দশ দিগন্তে

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দ্বারা এই ধর্মীয় সন্ত্রাসকে পরাজিত করা কি সম্ভব

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

Terror

পৃথিবীর চারদিকে এখন সন্ত্রাস বাড়ছে। কিন্তু জয়ী হচ্ছেনা কোথাও। সম্ভবতঃ এই সন্ত্রাস আরো বহু আগে নিরুত্সাহিত ও পরাভূত হতো যদি এই সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে আমেরিকা সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছড়ানো শুরু না করতো। কিন্তু এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসও ব্যর্থ হয়েছে। ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এই সংঘাতে ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়া প্রভৃতি বহু দেশ ধ্বংসের মুখে, কিন্তু না ধর্মীয় সন্ত্রাস, না রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কোনোটাই জয়ী হয়নি। মানবতা ও মানব সভ্যতার শুধু বিপর্যয় ঘটছে।

শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা স্বীকার করেছেন, কেবলমাত্র সামরিক প্রচেষ্টা (রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস) দ্বারা সঙ্কটের নিরসন সম্ভব নয়। সিরিয়ায় শান্তি স্থাপনও সম্ভব নয়। তিনি সিরিয়ায় মার্কিন স্থল বাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন। বলেছেন সিরিয়ায় স্থল সেনা পাঠানো হবে বড় ভুল। ওবামা এও স্বীকার করেছেন তার হোয়াইট হাউসে অবস্থানের বাকি নয় মাসে আইএস বা ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন না। এখানেই প্রশ্ন, আমেরিকা তাহলে বছরের পর বছর ধরে অপরের দেশে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে কেন?

অন্যদিকে ধর্মের নামে যে জঙ্গি গোষ্ঠী প্রধানতঃ মুসলিম দেশগুলোতে বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, তাতে মারা যাচ্ছে যারা, তারা অধিকাংশই মুসলমান নর-নারী নয়কি? তাদের হামলা থেকে মসজিদ ও মাদ্রাসাও রক্ষা পাচ্ছেনা। চলতি মাসেই ইরাকের রাজধানী বাগদাদে একটি শিয়া মসজিদে হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ৩৪  জন নামাজিকে হতাহত করা হয়েছে। তাতে ইসলামের মর্যাদা বেড়েছে কি, না তা আরও ক্ষুণ্ন হলো? সিরিয়ায় সেক্যুলার আসাদি সরকারকে উত্খাত করার জন্য আইএস সন্ত্রাসী হামলা শুরু করার পর আড়াই লাখ নর-নারী নিহত হয়েছে। দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। সীমান্ত রক্ষীদের গুলিতে, সমুদ্রে নৌকা ডুবিতে মারা যাচ্ছে। কিন্তু আইএসের তথাকথিত ইসলামিক খেলাফত্ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে কি?

বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবরেই দেখা যায়, সউদি আরবের অর্থ, ইসরায়েলি ট্রেনিং এবং আমেরিকার এক সময়ের পৃষ্ঠপোষকতা (আসাদ সরকারকে উত্খাতের স্বার্থে) সত্ত্বেও আইএস সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু কোথাও জয়ী হতে পারছে না। লন্ডনের ‘ডেইলি মেইলের’ এক খবরে বলা হয়েছে ২০১৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে তাদের দখলিস্থত ১০ শতাংশ এলাকায় ও উদের দখল হারিয়েছে আই এস। ২০১৫ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১৪ সালে সিরিয়া ও ইরাকে ২২ শতাংশ দখল করা এলাকা থেকে তারা সরে আসতে বাধ্য হয়েছে।

যদিও আই এস মূলে ইসলামের কথা বলে, কিন্তু তাদের আয়ের প্রধান উত্স মাদক দ্রব্যের ব্যবসা এবং তেলের চোরাচালান। আফগানিস্তানে পপিচাষের উপর তালেবানেরা ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, অন্যদিকে আই এস তেলের চোরাচালানের আয় ৪০ শতাংশ হারিয়েছে। ফলে ভাড়াটে জিহাদিস্ট রিক্রুট করার সংখ্যাও দিন দিন কমছে। বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত অবম্য ডন কুইপবাটের মতো আই এস আই এস বলে চিত্কার করছেন, কিন্তু বাংলাদেশকে প্রকৃত পক্ষে আই এস ঘাটি গড়তে পারেনি। আই এসের নাম ভাঙিয়ে টার্গেটেড কিলিং চালাচ্ছে জামায়াত-শিবির এবং তাদের সহযোগী জঙ্গি সংগঠনগুলো।

ইসলামে সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই। জিহাদের স্থান আছে। কিন্তু জিহাদের অর্থ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও ধর্মের জন্য যুদ্ধ করা, গুপ্ত হত্যা ও নিরীহ মানুষ হত্যা নয়। আর ইসলাম খেলাফত বা রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে আই এস এবং তার সমমনা দলগুলো যা করছে তা ইসলামের আদর্শ ও নীতির সম্পর্ক বিপরীত কাজ। নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম প্রতিষ্ঠানটি দু’শ স্কুল ছাত্রী অপহরণ করে তাদের যৌন দাবীতে পরিণত করেছে বলে খবর এসেছে। সম্প্রতি আরেকটি খবর এসেছে ইরাকের শহর থেকে। সেখানে যৌনকামী হতে অস্বীকার করায় আড়াইশ’র মতো নারীর শিরচ্ছেদ করেছে আই এস। খবরটি যে একেবারে মিথা নয়, তা বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে।

মসুল শহর দখল করার পরই আই এসের যোদ্ধারা সুন্দরী ও তরুণী নারী বাছাই করার কাজ শুরু করে। ২৫০ জন বাছাই করা নারীকে জিহাদিস্টদের সঙ্গে মুতা ম্যারেজ বা স্বল্পমেয়াদী বিয়েতে রাজি হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তারা রাজি না হওয়ায় তাদের হত্যা করা হয়। জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের যৌন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই এই অভিনব বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং তার নাম দেওয়া হয়েছে স্বল্পমেয়াদী বিয়ে। এই ধরনের নারী নির্যাতনের অনুমোদন ইসলাম কেন কোনো ধর্মেই আছে কি?

ইউরোপের অন্যান্য অনেক শহরের মতো লন্ডনে এখন অনেক আফগান শরণার্থীর ভিড়। তারা অনেকেই উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু বিদেশে এসে ক্যাব ড্রাইভার, লরী চালক, হোটেলে ও কেটার ইত্যাদি নানা কায়িক পরিশ্রমের কাজ নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেক আফগান নারীও আছেন। এদের একজনের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। তিনি তার দেশে পাশ করা ডাক্তার হিসেবে হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। তার স্বামীকে নজিবুল্লাপন্থী আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয় এবং তাকে বোরখা পরতে এবং ঘরে অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়। বলা হয় বাইরের কোনো কাজ করা, চিকিত্সা এবং শিক্ষকতার কাজ করতে নারীর জন্য অবৈধ। কিছুদিন পর তার ঘরে কয়েকজন তালেবান সদস্য আসেন এবং তাকে তাদেরই একজনের সঙ্গে তিন মাসের জন্য ‘মেয়াদী বিয়েতে’ রাজি হতে নির্দেশ দেন। তাকে বলা হয় ইসলামের জন্য যুদ্ধরত কোনো সৈনিককে এইভাবে সেবা করা পরম পূণ্যের কাজ। তিনি রাজি না হওয়ায় প্রথমে তাকে চাবুক মারা হয়, পরে ওই তালেবান সদস্য এসে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।

এই আফগান নারী-ডাক্তার পুরুষের ছদ্মবেশে দেশ থেকে পালান এবং নানা দেশ ঘুরে লন্ডনে এসে ঠাঁই নেন। এখানে তিনি একজন ক্যাব ড্রাইভার। এই ধরনের আফগানদের সঙ্গে দেখা হলেই তাদের মুখে তালেবান-রাজত্বের বীভত্স অত্যাচার ও নির্যাতনের কথা শোনা যায়। লন্ডনের এক পত্রিকায় এক ইরাকি শিক্ষক চিঠিপত্র কলামে লিখেছেন, আমেরিকা এবং ব্রিটেন সাদ্দামের অত্যাচার থেকে বাঁচানোর নাম করে এমন এক বিভীষিকার রাজত্বে আমাদের ঠেলে দিয়েছে, যেখান থেকে আগামী ৫০ বছরেও আমরা মুক্ত হতে পারবো কিনা সন্দেহ।

ইসলাম এক সময় সারা বিশ্বে পরিচিত ছিলো শান্তির ধর্ম হিসেবে। বানার্ডশ’ এই ধর্মের প্রশংসা করেছেন; হিউম্যানিস্ট মুভমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা এম. এন. রায় বিশ্ব সভ্যতার ইসলামের অবদান নিয়ে বই লিখেছেন। কিন্তু গত শতকের মধ্যভাগ থেকেই আমেরিকাসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ কম্যুনিজমের মোকাবিলা করার জন্য পলিটিকাল ইসলামের জন্ম দেয়। এই পলিটিকাল ইসলাম প্রকৃত ইসলাম ধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতায় সউদি রাজতন্ত্র এবং কট্টর ওয়াহাবিজমের প্রতিষ্ঠা। পরবর্তীকালে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে তালেবান, আল কায়েদা ও আইএসের জন্ম। উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামী এবং মওদুদীবাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠাও সউদি আরব ও আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায়। এককালের এই বিষবৃক্ষের চারা গাছই এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক কারা এই সত্য এখন আর গোপন রাখা যাচ্ছে না। নিউইয়র্কের নাইন ইলেভেনের ধ্বংসযজ্ঞকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে ওয়ার অন টেররিজমের নামে আমেরিকা অবৈধ যুদ্ধে ইরাক ও লিবিয়ার দুটি সেকুলার সরকারকে ধ্বংস করেছে। সিরিয়া ও ইরানকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। এখন নাইন ইলেভেন সংক্রান্ত ২৮ পৃষ্ঠার এক তদন্ত প্রতিবেদন বেরিয়েছে, যেটিকে গোপন রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাতে দেওয়া তথ্য প্রমাণে দেখা যায় নাইন ইলেভেনে টুয়িন টাওয়ারে হামলায় ব্যবহৃত বিমানগুলো ইরানের কেউ ছিনতাই করেনি। করেছিল সউদি নাগরিকেরা। আরও জানা যায় অন্তত দু’জন সউদি যুবরাজ ওসামা বিন লাদেনকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য জুগিয়েছেন। আমেরিকা সেজন্যে সউদি আরবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, ধ্বংস করেছে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি সেকুলার রাষ্ট্রকে।

বাংলাদেশের বেলাতেও দেখা যাচ্ছে, দেশটিতে জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাস ও টারগেটেড কিলিং আই এসের কাজ বলে প্রমাণ করার জন্য আমেরিকা অতিউত্সাহী। এটা প্রমাণ করা গেলে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে বাংলাদেশেও তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা সম্ভব তাদের এই সামরিক উপস্থিতি পাকিস্তানের মাটিতে প্রলম্বিত করেছে একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, মার্কিন সেনাপাহারায় কোনো রকমে টিকে আছে “গণতন্ত্র”।

বাংলাদেশে এই অবস্থার যাতে উদ্ভব না হয় সেজন্যে হাসিনা সরকার চেষ্টা করে চলেছেন। রাজপথের সন্ত্রাস তারা দমন করেছেন। কিন্তু চাপাতি হত্যার সন্ত্রাস এখনো তারা  বন্ধ  করতে পারেননি। এটা জামায়াত-শিবিরের পরিবর্তিত রণকৌশল। এই ধর্মীয় সন্ত্রাসকে দমনের জন্য আমেরিকার রাষ্টীয় সন্ত্রাসের সাহায্য গ্রহণ করে কোনো লাভ হবে না। তাতে বিপর্যয় বাড়বে। ধর্মীয় সন্ত্রাস ও রাস্ট্রীয় সন্ত্রাসের মধ্যে যুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হচ্ছে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট ওবামার মতে, তিনি ক্ষমতায় থাকার অবশিষ্ট সময়টাতে তিনি এই সন্ত্রাসীদের পরাজিত করে যেতে পারবেন না।

অবশ্যই এই ধর্মীয় সন্ত্রাস দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশকে এই সন্ত্রাস দমনে সরকার ও জনগণের প্রচেষ্টার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। বর্তমান সন্ত্রাস এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে পরাজিত হয়নি; কিন্তু সন্ত্রাস কোনোকালে কোনো দেশে জয়ী হয়েছে তার প্রমাণ নেই। সামরিক শক্তি নয়, ঐক্যবদ্ধ গণচেতনা এই সন্ত্রাসকে পরাস্ত করতে সক্ষম। হাসিনা সরকার সেই গণচেতনাকে জাগ্রত করুন, এপিজমেন্টের পলিসি ত্যাগ করুন। পেট্রল বোমা হামলা বন্ধ করার মতো তারা এই বর্বর টার্গেটেড কিলিং বন্ধ করতে পারবেন। এই ঘাতকেরা ইলভিজিবল ম্যান নয়। – ইত্তেফাক

লন্ডন ৩০ এপ্রিল, শনিবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment