আসল টার্গেট শেখ হাসিনা, বর্তমানে রিহার্সাল চলছে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGC 2

 

রাজশাহীর মাটিতে অধ্যাপক রেজাউল করিমের রক্ত এবং ঢাকার মাটিতে নাজিমুদ্দিন সামাদের রক্ত না শুকাতেই ঢাকার কলাবাগানে একই সঙ্গে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। নিহত ব্যক্তিদের একজন হলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির আত্মীয়, অপরজন তার বন্ধু। তৃতীয় আক্রান্ত ব্যক্তি সিকিউরিটি গার্ড। তিনি অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। তবে গুরুতর আহত। হত্যা প্রক্রিয়া আগেরগুলোর মতোই এবং হত্যাকারীরা আগের মতোই বহাল তবিয়তে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। আমার এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত পুলিশ কাউকে ধরতে পারেনি।

আমি গত দু’দিন ধরেই (আমার অন্যান্য কলামে) লিখছি, এই হত্যাকাণ্ড ধর্মের অবমাননার জন্য নয় এবং আইএসের কর্মকান্ডও নয়। আইএসের সমর্থন এই হত্যাকান্ডের পেছনে থাকতে পারে; তবে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছে জামায়াত-শিবির এবং তাদের সহযোগী উগ্র মৌলবাদী দলগুলো। বিএনপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা রাজপথে পেট্রোলবোমার সন্ত্রাস চালিয়ে সরকার উচ্ছেদ করতে পারেনি; শেখ হাসিনাকে গদি থেকে টেনে নামাতে পারেনি, বরং শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাদের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক ফাঁসিতে লটকাচ্ছেন। এজন্য প্রতিশোধ গ্রহণে তারা বদ্ধপরিকর। প্রকাশ্য সন্ত্রাস ব্যর্থ হওয়াতে তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে সরে গেছে। সেখানে বসে তারা চালাচ্ছে এই গুপ্তহত্যার অভিযান। দেশবাসীর মনে ভয় ও বিভীষিকা সৃষ্টির জন্য সাধারণ মানুষ, স্বল্পখ্যাত ব্লগার, মুক্তমনা সংস্কৃতিসেবী ও বিদেশী নাগরিকদের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের টার্গেট করেছে। ধর্মের অবমাননাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে।

কিন্তু এদের আসল টার্গেট কে, এই সত্যটা সম্ভবত বর্তমান সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা এখনও বুঝে উঠতে পারেননি। তাই এই ঘাতকদের ধরা এবং শাস্তি দানের ব্যাপারে তাদের গড়িমসি ভাব লক্ষ্য করছি। কিন্তু দেশের অনেক প্রাজ্ঞ ব্যক্তিই জানেন এবং বোঝেন এই পৌনঃপুনিক হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য কী এবং আসল টার্গেট কে? কেবল সাহস সঞ্চয় করে কথাটা তারা বলতে পারছেন না। আমার আজকের লেখায় এই সাহসটাই দেখাতে চাই এবং যে কথা কেউ উচ্চারণ করতে চান না সেই অপ্রিয় সত্যটি উচ্চারণ করতে চাই। জনকণ্ঠ সম্পাদক যদি দয়া করে আমার এই লেখাটি ছাপেন এবং আমার এই সতর্কীকরণ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের চোখে পড়ে তাহলেই এই ভেবে খুশি হব যে, জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে অন্তত একটি বড় দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।

দেশের শহরগুলোতে পেট্রোলবোমায় নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যার পর এখন যে এই টার্গেটেও কিলিং চলছে, এগুলো আসলে রিহার্সাল। এর মূল টার্গেট শেখ হাসিনা। আন্দোলন ও সন্ত্রাস দ্বারা শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো যাবে না; পঁচাত্তরের মতো সেনাবাহিনীর একাংশকে বিভ্রান্ত করে হত্যাকাণ্ডে সহযোগী করা যাবে না, কিংবা ২০০৪ সালের মতো প্রকাশ্য জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে নিধন করা যাবে না এই উপলব্ধি থেকেই এই টার্গেটেড কিলিংয়ের রিহার্সাল শুরু করা হয়েছে। শেখ হাসিনা যতই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে থাকুন না, এই গুপ্ত ঘাতকদের বন্দুকের তাক থেকে তিনি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবেন না বলেই হয়ত তারা আশা করছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতও তো কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ছিলেন।

আলামতগুলো স্পষ্ট। পঁচাত্তরের আলামতগুলো কি এখন কারও চোখেই ধরা পড়ছে না? বিপুল জনপ্রিয়তার অধিকারী শেখ মুজিবকে আন্দোলন করে ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। নির্বাচনে হারানো যাবে না, সুতরাং শুরু হলো হত্যাপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টির নিপুণ পরিকল্পনা। প্রকাশ্য হত্যা ও গুপ্তহত্যা দুই-ই শুরু হলো। শুরু হলো রিলিফের দ্রব্য লুটপাট, নদীতে ভাসিয়ে দেয়া। রহস্যময় ম্যান ছেরুমিয়ার আবির্ভাব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্টুডেন্টস হলের সামনে ব্রাশফায়ারে সাতজন ছাত্রনেতা হত্যা। তোপখানা রোডে তখনকার মার্কিন তথ্য কেন্দ্রের সামনে লোক খুন করে লাশ ফেলে রাখা। মাওবাদী নামে চিহ্নিত বহু সন্ত্রাসী গ্রুপের আবির্ভাব। দক্ষিণ বাংলায় তাদের তাণ্ডব। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর সরকার বিরোধী জোট (এখনকার সুশীল সমাজের মতো) গঠন। সাম্র্রাজ্যবাদীদের সহযোগিতায় বাংলাদেশে ম্যানমেড দুর্ভিক্ষ। ইত্যাদি বহু ঘটনা তখন পর পর ঘটতে থাকে। মতিঝিলে সন্ত্রাসীদের হামলা প্রতিরোধের জন্য শেখ কামাল নিজেই এগিয়ে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। প্রচার করা হয় শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়েছিলেন।

প্রচার, ষড়যন্ত্র, প্রকাশ্য ও গুপ্তহত্যা সব মিলিয়ে দেশে এক ভয়াবহ অরাজক অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা চলছিল। উদ্দেশ্য, বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা ধ্বংস করা, তার সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করা এবং দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে প্রমাণ করা বঙ্গবন্ধুর সরকার দেশ শাসনে অক্ষম। এভাবে বঙ্গবন্ধুর ওপর জন-আস্থা নষ্ট করে সহসা তাকে হত্যা করে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হলে দেশের জনগণ বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাবে না এবং চক্রান্তকারীরা ক্ষমতা দখল করলে তা প্রতিরোধের জন্য এগিয়ে যাবে না, চক্রান্তকারীদের এই আশা অবশ্য সর্বাংশে পূর্ণ হয়নি।

পঁচাত্তরের এই আলামতগুলো এখন আরও স্পষ্ট। এবং তার চেহারাটা আরও ভয়াবহ। তা কি আওয়ামী লীগের সচেতন নেতাকর্মী এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির শিবির লক্ষ্য করছেন না? শেখ হাসিনা এখন পিতার সঙ্গে তুলনীয় জনপ্রিয়তা অনেকটাই অর্জন করেছেন। দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দিয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াত শক্তিশালী জোট গঠন করে এবং তাদের বিদেশী পৃষ্ঠপোষকদের মদদ নিয়েও হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটাতে পারেনি। হেফাজতী অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং নির্বাচনের মাধ্যমেও আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানো যাবে এই আশা জামায়াত-বিএনপি শিবিরে ক্রমবিলীয়মান।

সুতরাং এই গুপ্তহত্যা বা টার্গেটেড কিলিংয়ের পরিকল্পনাটি উদ্ভাবিত হয়েছে। এই ধরনের পরিকল্পনা মিসরে এবং চিলিতে বাস্তবায়নের ইতিহাস আমাদের জানা। মিসরে জামাল নাসের ক্ষমতায় থাকাকালে সেখানকার উগ্র মৌলবাদী দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে কঠোরহাতে দমন করেন এবং তাদের নেতা সাইয়িদ কুতুবকে ফাঁসি দেন। ফলে নাসেরের আমলে মৌলবাদীরা মিসরে মাথা তুলতে পারেনি। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত তার ক্ষমতার স্বার্থে এই মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দিতে থাকেন। বাংলাদেশের মতোই মৌলবাদীরা যখন গুপ্তহত্যার পথ ধরে, তখন সাদাত ভেবেছিলেন, ওরা নাসেরপন্থী সেক্যুলারিস্টদের হত্যা করছে (বাংলাদেশে নাস্তিকদের হত্যা করা হচ্ছে ভাবার মতো)। তার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট সাদাতই তাদের হাতে নিহত হন।

চিলিতেও সিআইএর নীলনকশা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট আলেন্দের জনপ্রিয়তা ধ্বংস করার জন্য গুম-খুন ও গুপ্তহত্যা ব্যাপকভাবে শুরু করা হয়। চার্চ এবং বুদ্ধিজীবী, এমনকি শ্রমিক সংস্থাগুলোর এক অংশকেও আলেন্দের জনপ্রিয়তা ধ্বংস করার প্রচারে কাজে লাগানো হয়। এভাবে আলেন্দে সরকার দেশ শাসনে অক্ষম এই প্রচারণা তুঙ্গে তোলার পর তাকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার আগেই চিলিতে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল।

বাংলাদেশে যাতে এই অবস্থার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, হাসিনাবিরোধী চতুর্ভুজ ষড়যন্ত্র যাতে সফল না হয় সেজন্যে দলমত নির্বিশেষে সচেতন মানুষমাত্রকেই সতর্ক ও সক্রিয় হতে হবে। একদিকে উগ্র মৌলবাদীদের দ্বারা এই অবিরাম টার্গেটেড কিলিং চালিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে হাসিনা সরকার দেশে অরাজকতা ঠেকাতে এবং দেশ শাসনে অক্ষম। এই মৌলবাদী চক্রান্তের পক্ষে নিজেদের জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে সহায়ক ভূমিকা গ্রহণ করেছে দেশের একটি সুবিধাভোগী সুশীল সমাজ এবং নিরপেক্ষতার ছদ্মবেশধারী একটি মিডিয়া গ্রুপ। কামাল-ইউনুস এ্যান্ড কোং সাগ্রহে দিন গুনছেন কবে হিলারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে বসে তাদের কপালে রাজটীকা পরাবেন। (অনেকে অবশ্য বলছেন এই দুরাশা পূর্ণ হওয়ার নয়। হিলারি ক্ষমতায় গেলে ভারতের মোদির পথ অনুসরণ করবেন)।

এই চতুর্ভুজ চক্রান্তের শেষ ভুজে আছে বিএনপি ও তাদের প্রোমোটেড নেতা তারেক রহমান। তিনি বিদেশে বসে ইতিহাসের নামে মিথ্যা এবং চক্রান্তের জাল ছড়াচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে এখন একটি বড় অভিযোগ উঠেছে, শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদকে অপহরণ চেষ্টায় জড়িত থাকার যে অভিযোগে আমার বন্ধু শফিক রেহমান সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন, এই কথিত চক্রান্তেরও মূল হোতা তারেক রহমান। অবশ্য বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে বলার কিছু নেই। তদন্ত এবং আদালতের বিচারেই এই অভিযোগ কতটা সত্য এবং সত্য হলে এই চক্রান্তে দল হিসেবে বিএনপি কতটা জড়িত তা জানা যাবে।

বাংলাদেশে ঘটনা যেভাবে দ্রুত গড়াচ্ছে, তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না চতুর্ভুজ ষড়যন্ত্র কিভাবে চারদিকে তার ভয়ঙ্কর বাহু প্রসারিত করছে। এই ষড়যন্ত্র-সমষ্টির টার্গেট শেখ হাসিনা। তাকে ধ্বংস করা গেলে শুধু আওয়ামী লীগ ধ্বংস হবে না, দেশে নিভু নিভু গণতন্ত্রের প্রদীপটি নিভে যাবে। পঁচাত্তরের পরের চাইতেও গভীর অন্ধকার নেমে আসবে দেশে। বাংলাদেশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো কিলিং ফিল্ডে পরিণত করা কোনভাবেই প্রতিরোধ করা যাবে না।

সুতরাং বর্তমানের টার্গেটেড কিলিংগুলো যে আরও বড় কিলিং ঘটানোর রিহার্সাল এবং এর আসল টার্গেট শেখ হাসিনা এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সরকার ও দল এবং দেশের ছোট-বড় সকল গণতান্ত্রিক দল, দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীরা সময় থাকতে সতর্ক হোন এবং এই ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হোন। এই টার্গেটেড কিলিং অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং কিলারদের ঘাঁটিগুলোর উচ্ছেদ করতে হবে। এই ব্যাপারে আর দেরি করা ঠিক হবে না। – জনকন্ঠ

লন্ডন ২৬ এপ্রিল, মঙ্গলবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment