কালান্তরের কড়চা

এই সন্ত্রাস ফ্যাসিবাদের নতুন চেহারা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

AGC 2

ব্রিটিশ এমপি জো কক্সের হত্যাকাণ্ড ও আমেরিকার অরল্যান্ডোতে এক সমকামী ক্লাবে অর্ধশত মানুষ হত্যা বিশ্ব সন্ত্রাসবাদে এক নতুন মাত্রা দান করেছে। মাত্রাটি হলো, এই সন্ত্রাসবাদ বিশ্বের যে কোনো স্থানে একযোগে হামলা চালানোর শক্তি রাখে। বাংলাদেশকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিশ্বের একক সুপার পাওয়ার আমেরিকাও এই সন্ত্রাসের কাছে অসহায়। এই সন্ত্রাস যেমন বাংলাদেশে সমকামীদের সমর্থক—এই অজুহাতে দুজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে পারে, তেমনি পারে আমেরিকার এক রাতে সমকামীদের ক্লাবে হানা দিয়ে শতাধিক মানুষকে হতাহত করতে। বিশ্ব ধনবাদের গর্ভে জন্ম নিয়ে এই সন্ত্রাসের যেভাবে বিশ্বায়ন ঘটেছে ও নানা চেহারায় বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে, তা বিশ্ব মানবতা ও গণতান্ত্রিক জগতের জন্য এক মহাবিপদ সংকেত।

এই সন্ত্রাসেরই অপর নাম ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদের জন্ম ঘৃণা থেকে। ধর্মান্ধতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ বা বর্ণবাদ, বিকৃত আদর্শ—যে কোনো কিছু অবলম্বন করে এই ঘৃণার জন্ম হতে পারে। অরল্যান্ডোয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এক তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি। আর জো কক্সকে হত্যা করেছে এক শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান জঙ্গি। পুলিশ সন্দেহ করছে, ব্রিটেনে বর্তমানে যে নব্য নাৎসিদের (neo-nagi) আবির্ভাব ঘটছে, তাদের সঙ্গে কক্সের হত্যাকারী টমাস মেয়ারের যোগাযোগ রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদেরও সে সমর্থক ছিল।

মেয়ার যে হ্যান্ডমেড গানটি কক্স হত্যায় ব্যবহার করেছে, সেটিও সে বানানোর কৌশল শিখেছে আমেরিকার নিওনাজি গ্রুপের সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে। আমাদের উপমহাদেশে যেমন উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে, আমেরিকায় তেমনি নিওনাজি বা উগ্র ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটছে ব্রিটেনের নব্য নাৎসিদের। এরা উগ্র জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী। কক্সের হত্যাকারী মেয়ার মনে করে, ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা যারা সমর্থন করে তারা দেশদ্রোহী। লেবার দলীয় এমপি জো কক্স ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের অবস্থান সমর্থন করেন। সুতরাং মেয়ার তাঁকে ঘৃণা করে এবং শেষ পর্যন্ত এই উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে তাঁকে হত্যা করেছে।

এর আগে দুজন ব্রিটিশ এমপির ওপর হামলা হয়েছে। তাঁরা ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন। এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ২৩৯ জন ব্রিটিশ এমপির মধ্যে ৪৩ জনই কোনো না কোনো ধরনের হামলার সম্মুখীন হয়েছেন।

শতাধিক এমপি জানিয়েছেন, তাঁদের অনবরত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। লন্ডনের ‘ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকায় বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর নাতনি ও সদ্য নির্বাচিত লেবার দলীয় এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের ওপর হামলা চালানোর নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই হুমকি আসছে দুই দিক থেকে। ইসলামী জঙ্গি ও ব্রিটিশ নব্য নাৎসিদের কাছ থেকেও। চরিত্রে এই দুই গ্রুপই ফ্যাসিবাদী।

শুধু টিউলিপ নন, সব ব্রিটিশ এমপিই কীভাবে সন্ত্রাসমুক্ত হয়ে তাঁদের জনপ্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তা ভেবে ব্রিটিশ সরকার বিচলিত। একটি ব্রিটিশ দৈনিক মন্তব্য করেছে, ‘The open nature of British democracy means MP’s will unfortunately never be entirely safe.’ (ব্রিটিশ গণতন্ত্রের খোলামেলা চরিত্রের জন্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমপিরা কখনোই সম্পূর্ণ নিরাপদ হবেন না)।

এ কথা শুধু ব্রিটিশ এমপি নন, বাংলাদেশের এমপিদের জন্যও সত্য। এখন পর্যন্ত তাঁরা টার্গেটেড কিলিংয়ের শিকার হননি। কিন্তু হতে কতক্ষণ? ব্রিটিশ মন্ত্রী ও এমপিদের চেয়েও বাংলাদেশের মন্ত্রী ও এমপিদের নিরাপত্তাব্যবস্থা অবশ্য বেশি বলে জানি। তাঁরা অনেকেই নিজেরাও নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে থাকেন। তাই জঙ্গিরা তাদের হত্যার টার্গেট করছে নিরীহ সাধারণ মানুষকে। কিন্তু এই হত্যা বন্ধ করতে না পারলে, ঘাতকদের ঘাঁটি সমূলে উচ্ছেদ করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে মন্ত্রী-এমপিরাও যে নিরাপদ থাকবেন না – এটা বলার জন্য জ্যোতিষী হওয়ার দরকার নেই।

আগেই বলেছি ফ্যাসিবাদের জন্ম ঘৃণা থেকে। ধর্মান্ধতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ বা বর্ণবিদ্বেষ ইত্যাদি এই ঘৃণার জন্ম দিতে পারে। এ জন্য ফ্যাসিস্টদের চরিত্র, চেহারা ও পরিচয় ভিন্ন। অরল্যান্ডোর গণহত্যাকারী, জো কক্সের হত্যাকারী ও বাংলাদেশের ঘাতকদের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ বা জাতিত্বের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তাদের চরিত্র ও লক্ষ্য অভিন্ন। তাদের চরিত্র ঘাতকের এবং লক্ষ্য তাদের ঘৃণার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মানবতার শত্রুতা করা। বাংলাদেশের জঙ্গি ও আমেরিকা-ব্রিটেনের ঘাতকদের চরিত্রের মধ্যে কোনো ব্যবধান নেই। তারা নতুন চেহারায় আবির্ভূত অভিশপ্ত ফ্যাসিবাদের আরেক রূপ।

গত শতকের প্রথম দিকে ইউরোপের জার্মানি, ইতালি, স্পেন, পর্তুগালে এই ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। হিটলারের জার্মানিতে এই ফ্যাসিবাদের পুঁজি ছিল ইহুদিবিদ্বেষ। লাখ লাখ ইহুদি নর-নারী ও শিশুকে এ জন্য তারা হত্যা করেছে। মুসলমানদের কাছে যেমন কারবালা, তেমনি ইহুদিদের কাছে হলোকাস্ট এক চরম ট্র্যাজেডির প্রতীক।

এই ফ্যাসিবাদের জন্মও বিশ্ব ধনবাদের গর্ভে। রাশিয়া কমিউনিস্ট বিপ্লব তখন সদ্য সফল হয়েছে। বিশ্ব ধনবাদ মাত্র সূচনা পর্বে রয়েছে। ব্রিটেন ও আমেরিকা তার নেতা। কমিউনিজমকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এক নম্বর শত্রু বিবেচনা করে তাকে ঠেকানোর জন্য পশ্চিমা শক্তি প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজিত জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের বিকাশে সহায়তা জোগায়। নাৎস পার্টি গঠনে ও তাদের ক্ষমতা দখলে সাহায্য জোগায় ইঙ্গ-মার্কিন জোট। বর্তমান বাংলাদেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর মতো তখন ছিল ব্রিটেনের একদল শীর্ষ বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা। তাঁরা স্লোগান তুলেছিলেন, ‘better dead then Red’, কমিউনিস্ট হওয়ার চেয়ে মৃত্যু ভালো।

১৯৫৩ সালে মৃত্যুর আগে স্তালিন বলেছিলেন, ‘ধনবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ কখনো অভিন্ন থাকতে পারে না, তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হবেই।’ স্তালিন এ কথা বলার বহু আগে ১৯৩৯ সালেই কথাটার সত্যতা প্রমাণিত হয়। পুঁজিবাদী বিশ্বের দুই রাষ্ট্র ব্রিটেন ও জার্মানি আরেকটি মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকাও তাতে যোগ দেয়। দীর্ঘ সাত বছর বিশ্বধ্বংসী মহাযুদ্ধের পর ইউরোপে বর্বর ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে। আটলান্টিকে এক জাহাজে বসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল স্বাক্ষর দিলেন এক ঐতিহাসিক চার্টারে; যার নাম আটলান্টিক চার্টার। এই চার্টারে বিশ্ববাসীকে আশ্বাস দেওয়া হলো, পৃথিবীতে যুদ্ধ আর হবে না। ফ্যাসিবাদকে মাথা তুলতে দেওয়া হবে না।

কিন্তু কমিউনিজমের বিরোধিতা বিশ্ব ধনবাদকে এমনভাবে পেয়ে বসেছিল যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার চার বছর না যেতেই জাতিসংঘের নাম ব্যবহার করে (তার অনুমতি ছাড়া) উত্তর কোরিয়ায় কমিউনিস্ট সরকারকে দমনের নামে আমেরিকা কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং চীনের ওপর হামলা চালানোর প্রস্তুতি নেয়। তারপর একে একে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, লাওস, কম্বোডিয়ায় যুদ্ধ বিশ্বে আবার সমরবাদী দানবের জন্ম দেয়। এই সমরবাদী দানবই শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের পুনর্জন্ম ঘটায়, যা এখন নব্য ফ্যাসিবাদ নামে পরিচিত।

গত শতকে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল ধনবাদ; উদ্দেশ্য সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের অভিযাত্রা ঠেকানো। ভাগ্যের পরিহাস, নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বিরুদ্ধেই শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন ও আমেরিকাকে লড়তে হয়েছিল। এটা ছিল প্রথম মহাযুদ্ধের পরের ঘটনা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পশ্চিমা শক্তিই এশিয়া-আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন অনেক দেশে সামরিক অভ্যুত্থানে সাহায্য জুগিয়ে সামরিক ডিক্টেটরশিপ প্রতিষ্ঠা করে এবং গণতন্ত্রের পতন ঘটায়। আফগানিস্তানে সমাজতান্ত্রিক নজিবুল্লাহ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য তালেবান, মুজাহেদীন ইত্যাদি ধর্মীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম দেয়। দীর্ঘকাল আল-কায়েদা পেয়েছে মার্কিন সাহায্য ও সহযোগিতা। সিরিয়ায় সেক্যুলার আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য তৈরি করা হয় সন্ত্রাসী আইএস সংগঠন। যা আজ মানবতা ও বিশ্বশান্তির জন্য এক ভয়ানক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদ মূল ফ্যাসিবাদেরই নতুন রূপান্তর।

গত শতকে নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বিরুদ্ধে ইঙ্গ-মার্কিন জোটকে যুদ্ধে নামতে হয়েছিল; এই শতকে তাকে যুদ্ধে নামতে হয়েছে তারই হাতে গড়া ধর্মীয় ফ্যাসিবাদরূপী ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের ওপর বিশ্বমানবতা ও সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। এই যুদ্ধে সাফল্য লাভের জন্য বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রয়োজন। কিন্তু আমেরিকার আধিপত্যবাদী ভূমিকার জন্য সে ঐক্যও গড়ে উঠছে না।

প্রতীয়মান হয়, আমেরিকার লক্ষ্য এই সন্ত্রাসবাদকে সম্পূর্ণ পরাজিত করা নয়, বরং সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের সামরিক ঘাঁটির বিস্তার ও আধিপত্য স্থায়ী করা। এই মার্কিন নীতির ফলে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আইএস এখনো চূড়ান্তভাবে পরাজিত হচ্ছে না।

যেসব দেশে আইএস নেই, সেসব দেশে তাদের অনুসারী ও অনুরাগীরা সন্ত্রাস চালাচ্ছে। বাংলাদেশে হাসিনা সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে এই ফ্যাসিবাদী উত্থান দমনের জন্য। এর পূর্ণ সাফল্য নির্ভর করে বিশ্ব সন্ত্রাস দমনে পশ্চিমা শক্তির আন্তরিকতার ওপর।

এখন প্রশ্ন, বিশ্বব্যাপী এই নব্য ফ্যাসিবাদ দমনে সন্ত্রাসবিরোধী বিশ্ব ঐক্য গড়ে উঠবে কি না। – কালের কন্ঠ

লন্ডন সোমবার, ২০ জুন, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment