তৃতীয় মত

সন্ত্রাসের রাজনীতি আন্ডারগ্রাউন্ডে জোট বাঁধছে : সরকার সতর্ক হোন

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGC

আওয়ামী লীগের এক প্রবীণ নেতা এবং মন্ত্রী লন্ডনে এসেছেন। দীর্ঘক্ষণ তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সুযোগ হয়েছিল। ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, সেজন্য তার নামটা আর উল্লেখ করলাম না। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বললেন, দেশ মোটামুটি ভালোই চলছে। শেখ হাসিনা বয়স্ক-ভাতা, বিধবা-ভাতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জন্য যে অসংখ্য কল্যাণকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, তাতে মনে হয় আগামী সাধারণ নির্বাচনে জেতা আওয়ামী লীগের পক্ষে খুব একটা কষ্টকর হবে না।

এ পর্যন্ত বলে তিনি একটু থামলেন। বললেন, এই ভালো দিকের একটা খারাপ দিকও আছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটানো যাবে না, এই উপলব্ধি থেকে বিএনপি ও জামায়াত একটা নতুন রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করেছে মনে হয়। বিএনপির কৌশল হল, নির্বাচনের আগেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত দ্বারা এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের ব্যবস্থা করা। লন্ডন এখন বিএনপির এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির মূল ঘাঁটি। মোসাদের সঙ্গে সম্পর্ক ও বৈঠক করা এই ষড়যন্ত্রেরই একটা অংশ।

মন্ত্রী বললেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্তের এই রাজনীতিকে ততটা ভয় করার কিছু ছিল না। কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ডের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি। এর হোতা জামায়াত। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর এই দলটি এতই কোণঠাসা হয়েছে যে, ধর্মের দোহাই পেড়ে এরা এখন আর তাদের আন্দোলনে লোক জড়ো করতে পারছে না। তাদের ডাকা হরতালে কেউ সাড়া দেয় না, ভয়ও পায় না। এই অবস্থায় আমাদের গোয়েন্দা সূত্রের একটা খবর, জামায়াত ও শিবির কর্মীরা দলে দলে আন্ডারগ্রাউন্ডে যাচ্ছে এবং দেশময় আরও ধ্বংসাত্মক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নিচ্ছে। তার মধ্যে টার্গেটেড কিলিং তো থাকবেই এবং এখনও আছে। সহসাই তারা ব্যাপকভাবে ধ্বংসাত্মক তৎপরতায় নামতে পারে।

বাংলাদেশের একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার এই আশংকা উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। সম্প্রতি ভারতের একটি সংবাদপত্রেও এই মর্মে খবর বেরিয়েছে যে, ভারতের পূর্বাঞ্চলে মাওবাদী সন্ত্রাসীরা নতুনভাবে ঘাঁটি গাড়ছে এবং এবার তাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে পলাতক একদল জামায়াত ও শিবির কর্মী। যুক্তভাবে তারা এই সন্ত্রাসের সম্প্রসারণ ঘটাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পর্যন্ত।

এই ধ্বংসাত্মক অভিযানের যারা রূপকার তাদের আরও একটি কৌশল হবে, এই সম্মিলিত জঙ্গি হামলার জন্য আইএসের নামে প্রচার চালানো। যাতে আইএসকে দমনের নামে বাংলাদেশ পর্যন্ত মার্কিন প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ ডেকে আনা যায়। বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌঘাঁটি শক্ত করা যায়। এটা আমেরিকারও লক্ষ্য। তাই বাংলাদেশে জামায়াত ও শিবিরের দ্বারা অনুষ্ঠিত টার্গেটেড কিলিংগুলোকে আইএসের বলে চালানোর চেষ্টা তারাও করছে। আর এই প্রচারণার পালে হাওয়া দিচ্ছে কলকাতার একটি রাজনৈতিক মহলও।

হালে ‘মমতার ক্রোড়পত্র’ বলে পরিচিত কলকাতার বাংলা দৈনিক স্টেটসম্যান এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে আইএসের কাজ এবং বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আছে বলে মার্কিন প্রচারণাকে সমর্থন দিয়েছে। এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মানস ঘোষ মমতা ব্যানার্জির রাজনীতির সমালোচক হওয়ায় পত্রিকার কর্তৃপক্ষের ওপর সরকারি চাপ প্রয়োগ করে তাকে সম্পাদকের পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

এখন একটি মাত্র ভরসার কথা, বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আছে বলে যে বিদেশী মহলটি ক্রমাগত প্রচারণা চালাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে হাসিনা সরকার খুবই সচেতন ও সতর্ক রয়েছে। জঙ্গি দমনের নামে আফগানিস্তান, ইরাক ও পাকিস্তানে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তা প্রত্যহ কাগজের পাতা খুললেই জানা যায়। উপমহাদেশে- বিশেষ করে বাংলাদেশে ও ভারতে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, তা দু’দেশের সরকারই চায় না। সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে হাসিনা সরকার সক্রিয় এবং বিএনপির চক্রান্তের রাজনীতির মুখোশ উন্মোচনেও সরকার তথাকথিত সুশীল সমাজের সমালোচনা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাচ্ছে।

দেশে জামায়াতিদের অন্তর্ঘাত চলছে। এই লেখাটি যখন লিখতে বসেছি, তখন খবর পেয়েছি, চট্টগ্রামের এসপির স্ত্রীকে প্রথমে ছুরি মেরে এবং পরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ভদ্রমহিলা তার ছেলেকে স্কুলের বাসে তুলে দিতে যাচ্ছিলেন। তখন ঘাতকরা মোটরবাইকে এসে তাকে হত্যা করে। সন্দেহ করা হচ্ছে এটা জঙ্গিদের কাজ। সেই মোটরবাইকে করে আসা, ছুরি মারা, তারপর গুলি করা। কেবল চাপাতির ব্যবহার এখানে করা হয়নি।

অনেকে বলছেন এটা সম্ভবত রিভেঞ্জ কিলিং। চট্টগ্রামের এই এসপি জঙ্গি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। জঙ্গিদের ঘাঁটি আবিষ্কার, তাদের অনেককে গ্রেফতার ও তাদের অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করার ব্যাপারে তার সাহসী ভূমিকা রয়েছে। জঙ্গিরা সম্ভবত তার শোধ নিতে তার নিরীহ স্ত্রীকে হত্যা করেছে। আমি আগেও লিখেছি, এই জঙ্গিরা ইসলামের নাম ভাঙিয়ে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে বটে, এরা ইসলামের মিত্র নয়, শত্রু। ইসলামে নারী ও শিশুহত্যা মহাপাপ। এরা তা বিনা দ্বিধায় করে চলেছে। এমনকি ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস তাদের তথাকথিত জিহাদের তহবিলে অর্থ সংগ্রহের জন্য নারী ব্যবসা ও নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছে। এই মেয়েরা অধিকাংশই অপহৃত এবং মুসলমান। কিছু স্বেচ্ছায় এসে ‘জিহাদিস্টদের’ দলে যোগ দিয়েছে। ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে, সুদর্শনা ১৮ বছরের সুন্দরী মেয়ে বিক্রি করা হবে। দাম ৮ হাজার ডলার। এরকম অসংখ্য বিজ্ঞাপন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

অস্ত্র ও খাদ্য ক্রয়ের জন্য আইএসের জঙ্গিদের অর্থের প্রয়োজন। এই অর্থ পাওয়ার জন্য তাদের তিনটি পন্থা। অধিকৃত ইরাক ও সিরিয়ার তেলকূপের তেল পশ্চিমাদের কাছেই সস্তায় বিক্রি করা। আফগানিস্তানে পপি চাষ দ্বারা বিদেশে মাদক ব্যবসার প্রসার। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণী নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার ও বিক্রি করা। ধর্মের নাম ভাঙিয়ে ইসলামের পবিত্রতাকে এরা আজ কোথায় নিয়ে ঠেকিয়েছে তা এক গভীর আশংকার ব্যাপার।

আইএস মধ্যপ্রাচ্যে এখন যে কাজগুলো করছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে এই কাজ করেছে জামায়াত-শিবিরের নেতারা। অগ্নিসংযোগের বেলায় জামায়াতিরা মসজিদ-মন্দির ভেদাভেদ করেনি। এখন পাকিস্তানে যেমন জঙ্গিরা মসজিদের ওপরও হামলা চালাচ্ছে। নামাজরত মুসল্লি হত্যাতেও দ্বিধা করছে না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সৈন্যদের লালসা পূরণের জন্য নারী অপহরণের ক্ষেত্রে মুসলমান নারীদেরও অব্যাহতি দেয়া হয়নি। এরাই যখন ইসলামের পবিত্রতা রক্ষা, আল্লাহ ও তার রাসূলের (সা.) মর্যাদা রক্ষার নামে যে কোনো ধর্মের নিরীহ মানুষকে হত্যা করে তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না ধর্ম এদের হাতের ঢাল। এই ঢালের আড়ালে রয়েছে মানবতা বিরোধী শত্রুর দল।

আমি বাংলাদেশের মন্ত্রী মহোদয়কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বাংলাদেশে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে জামায়াত ও তাদের উগ্রপন্থী সহযোগীরা যে ধ্বংসাত্মক তৎপরতা ব্যাপকভাবে শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, সরকার তা প্রতিহত করার জন্য কোনো কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কিনা। তিনি বললেন, ‘এটা আমার জানা নেই। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই জানে। আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, সরকার এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরিকল্পনা আঁটছে। তবে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে এ ধরনের চক্রান্ত ও সন্ত্রাস দমন সহসা সম্ভব হয় না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটাই এ ব্যাপারে প্রধান বাধা। সরকার বেশি কঠোর হতে গেলে আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ চিৎকার শুরু করবে- মানবাধিকার গেল, নাগরিক স্বাধীনতা গেল। গণতন্ত্রের সর্বনাশ হয়ে গেল।’

আমাদের সুশীল সমাজের একটি বড় অংশের এই ভূমিকা সম্পর্কে সবাই অবহিত। চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকেও সম্ভবত তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ বলে মনে করেন। নইলে সন্ত্রাস ও চক্রান্ত দমনে সরকার কঠোর হলেই তারা গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার গেল গেল বলে রব তুলতেন না। আমেরিকা এবং ব্রিটেন এখন বাংলাদেশে টার্গেটেড কিলিংগুলোকে মূলধন করে চিৎকার জুড়েছে, বাংলাদেশে নাগরিকদের নিরাপত্তা নেই। সরকার সন্ত্রাস দমন করতে পারছে না।

অথচ আইআরএ (আইরিশ) সন্ত্রাস দমনে ব্রিটিশ সরকারের লেগেছে দু’শ বছর। সন্ত্রাসীদের হাতে লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের মতো ব্যক্তিও নিহত হয়েছেন। তারপর এই আইআরএ’র সঙ্গে আপস বৈঠকে বসে ব্রিটিশ সরকার এ সন্ত্রাসের কবল থেকে মুক্ত হয়েছে। আমেরিকার কুক্লাক্সক্লানের সন্ত্রাস দমনে মার্কিন সরকার দু’দশকের বেশি সময় নিয়েছে। তারপরও এই সন্ত্রাস একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। ভারত স্বাধীনতা লাভের কিছু পর থেকে মাওবাদী ও নকশালপন্থী সন্ত্রাস দমনের চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত কয়েকটি রাজ্যে মাওবাদী সন্ত্রাস সম্পূর্ণ দমন করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশেও রাতারাতি জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ করা যাবে, তা মনে হয় না। যখন তার পেছনে আন্তর্জাতিক মদদ রয়েছে। হাসিনা সরকার বিএনপি ও জামায়াতের প্রকাশ্য সন্ত্রাস দমন করেছে। এখন জামায়াতিরা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে আরও ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক তৎপরতার পরিকল্পনা এঁটে থাকলে সরকারকে জনগণের সহযোগিতা নিয়ে তা কার্যকরভাবে প্রতিহত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই ব্যাপারে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পরিচালিত সন্ত্রাস দমনের কাজে ভারতীয় এবং ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও সরকার গ্রহণ করতে পারে। এক কথায়, সময় থাকতে সরকারের সতর্ক ও সক্রিয় হওয়া দরকার। সন্ত্রাসীরা আন্ডারগ্রাউন্ডে জোট বাঁধার আগেই তাদের গোপন ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করতে হবে। – যুগান্তর

লন্ডন, ৫ জুন, রোববার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment