস্থল গড়ে তোলা আবশ্যক ছিল। মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কবরস্থানের পাশে এই ধরনের আরেকটি কবরস্থান তৈরি হতে পারতো। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ক্ষমতার হাত বদলের পর জিয়াউর রহমানের আমলে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী অনেকের কবর মর্যাদাজনক স্থানে দেয়া শুরু হয়। জাতিকে কলঙ্কিত করা হয়।

জাতির পিতার সমাধি ঢাকায় হয়নি। ওয়াশিংটনে জর্জ ওয়াশিংটনের সমাধিসৌধের মতো ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর জন্য সমাধিসৌধ হওয়া উচিত ছিল। পঁচাত্তরের ঘাতকরা সে কাজটি হতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে বনানীতে নিয়ে গণকবর দেয়া হয়েছে। স্বাধীনতার যুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং জিয়াউর রহমান যাদের অধীনস্থ সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেছেন, সেই তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামানকে হত্যার পর বনানীতে সাধারণভাবে কবর দেয়া হয় (কামরুজ্জামানের মৃতদেহ রাজশাহীতে নিয়ে যাওয়া হয়)। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘকাল পর ক্ষমতায় এসে এই কবরগুলোর উন্নত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু তাদের মর্যাদা অনুযায়ী কোনো মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স এখানে গড়ে ওঠেনি।

জাতির পিতা এবং জাতির মহানায়কদের প্রতি এই ধরনের অবজ্ঞা দেখানোর পর জিয়াউর রহমানের অনুসারীরা (ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়া তার দলটি) এক খলনায়ককে জাতির শ্রেষ্ঠ নেতা বাননোর রাজনৈতিক মতলব নিয়ে তার মৃতদেহ জাতীয় সংসদ সংলগ্ন এলাকায় দ্বিতীয়বারের জন্য সমাহিত করে তার ওপর বিরাট কমপ্লেক্স তৈরি করে। রমনার মাঠে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য সেখানে তৈরি করা হয়েছিল জিয়া শিশু উদ্যান। তারপর জিয়াউর রহমানের নামে রাস্তাঘাট, বিভিন্ন স্থানের নামকরণের ধুম পড়ে যায়। জাতির পিতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সারির অন্য কোনো নেতার নামের বদলে জাতীয় সংসদের কোনো অনুমোদন ছাড়াই ঢাকায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম রাখা হয়েছিল জিয়া বিমান বন্দর। এই ধৃষ্টতার কোনো তুলনা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে নেই।

মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত নেতাদের নাম মুছে ফেলে বিভিন্ন স্থানের নতুন নামকরণের ব্যবস্থাও বিএনপি সরকার প্রথম গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধের নেতাদের নাম অপসারণে দেশের মানুষ যাতে ক্ষুব্ধ না হয়, সে জন্যে ধর্মীয় নেতাদের নাম সেখানে বসানো হয়। যেমন চট্টগ্রাম বিমান বন্দরের পরিচিতি ছিল চট্টগ্রাম বেতার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রথম প্রচারকারী আওয়ামী নেতা আবদুল হান্নানের নামে। বেগম জিয়ার সরকার সেই নাম মুছে ফেলে। ঢাকা বিমান বন্দরেও জিয়াউর রহমানের নাম যুক্ত করা হয়েছিল ক্ষমতার জোরে। বিএনপি ক্ষমতায় বসে জাতির অনুমোদন না নিয়েই এ কাজটি করেছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিএনপির পন্থা অনুসরণ করেই ঢাকা বিমান বন্দর থেকে জিয়াউর রহমানের নামটি অপসারণ করে সেখানে হযরত শাহজালালের (র:) নাম যুক্ত করেছে। বলা চলে ইঘচ রং নবরহম ঢ়ধরফ নু রঃং ড়হি পড়রহ বিএনপির অন্যতম নেতা রিজভি সাহেব সম্প্রতি হুমকি দিয়েছেন, জিয়াউর রহমানের সমাধি স্থানান্তর করা হলে তারা গণআন্দোলন গড়ে তুলবেন। তিনি যদি রাজনীতিতে দূরদর্শী নেতা হতেন তাহলে বলতেন, জাতীয় সংসদ জাতির সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তার মর্যাদা রক্ষার জন্যই জিয়াউর রহমানের দেহাবশেষ সরিয়ে নিয়ে এমন স্থানে সমাহিত করা হোক যেখানে মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য সেক্টর কমান্ডারদের সমাধিস্থল সংরক্ষিত রাখা হবে। এবং এই সমাধিস্থল হবে ঢাকার ন্যাশনাল প্যানথিউ, তাতে জিয়াউর রহমানের মর্যাদা বাড়বে। ক্ষমতা অপহরণকারী সামরিক ডিক্টেটর হিসেবে তার ইতিহাস অনেকে বিস্মৃত হবেন।

সমাধি স্থানান্তরের মধ্যে অমর্যাদার কোনো প্রশ্ন নেই। অবিভক্ত ভারতের মুসলমানদের অবিসম্বাদিত নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর লন্ডনে মৃত্যুবরণ করলে তাকে লন্ডনেই সমাহিত করা হয়। পরে তার সমাধি জেরুজালেমে হযরত ওমরের (রা.) মাজারের পাশে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে ঢাকায় জিয়াউর রহমানেরও কবর স্থানান্তরে তার প্রতি অসম্মান দেখানো হবে না। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সারির নেতাদের স্মৃতি সংরক্ষণের যেখানে যথাযথ ব্যবস্থা এখনো হয়নি সেখানে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী একজন মাত্র সেনা কর্মকর্তার (পরে বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রপ্রধান) নামে বিভিন্ন স্থানের নামকরণের এত ছড়াছড়ি শোভন নয়, সঙ্গতও নয়।

ক্ষমতার জোরে জিয়া পত্নী সেনানিবাসের একটি বাড়িতে স্থায়ী বসবাসের এবং তার রাজনীতির প্রধান কেন্দ্র করে তুলেছিলেন। সেনাবাহিনী ও সেনানিবাসকে রাজনীতির সঙ্গে যে যুক্ত রাখা ঠিক নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক এই সত্যটা বেগম জিয়া বুঝে উঠতে চাননি। তাকে শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে সেনানিবাসের বাড়ির দখল ছাড়তে হয়েছিল। তখনো বিএনপি নেতারা হুঙ্কার দিয়েছিলেন, বেগম জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হলে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। এটা অসারের তর্জন-গর্জন বলেই প্রমাণিত হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ছাড়তে হয়।

ঢাকা বিমান বন্দরের নাম যখন বদল করা হয় তখনো বিএনপি নেতারা কম গর্জন করেননি। কিন্তু বিমান বন্দরের নাম শান্তিপূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিএনপি যে এসব ব্যাপারে তর্জন-গর্জন করেও কিছু করতে পারেনি তার বড় কারণ, বিএনপির অন্যায় কাজগুলোর বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ ছিল এবং তারা এই পরিবর্তনগুলো কামনা করছিল। ফলে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি সেনানিবাসকে ফিরিয়ে দেয়া থেকে ঢাকা বিমান বন্দরের নাম বদল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কোনো পদক্ষেপেরই বিরোধিতা করে বিএনপি কোনো গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। যদি জিয়াউর রহমানের কবর বর্তমান স্থান থেকে মর্যাদার সঙ্গে অন্য কোনো স্থানে সারানো হয় তাহলেও জনমনে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে না। বরং দেশের মানুষ এই ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে যে, একটি অন্যায় কাজের প্রতিকার হলো এবং তাতে জাতি গ্লানিমুক্ত হবে। – জনকন্ঠ

[লন্ডন ১৯ এপ্রিল মঙ্গলবার, ২০১৬]

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment