আওয়ামী লীগের ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস

তোফায়েল আহমেদ –

Flag

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন। ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার লালসূর্য অস্তমিত হয়েছিল। যারা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন-মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অকালপ্রয়াত নেতা শামসুল হক-তারা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার জন্য ঐতিহাসিক এই ২৩ জুন তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে থাকার দুর্লভ সুযোগ হয়েছিল আমার। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আমি শুনেছি, তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছি যে, এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয় নাই। একদিন বাঙালির ভাগ্য-নিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই প্রথমে তোমাদের ছাত্র-সংগঠন ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছি। তারপর ২৩ জুন এই ঐতিহাসিক দিনটি বেছে নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছি। লক্ষ্য ছিল একদিন বাংলাদেশকে স্বাধীন করা।’ আজ আওয়ামী লীগের ৬৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সেসব কথা আমার মানসপটে ভেসে ওঠে।

জাতির জনক যে লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ, ’৬২-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে বাংলার মানুষকে মহান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ’৬২তে আমাদের স্লোগান ছিল ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো; ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’। ’৬৬তে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দিয়েছিলেন লাহোরে। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখে ৬ দফা দিলেন। বিমান বন্দরে জাতির সামনে ৬ দফা পেশ করলেন এবং ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে জাতির জনক আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন এবং শহীদ জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক হলেন। ৬ দফা দেয়ার পর বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন ‘সাঁকো দিলাম, এই সাঁকো দিয়েই একদিন আমরা স্বাধীনতায় পৌঁছাব।’ ছয়- দফা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজমন্ত্র তথা অঙ্কুর। কাউন্সিল অধিবেশনের শেষদিন অর্থাৎ ২০ মার্চ চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় দলীয় নেতাকর্মী ও দেশবাসীর উদ্দেশে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘চরম ত্যাগ স্বীকারের এই বাণী লয়ে আপনারা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত প্রদেশের প্রতিটি মানুষকে জানিয়ে দিন, দেশের জন্য, দশের জন্য, অনাগতকালে ভাবী বংশধরদের জন্য সবকিছু জেনে-শুনেই আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীরা এবার সর্বস্ব পণ করে নিয়মতান্ত্রিক পথে ছয় দফার ভিত্তিতে দেশব্যাপী আন্দোলনের জন্য এগিয়ে আসছে।’ সেদিনের বক্তৃতায় তিনি আরও বলেছিলেন ‘ছয়-দফার প্রশ্নে কোন আপোস নাই। রাজনীতিতেও কোন সংক্ষিপ্ত পথ নাই। নেতৃবৃন্দের ঐক্যের মধ্যেও আওয়ামী লীগ আর আস্থাশীল নয়। নির্দিষ্ট আদর্শ ও সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ঐক্যেই আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ নেতার দল নয়-এ প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রতিষ্ঠান।’ সত্যিকার অর্থেই আওয়ামী লীগ কর্মীদের প্রতিষ্ঠান।

৬ দফা দেয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা মামলার আসামি হিসেবে ফাঁসি দেয়ার চেষ্টা করা হলো। আমরা জাগ্রত ছাত্র সমাজ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে রাজপথে নেমে এসে গণ অভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিলাম। আসাদ, মকবুল, রুস্তম, মতিয়ুরসহ অসংখ্য শহীদের বিনিময়ে। তখন আমরা স্লোগান দিতাম ‘পাঞ্জাব না বাংলা, পিন্ডি না ঢাকা’। এভাবে ধাপে ধাপে আমরা আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি এবং জাতির পিতাকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞ চিত্তে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছি। তারপরে আওয়ামী লীগ ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। যখন ১ মার্চ জাতীয় সংসদের পূর্বঘোষিত ৩ মার্চের অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত ঘোষণা করল ইয়াহিয়া খান তখন দাবানলের মতো আগুন জ্বলে উঠল। রাজপথে লক্ষ লক্ষ লোক নেমে এলো। শুরু হলো আরেক দফা আন্দোলন। তারপর জাতির জনক ৭ মার্চ সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে তিনি সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করলেন এবং শেষ করলেন এই কথা বলে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই বক্তৃতাটিই ছিল আমাদের ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বঙ্গবন্ধু ৯ মাস মিয়ানওয়ালী কারাগারে কারারুদ্ধ অবস্থায় যখন মৃত্যুর প্রহর গুনছেন, আমরা তখন হাতিয়ার তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে ১৬ ডিসেম্বর দেশকে স্বাধীন করেছি। সুতরাং জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের এই যে ইতিহাস, তার শুরু আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই; সুতরাং আওয়ামী লীগের অর্থই হলো সংগ্রাম।

পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন। কাউন্সিলে অনেক আলাপ-আলোচনার পর জাতীয় ও দলীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আমরা সাব্যস্ত করি মহান জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগের পতাকা তাঁরই হাতে তুলে দেব। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। একই বছরের ১৭ মে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বৃষ্টিমুখর দিনে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন। ওইদিন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ৭৩৭ বোয়িং বিমানে ভারতের রাজধানী দিল্লী থেকে কলকাতা হয়ে সে-সময়ের ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে বিকেল সাড়ে ৪টায় এসে পৌঁছেন। সারাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে সেদিন বিমান বন্দরে সমবেত হয়।

দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ সাফল্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে যোগ্যতার সঙ্গে দলকে গণরায়ে অভিষিক্ত করে তিনবার সরকারে অধিষ্ঠিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। নিষ্ঠার সঙ্গে, সততার সঙ্গে, অত্যাচার-অবিচার সহ্য করে, জেল-জুলুম নির্যাতন ভোগ করে আওয়ামী লীগকে বাংলার মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ’৭৫-এর পর অনৈক্য আর ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ যখন কঠিন সময় অতিক্রম করছিল, তখন তিনি দলের হাল ধরেছিলেন। সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তখন সামরিক শাসকের দুঃশাসনের কবলে নিপতিত। দীর্ঘকাল সংগ্রাম করে সেই দুঃসময় থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছেন। ’৮১-এর সম্মেলনে সবাই ধরে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা জীবন-পণ চেষ্টা করে সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে আওয়ামী লীগের ঐক্য ধরে রেখে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর দলের নেতৃত্বভার অর্পণ করেছিলাম। যেদিন তিনি ফিরে এলেন সেদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করেছিলেন তারা শেখ হাসিনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকেই যেন ফিরে পেয়েছে।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ও ৩ নবেম্বরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তুলেছিলেন স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়া। চারদিকে গড়ে তোলা হয়েছিল এক সর্বব্যাপী ভয়ের সংস্কৃতি। ’৭৬-এর ১ আগস্ট সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া সীমিত পরিসরে ‘ঘরোয়া রাজনীতি’ করার অনুমতি দেন। আমরা যারা জেলে ছিলাম এবং যারা জেলের বাইরে ছিলেন তারা দলকে সংগঠিত করেছিলেন। তখন প্রয়াত মহিউদ্দীন আহমেদকে সভাপতি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করে আওয়ামী লীগ পরিচালিত হয়। রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যে ’৭৭-এর ৩ ও ৪ এপ্রিল মতিঝিলের হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে কয়েক হাজার নেতাকর্মী সমবেত হয়। নেতৃবৃন্দ মতবিরোধ নিরসন করে দলীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার্থে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে। ’৭৭-এর এপ্রিলে আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হওয়ার এক বছর পর ’৭৮-এর ৩ থেকে ৫ মার্চ ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কারান্তরালে থাকা অবস্থায়ই আমাকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয়। সম্মেলনে আবদুল মালেক উকিল সভাপতি, আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক ও আমি সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই।

’৮১-এর সম্মেলনে সবারই ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবে। সম্মেলনের সমাপ্তি দিবসে সন্ধ্যার প্রাক্কালে সকলের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমি যখন দলীয় প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু কন্যার নাম প্রস্তাব করি, তখন তা সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। সেকি আনন্দ-উচ্ছ্বাস, সেকি দৃশ্য! চোখের সামনে সেই ছবি ভেসে ওঠে। আওয়ামী লীগের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন সংঘটিত করে দীর্ঘ ২১ বছর পর ’৯৬-এ আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসীন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করে আমরা মন্ত্রী হয়েছি, ৫ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করে আমাদের হারানো গৌরব স্বাধীনতার সুমহান চেতনা প্রতিষ্ঠার পথে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। ২০০১-এ বিশাল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে হারানো হয়। ২০০৮-এর নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ আমলে আমরা যদি দেশের উন্নয়নের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে, বিস্ময়কর উত্থান এই বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল-এক, বাংলার স্বাধীনতা; দুই, শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আজ জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলার মানুষ সেই অর্থনৈতিক মুক্তি পেতে চলেছে। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে খাদ্যাভাব ছিল, এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে খাদ্যশস্যে আমরা উদ্বৃত্ত শুধু নই, বাংলাদেশ এখন খাদ্য রফতানিকারক দেশ। যখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তারপর থেকে আমাদের রফতানি ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে আজ তা প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীদের থেকে আয় ১৫ বিলিয়ন ডলার। ১৯৭১-এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩৯ বছর; একই কালপর্বে ভারতের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫০ বছর; আর ২০১৪-এর হিসাব মতে, বর্তমানে ভারতের মানুষের গড় আয়ু ৬৬ বছর, পাকিস্তানের ৬৫ বছর আর বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৬৯ বছর। ১৯৭১-এ ৫ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে বাংলাদেশে ছিল ২২৫ জন; ভারতে ১৬৬ জন। আর এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় বাংলাদেশে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪৬-এ আর ভারতে তা ৬৫ আর পাকিস্তানে ৭২ জন। আর্থ-সামাজিক সকল ক্ষেত্রেই আমরা এগিয়ে চলেছি। নোবেল লরিয়েট অমর্ত্য সেনের ভাষায়, ‘সামাজিক-অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। কোন কোন ক্ষেত্রে ভারত থেকে এগিয়ে।’ গত বছর ডিসেম্বর মাসে কৌশিক বসু এসে বলে গেলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি চমৎকার। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বিশ্বে একটি মডেল।’ মানব সূচক উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বিস্মিত জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, ‘অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের উচিত বাংলাদেশকে অনুসরণ করা।’

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটানা ১৪ বছর দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। তারপর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও তাঁর কাছে থেকে কাজ করেছি। এছাড়াও মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি। আমার বার বার মনে হয়েছে যখন তার কাছে বসি বা ক্যাবিনেট মিটিং করি বা সভা-সফর করি, তখন বঙ্গবন্ধুর কথা আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর জীবনে রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি যা বিশ্বাস করতেন তাই করতেন; একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার সঙ্গে আপোস করতেন না এবং ফাঁসির মঞ্চে গিয়েও মাথা নত করতেন না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও আমাদের জাতির জনকের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে সেই আদর্শ অর্জন করেছেন। তিনিও লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করেন এবং সেই লক্ষ্য পূরণে থাকেন অবিচল।

প্রিয় মাতৃভূমির স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে শেখ হাসিনা অঙ্গীকার করে বলেছিলেন, ‘৫০ বছরের গ্যাসের মজুদ না রেখে আমি গ্যাস রফতানি করব না।’ সেই অঙ্গীকার তিনি সমুন্নত রেখেছেন এবং দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে শক্তিশালী করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। শেখ হাসিনা সর্বশেষ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে খোদ আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের জাতিগত পক্ষপাতিত্বের কথা খুবই স্পষ্ট করে বলেছেন। শেখ হাসিনাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন টেলিফোনে অনুরোধ করে কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ রহিত করতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু জন সাধারণের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শেখ হাসিনাকে টলাতে পারেননি। ফারাক্কার পানি বণ্টনে বঙ্গবন্ধু সরকার শুষ্ক মৌসুমে পেয়েছিল ৪৪ হাজার কিউসিক পানির নিশ্চয়তা। সেই পানি কমতে কমতে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে ৯ হাজার কিউসিকে নেমেছিল। আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনায় সুযোগ পেয়ে প্রথমেই পানি সমস্যার সমাধানে ঐতিহাসিক গঙ্গা চুক্তি করেছে। একটা সময় ছিল যখন আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থকও অনেকে মনে করত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত অনিশ্চিত এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন; রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্তি যেন এক দুঃস্বপ্ন। কিন্তু শেখ হাসিনার বাস্তবোচিত রাজনৈতিক কর্মতৎপরতায় আওয়ামী লীগ তিনবার গণরায় নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্বভার লাভ করেছে। আজ সমগ্র বিশ্বে বিশেষ করে কৃষি উৎপাদনের পথিকৃৎ বাংলাদেশ। ’৯৬-এ আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে তখন দেশের খাদ্য ঘাটতি ছিল ৪০ লাখ মেট্রিক টন। সেই খাদ্য ঘাটতি পূরণ করে বাংলাদেশকে তিনি উন্নীত করেছেন খাদ্য রফতানিকারক দেশে। ধান, গম ও ভুট্টা জাতীয় ফসলে বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই অগ্রসরমান বাংলাদেশ। বর্তমান বিশ্বে প্রতি হেক্টর জমিতে গড় উৎপাদন প্রায় ৩ টন আর বাংলাদেশে তা ৪ দশমিক ১৫ টন। ২০১৪-এর ৭ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কো প্রধান ইরিনা বোকোভা শেখ হাসিনার হাতে ‘শান্তি বৃক্ষ’ পদক তুলে দেয়ার সময় বলেছিলেন, ‘সাহসী নারী শেখ হাসিনা সারা পৃথিবীকে পথ দেখাচ্ছেন।’ ২০০৮-এর নির্বাচনে জয়লাভের পর সফলভাবে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি ও সমুদ্রসীমা নির্ধারণ চুক্তি করেছেন। বিশ্ব ব্যাংকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে পদ্মা সেতু নির্মাণের মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আসলেই শেখ হাসিনা না থাকলে পদ্মা সেতু হতো না। বঙ্গবন্ধু সেতু, বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেলপথ নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের উদ্যোগ, মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ এসবই তাঁর নেতৃত্বে যুগান্তকারী কাজ। দেশে বিদ্যুত উৎপাদনে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া বিদ্যুতের বিপুল ঘাটতি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করে জনজীবন থেকে লোডশেডিং দূর করেছেন। বিগত সাত বছরে রাজধানী ঢাকার উন্নয়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন। যার ফলে ঢাকার চেহারাই পাল্টে গিয়েছে। নয়নাভিরাম হাতিরঝিল প্রকল্প, চলাচলের সুবিধার জন্য নিত্য-নতুন ফ্লাইওভার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের অবদান।

২০০৭-এর ১/১১-এর পরে ১৬ জুলাই যেদিন শেখ হাসিনাকে বন্দী করা হয়, সেদিন তিনি জিল্লুর রহমান সাহেবকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বভার অর্পণ করেন। সেদিনই আমি জিল্লুর রহমানের বাসভবনে যাই। তিনি আমাকে বুকে টেনে নেন। তাঁকে জড়িয়ে ধরেই অঙ্গীকার করেছিলাম, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও এই কঠিন দুঃসময়ে আপনার নেতৃত্বে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করব। জিল্লুর রহমান সাহেব আমাকে দলের মুখপাত্র এবং চৌদ্দ দলের সমন্বয়কের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেখানেও ১৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির কনভেনর হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। আমি যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ‘শেখ হাসিনা ছাড়া কোন নির্বাচন না, শেখ হাসিনা ছাড়া কোন সংলাপ না’-সেই সিদ্ধান্ত আমরা অটুট রেখেছিলাম। যে কারণে তৎকালীন সেনাসমর্থিত সরকার স্ত্রী, কন্যা এবং আমার নামে মিথ্যা মামলা দেয়। আমার স্ত্রী ও মেয়েকে হাইকোর্টে গিয়ে জামিন নিতে হয়। এমন অবস্থা হয়েছিল যে, কঠিন অসুস্থতা সত্ত্বেও আমাকে বিদেশ যেতে দেয়া হয়নি। সে এক কঠিন সময়। নির্বাচনে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে শেখ হাসিনার দাবি তথা গণদাবি অনুযায়ী ১/১১’র সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও জাতীয় পরিচয়পত্রের দাবি মেনে নিয়ে তা প্রণয়নে বাধ্য হয়েছিল। কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির সামনে ঘোষণা করেছিলেন রূপকল্প-২০২১। তাতে তিনি প্রধান দুটি অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিলেন এক. ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন দুই. মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে দুটোই এখন বাস্তব। সম্প্রতি জাপানের উপদ্বীপ ইসে-শিমায় জি-৭ ভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের আউটরিচ বৈঠকে অংশগ্রহণ করে দেশকে এক অনন্য-উচ্চতায় তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ব সম্পদের ৬৪ শতাংশের অধিকারী বিশ্বের শক্তিশালী ও উন্নত রাষ্ট্রসমূহের নেতৃবৃন্দের প্রতি পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবেলা এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গীবাদমুক্ত বিশ্ব গঠনের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

শতরকম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জাতির জনকের হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত। সংবিধান এবং সাংবিধানিক শাসন সমুন্নত রাখতে আওয়ামী লীগ বদ্ধপরিকর। কেননা আওয়ামী লীগ নিয়মতান্ত্রিক দল, গণতান্ত্রিক দল আর নিয়মতান্ত্রিক দল বলেই সেই ’৫৪ সাল থেকে অনুষ্ঠিত-’৮৮-এর এবং ’৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রহসনের নির্বাচন বাদে-প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করেছে। এমনকি স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের আমলে অনুষ্ঠিত বেসিক ডেমোক্র্যাটিক ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করেছিল।

সংবিধান মোতাবেক আগামী ২০১৯-এর ২৯ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের যে কোন দিন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে। আমার বিশ্বাস সেই নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহণ করবে। কেননা ২০১৪’র ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে তারা যে ভুল করেছে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে নিজেদের দলীয় অস্তিত্বকে বিপন্ন করে বিপজ্জনক পথে এগোবে না। সুতরাং, সকলের শুভবুদ্ধির প্রয়োগ ঘটিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অক্ষুন্ন রেখে জাতীয় অগ্রগতিকে সমুন্নত রেখে চলতে পারলে আমরা ২০২১-এ মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪২-এ উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে সক্ষম হব। জাতির জনকের আদর্শ ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের গৌরবময় সংগ্রামী পতাকা উর্ধে তুলে ধরে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সোনার মানুষ তৈরি করে সোনার বাংলা কায়েম করাই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অভিপ্রায়।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য,

বাণিজ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

tofailahmed69@gmail.com

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment