কালের আয়নায়

আক্রান্ত গণতন্ত্র ও ভীতির রাজত্বের উৎস

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

Image

আমাদের এক প্রবীণ বাম কলামিস্ট (এবং রাজনীতিবিদও) ঢাকার একটি কাগজে সম্প্রতি একটি কলাম লিখেছেন। প্রতিপাদ্য বিষয়, বাংলাদেশে ভীতির রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ভয়ের রাজনীতির সংস্কৃতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। লেখাটির শিরোনাম দেখে পড়তে আগ্রহী হলাম। মনে হলো দেশে পর পর যে তিনটি চাপাতি হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল সম্ভবত তা নিয়েই প্রবীণ বাম কলামিস্ট লিখেছেন। যদি লিখে থাকেন, তাহলে আমি তার সঙ্গে সহমত পোষণ করি যে, দেশে ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী সত্যিই ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছে। এবং একথা দুঃখের হলেও সত্য, সরকার দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। আর নিরাপত্তা না থাকলে দেশের মানুষ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে কী করে? এদিক থেকে সুলতানা কামাল একটি সঠিক কথাই বলেছেন, ‘নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন অর্থহীন।’

বাম কলামিস্টের লেখাটি তাই অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পড়লাম। পড়ে দেখি আমার ধারণাটি সত্য নয়। তিনি চাপাতি সন্ত্রাস নিয়ে লেখেননি। তিনি তার লেখায় দেখিয়েছেন বর্তমান সরকারই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর জেল-জুলুম, কঠোর দমননীতি চালিয়ে দেশে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিএনপি নেত্রীর উপদেষ্টা এবং প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানের সাম্প্রতিক গ্রেফতার এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা দায়েরের কথা বলেছেন।

আমি তার লেখাটা পড়ে একটু হতাশ হয়েছি। তিনি একজন বামপন্থী চিন্তাবিদ। কিন্তু গত চার দশক ধরে তার সহানুভূতি চরম ডানপন্থিদের দিকে। এবং তার সব আক্রোশ মধ্যবাম (হালে মধ্যডানের দিকে হেলে পড়া) আওয়ামী লীগের প্রতি। তার লেখার পাঠকদের কেউ কেউ বলেন, এর কারণ রাজনৈতিক হতাশা থেকে মানসিক ভারসাম্যহীনতা। তার সম্পর্কে এই ধরনের ধারণা কতটুকু সত্য জানি না। তবে তার আলোচ্য কলামটি পড়ে মনে হলো তিনি উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়েছেন। দেশে যে চাপাতি-সন্ত্রাস ভয়ানক ভীতির সৃষ্টি করেছে, তাকে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি একজন সাংবাদিকের গ্রেফতার হওয়াটাকেই বড় করে তুলে ধরেছেন। তার লেখাটি পড়লে মনে হয় বর্তমান সরকারই সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী। দেশে যারা কুপিয়ে মানুষ হত্যা করছে, তারা ততটা ভীতির কারণ নয়।

প্রবীণ বাম কলামিস্ট তার লেখায় আরও একটি প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার চেষ্টা করা হলে সেটাকে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অপরাধ বলে গণ্য করা যায় কি না? তিনি যায় না বলেই রায় দিয়ে সরকারকে এই ব্যাপারেও এক হাত নিয়েছেন। আমার মনে হয়েছে, তার এই একচক্ষু হরিণের মতো দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা ঠিক হয়নি। দেশে বর্তমানে যে ভীতির রাজত্ব চলছে তার উৎস সম্পর্কেও তিনি তার লেখায় বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। আক্রান্ত গণতন্ত্রের সবল আত্মরক্ষার নীতিকে তিনি বলছেন সন্ত্রাস। আর যারা দেশে বিশেষ উদ্দেশ্যে- বিশেষ করে গণতন্ত্র ও মুক্তচিন্তার অধিকার নস্যাৎ করার জন্য বর্বর হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে তাদের অপরাধকে তুলনামূলকভাবে লঘু করে দেখাচ্ছেন। একজন বামপন্থি প্রবীণ কলামিস্টের কাছ থেকে এই ধরনের মতিভ্রম আশা করা যায় কি?

শফিক রেহমানের গ্রেফতারের বিষয়টি অবশ্যই দুঃখজনক। আমি তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত বন্ধু হিসেবে কামনা করি, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো যেন সত্য প্রমাণিত না হয় এবং তিনি শিগগিরই মুক্তি লাভ করেন। কিন্তু তাকে সাংবাদিক হিসেবে এবং তার কোনো লেখার জন্য গ্রেফতার করা হয়নি। করা হয়েছে একটি ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে। শফিক রেহমানের এখন বড় পরিচয় তিনি বিএনপি-ঘরানার রাজনীতিক। তিনি বিএনপি নেত্রীর একজন ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা, তার বক্তৃতা-বিবৃতির প্রধান ঘোস্ট রাইটার এবং বিএনপির একজন নীতিনির্ধারকও।

তিনি বিএনপি-সমর্থক একজন সাংবাদিক হলে আপত্তি নেই, বিএনপির সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিক হলেও আপত্তি নেই। কিন্তু বিএনপি-রাজনীতির একটা দিক হলো ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। যে রাজনীতির সঙ্গে দশ ট্রাক অবৈধ অস্ত্র আমদানি, কিবরিয়া-আহসানউল্লা মাস্টার হত্যা; শেখ হাসিনার জীবননাশের জন্য ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ইত্যাদির যোগাযোগ থাকার অভিযোগ রয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির হেডকোয়ার্টারটি এখন লন্ডনে। এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির সঙ্গে শফিক রেহমান যদি কোনোভাবে জড়িত হয়ে থাকেন, তাহলে তার বিচার হতেই পারে। এক্ষেত্রে তার বিচার হবে ষড়যন্ত্রের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার জন্য, তার সাংবাদিকতার জন্য নয়। এ ক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব পথে চলবে। কেউ দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি বলে তিনি রেহাই পাবেন না।

আমার দেশ পত্রিকার মাহমুদুর রহমান সম্পর্কেও একথা সত্য। তিনি তো আবার একজন প্রকৃত সাংবাদিকও নন। আদালতের মন্তব্য অনুযায়ী হঠাৎ সম্পাদক। উত্তরা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তার নাম ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং অভিযোগ রয়েছে তিনি ষড়যন্ত্রের রাজনীতি সফল করার জন্য হঠাৎ সম্পাদক বনে গিয়েছিলেন। তাকে গ্রেফতার করাকে সাংবাদিক-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে বলা হলে একটু বেশি বলা হয়।

এই ব্যাপারে অতীতের একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হওয়ার পর বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উদ্ভূত বিভিন্ন জটিল সমস্যা সমাধানকল্পে সিমলায় ইন্দিরা-ভুট্টো বৈঠক হয়। একটি সিমলা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। এই বৈঠকে তিন দেশেরই বহু সাংবাদিক গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রয়াত সাংবাদিক আতিকুল আলমও ছিলেন। তিনি বহুদিন ছিলেন লাহোরের পাকিস্তান টাইমস পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরোর প্রধান। পরবর্তীকালে বিবিসিরও বাংলাদেশ প্রতিনিধি ছিলেন।

আতিকুল আলম একটু পাকিস্তানঘেঁষা সাংবাদিক ছিলেন। ভারতীয় গোয়েন্দারা অভিযোগ তোলে তিনি সিমলায় সাংবাদিকতার আড়ালে পাকিস্তানের জন্য গুপ্তচরগিরি করছিলেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশে ফিরে এলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এই সময় আমি ছিলাম ঢাকার একটি বাংলা দৈনিকের সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের সভাপতি। আমি আতিকুল আলমের মুক্তি দাবি করে একটি সম্পাদক প্রতিনিধি দল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। বঙ্গবন্ধু আমাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তোমরা একজন সাংবাদিকের মুক্তি চাও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু তোমরা কি একজন গুপ্তচরেরও মুক্তি চাও?’

আমি সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। সেই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নির্যাতন বরণেও রাজি আছি। কিন্তু কেউ যদি সাংবাদিকতার মুখোশের আড়ালে দেশ ও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী অপরাধ করে, তাহলে সাংবাদিক পরিচয়ের ঢাল ব্যবহার করে তাকে রক্ষা করার নীতিতে বিশ্বাসী নই। ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনাম সাংবাদিকতার নীতিমালা ভঙ্গ করেছেন একথা সত্য। কিন্তু এই ব্যাপারে স্বীকারোক্তির পর তার বিরুদ্ধে একটার পর একটা মামলা দায়ের করা সঠিক কাজ হয়নি। মাহফুজ আনামকে হয়রানি করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়নি। বামপন্থী কলামিস্ট সাংবাদিক-দলনের উদাহরণ হিসেবে স্টার-সম্পাদকের নামটি অযথাই টেনে এনেছেন।

এবার মূল প্রশ্নে আসি। বর্তমানে বাংলাদেশে যে ভীতির রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তার উৎস কি সরকার, না জঙ্গি গোষ্ঠীর চাপাতি-বর্বরতা? এই চাপাতি-বর্বরতার উদ্ভাবক জামায়াতের সঙ্গে কি বিএনপির দু’দিন আগেও প্রকাশ্য সখ্য ছিল না এবং তারা কি পেট্রোল বোমায় নিরীহ নাগরিককে পুড়িয়ে মারার অভিযান শুরু করেনি? এই বর্বর হত্যাযজ্ঞের মোকাবেলায় কোনো সরকারের পক্ষে নিষ্ক্রিয় ও নীরব থাকা সম্ভব কি?

এই ‘গণহত্যার’ মোকাবিলায় সরকারকে কঠোর হতে হয়েছে। এই সন্ত্রাস এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল যে, সরকার যদি বিএনপি ও জামায়াত দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করত, তাহলে তাও অন্যায় হতো না! ভারতে নেহরুর মতো গণতান্ত্রিক নেতাও পঞ্চাশের দশকের সূচনায় পশ্চিমবঙ্গে কম্যুনিস্ট সন্ত্রাসের (ইয়ে আজাদি ঝুটা হায় মুভমেন্ট) মুখে কম্যুনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে হাজার হাজার কম্যুনিস্ট নেতা ও কর্মীকে কি জেলে ঢোকাননি? কেউ বলেনি, নেহরু ভারতে ভীতির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই নেহরুই পরবর্তীকালে কম্যুনিস্ট পার্টি সন্ত্রাসের পথ ত্যাগ করলে কেরল রাজ্যে তাদের কম্যুনিস্ট সরকার গঠন করতে দিয়েছিলেন।

২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে ও পরে বাংলাদেশে বিএনপি ও জামায়াত আন্দোলনের নামে যে ভয়াবহ সন্ত্রাস শুরু করেছিল, তা কঠোর হাতে মোকাবেলা না করলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে যে নাজুক কাঠামোটি এখনও টিকে আছে, তা টিকে থাকত না এবং জঙ্গিদের উপদ্রবে বাংলাদেশে পাকিস্তানের মতো নিত্য রক্তগঙ্গা বইত। এখনও তা বইছে, তবে সীমিতভাবে। পেট্রোল বোমা হামলা এখন চাপাতি-সন্ত্রাসে রূপান্তরিত হয়েছে। আমার কথিত বামপন্থী কলামিস্ট বন্ধুদের মতো ‘গণতন্ত্র প্রেমিকদের’ খুশি করার চেষ্টা না করে বর্তমান সরকার যদি আরও কঠোরতার সঙ্গে এই চাপাতি-সন্ত্রাস দমনেরও ব্যবস্থা করে, তাহলে মানুষ জানে বাঁচবে, গণতন্ত্র রক্ষা পাবে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের চশমায় বিচার করা চলবে না। পশ্চিমের গণতন্ত্র স্থিতিশীল গণতন্ত্র, তার ওপর বারবার হামলা হয় না; তার বিরুদ্ধে বারবার চক্রান্ত হয় না। সন্ত্রাস দ্বারা গণতন্ত্র হত্যা করার চেষ্টা করা হয় না। ফলে গণতন্ত্রকেও সে সব দেশে আত্মরক্ষার কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই গণতন্ত্র হচ্ছে আক্রান্ত গণতন্ত্র। কখনও রক্তপাত, কখনও রক্তপাতহীন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে বিচ্ছেদ করা হয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চেহারা আক্রান্ত ও পরাজিতের চেহারা। এই প্রথমবারের মতো গণতন্ত্র আত্মরক্ষার জন্য কঠোর হয়েছে। এই কঠোরতা সাময়িক। দেশের অবস্থা স্বাভাবিক হলেই গণতন্ত্র তার কল্যাণমূর্তি আবার ফিরে পাবে। এক গালে চড় খেয়ে আরেক গাল পেতে দেওয়ার নীতিতে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন আর রাজি নয়।

জয়ের অপহরণ চেষ্টা রাষ্ট্র্রদ্রোহের পর্যায়ে পড়ে কি-না আমার জানা নেই। কিন্তু কোনো ঘটনা যদি রাষ্ট্রের অমঙ্গল ঘটায়, স্থিতিশীলতা নষ্ট করে, কিংবা বলপূর্বক সরকার বিচ্ছেদে সহায়তা জোগায় তাহলে তা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ বলে গণ্য হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন। এখন প্রবীণ বাম কলামিস্টই বিবেচনা করে দেখুন জয়ের অপহরণ-সংক্রান্ত ঘটনার যে অভিযোগ উঠেছে, তা রাষ্ট্রের অমঙ্গল ঘটানোর ষড়যন্ত্র বলে গণ্য হতে পারে কি-না? – সমকাল

লন্ডন, ২৯ এপ্রিল শুক্রবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment