কালের আয়নায়

মাদারীপুর থেকে অরল্যান্ডো :এই সন্ত্রাসের দৌড় ঠেকানোর উপায় কী?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AG

মাদারীপুরের এক হিন্দু কলেজ শিক্ষক চাপাতি-হত্যার শিকার হতে চলেছিলেন। তিনি মারা যাননি, গুরুতর জখম হয়েছেন। তার জীবনের আশঙ্কা এখনও যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদকেও চাপাতি দ্বারা নৃশংসভাবে আঘাত করা হয়েছিল। চিকিৎসার জোরে তিনি বেঁচে গিয়েও পরে বিদেশে গেলে ওই আঘাতজনিত প্রতিক্রিয়াতেই মারা যান। মাদারীপুরের কলেজ শিক্ষকের একই পরিণতি না ঘটুক- এই প্রার্থনা করি।

দেশে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। তাতে মনে হয়, ঘাতকের দল জামায়াত-শিবির, জেএমবি বা আনসারুল ইসলাম যারাই হোক, এখন বেপরোয়া। মাদারীপুরের ঘটনার একটা ভালো দিক, আক্রান্ত শিক্ষককে ঘাতকরা সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলতে সক্ষম হয়নি এবং তাদের একজন ধরা পড়েছে। সে কলেজের ছাত্র। তার পরিবার ঢাকায় থাকে এবং সে স্বীকার করেছে, সে জামায়াতের ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত। তার বাবা পুত্রের কাণ্ডকীর্তির কথা জেনে বলেছেন, এটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা।

মাদারীপুরের ঘটনায় একটি সত্য প্রমাণিত হলো, আইএসের সাইনবোর্ডের আড়ালে এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে জামায়াত-শিবির। সঙ্গে আছে জামায়াতের গর্ভেই জন্ম নেওয়া জেএমবি, আনসারুল ইসলাম প্রভৃতি উপদল। সাঁড়াশি অভিযানের মুখেও এই সন্ত্রাস চলার কারণটি খুঁজতে কষ্ট করার কোনো দরকার নেই। ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের কারও মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার সময় হলেই দেখা যায়, ঝটপট দু’চারজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। এখন যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেমের দণ্ডাদেশ কার্যকর করার উদ্যোগ চলছে। সুতরাং আগের মতো জামায়াত-শিবির কিছু নিরীহ মানুষ হত্যা করে তাদের রক্তপিপাসা মেটাতে চাইবে- এটা ধরে নেওয়া যায়। মাদারীপুরের ঘটনা তার সত্যতা বহন করে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ চাপাতি-হত্যার পর আইএসের নামে দায় স্বীকারের ঘোষণা জামায়াতিদের একটা কৌশল। এই কৌশল দ্বারা তাদের ওপর নিপতিত দৃষ্টি তারা অন্যদিকে সরিয়ে দিতে চায়। অন্যদিকে আমেরিকা যে বাংলাদেশে আইএস আছে বলে চিৎকার জুড়েছে, তার মূল কারণ বাঘ বাঘ বলে চিৎকার করে তারা বাঘ নিধনের অজুহাতে বাংলাদেশে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি গাড়তে ইচ্ছুক। মধ্যপ্রাচ্যের ধ্বংসযজ্ঞ তারা উপমহাদেশেও ডেকে আনতে আগ্রহী।

আমেরিকার জন্য ভাগ্যের পরিহাস হলো, অন্যের ঘরে বাঘ আছে বলে মিথ্যা চিৎকার জুড়তে গিয়ে বাঘ যে নিজের ঘরেই বসে আছে, তারা তা সম্ভবত টের পায়নি। অরল্যান্ডোর এক সমকামী ক্লাবে ওমর মতিন নামের এক মার্কিন মুসলিম যুবকের এলোপাতাড়ি গুলিতে ৫০ জনের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে শতাধিক। আইএস এর দায় কি স্বীকার করছে না? বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের হাতে এক বছরে যেখানে মারা গেছে ৪৯ জন, সেখানে মার্কিন মুলুকে এক রাতেই মারা গেছে ৫০ জন।

এখন মার্কিন প্রশাসন কী বলবে! অনের ঘরে বাঘ খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাঘ নিজের ঘরেই লুকিয়ে আছে। আইএস আবার আমেরিকার এককালের পোষা বাঘ। প্রভুর আদরে তার কপাল চাটতে গিয়ে রক্তের স্বাদ পেয়ে বাঘ এখন প্রভুকেই হত্যা করতে চায়। বাংলাদেশে একজন সমকামী সমর্থক নিহত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ওবামা তার পরিবারের কাছে সমবেদনা জ্ঞাপন করে চিঠি পাঠিয়েছেন। এটা তার মহানুভবতার পরিচয় অবশ্যই। কিন্তু এখন তিনি নিজের দেশে ক’জন সমকামী বা সমকামী সমর্থকের শোকসন্তপ্ত পরিবারের কাছে চিঠি পাঠাবেন?

বাংলাদেশে এই অব্যাহত টার্গেটেড কিলিং সম্পর্কে আমাদের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই, তা নিয়ে তর্ক করা বৃথা। আসল কথা উগ্রপন্থিদের উপদ্রব বাড়ছে এবং সরকার তাদের দমনের জন্য নতুন কোনো কৌশল গ্রহণ না করলে সন্ত্রাসীদের শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তা সঠিক কথাই বলেছেন। বাংলাদেশে আইএস নেই। কিন্তু তাদের অনুসারীরা আছে। আল কায়দা ও তালেবানদেরও অনুসারী আছে। এরা আনসারুল ইসলাম, জেএমবি ইত্যাদি নামে পরিচিত বটে; কিন্তু এদের মূল শিকড় হচ্ছে জামায়াত-শিবির। এ পর্যন্ত যত সন্ত্রাসী (মাদারীপুরের সন্ত্রাসীসহ) ধরা পড়েছে, তাদের অনেকেই শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছে।

দেশের বিজ্ঞজনের কেউ কেউ বলছেন, সন্ত্রাসী দল হিসেবে জামায়াত ও তার সহযোগী দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। তাতে খুব লাভ হবে বলে মনে হয় না। জামায়াতের সাধারণ নেতাকর্মীদের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যেই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। প্রকাশ্যে দু’একটা ব্যর্থ হরতাল তারা ডাকছে বটে; কিন্তু তাদের আসল রাজনীতি এখন আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি। সেখানে বসেই তারা ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা আঁটছে এবং কার্যকর করছে।

এই সন্ত্রাস চরিত্রে দেশীয়; কিন্তু তার যোগাযোগ আন্তর্জাতিক। আল কায়দা, তালেবান, আইএস ইত্যাদি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গেই এরা হয়তো যোগাযোগ গড়ে তুলছে। এককালে এদের স্লোগান ছিল- ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান।’ এখন সুযোগ বুঝে আইএসের নাম ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশের পক্ষে এই সন্ত্রাস দমন রাতারাতি সম্ভব নয় এ জন্য যে, চরিত্রে দেশীয় হলেও এর ব্যাপ্তি আন্তর্জাতিক। অরল্যান্ডোর হত্যাকাণ্ড তো আরও বেশি করে প্রমাণ করল, এই সন্ত্রাসের ব্যাপ্তি বাংলাদেশের মাদারীপুর থেকে আমেরিকার অরল্যান্ডো পর্যন্ত। আমেরিকা এই বলে বাংলাদেশকে দোষারোপ করছে যে, এই সন্ত্রাস দমন ও নাগরিক জীবনকে নিরাপদ করতে বর্তমান সরকার সফল হচ্ছে না। এই অভিযোগ সঠিক নয়। বিশ্বের একক সুপারপাওয়ার আমেরিকা তার বিশাল সামরিক শক্তি নিয়ে ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে জিহাদিস্টদের সঙ্গে পেরে উঠছে না; এমনকি নিজ দেশেও নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না।

সেখানে বাংলাদেশ সরকার রাজপথের পেট্রোল বোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারার ভয়াবহ সন্ত্রাস দমনে সাফল্য দেখিয়েছে। এই চোরাগোপ্তা হত্যাকাণ্ড তারা বন্ধ করতে পারবে, যদি তারা জনগণ-সম্পৃক্ত নয়া স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল গ্রহণ করে। পুলিশ ও র‌্যাবের দ্বারা সাঁড়াশি অভিযান তারা ইতিমধ্যেই শুরু করেছে। তবে ভারতের নকশালী সন্ত্রাসের মতো বাংলাদেশে এই জামায়াতি সন্ত্রাস দমনেও একটু সময় লাগবে। এই সন্ত্রাস মোকাবেলায় আমেরিকার চেয়ে বাংলাদেশের সাফল্য অনেক বেশি।

আমেরিকার সঙ্গে গলা মিলিয়ে ব্রিটেনের টোরি সরকারও অহরহ বাংলাদেশে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে, নাগরিকদের নিরাপত্তা নেই বলে অভিযোগ তোলে। কিন্তু নিজেদের দেশের অবস্থার কথা তারা ভাবে না। গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) লেবার দলীয় মহিলা এমপি জো কক্সকে (নর্থ ইয়র্কশায়ারের এমপি) এক দুর্বৃত্ত ছুরি মেরে ও গুলি করে হত্যা করেছে। তার আগে ক্রয়ডন থেকে নির্বাচিত এমপি গেভিন বারওয়েলের ওপর হামলা হয়। তিনি বেঁচে যান। তারও আগে ইস্টএন্ডের এমপি স্টিফেন টিমের প্রাণনাশের চেষ্টা হয়। তিনিও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান; কিন্তু আহত হন।

যদিও এগুলো জিহাদিস্টদের হামলা নয়, বরং বিভিন্ন কারণে ‘লোন অ্যাটাকারদের’ কাণ্ড বলা হচ্ছে; তবু এগুলো সন্ত্রাস। সাধারণ কেউ নয়, খোদ ব্রিটিশ এমপিরা এই সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন। সরকার ঠেকাতে পারছে কি? এমনকি ফ্রান্সে জিহাদিস্টদের কর্মকাণ্ডের পর ব্রিটিশ সরকারও কম্পিত। জিহাদিস্টদের সন্ত্রাস ঠেকানোর জন্য তারা যে তৎপরতা চালাচ্ছে, তা যুদ্ধকালীন তৎপরতার চেয়েও ব্যাপক। তারপরও ব্রিটিশ সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা যতটা নিশ্চিত করতে পারবে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত নয়।

সন্ত্রাসের সঙ্গে যখন কোনো আইডোলজি (সঠিক অথবা বিকৃত) যুক্ত হয়, তখন তা কেবল আইন ও প্রশাসনিক শক্তি দ্বারা ঠেকানো কষ্টকর। ভারতে সে জন্য মাওবাদী বা নকশালী সন্ত্রাস দমন ব্যাপক মিলিটারি তৎপরতা চালিয়েও দীর্ঘকাল ধরে সম্ভব হয়নি। প্রকৃত মাওবাদের সঙ্গে এই বিকৃত মাওবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবু এই সন্ত্রাস তরুণ মনে আবেদন সৃষ্টি করেছে। বর্তমান জিহাদিষ্ট সন্ত্রাসের সঙ্গেও জিহাদিজমের একটা আইডোলজি যুক্ত রয়েছে। যদিও প্রকৃত ইসলাম ও প্রকৃত জিহাদিতত্ত্বের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এটা বিকৃত জিহাদিজম। তবু তরুণ প্রজন্মের বহু মুসলমানকে তা সম্মোহিত করছে।

এই বিকৃত আইডোলজির বিস্তার রোধ করার জন্য প্রকৃত ও সঠিক আইডোলজির বর্ম ব্যবহার করতে হবে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, তা করার মতো শক্তিশালী সরকারি অথবা বেসরকারি কোনো আন্দোলন দেশে-বিদেশে এখন কোথাও নেই। কমিউনিজমকে ঠেকাতে গিয়ে পশ্চিমা শক্তি টেরোরিজমকে ডেকে এনেছে। তারই বিস্তার এখন চলছে বিশ্বের সর্বত্র। কেবল সামরিক অভিযান, সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এই সন্ত্রাসকে সম্পূর্ণ পরাজিত করা যাবে না। সে জন্য চাই আইডোলজির অস্ত্র।

কিন্তু বর্তমান দুনিয়ায় গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর হাতেও সেই অস্ত্র এখন কোথায়? সুতরাং রাতারাতি এই সন্ত্রাস দমনের আশা করে বা তার দাবি তুলে কোনো লাভ নেই। এই সন্ত্রাস দমনের অভিযানে জনগণকে সম্পূর্ণ সম্পৃক্ত করতে হবে। অতীতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী আন্দোলনের মতো ব্যাপক সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদেরও এই আন্দোলন গড়ে তোলার সাহস ও শক্তি দেখাতে হবে। কেবল টিভি টক শোতে কিংবা সংবাদপত্রের কলামে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করে দায় সারলে সমস্যার সমাধান হবে না।

বাংলাদেশে সরকারের সদ্য সমাপ্ত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে সমর্থন না দিয়ে তাকে দমননীতি নামে অভিহিত করে বিক্ষোভ, জনসমাবেশের ডাক দিয়ে বিএনপি আবারও প্রমাণ করল- জাতীয় দুর্যোগের সময়েও তারা দুর্যোগ প্রতিরোধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে আগ্রহী নয়। সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করলেই যদি বিএনপির নেতা-নেত্রীরা চিৎকার শুরু করেন- এরা আমাদের নেতা ও কর্মী, তাহলে বুঝতে বাকি থাকে না, এই দলটির আসল চরিত্র কী? – সমকাল

লন্ডন, ১৭ জুন শুক্রবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment