কালান্তরের কড়চা

আওয়ামী লীগের স্বধর্মে ফিরে আসা অত্যন্ত জরুরি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AG

প্রকৃত রাজনৈতিক দলের, সেটি ডানের হোক আর বামের হোক, একটি দর্শন (ধর্ম) থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী দলটির কর্মপন্থা বদলায়, কিন্তু মূল দর্শন বদলায় না। এই দর্শন বা ধর্ম বদলাতে গেলে দলটির পতন ঘটে। জন্য শাস্ত্রে বলেস্বধর্মে নিধনংশ্রেয়, পরধর্ম ভয়াবহ।অর্থাৎ নিজ ধর্মে নিষ্ঠ থেকে মৃত্যু ভালো, পরধর্মে আশ্রয় গ্রহণ ভয়াবহ। কথাটি প্রকৃত রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কেও অনেক সময়েই খাটতে দেখা গেছে

একেবারে কাছের উদাহরণ ব্রিটেনের লেবার পার্টি। শ্রমিক মেহনতি মানুষের স্বার্থ অধিকার রক্ষার জন্য ট্রেড ইউনিয়নের অর্থে সমর্থনে এই দলটির জন্ম। সমাজতন্ত্র ছিল এই দলটির দর্শন বা ধর্ম। ধীরে ধীরে এই দলে অক্সফোর্ড কেমব্রিজে শিক্ষিত সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা ঘটতে থাকে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের নেতৃত্বে পরবর্তীকালে তা ঘটেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতারা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির স্লোগানের আড়ালে বড় লোকদের টোরি দলের রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়াশীল নীতির ছায়া অনুসরণ করতে থাকেন

এর পূর্ণাহুতি ঘটে টনি ব্লেয়ারের লেবার নেতৃত্বে আরোহণের পর। তিনি নামে লেবার, কিন্তু লেবার পার্টির দর্শনে তাঁর বিশ্বাস ছিল না। তিনি টোরি দলেরবিশেষ করে মার্গারেট থ্যাচারের কল্যাণরাষ্ট্র ভাঙার নীতিতে বিশ্বাসী। তিনি নেতা হয়ে দলের ম্যানিফেস্টো থেকে সমাজতন্ত্রের আদর্শের কথা বাদ দেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদে কমন ওনারশিপ (সাধারণের মালিকানা) প্রতিষ্ঠার কথা বাতিল করেন। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী নীতির লেজুড়বৃত্তি শুরু করেন। তাঁর পূর্ববর্তী এক লেবার সরকার ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকাকে সমর্থন দেয়নি; তিনি পরবর্তী লেবার গভর্নমেন্টের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমেরিকার অন্যায় অবৈধ গালফ যুদ্ধে শুধু সমর্থন দেওয়া নয়, ইরাকের হাতে ভয়াবহ মারণাস্ত্র আছেএই মিথ্যা প্রচার দ্বারা ব্রিটেনকে গালফ যুদ্ধে জড়িত করেন। তাঁর এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে লেবার দলে বিদ্রোহ হয়েছিল। তিনি টোরিদের ভোটে তখন ক্ষমতার টিকে গিয়েছিলেন

টনি ব্লেয়ায়ের মতো বিভীষণই লেবার দলকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেন। ওল্ড লেবার নিউ লেবার। দলের যাঁরা সমাজতন্ত্র কল্যাণরাষ্ট্রের নীতিতে বিশ্বাসী তাঁরা ওল্ড লেবার হিসেবে পরিচিত। আর যাঁরা দলটির আদর্শ লক্ষ্য সব কিছু বদলে দিয়ে বিগ মিডিয়া বিগ বিজনেসের সমর্থনে টোরি পার্টির আদলে লেবার পার্টিকে গড়তে চান বা স্বধর্মচ্যুত করতে চান, তাঁরা নিউ লেবার বা ব্লেয়ারপন্থী হিসেবে পরিচিত। দলের ভেতরে এই দুই গ্রুপের লড়াই এখনো চলছে। ব্লেয়ারের ভণ্ডামি প্রতারণা সম্পর্কে শুধু লেবার পার্টির সাধারণ নেতাকর্মীরা নয়, ব্রিটেনের সাধারণ মানুষও এখন অনেকটা সচেতন। তাই তারা ওল্ড লেবারের জেরেমি কারবিনকে অনেক বিরুদ্ধ প্রচারণার মুখেও দলের নেতা নির্বাচিত করেছে। ফলে ব্লেয়ারের স্বধর্মচ্যুতির দ্বারা লেবার পার্টির যে বিরাট বিপর্যয় ঘটেছিল, তা তারা অনেকটা কাটিয়ে উঠতে চলেছে। লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ মুসলিম সাদিক খান লেবার দল করবিনের মনোনয়ন পেয়ে বিশাল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগকেও আমি ব্রিটেনের লেবার পার্টির সঙ্গে তুলনা করি। যদিও দলটি সাম্প্রদায়িক দলের নাম নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু জন্মের মাত্র ছয় বছরের মাথায় সাম্প্রদায়িক নামের খোলস ছুড়ে ফেলে দিয়ে একটি মধ্যবাম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মওলানা ভাসানী বামপন্থী ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে লন্ডনের একটি কাগজে তাঁকে বলা হয়েছিল ‘Red Moulana of the East’—প্রাচ্যের লাল (কমিউনিস্ট) মওলানা

আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেই সমাজতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতাকে দলের দর্শন (ধর্ম) হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি নিজেও ছিলেন একজন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেতা। আওয়ামী লীগের ভেতরেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব দলের দর্শনের বিরুদ্ধে বারবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। জোট পাকিয়েছেন একদল প্রবীণ ডানপন্থী নেতাকর্মী। দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের প্রতিরোধের মুখে তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে

লেবার পার্টিতে ব্লেয়ার ব্লেয়ারপন্থীদের অভ্যুত্থানের মতো আওয়ামী লীগেও কখনো মোশতাক, কখনো . কামাল হোসেনদের অভ্যুত্থান ঘটেছে। তাঁরা আওয়ামী লীগকে স্বধর্মচ্যুত অর্থাৎ দলটির মূল আদর্শ চরিত্র থেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছেন। তাঁরা তা পারেননি। তবু ব্রিটেনের লেবার পার্টির মতোই বাংলাদেশের আওয়ামী লীগেও ডান বামের অর্থাৎ প্রগতিশীল প্রতিক্রিয়াশীল অংশের লড়াই চলেছে নিরন্তর। এখনো চলছে। ভারসাম্য রক্ষা করছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের মৌলিক দর্শনের প্রতি তাঁর আস্থা দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের প্রশ্নাতীত সমর্থনই হাসিনানেতৃত্ব আওয়ামী লীগকে রক্ষা করে চলেছে। সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিচ্ছে

আওয়ামী লীগে হাসিনানেতৃত্বের বিরুদ্ধে সর্বশেষ চক্রান্ত হয়েছে একএগারোর সময়। একদল প্রবীণ নেতা সংস্কারপন্থী সেজে তখনকার নেপথ্যের সামরিক শাসকদের মাইনাস টু থিওরি বাস্তবায়নে সাহায্য জোগাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। দলের সাধারণ নেতাকর্মী সাধারণ মানুষের সচেতনতা প্রতিরোধের মুখে সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয় এবং আওয়ামী লীগ সরকার পর্যায়ক্রমে দুই দফা ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হয়েছে

কিন্তু দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার যেমন একটা সুফল আছে, তেমনি ক্ষমতাসীন দল সচেতন না থাকলে তার একটা কুফলও আছে। দলের সরকারের ভেতরে আত্মসন্তোষ, অন্তর্দ্বন্দ্ব, নীতিহীনতা দুর্নীতি প্রশ্রয় পায়। আওয়ামী লীগের ভেতরে এখন তাই ঘটেছে। সম্পর্কে দলের শীর্ষ নেতারা বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি এখনই সতর্ক না হন এবং আওয়ামী লীগ শুধুই স্বধর্মচ্যুতির দিকে এগোতে থাকে তাহলে কেবল উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে এই দলকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা যাবে না

আওয়ামী লীগ বর্তমানে ক্ষমতায় আছে বটে, কিন্তু তার সংগঠন অত্যন্ত দুর্বল। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার দুর্নীতির অভিযোগ দলটির বিরুদ্ধে জনমনে ধূমায়িত অসন্তোষ সৃষ্টি করে রেখেছে। জামায়াতশিবিরের দুষ্কৃতীদের আশ্রয়প্রশ্রয় দানের অভিযোগও রয়েছে আওয়ামী লীগের একশ্রেণির নেতা, এমপি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রমাণিত হয়েছে আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগ নিজেই

ঢাকার কাগজেই খবর বেরিয়েছে, এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংস ঘটনার জন্য মূলত দায়ী আওয়ামী লীগ এবং সহিংস ঘটনায় নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সংখ্যাই বেশি। বিরোধী দল তাদের হত্যা করেনি; নিজেদের মধ্যে বিবাদেই তাঁরা নিহত হয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন দিয়ে এবার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করে তাহলে কী লাভ হলো? আত্মহননের রাজনীতিতে দলটিকে ঠেলে দেওয়া হলো কি?

অভিযোগ, এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নবাণিজ্য হয়েছে প্রচুর। টাকাপয়সার দেদার ছড়াছড়ি হয়েছে। বহু কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের খাঁটি কর্মীরা মনোনয়ন পাননি। টাকার জোরে মনোনয়ন ছিনিয়ে নিয়েছে এলাকায় দুর্বৃত্ত দুষ্কৃতী হিসেবে পরিচিত একশ্রেণির নব্যধনী। আওয়ামী লীগের একশ্রেণির এমপি এই মনোনয়নবাণিজ্যে ফুলেফেঁপে উঠেছেন। স্থানীয় জনগণের তাঁরা ঘৃণা রোষের পাত্রে পরিণত হয়েছেন। এই রোষ ঘৃণার প্রকাশ ঘটতে পারে আগামী সাধারণ নির্বাচনে। আমার কাছে এমন অভিযোগও এসেছে, বহু নির্বাচনী এলাকায় টাকার জোরে জামায়াতিরা আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেজে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। আওয়ামী লীগের তৃণমূলে এই জামায়াতি অনুপ্রবেশ দেশের রাজনীতির জন্য এক বিপজ্জনক অশনিসংকেত

বর্তমান অনিশ্চিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক চরিত্র রক্ষা করতে হলে আওয়ামী লীগকে অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াতে হবে। স্বধর্মে ফিরে আসতে হবে। ক্ষমতার বানের জলে আওয়ামী লীগে যে জঞ্জাল এসে ঢুকেছে এবং যে জঞ্জাল গজিয়েছে, সবল হাতে তার গ্রাস থেকে দলটিকে রক্ষা করতে হবে। দলটিকে তার আদর্শ নীতির সঠিক স্থানে ফিরিয়ে নিতে হবে। আওয়ামী লীগকে মিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি কি আওয়ামী লীগের প্রকৃত মিত্র?

নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক প্রহারের বর্বর ঘটনা সে সম্পর্কে দলটির নীরব ভূমিকাই প্রমাণ করে তাদের প্রকৃত অবস্থান! তাদের দলীয় সংসদ সদস্য শেষ পর্যন্ত ঘটনাটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন বটে, কিন্তু তলে তলে হেফাজতিদের একটা অংশকে উসকে দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। শেখ হাসিনা তাদের সম্পর্কে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করুন। এরশাদ সাহেব আওয়ামী লীগের সুদিনের বন্ধু হতে পারেন, কিন্তু দুর্দিনের বন্ধু নন

সামনে একটা ক্ষীণ আশার বাতি জ্বলছে। জুলাই মাসে আওয়ামী লীগের বহু প্রতীক্ষিত কাউন্সিল অধিবেশন। দলকে জঞ্জালমুক্ত করা, নতুনভাবে সংগঠিত করা, আদর্শবান তরুণদের নেতৃত্বে টেনে আনার কাজে সভানেত্রী শেখ হাসিনা সর্বশক্তি প্রয়োগ করুন। আওয়ামী লীগ তার আদর্শ নীতির কক্ষ থেকে যেকোনো কারণেই হোক বহু দূরে সরে এসেছে। তাকে স্বস্থানে, স্বধর্মে ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আসন্ন কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম হোকএই কামনা করি

লন্ডন, সোমবার, ৩০ মে, ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment