স্থিতাবস্থার আড়ালে অস্থিরতার ঘূর্ণিস্রোত

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGC

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটা স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে। কিন্তু তার অন্তরালে একটা অন্তঃসলিলা ঘূর্ণিস্রোতও যে চলছে সেটা কেউ লক্ষ্য করছেন না তাও নয়। এই ঘূর্ণিস্রোতটি ভাল নয়। সরকারের সময় থাকতে এ সম্পর্কে সতর্ক হওয়া উচিত। জোরেশোরে ঘোষণা দিয়ে সরকার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছেন। সম্ভবতঃ তার জবাবদানের জন্যই সন্ত্রাসীরা পাবনায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটায়। গতকাল (মঙ্গলবার) আবার খবর পেয়েছি রাজশাহীতে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একজনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে গলির মধ্যে। অন্যজনকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে।

আমার এই লেখা শুরু করা পর্যন্ত এই হত্যার দায় কেউ স্বীকার করেনি। আইএসও নয়। তবে এ দু’জনকেও কুপিয়ে হত্যা করা থেকে মনে হয় হয়তো একই সন্ত্রাসীরা এদের হত্যা করেছে। তবে এবারের হত্যাকাণ্ডের বৈশিষ্ট্য একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে একজন বিএনপিকর্মীকেও হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে ধর্মের বিরুদ্ধে কটূক্তি করার অপবাদ দিয়ে ব্লগার হত্যা, তারপর বিদেশী নাগরিক হত্যা, তারপর হিন্দু ও খ্রীস্টান হত্যা। সমকামী সমর্থক হত্যা। এখন বিএনপির কর্মী হত্যা। এটাও যদি একই গ্রুপের ঘাতকদের দ্বারা ঘটে থাকে তাহলে প্রশ্ন করা চলে, এই টার্গেটেড কিলিংয়ের পরিধি কি ক্রমশ বাড়ানো হচ্ছে? ঘাতকরা তো এখন সরাসরি সাঁড়াশি অভিযানকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

এটাতো গেল দৃশ্যপটের একদিক। অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন উপলক্ষ করে দেশের বহু জায়গায় যে খুনোখুনি ঘটে গেল, বহু প্রাণ অকালে ঝরে গেল তার জন্য দায়ী কে? এই সন্ত্রাসতো জামায়াত, জেএমবি, আনসারুল ইসলাম ঘটায়নি। তাহলে এই নির্বাচনী সন্ত্রাস কারা ঘটিয়েছে। বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রীর মতে, এই সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে আওয়ামী লীগেরই বিদ্রোহী প্রার্থীরা। তাজ্জবের কথা, বহু জায়গায় এই বিদ্রোহী প্রার্থীরাই দলের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হয়েছে।

এটা ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে কি আভাস দেয়?

ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে দলীয় প্রতীক নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে এই ঘোষণা যখন দেয়া হয়েছিল, তখনই প্রশ্ন উঠেছিল- সরকারী দলেরও অভ্যন্তরীণ অবস্থা যদি ভাল না থাকে, তাহলে দলীয় মনোনয়ন উপেক্ষা করে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়াবার সংখ্যা বাড়বে কি? দলনেত্রী শেখ হাসিনা এই সম্ভাবনা রোধ করার উদ্দেশ্যে দলের মনোনয়ন না পেলে কেউ যাতে বিদ্রোহী প্রার্থী না হয় সেজন্যে নির্বাচনের আগে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণও করেছিলেন। সেই হুঁশিয়ারি অগ্রাহ্য করার দুঃসাহস অনেকে দেখিয়েছেন এবং আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী একশ্রেণীর বিদ্রোহী প্রার্থীই খুন খারাবির কাজটা করেছেন।

এটা সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্য একটা দুঃসংবাদ। সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে দেশে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন আর সরকারী দলই তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অনৈক্যের জন্য সেই স্থিতাবস্থা রক্ষায় সহায়কের ভূমিকা পালন করছে না বা পালন করতে পারছে না। এটা ভবিষ্যতের জন্য একটা অশনিসঙ্কেত। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল জুলাই মাসে। সেটা সরে গেছে অক্টোবর মাসে। জুলাই মাসে রমজানের ঈদ। সুতরাং অধিবেশনের তারিখ পেছানোটা হয়তো সঙ্গতই হয়েছে। কিন্তু এই কাউন্সিল অধিবেশনকে দল গুছোবার কাজ যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার একটা প্রভাব পড়বেই। বর্তমান স্থিতাবস্থার আড়ালের অস্থিরতা প্রকট হয়ে উঠবে।

এটাতো গেল আওয়ামী লীগের কথা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট সরকারের অবস্থাটাই বা এখন কি? মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের কম কথা বলার জন্য প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন। তারা সকলেই কি সে কথা শুনছেন? এখনো পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা বলছেন একশ্রেণীর মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। একবার মন্ত্রিসভার বাইরে থেকে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা সরকারের এক মন্ত্রীর সমালোচনা করেছিলেন। এই মন্ত্রী মহাজোটের এক শরিক দলের নেতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন তার দলের সকলকে এই ধরনের কথাবার্তা না বলার জন্য সতর্ক করে দিয়েছিলেন। এখন আবার দেখা যাচ্ছে সেই ধরনের সরব সমালোচনা।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের এক সভায় সৈয়দ আশরাফ নিজেদের মন্ত্রিসভার শরিক দলের মন্ত্রীকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন। সৈয়দ আশরাফ শুধু পূর্ণ মন্ত্রী নন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও। সুতরাং নিজের এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে তার এই তীব্র সমালোচনায় স্বাভাবিকভাবে দেশে নানা জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। সৈয়দ আশরাফ যদি অবিভক্ত জাসদের পঁচাত্তর সালের ভূমিকার সমালোচনা করেই ক্ষান্ত থাকতেন, তাহলে হয়তো গুজবের ঘুড়ি আকাশের খুব উঁচুতে উঠতো না। কারণ, অবিভক্ত জাসদের ’৭৫ সালের ভূমিকা সম্পর্কে সৈয়দ আশরাফ যা বলেছেন তা অসত্য নয়। কিন্তু জাসদের যে নেতাকে মন্ত্রী করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তিনিও বর্তমান সরকারের একজন পূর্ণমন্ত্রী এবং তারই সহকর্মী। সহকর্মীর বিরুদ্ধে এই প্রকাশ্য সমালোচনায় মহাজোটের ভেতরের ঐক্য এবং এই ঐক্যের ভবিষ্যত সম্পর্কে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

বাজারে নানা ধরনের গুজব সৃষ্টি হতে পারে এবং ইতোমধ্যে হয়েছেও। সৈয়দ আশরাফ কি এসব সম্ভাবনার কথা জেনেশুনেই মন্তব্যটি করেছেন, না, তার এই বক্তব্যের মধ্যে কোন রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে? নাকি মন্ত্রিসভায় ঈদের আগে বা পরে বড় ধরনের কোন রদবদল হতে যাচ্ছে? এসব না জেনে তার বক্তব্য সম্পর্কে মতামত দেয়া মুশকিল। সৈয়দ আশরাফ ধীরস্থির চরিত্রের মানুষ। ব্যক্তিগত মতবিরোধিতা বা রাজনৈতিক হঠকারিতা দ্বারা তিনি মহাজোট সরকারের এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তা মনে হয় না। তবে গুজবের ডালপালা যাতে না ছড়ায় সেজন্যেই এই ব্যাপারে অতীতের মতো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ সম্ভবত প্রয়োজন।

রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু ও মিত্র বলে কিছু নেই। থাকলে দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করার পর ব্রিটেন ও জার্মানি একই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ঐক্যবদ্ধ হতে পারত না। যে জাসদ বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরিবেশ তৈরি করেছিল সেই জাসদ এখন নেই। জাসদ এখন বহুবিভক্ত এবং এক অংশ আওয়ামী লীগের গঠিত মহাজোট সরকারের অংশ। এর আগেও জাসদের আরেক অংশের নেতা আ. স.ম আবদুর রবকে শেখ হাসিনা তার ঐকমত্যের সরকারে মন্ত্রী করে তার উদারতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

এই ঐকমত্যের সরকার গঠন দ্বারা তিনি বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনাকে প্রতিহত করেছিলেন। তা নইলে দেশের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের জন্য আরও বড় বিপদ দেখা দিত। এবারে জাসদের আবদুর রব মন্ত্রিসভায় নেই। কিন্তু অপর অংশের হাসানুল হক ইনু আছেন। মন্ত্রিসভায় আছেন এককালের আওয়ামী লীগবিরোধী ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননও। তাদের নিয়েই বর্তমান মহাজোট সরকার। দেশের উগ্রপন্থীদের ভয়াবহ সন্ত্রাস এবং গণবিরোধী অশুভ রাজনীতির মাথা তোলার মহা আশঙ্কার মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই মহাজোট সরকারের ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন এবং সেজন্য মহাজোটের মধ্যে অটুট ঐক্য থাকা অত্যাবশ্যক। অতীতের কাসুন্দি ঘাটতে গিয়ে এই ঐক্য ভাঙ্গা উচিত হবে না। ঠগ বাছতে গেলে গাঁ উজার হয়ে যাবে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর জওয়াহেরলাল নেহরু দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি জয়প্রকাশ নারায়ণকে পার্লামেন্টে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র পাকাপোক্ত হয় না। তিনি আরও বলেছিলেন, কোন দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের পাশে যদি একটি শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকে, তাহলে ওই সরকার ও সরকারী দলের মধ্যেই কোন্দল ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। বাইরের শত্রু না থাকলে তখন নিজেদের মধ্যেই শত্রু তৈরি করে ক্ষমতাসীন দল হানাহানি শুরু করে এবং নিজেদের পতনের পথ প্রশস্ত করে।”

আমি জানি না, বাংলাদেশে এখন মহাজোট সরকারের মধ্যে নেহেরু বর্ণিত এই অবস্থার উদ্ভব ঘটেছে কিনা! যদি ঘটে থাকে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখনই সতর্ক হওয়া উচিত। তিনি মন্ত্রীদের সতর্ক করুন এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করুন। দল থেকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের গডফাদারদের বহিষ্কার করুন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “চাটার দল আমার চারদিক ঘিরে ফেলেছে। আমি এদের বিরুদ্ধে লালঘোড়া দাবড়াবো।” বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সামনে সেই লালঘোড়া দাবড়ানোর সময় এখন এসেছে। তাঁর সাহস আছে। তিনি শক্ত হলে সফল হবেন। দেশের বর্তমান দৃশ্যমান স্থিতাবস্থার আড়ালে যে অন্তসলিলা ঘূর্ণিস্রোত বইছে বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আগেই তা বন্ধ করুন। – জনকন্ঠ

[লন্ডন ১৪ জুন, মঙ্গলবার, ২০১৬]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment